কোথাও কোনো শব্দ নেই আর

বিধান সাহা


রাত এগারটায় বাস। ঢলতে-ঢলতে, টলতে-টলতে, ভোরবেলা বাস থেকে নামবো যখন, কারেন্টের তারে তাকিয়ে খুঁজব কাকেদের মিটিং—ইজিবাইক ড্রাইভার রহমত ভাইকে পেলে ভালো—নইলে রিক্সায় করে ভোরের বাতাস শরীরে মাখতে মাখতে—ঘুম জড়ানো মানুষগুলোর মুখের উপর ভেসে থাকা সারল্য দেখতে দেখতে—শালফা ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে সূর্যোদয়ের দৃশ্য সেদিন কেনা নতুন স্মার্টফোনে আটকে নিয়ে যদি বাড়ি ফিরতে পারি— গিয়ে দেখব হয়ত বাবা তখনও ঘুমিয়ে আছেন— মা ভর-রাত জেগে ছিলেন; আমি ফিরব বলে।


গতকাল, অনেক রাতে, একবার জানালা দিয়ে নিচে তাকালাম। মধ্যরাতের শহর কেমন উদাসীন! ফাঁকা চারপাশ। মাঝে মাঝে দু একটা গাড়ি হুশ হুশ করে চলে যাচ্ছে। ল্যাম্পপোস্ট ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আবেগহীনভাবে আলো বিলিয়ে যাচ্ছে। যেন রূপসী বেশ্যা। পাশের বিল্ডিংয়ের সকলেই হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। কোনো উচ্চ-বাচ্য নাই। লাইটও নেভানো। ঘরে ফিরে শুয়ে পড়লাম। একা। চোখ বন্ধ। মা’র মুখটা খুব মনে পড়ল। কতদিন দেখি না!


মাকে এভাবে এর আগে কখনো অনুভব করেছি বলে মনে পড়ে না। বরং তাঁর সমস্ত ভালোবাসার বিপরীতে রাজ্যের অভিমান জমা হয়ে থাকত। সেদিন ঢাকা থেকে বাড়ির পথটা যেন আর শেষ হচ্ছিল না! মা তখন ক্লিনিকে। অপারেশন সাকসেসফুল হয়েছিল। গলব্লাডারে পাথর ছিল। একুশ মি. মি. সাইজের তিনটি পাথর বের করা হলো। মা’র পাশে বসে আমার একটু একটু করে সেইসব দিনগুলোর কথা মনে ভেসে আসছিল। একবার সেই ছোটবেলায়, মা তখন চাকরি করে। পোস্টিং উল্লাপাড়ায়। আমি আর মা একসাথে থাকি। বাবা প্রতি সপ্তাহে এসে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দিয়ে যান। একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে আমার হঠাৎ জিদ চাপল রিক্সায় ফিরব। মা বারবার বলছেন, সামান্যই পথ, হেঁটেই চল্ বাবা। চল্, কোলে করে নিয়ে যাই। সোনা বাবা আমার, জিদ করে না।

আমার জিদ তখন ক্রমে সপ্তমে চড়তে থাকে। এ যেন আত্মসম্মানের প্রশ্ন। রিক্সায় না গেলে যেন সব মাটি হয়ে যাবে। আকাশে তখন পড়ন্ত বিকেলের রোদ হেলে পড়ছে ধীরে ধীরে। এখনও মনে পড়ে, সমস্ত দিন আমার অভুক্ত, ক্ষুধার্ত মায়ের মুখখানা সেই করুণ আলোয় কেমন অসহায় হয়ে উঠেছিল। ক্লান্ত, ধ্বস্ত শরীরে আমাকে কোলে নিতে চাইছেন আর আমি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে প্রতিহত করছি। মা’র এক কলিগ, রিক্সায় ফিরছিলেন। আমাদের দেখে মাকে একবার জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে, দিদি?

