কবিতা

সুব্রত সরকার

নক্ষত্র বিলাপ

এই রাতে
যখন একটি নক্ষত্রের চোখে জল
অন্য নক্ষত্রেরা রুমালের কোনায় গোল হয়ে বসে অনুতাপ করে।
একটা বিপদ মাথায় যেদিকে আধার সেখানেই ঝাপটা দিচ্ছে
কেন শরীরের রেখার পাশে
এত অমানবিক আলো?
শস্য মরুদুর্ঘটনা আবার ঘটুক,
বিখ্যাত মহাকাশ আবার পাঠাও শীত,কম্পন,ধূলিঝড়ে
বাষ্প পাঠাও তিমির আচ্ছাদিত
আত্মা খুটখুট করে ভাষার আরশ সৃষ্টি করে চলেছে
কিন্তু শুকনো কাঠে কিছুতেই প্রাণ আসছে না।
একটা তেকোনা পোকা বাতাসের মতো পাতলা শুঁড় তুলে জানতে চায়
অয়নমন্ডলে কি এখনো মৃত্যু পেট্রোল দিচ্ছে
না রানওয়েতে ফিরে গেছে?
অতিরিক্ত রাত্রি-ফসলের শিখর গোড়ালি উঁচু করে লম্বা হয়
যেন এই নিরীহ আকাশ আঁকশি দিয়ে নামিয়ে আনবে
কুয়াশায় সরসর শব্দে নিদ্রা জন্ম নিচ্ছে, প্রাচীনেরা বলেনঃ
এ সময় কারো দেখা দিতে নেই।

অন্ধকার মাথায় হাত রেখে নক্ষত্রেরা আলোচনা করে
পরাজিত মানুষের গ্রন্থ ছাড়া এ মহাবিশ্বে হারাবার কিছু নেই
যদি থাকে, মানুষ রচনা করে রেখে গেছে।

জঙ্গলে গাছের শীর্ষে চাঁদ রেখে তারা যুদ্ধে গিয়েছিল।
লজ্জিত ফুল, বাধ্য হয়ে পৃথিবীর উপমা হয়েছে।
যদি ক্ষার,গণিত ও শব্দকণিকা আবার জন্ম নিতে চায় —
আমরা সমর্থন করবো। মানুষের ধাতু ছাড়া
এ গ্যালাক্সি
শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে।


যখন ওড়িয়া ভাষায় পাখি ডাকে

[উড়িষ্যার ময়ুরভঞ্জ জেলার বারবিল একটি ছোট্ট ও সুখ্যাত স্টেশন। লোহার পাহাড় একটু একটু করে কেটে রেক ভর্তি হয়ে এখান থেকে চালান যাচ্ছে সারা দেশে,বিদেশেও। স্থানীয় মানুষ লেবার, তাদের প্রধান খাদ্য দেশী মদ। এমনকি ছোট শিশুও কাঁদলে মা তাকে মদ খাইয়ে দেয়। অথচ বাতাসে কোটি কোটি টাকা উড়ছে। শুনেছি এখানকার পথের ধুলোও চিন কিনে নিচ্ছে। সাদা জামা পড়ে গিয়েছিলাম, লোহার ধূলোয় লাল হয়ে ফিরেছি কলকাতায়। ]

বারবিল স্টেশনের শালবৃক্ষটি প্রাচীন মুখিয়াদের মতো ট্রেন থেকে নামতেই
হাত জড়ো করে, এ দিগরের মদ বাবু
ভূ-ভারতের কাউকে ফেরায় না শূণ্য হাতে,চোর-বজ্জাত কম তো জীবনে
দেখি নি,সক্কলেই কিন্তু কোথাও গিয়ে শেষে শান্তি পায়, লোহা
না হলে লোহাকে কাটে কেমনে, তার
মুখের হাসিটি যেন যন্ত্রনায়-মোড়া মধু, চোখ মুছলেও দৃশ্য
মুছে যায় না, তারপর-

শালপাতার দোনায় গরম মদ ঢেলে দিচ্ছিলো
যে যুবতী,তার নাম চন্দ্রমা,গরম মদে বারবার তার ছায়া
এসে পড়ছে, বললামঃ ঠান্ডা হয়ে যাবে,সরে
বোস, শুনে খপ করে হাত বাড়িয়ে শূণ্যে মুদ্রা রচনা করে, যেন
আমার উচ্ছ্রিত লিঙ্গ হাতের মুঠোয় নিয়েছে, বিড়বিড়
মন্ত্র পড়ছেঃ এই সাপ আজ রাতে
আমাকে দংশন করুক, আমি গর্ভবতী হবো, দিকুর বাচ্চা
বড় হয়ে তাহলে বাগালি করবে এঠি।

করুণ মদ কখনো খাই নি, রুগ্ন মদ কেশে কেশে বমি করে
গাছতলায়, তার কাশির শব্দে শালপাতাও
শিউরে ওঠে, আসলে খর দুপুরের এই আসরের সঙ্গে একমাত্র
রাত্রি নক্ষত্রদেরই তুলনা হতে পারে, আমি
ওড়িয়া ভাষায় আমার প্রথম কবিতার বইয়ের পাণ্ডুলিপি মনে মনে
প্রস্তুত করছি, কিন্তু ফুড নেই,আর অসুস্থ মদ, শুধু
নুনের টাকরা, ব্লার্স্টের শব্দ, লৌহচুর, অক্ষরের হাত-পা, মাথা
উড়ে গেছে, তখনই গাছের ডালে ওড়িয়া ভাষায়
পাখি ডেকে ওঠে, অনুবাদ করার জন্য চন্দ্রমাকে বলিঃ মুকে ধাইকিড়ি টুকু মদ দেঅ, কিন্তু কিছু হয় না
দেহাতি কুরূপ পাণ্ডুলিপি তখন ঘুমিয়ে পড়েছে, তার গুন্ডিপান
খাওয়া উঁচু দাঁতে শুধু সূর্যকিরণ ঝরে পড়ে।