তুমি আঁকো, চিত্রলিপি

অপরাহ্ণ সুসমিতো




১. আমার মৃত্যু সংবাদ লিখছি


The body of 23-year-old Evelyn McHale rests atop a crumpled limousine minutes after she jumped to her death from the Empire State Building, May 1, 1947.
Photo: Robert Wiles

আমার মৃত্যু সংবাদ লিখছি। খটাখট টাইপ করছি। নামের বানান লিখতে গিয়ে উত্তেজনায় অপরাহ্ন লিখে ফেলছি যেমন অধিকাংশ বন্ধুজন লেখেন। আবার টাইপ করতে গিয়ে নিজের কাছেই দ্বন্দ্ব হচ্ছে। কম্পিউটারে বানান ভুলে সমস্যা নেই, মুহূর্তে ঠিক করতে পারছি।

অগ্রিম দেখতে পাচ্ছি নূরজাহান চক্রবর্তী লাইক দিচ্ছেন। জাহ্নবী মাসী সংক্ষেপে আরআইপি লিখছেন। যে সূচালু আহমেদের কাছে ১৪৩০০ টাকা পেতাম, তিনি সবচেয়ে বড় কমেন্ট লিখছেন বিনিয়ে ইনিয়ে। মধু ভাই এখনো জানেন না। উনি প্রতি মাসের ২৮ তারিখ বেতন পান, সেদিন ফেসবুকে লগইন করেন। উনি খুব কষ্ট পাবেন ভাবতেই একটা কষ্ট কাবেরী নদীর মতো তিরতির করল বুকের হিমালয় পাদদেশে।

আমি যে মন্ত্রণালয়ে কাজ করি,সেখানে বেশুমার ঘুষ। সহকর্মীরা চটজলদি চাঁদা দিতে শুরু করেন স্মরণ সভার। ঘুষখোর লোকজন খুব উদার হয় এরকম দান খয়রাতে। বেতনের টাকায় গয়া কাশী যায়, হজ্ব করে আর ঘুষের টাকায় বউকে বাদামী ব্রা কিনে দেয়। ফেসিয়াল করে, এবেনটি বায়স্কোপ করে।

আমার ড: যে হাসপাতালে কাজ করেন সেখানে ৮০% কর্মকর্তা কর্মচারী পরষ্পর প্রেম করেন। ড: আমার ডেথ সার্টিফিকেট খসখস লিখতে লিখতে খিকখিক হাসেন ;

: প্রেমের আবার প্রথম শেষ কি?

সামরান হুদা মাথা নিচু করে গল্প লিখছেন পাতার পর পাতা। মনটা রাজশাহী আমের মতো টুপলু হয়ে আছে; আহা সামরানের লেখা আর পড়ব না। মৃত্যুর পরেও আমার ইমেইল একই পাসওয়ার্ড থাকবে। খনাকে কি পাসওয়ার্ড দিয়ে যাব? সে আমার হয়ে জবাব দিবে।

খনা ছলছল কাঁদতে কাঁদতে বলবে;
: এই আমি মানস কন্যা, কত মানুষ স্বপ্নে নদীর ছবি আঁকে। তুমি এঁকেছিলে ছায়ায় ছায়ায় আমাকে। দাও রক্ত দাও এক প্রভু জীবন।

হাঁটতে হাঁটতে পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম,বাসার চাবির রিং, ফোনে অণু টেক্সট। তুমি ঘরে ফিরছ। কচুর লতি দিয়ে হাপুস হুপুস ভাত খাচ্ছ। খাবার সময় কাউকে সুন্দর লাগে না কেবল ছোট দুধের শিশু ছাড়া।
মৃত্তিকা নতুন ছবি পোস্ট করেছে। এতো মুটিয়েছে তবুও শরণার্থী ভক্তের থকথকে দল কমেন্টের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। এতো কবি আমাদের বাংলা ভাষায়। টেলিভিশনে কবিতা, গুলিস্তানে কবিতা, রিক্সায় জড়াজড়ি কবিতা, আওয়ামী বিএনপি কবিতা, ফালতু কবিতা, নমোশুদ্র কবিতা, সৈয়দ কবিতা, লকডাউন কবিতা...

