যুক্ত বিযুক্ত

শুভংকর গুহ



“সারাদিন বইল তর্কের ঝড়, হৃদয়াবেগের উদ্দাম হানাহানি। গগাঁকে আটকে রাখার জন্য ভিনসেন্ট লড়তে লাগল প্রাণপণ। তেমনি প্রাণপণে গগাঁ এড়াতে লাগল ভিনসেন্টের প্রতিযুক্তি, প্রতিটি অনুনয়। কখনও অনুনয়, কখনও ভিক্ষা, কখনও দাবি, কখনও হুহুংকৃত অভিশাপ। একবার এমনকী হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল ভিনসেন্ট। বন্ধু যদি রাগ করে ব্যথা পেয়ে চলে যায়, তাহলে কাজ কী এ-জীবনে ? শেষ পর্যন্ত ভিনসেন্টেরই জয় হল। ক্লান্ত হয়ে পড়ল গগাঁ সারাদিনের এই হৃদয়রণে। দিনান্তে সে হার মেনে পেল মুক্তি। থাকবে, থাকবে সে, ছেড়ে যাবে না ভিনসেন্টকে। ছেড়ে যাবে না এই হলদে বাড়ি।”
জীবন পিয়াসা
আরভিং স্টোন


পাশাপাশি ভিনসেন্ট আর পল গগাঁর ছবিটি দেখে, আমার পাশে তোমাকে বসালাম। আমি তোমার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, দেখে যাচ্ছি দূরে উঠোনে বসে একজন মহিলা, চমৎকার নিপুণ হাতে খেজুর পাতার মাদুর বুনে যাচ্ছে। পৃথিবীর সমস্ত আকাশ যেন আমার গ্রামের তৃনভুমিতে নেমে এসছে। দেখতে পারছি, সমস্ত মহৎ ছবিগুলি ডানা মেলে উড়ছে, রঙয়ের টিউব ইজেল চারকোল গ্রীষ্মকালীন বিকেলে ভাসিয়ে দিয়েছে বহুদূরে মাঝির ফিরে যাওয়ার গান। আমার সামনে জলা জমির আয়নাতে পড়েছে এই পৃথিবীর জলছায়া।

এই ঘরটি থেকে আমি আর তুমি বের হয়ে আসব। তারপরে খুব দ্রুত পথে নেমে আসব। আমার খুব ক্ষিধে পেয়েছে। আমি জানি তোমার ঝোলার ভিতরে আরবি খেজুর আছে। আর কালো রঙয়ের কেক। আমি তোমার কাছে চাইতে পারতাম। কিন্তু তুমি এখন আর্লসের লাইলাক ফুলের বাগানের কথা ভাবছ।

ভাবছি, পৃথিবীর সমস্ত সময় একটি উন্মাদ আর একটি বেহিসেবি মানুষের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আমি ভিনসেন্টের ঘরের ভিতরে বসে ভাবছিলাম, আফ্রিকান জোয়াভ তরুণের কথা। তার কথা খুব বলছিল ভিনসেন্ট। অল্প পয়সার বিনিময়ে তাকে মডেল করেছিল। ভিনসেন্ট বলেছিল, ষাঁড়ের মতো তার মোটা ঘাড়, বাঘের মতো জ্বলজ্বল চোখ। ভিনসেন্ট তার নীল ইউনিফর্ম পরা একটা ছবি এঁকেছিল। মাথায় তার লালচে টুপি, ক্যানভাস জুড়ে সবুজ পটভূমি। কেমন চড়া রঙ। চিৎকার করে গলা ফাটানো রঙ।




