পর্ণমোচী

দেবদ্যুতি রায়

এক

সকাল থেকেই মাথাটা সমানতালে ঘুরছে। সেই বনবন করতে থাকা মাথা নিয়ে অমিয়া শুয়ে শুয়ে আকাশ পাতাল ভাবেন। না, এই বয়সে আর এত চাপ নেয়া যায় না। এখন একটু শান্তি দরকার, দুদণ্ড কোথাও গিয়ে খানিকক্ষণ বসতে পারলে হতো। কিন্তু যাবেনই বা কোথায়? এই মরার শহরে না আছে আত্মীয়, না আছে কোনো কাছের মানুষ। এখানে পাশাপাশি ফ্ল্যাটে যাওয়া হয় শুধু চা কিংবা রাতের খাওয়ার নেমন্তন্নে। অমিয়া তাই নিজের বিছানাকেই আশ্রয় মানেন আপাতত।

আজকের সকালটাই কী বিশ্রী ছিল! রাস্তার ওপাড়ের তেঁতুল গাছটায় কেমন সাত সকালেই কড়কড় করে কাক ডেকে উঠলো কয়েকটা। ওরা সবাই মনে হয় ঐ গাছের বাসিন্দা। এর আগে এতগুলো কাকের কর্কশ চিৎকার অমিয়া শুনতে পাননি কোনোদিন। মা বলতো, কাকের তারস্বরে ডাকের মধ্যে গৃহস্থের অমঙ্গল লুকিয়ে থাকে। সে কথা মনে করে তখন অমিয়ার বুক কেঁপে উঠেছিল, কু গেয়ে উঠেছিল মনটা- কী জানি আবার কী হয়! তবু মনকে চোখ ঠেরে সাত তাড়াতাড়ি করে রুটি আর মিষ্টি কুমড়োর ছক্কা বসিয়েছিলেন গ্যাসের চুলায়। খোকা বড্ড ভালোবাসে খেতে। কিন্তু কীসের কী, সেই রুটি আর কুমড়োর ছক্কা এখনও খাবার টেবিলে ঢাকা দেয়া আছে, কেউ ছুঁয়েও দেখেনি।

খোকাদের ঘরের দরজা বন্ধ মনে হয়। কারো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। কে জানে খোকা এতক্ষণে ঘুম থেকে উঠেছে কি না আজ। আচ্ছা, রিখিয়া কি আজকাল একটু বেশিই ক্ষেপে গেছে? তাই বা কেন, অমিয়া ভাবেন- খোকা শুধু তার ছেলে বলে তো ওর সব দোষ মাফ হয়ে যায় না। মেয়েটার বুকের ভেতরের কষ্টটা তিনি কি একটু হলেও বুঝতে পারছেন না? এতটা অবুঝও তো তিনি নন।

এই তো, ঘণ্টা কয়েক আগে, কুমড়োর ছক্কাটা তখন প্রায় হয়ে এসেছে, নরম গোল রুটিগুলো অমিয়া তখন কেবল হলদে সুতি কাপড়টা দিয়ে ঢেকে দিচ্ছেন, রিখিয়া দরজাটা হুট করে খুলে বেরিয়ে এসেছিল। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে কাটা কাটা শব্দে বলেছিল- আপনার ছেলের সঙ্গে যদি আর সংসার না করি, আপনি আমাকে দোষ দেবেন না মা।

চমকে উঠে মেয়েটার দিকে তাকাতে অমিয়া দেখেছিলেন রিখিয়া নিজের ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেছে। কেবল ওর পিঠের ওপর ছড়ানো লালচে চুলগুলোর নড়ে ওঠা দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। রিখিয়ার কথা শুনে তিনি ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তার বুকের ভেতর একটা গণগণে খুন্তি দিয়ে কেউ ছ্যাঁকা দিয়েছিল যেন। তখন কড়াইয়ে রান্না শেষ হয়ে যাওয়ার চটচট শব্দ কানে এসেছিল তার, একটা বাটিতে ছক্কাটা নামিয়ে রেখে এসেই আবার শুয়ে পড়েছেন বিছানায়। সেই তখন থেকেই মাথাটা ঘুরছে তার।