সৃজিত মুখর্জীর ‘শাহজাহান রিজেন্সি’ছবিটার দৃশ্য ভাসছে। কমলিনী’র লাশটা গাড়ির ছাদে রক্তাক্ত পড়ে আছে। বৃষ্টি হচ্ছে। সবাই ছাতা মাথায় কমলিনীকে দেখছে। আমরা ভাবি একজন হস্টেস কেবল দেহ বিক্রিই করে। একজন হস্টেস তার ক্লায়েন্টকে সেক্সুয়ালি এন্টারটেন করা ছাড়া আর কী করবে? এটা ভুল। কমলিনীর কাছে লোকে মগজের জন্য আসে। কমলিনীর ক্ষেত্রে সেক্সুয়াল অরগ্যাজমের সঙ্গে সঙ্গে ইন্টেলেকচুয়াল অরগ্যাজম খুব গুরুত্বপূর্ণ। লোকে সে জন্যও আসে ওর কাছে। ওর অসম্ভব পড়াশোনা আছে। নেরুদা থেকে স্টকমার্কেটের বিষয়, খেলোয়াড়দের নাম...যে কোনোও আলোচনায় কমলিনী মেধার উজ্জ্বল মুখ। ওর ইমোশনাল গ্রাফটা পুরো পয়েন্টেড। কখনও পাঁচ তো কখনোও নব্বই। ভীষণ ডিগনিফায়েড চরিত্র…

তবু বেঁচে থাকার লড়াইয়ে পরাজিত হয়...

এইসব পাঠ করে করেই নিজস্ব মৃত্যুর নোট লিখছি...
আহা..


২. আলোয় আলোয় মুক্তি



Charlie Chaplin
এসব কথামালা মনে সাথী করে গাছটা পার হচ্ছি। আমার কানে আসতে লাগল পাখিদের কাকলী। সেই পরিচিত! ক্রমে আরো স্পষ্ট! ঐ অত উঁচু দালানের সামনে আমি ওপরে তাকাই। কী যেন খুঁজি...

অবাক চোখে দেখি ২য় তলায় সেই খাঁচা ! নীল রঙের ! আর সেই ওরা !
মানুষের সাথেই মানুষের হয় না আর পাখিদের সাথে টেলিপ্যাথি! আমি যখন যাই রোজ সকালে ওরাও বুঝি আমাকে লক্ষ্য করে..


আজ মেট্রো থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে কথা বলছিলাম পাখিগুলোর সাথে। দূর থেকেই জানি গাছটা খালি। বলছিলাম কাল অনেক ভোরে আসতে হবে, তোমাদের দেখব না। রবিবার এ পথে আসব না। সোমবারে এলেও জানি না তোমরা থাকবে কি না। ভালো থেকো তোমরা।

পিল সরণি থেকে বেরিয়ে বোনাভেনচুর মেট্রোতে আসতে মিনিট দশেক। পথের এক পাশে খোলা জায়গাটায় যেখানে বাচ্চারা সাইকেল চালায়, এলেই অজান্তে চোখ যায় ওখানে অনেকগুলো মেপল গাছে। অনেক পাখি ওখানে! কোন কোন সকালে পাখি না থাকলে মন খারাপ হয়ে যায়।

একটা খাঁচার ভেতর কয়েকটা পাখি। মাঝ বয়সী লোকটা যথারীতি বেঞ্চে বসা। মর্নিং ওয়াক করার সময় ওদেরকে বের করে আনে তারপর এই দৃশ্য প্রতিদিন, আমার ধারণা।
পাখিগুলো মনের আনন্দে কিচিরমিচির করে, ওড়ে উল্টেপাল্টে খাঁচার ভেতর। এতটুকু আলোতে ভাবে মুক্তি পেয়ে গেছে ! বিভ্রম।
আমরাও একটু সুতো আলগা হলেই ভাবি মুক্তি। কে যে টান দিয়ে রাখে কেউ জানে না।
ঈশ্বর মানুষ মন নাকি নিজেই ! কিংবা সুরঞ্জনা কিংবা বনলতা কিংবা মণিদীপা কিংবা কারেনিনা কিংবা লেডি চ্যাটার্লি কিংবা ওকাম্পো কিংবা নৃপবালা অথবা অপু অথবা দীপ অথবা অভীক অথবা মেয়ারসল্ট অথবা সামসা অথবা কলিমুল্লাহ...