‘আর বইলেন না...’ বাক্যটি আর সম্পূর্ণ করেননি মা। বাসায় ফিরে সেদিন খুব কেঁদেছিলেন। আমি বুঝিনি। পরে জেনেছিলাম, সেদিন রিক্সাভাড়ার দুইটা টাকা মা’র ব্যাগে ছিল না। তারপর যত সময় গেছে, এই স্মৃতিটা ভীষণভাবে আমাকে তাড়িয়ে বেরিয়েছে। মা’র অসহায়ত্ব, তাঁর কলিগের কাছে নিজের অসহায়ত্বকে আড়াল করা, পথের সকল লোকের তাকিয়ে থাকাকে উপেক্ষা করা... মা নিশ্চয়ই সেদিন লজ্জায়, অসহায়ত্বে, অপমানবোধে ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে গিয়েছিলেন।

একবার খুব পক্স হলো। সারা শরীর ভরে উঠল ছোট ছোট দানায়। নিজের মুখের দিকেও তাকাতে পারতাম না। খেতে পারতাম না। সারাদিন শুয়ে শুয়ে থাকতে হতো। কথা বলতে পারতাম না। গলার ভেতর, কানের ভেতর, চোখের ভেতর... শরীরের সমস্ত জায়গা ভরে গেল পক্সে। ছোঁয়াচে রোগ বলে প্রায় সকলেই রোগীর ছোঁয়া থেকে দূরে থাকতে চায়। বন্ধুরা তো বটেই, পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও ভয়ে থাকেন। আমি শুয়ে আছি সবচেয়ে ভেতরের ঘরটায়। সমস্ত দিন কেবল বাইরের শিশুদের কোলাহল শুনি। কোন কণ্ঠটা বেশি চিকন, কোন কণ্ঠটা একটু মোটা— এসব আবিষ্কার করে তাদের বয়স নির্ধারণ করার চেষ্টা করি। ওদের চিৎকার চেঁচামেচিতে বুঝতে চেষ্টা করি, ওরা আসলে কী খেলছে। কখনো ধরতে পারি, এটা পলান-টু, এটা আত্তা-পাত্তা, এটা... ধরতে পারি না কখনো কখনো। কখনো বাঁশঝাড়ে পাখির ডাক শুনি, অথবা, দূরে, কোনো মাঠের মাঝে চলতে থাকা শ্যালো মেশিনের ভট ভট শব্দ শুনি। দূর থেকে ভেসে আসা সেই শব্দটা এতটা উদাসীন করে ফেলে— এর আগে কখনো এভাবে টের পাইনি। বিছানার নীচে নিমপাতা বিছিয়ে দেয়া হয়েছে। মশারি টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। দিনের বেলাতেও কেমন একটা রাতের আবহ। একা একা শুয়ে থাকি। শরীর শক্তিহীন। বড়জোর চোখ মেলে তাকিয়ে ঘরের সিলিং দেখি। বাঁশ দিয়ে বানানো সিলিংয়ের ঘর গুনি মনে মনে। রং দেখি। এসব। হঠাৎ টের পাই মশারির মাঝে, মাথার পাশে মা এসে বসেছেন। মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। খুব নরম সুরে জিজ্ঞেস করছেন, খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা? নানারকম ঠাকুর-দেবতার নাম নিয়ে মাথায় ফুঁ দিয়ে দিচ্ছেন। আর নিজেই নানারকম বিলাপ করছেন, ‘ঠাকুর, ভালো করে দাও ঠাকুর। আর কষ্ট দিও না ঠাকুর।’ অথচ মা সবসময় থেকে গেছেন মনোযোগের বাইরে প্রায়। যেন প্রয়োজনের তাগিদেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। তিনি যেন সংসারের নিত্য দিনের সূর্য। বেশি উঠলে পুড়ে যাই। না থাকলে জমে যাই।

বড় হতে হতে টের পেয়েছি মা’র প্রতি ভালোবাসাগুলোও বেড়েছে প্রকাশ্য সংকোচে। এত যে ভালোবাসা অথচ কখনো তাকে বলা হয়নি, ভালোবাসি। আর তাঁরও যেন এসব শোনার জন্য বয়েই গেছে!

মাকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে এখন ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। মা’র বিবর্ণ আর ফ্যাকাশে মুখটার দিকে নির্বাক তাকিয়ে আছি। এতটা মমতায় কোনোদিনও আমার মায়ের মুখটা দেখেছিলাম কি না মনে পড়ছে না।

মনে হচ্ছে, মা’র পেটে আমিও এক পাথর ছিলাম সত্যি! সেই পাথরটা এখন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে। ভেতরটা ডুকরে কাঁদছে আর ডাকছে, মামণি, ও মামণি, মামণি...