কদিন আগে অনেক রাতে তার মোবাইলে একটা কল এসেছিল। একটা মেয়ে ওপাশ থেকে জিজ্ঞেস করেছিল- শৌণককে দেয়া যাবে একটু? অত রাতে একটা মেয়ে কেন খোকাকে খুঁজছে সেই ধন্দ নিয়েও ঘুমচোখে খোকার ঘরের দরজায় ধাক্কা দিয়েছিলেন তিনি। কী জানি, জরুরি ফোন‌ই হয়তো, কত বন্ধু বান্ধব, কলিগ থাকে এদের। দরজা খুলেছিল খোকাই, তাকে মোবাইলটা দিয়ে ফেরার সময় হঠাত রিখিয়ার দিকে চোখ পড়তে দেখেছিলেন কেমন অদ্ভুত আগুনচোখে খোকার দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা! পরদিন খোকাকে জিজ্ঞেস করলে সে মুখ নিচু করে ছিল, উত্তর দিয়েছিল রিখিয়াই, কেমন শীতল আর হিসহিসে গলায় বলে উঠেছিল- ঐ মেয়েকে আপনার ছেলে এ বাড়ির বউ করে আনবে মা!

সেদিন হঠাৎ করে সারা গা হিম হয়ে গিয়েছিল, আজও তেমন শিরশিরে অনুভূতি হয় অমিয়ার শরীরে। আজকালকার ঘর সংসারের কথা বলা দায়, রিখিয়া যদি সত্যি সত্যি বিয়েটা ভেঙ্গে দেয়, তখন? উফ! তিনি আর ভাবতে পারেন না, দুহাতে কপাল টিপে ধরে শুয়ে থাকেন।

খোকার বিয়ের আড়াই বছর হলো মোটে। ওর নিজেরই পছন্দের বিয়ে। বরং বিয়ের সময় অমিয়ার পছন্দ ছিল না রিখিয়াকে। একে তো চাকুরি করা মেয়ে আবার দেখতে তেমন একটা সুন্দরও নয়- এমন মেয়েকে নিজের একমাত্র ছেলের বউ করে ঘরে আনার ইচ্ছে তার কোনোকালেই ছিল না। অথচ ছেলে সে কথা শুনলে তো! জেদ ধরে বসলো একেবারে। ওর বাবা মারা যাওয়ার সেটা তৃতীয় বছর, এক রকম নিজের অনিচ্ছাতেই ছেলের বিয়েটা দিয়েছিলেন তিনি। ছেলেকে কত শতবার বলেছেনও বউয়ের কথা। না, পুজোআচ্চা মোটেই করে না নতুন বউ, বাড়িতে কেউ এলে পায়ে হাত দিয়ে প্রণামটা পর্যন্ত করে না, কোনো কথা বললে তার উত্তরটা না দিয়ে ছাড়ে না! এমনকী খোকাকে কেমন পুতুল পুতুল করে বড় করেছেন তিনি, তাকে দিয়ে পর্যন্ত এটা সেটা কাজ করিয়ে নেয়! খোকা চুপচাপ শুনতো সব। বউকে কিছু বলতো কি না কে জানে কিন্তু মায়ের পক্ষে কোনোদিন টু শব্দ তো করেনি, মাকে নিষেধও করেনি অবশ্য। নিজের একমাত্র ছেলের কাছ থেকে এমন নীরবতা অমিয়াকে আরো কষ্ট দিয়েছে অনেক।

কিন্তু ঐ যে, এই আড়াইটা বছর একসাথে থাকতে গিয়ে এসে মেয়েটার ওপর কেমন মায়া পড়ে গেছে তার। সারাদিন পায়ে পায়ে না ঘুরুক, মা মা না করুক, যত্নটা তার ঠিকই করে। অফিস থেকে ফেরার পথে তার পছন্দের বিস্কুটটা, কেকটা নিয়ে আসে। প্রত্যেকটা ছুটির দিনে রান্না করে, বলে আপনি একটু রেস্ট নিন মা এবার, সারা সপ্তাহ আপনার ওপর দিয়ে যা গেল! অমিয়া অবাকই হয়ে যায় কখনো কখনো, এই মেয়েটা সত্যি অদ্ভুত! কোনো কোনো দিন একেবারে গাঁট হয়ে শুয়ে বসে থাকে, একটা কথাও বলে না তখন। আবার দ্যাখো, অন্যসময় কত ভালো! তার সঙ্গে অমন মন খুলে আড্ডা দেয় না কোনোদিন, অথচ নিজে দুটো শাড়ি কিনলে তার জন্য একটা কিনতে ভোলে না কখনও। তার পছন্দের চাটা, প্রিয় রংয়ের কাপড়টা, সেলাইয়ের সুতোটা ঠিকই মনে রেখে এনে দেয়। বউটা তাই একেবারে মনের মতো না হলেও খারাপ নয় বলেই মনে হয় তার। মাঝেমাঝে অন্য সংসারের বউ-শাশুড়ির সম্পর্কের কথা শুনে তো তিনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন, না,যাক, তার খোকার পছন্দ খারাপ ছিল না। কিন্তু এখন ওদের সংসারে এগুলো কী হচ্ছে অমিয়া বুঝতে পারেন না। আজকাল কখনো কখনো তার মনে হয় ওদের ঘরে একটা বাচ্চা থাকলে কি এমনসব ঝামেলা হতো না? কিন্তু তাও বা কেন? বিয়ের তো তিন বছরও হয়নি, বাচ্চার জন্য ওদের তাড়া নেই নিশ্চয়ই। ধুর! আপাতত তার শুধু মনে হয় এ ঝামেলা কোনোরকমে কেটে যাক এই সংসারটা থেকে।