অথবা

হতে পারেন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। উইলিং সাসপেনশান অব ডিসবিলিফে হয়ে যান তিনি মনের বাড়ির নায়িকা।
গল্পকার নিঃশব্দ...
গল্পকার বৈজ্ঞানিক। ফুল পাখি লতাপাতা মৎস্য মায় কাঁঠালের অনুভূতি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে নিয়ে গবেষণা করেন। ম্যাগনিফাইং গ্লাসে কখনো বাদাম মোটকু, ফিলাডেলফিয়া চিজের মতো মসৃণ রুমালি রুটি কখনো মুখে পুরলেই মিলিয়ে যায়, ৩৬-২৪-৩৬ কোকের বোতলের মতো সেক্সি হয়ে ওঠে কমলালেবু। সূর্যের উদরে ভোর ঢুকে যায় অবদমিত আত্মরতির মতো।
এ ছবি সিস্টেম ঠিক করে দেয়। যা কোন দর্শক ভাবেনি কোনদিন। এমন ছায়াছবিটা সম্ভব?
এর জন্য অস্কারও যোগ্য পুরষ্কার নয়। কোটি কোটি চোখের জল। বিস্ময়। আত্মা নিংড়ে প্রার্থনারত। এ ছায়াছবিটা যেন ট্রাজেডি না হয়ে যায়...

সবাই এখানে প্রধান চরিত্র। এখানে অসুর আছে। তাকে সুরে গাওয়াতে বাধ্য করে। কমিক রিলিফ দেয়। আশ্চর্য প্রদীপ্ত সব ডায়লগ। মুখস্থ নয়, তাতক্ষণিক। মাথা হেঁট হয়ে যায় হীরক রাজার দেশের ক্ষমতাধরের। লাঠিসোটা নিয়ে এগিয়ে আসে। রক্ত বুকে রুখে দাঁড়ায়।

মনে হচ্ছে বায়োস্কোপে আটকে আছে চোখ বা রূপালি পর্দায়। কোন চিত্রনাট্য নেই। লোকেশন বাছাইয়ের ঝামেলা নেই।

প্রযোজক নেই। পরিচালক নেই, এমনকি ক্ল্যাসিক চাপলিনও নেই..





৩. অড্রে হেপবার্ন ও গ্রেগরি পেক



Audrey Hepburn and Gregory Peck

ছেলে কাস্টমসে চাকরি করে দেখে বিয়ের প্রস্তাব বাসায় আসতেই বাবা রাজী হয়ে গেলেন। আমার বাবা একটা বেসরকারি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল। সারাজীবন সংসারের বোঝা টানতে টানতে ঢেড়শ নোয়ানো ক্লান্ত। আমার মা আরো সাধারণ। উপজেলা অফিসার্স ক্লাবে যেতে দ্বিধা করেন তার খুব গরিবানা পোষাকের জন্য।
আমি তখন লোকপ্রশাসন বিভাগ ২য় বর্ষ। ভাগ্যিস ঢাকায় মামার বাসা ছিল বলে। বাবার পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে রেখে আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো সম্ভব ছিল না। আমার গায়ের রঙ কালো বলে মামী আমাকে প্রায়ই সানন্দা’র রুপচর্চা বিভাগ পড়তে দিতেন। বিজ্ঞাপনের পাতায় এত সুন্দর সুন্দর মডেল দেখে আমি অবাক হয়ে ভাবতাম, মেয়েগুলো কি অন্য গ্রহের?