কোথাও কোনো শব্দ নেই আর।


দেয়ালে টাঙানো মামণির এই ছবিটা ঈশ্বরদীতে তোলা। রাখীর বিয়েতে। বিয়ের দিনই সকালে গায়ে হলুদ। সকলেই দেখি সকাল সকাল হলুদ শাড়ি পড়ে রেডি। রাতভর ট্রেন জার্নি করে যাওয়া এই আমি তখনও ঘুমাচ্ছি নাক ডেকে। এদিকে রাখী ক্ষেপে বম! ওর হলুদের ছবি তুলে দেয়ার কথা আমার। আমার বোনদের এই এক ভাইভাগ্য। এটা লাগবে তো দাদা, ওটা লাগবে তো দাদা, হ্যানো হইছে তো দাদা, তেনো হইছে তো দাদা। মামণি ডেকে ওঠাল। ছবির কথা মনো করিয়ে দিতেই ক্যামেরা হাতে নিয়ে সেই বাসি মুখে চোখ কচলাতে কচলাতে আমার মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি, কী এক অপূর্ব আভা খেলছে তাঁর মুখে। মাকে গত বছর অপারেশনের আগে কখনই তো এতোটা হৃদয় দিয়ে দেখা হয় নাই! সেই হাসপাতালে, অপারেশনের পরে, ঘুমন্ত নির্জিব মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম হতভম্বের মতো। আমার মায়ের মুখটা সেদিনই দেখেছিলাম পরম মমতায়, হৃদয় উজার করা ভালোবাসায়। তো, এই অপূর্ব বিভা, মায়ের মুখের উজ্জ্বলতা, এক অপার আনন্দের রেখা ধরে রাখার লোভ সামলাতে পারলাম না। রাখীর গায়ে হলুদ শুরু হয়ে গেছে ওদিকে। ফোনের পরে ফোন আসছে। আমি নির্বিকারের মতো আমার মায়ের ছবি তুলে যাচ্ছি। মায়ের সাথে ছোট কাকী, বড়পিশি, আমাদের বিন্তি বুড়িটা, সবার ছবি তুলছি ঈশ্বরদী আবাসিকের দোতলার ব্যালকনিতে। মায়ের তাড়া, ‘বাদ দে বাবা, তাড়াতাড়ি না গেলে ওরা রাগ করবে নি। তুই তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আয়, আমরা যাই।'

সে-ই তুলেছিলাম। পুরনো ছবি দেখতে গিয়ে কত স্মৃতি মনে পড়ে! মামণির সাথে কথা হলো সকালে। যেন প্রাণটা নিয়ে কোনমতে টিকে আছেন। আর আমি এই শুক্রবার সকালে বসে বসে কল্পনা করছি, মামণি সুস্থ হয়ে উঠছেন। আবার বাড়িটা মুখর হয়ে উঠছে। আবার তাঁর উপর রাগ করছি, অভিমান করছি। বাড়ি গেলে প্রত্যেক বেলা কপট অভিমানে গজগজ করতে করতে মুখে ভাত তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন আর বলছেন, ‘আচ্ছা, তুই কি জীবনেও মানুষ হবি না? এমন পাগলই থাকবি সারাজীবন?’


আজ তিন বছর হলো মামণির চলে যাওয়ার। এর মাঝে কত কিছু ঘটে গেল! দিদিমার মৃত্যু, ঠাকুমার মৃত্যু, প্রবল ডিপ্রেশান নিয়ে আমার বেঁচে থাকার প্রাণান্ত চেষ্টা, আমাদের বিয়ে, দাদার পুত্র লাভ... কত কী! মামণি বেঁচে থাকলে দুটো ঘটনায় খুবই খুশি হতেন নিশ্চিত। এক. শ্রীর মতো পুত্রবধূ। দুই. দাদার সন্তান হওয়ায়। আর খুবই রাগ করতেন বিয়ে নিয়ে আমার গোয়ার্তুমিতে। কারণ আমি জানি, মামণি বেঁচে থাকলে আমার বিবাহের ঘটনাটা অন্যরকম আবহের জন্ম দিত।

