উইপিং উইমেন

সুবর্ণা গোস্বামী




নারী এক আশ্চর্য মুকুট। রৌদ্র তাকে চেয়েছিল, চেয়েছিল নদীর উৎসে তীব্রতম জল। কিন্তু তাকে নিয়ে গেল নীল উত্তরীয়। তবুও সে এখানে নেই তা নয়। নৌকার মাঝখানে গভীর খাঁজে সে দুঃখ, নদীর ছলছল জলে সে জেগে থাকা নৈঃশব্দ্য। এসো তার সাথে পরিচয় হোক। তন্তু চেনো, চেনো রঙ? প্রসাধনের নিচে ক্ষতের জ্যামিতি কতটা জেনেছ? সে হতে পারে ত্রিভুজ বা বহুভুজ— কিন্তু বাহুর রহস্যভেদ করতে কজন পারে? তন্তুগুলি যতটা সেলাই করতে পারত বুকে তার, তারও বেশি হাহাকার। তবু সে আঁকতে পারে মাছ ও সাঁতার, ওড়াতে পারে নকশা আঁকা ঘুড়ি! এমনকি নিজের লাশের পাশে বসে সে বাজাতে পারে ভায়োলিন। ভালোবাসার জন্য— বরং শৈশবে ফিরি। একটা বৃদ্ধ গাছ তার চিরে দিয়েছিল যোনি। মনে পড়ে? মুক ও মুখের লড়াইয়ে জিতেছিল মুক। নয়ত গল্পটা হতে পারতো গোলাপি। কৈশোরে একটা নীল ফুলের দিকে ছুটে গিয়েছিল তারপর বিষেই আটকে রইল মায়া প্রজাপতি। আর্তনাদ চেন? হয়ত না। একটানে ছিঁড়ে নেয়া কুসুম, চিৎকারের আগেই যার পরিচয় হয় শূন্যের সাথে— তার কোন আর্তনাদ থাকে না। পরিচিত হও মুখের সাথে। বিক্রিত এবং বিকৃত ঠোঁটে উন্মাদের যৌনতা। চিবুকে তিল ছিল, খুঁটে নিয়েছে বিষণ্ণতা। আর যেখানে নাকফুল সেখানে বিস্তীর্ণ মাঠের মতো নিঃসঙ্গতা। তুমি তার কোন দিকে যেতে চাও? দশ দিকে খুন হয়ে পড়ে আছে তার সব রঙ এবং রঙ হবার বাতুলতা। নারীর কোন পোশাক হয় না। সে যাই পরে প্রথমে তা নগ্নতা হয়, তারপরে সাপ, তারপর আগুন। শরীর ও ত্বকের ভেতরে ঢুকে যায় বিবিধ হেঁয়ালির নেশা। নেশায় সে ক্রমশঃ শীৎকার হতে থাকে। একে সুখ বলে— এই ভেবে সে যেই প্রবেশ করতে যায়, তুমুল নেশায় শুরু হয় মদের তামাশা। কাচপাত্রের মতো ভেঙ্গে যায় আত্মবিশ্বাসের চূড়া। সে ফেরে। ঘরে তবু দেয়ালের ইতিহাস আছে, মৃত পিয়ানো এবং একটিমাত্র মদের গ্লাস আছে। তুমি কি আজ গান করবে পাখি? নীল উত্তরীয় নিয়ে অথবা যোনি? উন্মাদ পিয়ানো বেজে ওঠে, কেটে যায় ব্যথিত আঙ্গুল; হায়! এই পৃথিবীতে এত কোমলেও এতটা আঘাত বুকে বাজে! আঙ্গুল শান্ত হোক সোনা, চলো যাই। পানপাত্রে মিশিয়ে দিয়েছি তোমার প্রিয় বিষ। তাকে বলো না, আত্মহনন আমার সবচেয়ে প্রিয় খেলা। সে তার পোশাক প্রসাধনী খুলে ক্ষতগুলি উন্মুক্ত করে। হাত বুলিয়ে নেয় প্রেমিকের চুমু আর স্পর্শের সম্মোহনে। তারপর বিষ ঢেলে দেয় সারাশরীরে। রোজকার আত্নহনন শেষে মেয়েটি এবার চিৎকারের মতো ভঙ্গী করে। কিন্তু তার কান্না কণ্ঠের কাছে এসে লাভার মতো হঠাৎ পাথর হয়ে যায়। একজন তবু আছে। মেয়েটির মৃতদেহ কোলে নিয়ে রোজ রাতে ঘুম পাড়ায়। হাতে ভায়োলিন, লাল চুল উড়ছে হাওয়ার। নারীরা মুকুট হয়ে পৃথিবীতে আসে ঘুঙুর হয়ে ফিরে যায় ।

২.
এইবার সে জন্মায় তুলি হয়ে। ধীরে মুছতে থাকে বুকে গাঁথা বরফের তীর। জিহ্বার শীতল হিসহিস শিষ হয়ে ওঠে। একটা নদীকে নিয়ে সে হঠাৎই বসে যায় পাথুরে দাবায়। একটা ঘোড়া তার সঙ্গী হয়। দৌড় ও দৈর্ঘের সাথে যোগাযোগে কিছুদূর আসে। তারপর একটা মাছ— আর কিছু না। আদিবাসী রমণীর কর্কশ কালো কোমর তৈরি করে উন্মাদের আস্তানা। বিলুপ্ত আঙুর, কামরঙা, মদ এবং একটি সম্মোহিত কুকুর তাকে অনুসরণ করে। ধুলারা সম্মিলিত হয়ে তৈরি করে দিতে থাকে কারুকার্য খচিত পথ। সে লক্ষ করে তার মাথায় সোনালী মুকুট। কিন্তু সে জানে, মুকুটের জন্য সে নয়। এটা ভাবার পরমুহূর্তেই মুকুটটি কালো হয়ে যেতে থাকে। কোথায় যাচ্ছি আমরা? স্মরণ করো শূন্য ও কদর্য, মায়া ও সাপ। হিসেব করে দেখ, নিমফুল কোথাও ফোটেনি। যেখানে সাপ নেই, জিভ নেই, মদ বা ডাহুক নেই সেখানে আমার মায়াও যাবে না। নাও তবে, উন্মুক্ত করো, শুষে নাও তুমুল ধারা। অগ্নিতে প্রবেশ করো, উন্মুখ হও, বহুগামী হও, হও প্রকৃতই প্রাকৃতিক। তারপর যাব সেই শান্ত মধুপুর, নৌকার ছইয়ের ভেতর চরমপুলকের মতো মন্দ্রিত বাঁশি। লাল চুলের সেই ছেলেটি— আমি বা সে, সবারই গন্তব্য নিজের শরীর। অথচ উপায় নেই, নিয়ম এটাই— শরীরের ময়ূরনাচ নর্তকী দেখে না।

ছবি ঋণ: The Weeping Woman by Pablo Picasso