কমলার খোসা বেটে মুখে দিতাম, শসার চাকতি কেটে চোখে। মসুরীর ডাল ধোয়া পানি দিয়ে মাথা ধুতাম। আলু বাটা, পুদিনা চা, উপটান..কী করি নাই আমি ফর্সা হবার জন্য।

মুখে উপটান মেখে আমি কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র পড়তাম। গলায় আলুবাটা মাখিয়ে রোদে ঝিম মেরে থাকতে থাকতে পলিটিক্যাল ইকোনোমিকসের নোট মুখস্থ করি। রোদ বাড়ে, আমার মুখের চামড়া টনটন করে। কী জানি মাঝে মাঝে চোখ ভিজে যায়। কান্না বুঝি আমার সাথে একাকী তীর্থ যাত্রী!

ছেলে পক্ষ আমার ছোট বোনকে প্রায় পছন্দ করে ফেলেছিল। ছোটবোনটা অসম্ভব চালাক, সুন্দর, স্মার্ট। লুকিয়ে প্রেম করত। আমাকে প্রায় বলে;

: বড়পু তুই বিয়ে না করলে তো আমার কিছু হবে না। তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ফেল। ইউনিভার্সিটিতে পড়িস, একটাও প্রেম হলো না তোর?

খুব লোনলি আর অসহায় লাগত। এই আমি কি এত অসুন্দর? কোনো ছেলে কি আমার দিকে তাকিয়ে ঝরা পালকের গান শোনাবে না কোনদিন? এত মন খারাপ হয় আমার!

ছোট বোনটা কিভাবে যেন পাত্রপক্ষ কাস্টমসের ছেলেটাকে জানাল যে তার প্রেম আছে। বড়পু খুব মেধাবী ও খুব মমতাময়ী। আমি নাকি দুনিয়ার রান্না জানি। তাছাড়া ছায়ানটে গান শেখার কারণে আমি নাকি কিন্নরী। চশমা খুললে আমি অড্রে হেপবার্ন।

কাস্টমসের ছেলেটা মামার এক সহকর্মীর ছেলে। মামী আমার পড়ার টেবিলে সারাদিন বলতে লাগলেন;

: ছেলের অনেক উপরি। তোকে সব প্রসাধন কিনে দিতে পারবে। এই যে তমুক নায়িকা, আরে কী জানি নাম, ও তো একদম পাতিলের তলা ছিল। শুধু বিদেশি মেক আপের কারণে ও এখন পরী। কাস্টমসের লোকেরা প্রতিদিন বেতন পায়। তোর ছেলেমেয়েরা ও লেভেল এ লেভেল করে পরে কানাডা আমেরিকা পড়বে। তোর বাপের মতো মাস্টারি করতে হবে না ...

আমি সানন্দার পাতা ওল্টাই অনেক রাতে, সবাই ঘুমিয়ে গেলে। কী যে সুন্দর রাজকন্যাদের মতো মডেল। ছবির পাতা থেকে মেয়েগুলো উঠে এসে আমার হাত ধরে। আমি মালিবাগে ভাসতে থাকি। মনে হয়ে আমার চারপাশে বোগেনভেলিয়ার গাছগুলোতে কে যেন পেইন্ট করছে। কাস্টমসের ছেলেটার হাতে রঙ তুলি। আমি রেণু রেণু লজ্জা পাই।


অনেক রাতে ছেলেটার টেক্সট আসে আমার মোবাইলে। উদ্বেলিত আমি চোখ বড় বড় করে পড়তে থাকি :

: হ্যালো অড্রে হেপবার্ন

আমার কাল টিউটোরিয়াল জমা দেবার কথা। সব এলোমেলো লাগে। ইচ্ছে করছে গলা ছেড়ে গান ধরি। তখনই হু হু মন ভালো হতে শুরু করে। টেবিলে জমে থাকা সানন্দাগুলো ছুঁড়ে ফেলে দেই বাইরে।

মনে হচ্ছে আমি ধবধবে সাদা লং ড্রেস পরে রোমান হলিডে ছবির শুটিং করছি। গ্রেগরি পেক আমার কোমর ধরে আছে। নাচছি সুরে।

সর্বনাশ কাস্টমসের ছেলেটা দেখি অবিকল গ্রেগরি পেক।