মাঝে মাঝে গুলিয়ে ফেলি। একা একাই ভাবি, আমার ঠাকুমা কি শ্রীকে দেখে গিয়েছিলেন? মনোযোগ দিয়ে ভেবে তবে হিসেব বের করতে হয়। —না, দেখে যাননি। আসলে যাদের আমার বউ দেখার খুবই ইচ্ছে ছিল তারা কেউই ওকে দেখে যেতে পারেন নাই।

আগস্ট এলে প্রতিটি দিনই আমার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। এই সেদিনই ফেসবুক মেমোরিতে দেখলাম গাড়িতে করে মামণিকে চলনবিলের মাঝ দিয়ে কবিরাজের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার ছবি। দেখে খানিকক্ষণ হতভম্বের মতো চুপ করে থাকলাম। যেন গতকালের ঘটনা! এতো স্পষ্ট! এতো জীবন্ত হয়ে উঠল! সেদিনের প্রতিটি মুহূর্ত আমি স্পষ্ট অনুভব করতে পারি। সেদিন সন্ধ্যায়, প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পেরে আমি কৃষ্ণনাম জপে যাচ্ছি। মামণি আমার হাতের উপর। একবার বমি করার মতো উঁকি দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। কিছু বলতে চেয়েছিলেন কি না জানি না। আমি কোনোকিছু না ভেবে একটানা নাম জপে যাচ্ছি। জপে যাচ্ছি। মামণির মাথার পাশে টুলে বসা ঠাকুমা। এপাশে বড়কাকি। আর বিছানার ওপাশে দাদা। কিচ্ছুক্ষণ পর আমার বড়কাকি, হউমাউ করে কেঁদে উঠে বললেন, 'দিদি যে আর নড়ে না! ওই, দিদি নড়ে না ক্যা?' দাদা বিছানার আরেক পাশে মামণির মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছিল। দাদা কাকির কথা শুনে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। আমার মাথায় তখন শুধু আমার বাবা ঘুরছে। আমি জানতাম আমাকে শক্ত থাকতে হবে। আমার বাবাকে বাঁচাতে হবে। আমি আলগোছে ঘর থেকে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখি বাপি আরেক ঘরের বারান্দায় বেঞ্চির উপর বসে আছেন হতভম্বের মতো। আমার বুক ফেটে কান্না আসছে। কাঁদতে পারছি না। পুরো বাড়িতে তখন কান্নার রোল। শুধু আমার আর বাপির মুখে কোনো শব্দ নাই। আমি একে একে সবাইকে ফোন করতে থাকলাম। শিবু কাকাকে বলে রাখলাম সব ব্যবস্থা যেন করে সে। ওইটুকু খুব শক্তভাবে করেছিলাম। তারপর আমিও ভেঙে গেছি ভেতরে ভেতরে। যা কিছুই করি, আমার মাথায় ছিলো শুধু আমার বাবা। বেচারা হার্টের পেশেন্ট। পাছে না আমাদের দুই ভাইকে সব-ই হারাতে হয়! একবার খেয়াল করে দেখি বাপি বেঞ্চিতে নাই। আঁৎকে উঠলাম। মামণির মৃতদেহের পাশ থেকে উঠে গেলাম। ঘরে গিয়ে দেখি শুয়ে শুয়ে কাঁদছেন। পাশে গিয়ে বসলাম। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম। 'খুব কষ্ট পাচ্ছিল মামণি। তার চেয়ে এটা ভালো হয়েছে বাপি। ভগবান যা করেন ভালোর জন্যই করেন।' বলছিলাম বটে, আমার ভেতরে তখন কান্নার অবাধ স্রোত। আমি আটকে রেখেছি এই যা! শিবু কাকাকে বলে রাখলাম যেন বাপির খেয়াল রাখে।

মামণিকে শ্মশানে রেখে বাড়িতে ফিরতে ফিরতে আমাদের তখন বিকেল। আমার মা যে ঘরটায় থাকতেন, সে ঘরটার দিকে আর তাকাতে পারছি না। আমাদের দু-ভাইকে মার্কিন মোটা কাপড়ের উতুড়ি পড়িয়ে দেয়া হয়েছে। মামণিকে ছাড়া দিন যেন আর যায় না। এখনও প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি মুহূর্ত এসে বুঝিয়ে দেয়— আমার মা নেই! আমার মা নেই!!

পৃথিবীতে কারো মা যেন কোনোদিন না মরে!