স্বগতোক্তিপ্রায়

সৈয়দ কওসর জামাল


৩১

এত যে পাকদণ্ডী পথ পেরিয়ে এলে, কোথায় পৌঁছোলে?
কোথায় লুকোলে মুখ, ঠান্ডা হাওয়া এখনও গালে লেগে?
সময়ের কুয়াশা এসে অবশেষে তোমাকেও খেলো
শূন্যমুদ্রা হাতে বসেছিলে জঙ্গলের ধারে, বনের পথ হয়ে
কেউ ডাকেনি তোমাকে, কেউ বলেনি এ হল ভ্রমণগহ্বর
সবাইকে আঁতকে উঠতে হয় সেদিকে তাকিয়ে, বিস্ময় যা কিছু
তার ভিতরে বসে থাকে শূন্যতার হাড়কাঁপানো বাঘের গর্জন
কোন দিকে যাবে এবার, একদিকে বিস্মৃতি অন্যদিকে খাদ
গাঢ় নীল আকাশ একমাত্র স্বস্তি হয়ে মাথার ওপরে
এই সেই মায়াবী দর্পণ, যেখানে মুখ নয় স্বপ্ন ফুটে ওঠে
অথচ স্বপ্ন দেখার চোখ খাদের গভীরে, ভারাক্রান্ত, স্থির
সেই অন্ধকার থেকে তুমি কি ফেরাতে পারবে দৃষ্টি?
কীভাবে নিজেকে আবার জড়ো করবে নিজের কাছে
এই প্রশ্নে উত্তাল হল বাতাস, কখন যে মেঘ ফিরে আসে...


৩২

যে জগৎ তৈরি করেছ তুমি নিজের চারপাশে
তা এক গোপন জানালার মতো, দূরের সবকিছু তার মাপে
কেউ আর দেখতে পায় না তোমাকে, যে এক আয়নার মধ্যে
নিজেকে আটকে রেখেছ, ফ্রেমের বাইরে যাওয়ার পথ নেই
নির্জন বনপথে একাকী হেঁটে যেতে চেয়েছিলে একদিন
আজ বনপথ তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে অনেকদূর
যেটুকু আলো ঢোকে জগতে তোমার, মৃত, ছায়াঘেরা
তা কি সূর্যোদয়, না কি সূর্যাস্তের অন্তিম সংলাপ, জানো?
সংলাপমাত্রই জেনেছ নদীর, হেমন্তের দিনে তারও স্থবিরতা
সমুদ্র ডাকে না তাকে আজ, ফলত রহস্য ছড়ায়
রহস্য চোখ টানে, মায়াবী ছায়ার মতো তার চলার ধরন
যে দিগন্তরেখা অতি দূরে দেখো, তারও দৃষ্টির অঞ্জন
যদি মুগ্ধ হও, যদি তার আকাশে দ্যাখো রামধনু, সাঁকো
পারাপার সহজ ভেব না, সাঁকোটিকে তুমি নিজেই ভেঙেছ…



৩৩

সন্ধ্যার বিষণ্নতার ভিতর খেলে বেড়াচ্ছিল লিরিক্যাল হাওয়া
আমাকে কিছু বলতে চায় ভেবে দুঃস্বপ্নের ক্ষত অনাবৃত করি
এসো নিরাময়, নিভে যাওয়ার আগে জ্যা-মুক্ত করো দুহাত
খুব কি কঠিন ছিল ছোট্ট দেশালাইয়ের মতো জ্বলে ওঠা
এই অন্ধকারের মধ্যে, পরিণাম ভেবে দ্রুত ছিটকে আসি
যত সহজ এই জ্বলে ওঠা, ততই সহজ তার নিভে যাওয়া
কোনো নক্ষত্রই জ্বলবে না আর, বিদায় হে আকাশ, দ্যাখো,
আমি শুধু মাটির ওপর থেকে হাত বাড়াচ্ছি সমুদ্রের দিকে
এভাবেই তো মেঘ ঝুঁকে থাকে জলের দিকে সঙ্কোচহীন
সমুদ্র মেঘের প্রতিবিম্ব চেনে না, বরং ফুঁসে ওঠে আরো
সেও কি নারীর মতো, বিদ্যুতের মতো, ঝড়ের মতো?
আমি তো আগেই ভেঙে পড়ে আছি, উৎপাটিত বৃক্ষ হয়ে
উদ্বাস্তু জীবন কাটাই যেখানে দিগন্ত নামের এক কাঁটাতার
যেখানে ব্যর্থতার আয়তন পরিমাপ করে আমারই ক্লান্ত দুচোখ...


৩৪

আমি দেখাতে চেয়েছিলাম কীভাবে আমার জটার মধ্যে থেকে
বেরিয়ে আসছে একটা নদী, আসলে তো জটা নয়, আমার চোখ
তাতে কি খুব দুঃখ প্রকাশ করা গেল, না কি যদি বলি
ওটা নদীই নয়, শুধু মেঘ, চোখের পাতা ঢেকে রেখেছিল, আর
ওখানে হৃদয় মেলে রেখেছিল এক শাল্মলী বৃক্ষ আর তার ছায়া
কুটিরের কথা বলেছি আগেই, তার চারপাশে হরিণের মতো
ছুটছিল জাপানি কায়দায় লেখা কবিতার ছোটো ছোটো পঙক্তি
আর তাদের ধাওয়া করছিল কত যে অর্থ ও অর্থহীনতার মায়া
খুবই জটিল সে মায়াপথ, অনেক চড়াই ও উতরাই পেরিয়ে
যে মহাযান ছুটে যাচ্ছিল বাস্তব অবাস্তব ও প্রহেলিকা ধরে
এ জীবন পৌঁছে যেতে পারে রামধনুর কাছে, একএকটি রঙ
একএকটি স্বরবর্ণের মতো সামনে এসে দাঁড়াবে, যেন সূর্যোদয়
পর্বতচূড়ায় ধাক্কা খেতে খেতে বদলে ফেলতে থাকে নিজেকে
এ কি সেই মুহূর্ত যার কাছে কবচকুণ্ডল সব ব্যর্থ হয়ে যায়?