তোমার থেকে নিজেকে বিযুক্ত করতে চাইছি। তুমি আপত্তি করছ না। কেন জানি যুক্ত আর বিযুক্তর মধ্যে নিজেকে তুমি যুক্ত না করে, বিভোর হয়ে ভেবে যাচ্ছ, মহৎ শিল্পীদের বিন্যাস রচনার কথা। হ্যাঁ, তোমার আবার মনে পড়ছে, সেই আবার এক তরুণের কথা, দাঁতে চেপে ধরে আছে, একটি কর্ণ ফ্লাওয়ার। মাথার চুল ঘাড়ে নেমে এসেছে, কী অসম্ভব বাদামি রঙ ব্যবহার করেছে ভিনসেন্ট। আমি দেখতে পারছি, তুমিও দেখছ, দেখ বাদামি তরুণের পিছনে কেমন বিষণ্ণ বিকেল। আসলে বিষণ্ণ সকাল হয় না রাত্রি হয় না... বিকেল হয়।

দুইজনের ছবিতে একবার চোখ রাখো। পল গগাঁ তাকিয়ে আছে, অনেকটা যেন সন্দেহের চোখে। ভিনসেন্ট অনেক নিস্পৃহ, এমন ভাব আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু আবার নয়। পল যেন বলতে চাইছেন, কাকে দেখছ তুমি ? আমাকে না ভিনসেন্টকে ? এ ভারি মজার। শুনতে পাচ্ছ, পল গগাঁ বলছে,-- ভিনসেন্ট তুমি কাঁচকলা ছবি আঁক, তোমার স্টুডিয়োই তার প্রমাণ। এটা স্টুডিয়ো না আস্তাকুঁড় ? ইস, রঙয়ের বাক্সটারই বা কি ছিরি ! ডাচ দেশের লোকের মাথায় আর কত বুদ্ধি হবে ? ওই মাথায় যদি মন্তিচেলি আর দোদে অত না ঢোকাতে তাহলে মাথাটাও কিছুটা পরিষ্কার হতো, জীবনযাত্রাও কিছুটা ভব্য হত।

পলের এই কথা শোনার পরে, ভিনসেন্ট কি খুব আহত হলেন। বললেন,-- বেশ বেশ আমার স্টুডিয়ো নোংরা, তাতে কী ? তোমার স্টুডিয়ো কেমন তা নিয়ে আমি তো কথা বলতে যাচ্ছিনে।

জঞ্জাল ভর্তি তেমনি জঞ্জাল ভিনসেন্টের খুলির ভিতরে। তামাম দুনিয়ায় যত লোক পোস্টেজ স্ট্যাম্প এঁকেছে, সবাইয়ের নামে ভিনসেন্ট উচ্ছসিত, অথচ এটা ভিনসেন্টের মাথায় ঢোকে না, দেগার মতো একজন শিল্পী ...

হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ ......

অস্তিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমি, আমাকেই প্রশ্ন করলাম, বিবাহ করবে ? চলো ভিনসেন্টের নোংরা ঘরটিকেই সাক্ষী রেখে। ওখানে বসে আছে এখন পল ও ভিনসেন্ট। কালো কফি খাচ্ছে। এইটি পৃথিবীর সেরা ঘর। যার মধ্যে আশ্রিত গোটা দুনিয়ার নিসর্গ আর মানুষের শরীর।

সন্ধ্যে গড়িয়ে এল, অন্ধকার গভীর। কিছুই চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম না, আমি পল ও ভিনসেন্টের ছবির এ্যালবামটি খুলে ধরলাম, কি চমৎকার আলো, আলোয় আলোয় চারধার... অন্ধকার পথ আলোকিত হয়ে উঠল।

যে মহিলা বিকেলে আমার দেশের গ্রামে উঠোনে বসে নিপুণ হাতে মাদুর বুনছিলেন, তার উঠোন পেরিয়ে যাওয়ার পরে দেখলাম, দুইজন ঈশ্বর পল গগাঁ ও ভিনসেন্ট দাঁড়িয়ে আছেন, আমাকে প্রশ্ন করলেন, বিনোদবিহারীর মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে যাব ?

আমি বললাম,-- আমার সঙ্গে আসুন।

হ্যাঁ। একজন অন্ধ শিল্পীর ক্যানভাসে এত আলোর উৎসবের আয়োজন। ওনার কাছেই ... যাব ...