উল্টোপাল্টা ভাবতে ভাবতে কখন চোখ লেগে এসেছিল কে জানে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা পাঁচফোড়নের মিষ্টি গন্ধে ঘুমটা চটে যায় হঠাৎ। রিখিয়া রান্না করছে! একটু অবাকও লাগে তার, রিখিয়া আজও রান্না করছে! সকালবেলায় এসব কথা বলার পরও! সত্যি সংসার বড় আশ্চর্য জায়গা। এখানে সবকিছুর হিসেব মেলে না কোনোদিন।

অমিয়ার মনে পড়ে, তার হাতের রান্না নিজের আত্মীয়মহলে সুপ্রসিদ্ধ, সেই সুনামটা সারা জীবন উপভোগ করেছেন তিনি। কেবল এই মেয়েটা এ সংসারে আসার পর নিজের সেই অহমিকায় চিড় ধরেছে। মেয়েটা রান্না করে খুব ভালো।

রিখিয়া আর খোকার সংসারের কত কথা এলোমেলো মনে পড়ে তার। কী সুখের সংসার হ‌ওয়ার কথা ছিল এখন ওদের, অথচ... অমিয়ার হঠাৎ শুভ্রদার কথা মনে পড়ে। আচ্ছা, শুভ্রদা কেমন আছে এখন? শুভ্র মানে শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, যার কথা শুনলেই বুকের ভেতরটা ধুকপুক করে উঠতো এক সময়। এখনও হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়লে সেই ধুকপুকুনি ঠিকই টের পান তিনি। না, তার জন্য শুভ্রদার বুকের ভেতর কোনো ধুকপুকুনি ছিল না। এ জীবনে লেখা একমাত্র প্রেমপত্রটা শুভ্রদার বইয়ের ভেতর রাখতে গিয়ে অমিয়া সেখানে আবিষ্কার করেছিল দুই বেণি ঝোলানো সোহিনীদির সাদাকালো একটা ছবি! বাড়ি ফিরে সেদিন খুব কেঁদেছিল সে। সোহিনীদির সাথে বিয়ে হলো না বলে শুভ্রদা আর বিয়েই করেনি কোনোদিন, একদিন আমেরিকা চলে গেল পড়তে, আর ফিরলো না। বুকের পাঁজর ঠেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয় তার। কে জানে কার জন্য- খোকা, রিখিয়া না শুভ্রদার…

দুই

অমিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে আজ প্রথম কেক বানিয়েছে রিখিয়া, সুন্দর একটা চকোলেট কেক। আর রান্না করেছে মটরশুটি ছড়িয়ে চিনিগুঁড়া চালের সাদা পোলাও, মুরগির কোরমা। প্রতি বছরের মতো এবার আয়োজনের আধিক্য নেই। আজকাল হাঁটাচলার ওপর কড়াকড়ি, অকারণে ঘরের বাইরে যাওয়া নিষেধ। রিখিয়া, শৌণক সবার অফিসও ছুটি সেই কবে থেকে। করোনা নামের ভাইরাস মনে হয় পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম সারা পৃথিবীকে এক ছাদের নিচে নিয়ে এসেছে। মানুষের তৈরি করা সীমানা প্রাচীরের বিভেদ কেমন ঘুচিয়ে দিয়েছে এক নিমেষে। ইতালি থেকে চীন, বাংলাদেশ থেকে ইংল্যান্ড- সব জায়গায় মানুষ কেমন আশঙ্কায় ঘরে দোর দিয়ে চুপচাপ বসে আছে। আজ তাই তার জন্মদিন উপলক্ষে এ বাড়িতে কারোর নেমন্তন্ন নেই।

রাতের খাওয়াদাওয়া শেষে অমিয়া টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখেন। বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর মিছিলে প্রতিমুহূর্তে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন মানুষ। গত কয়েকদিন ধরে এসব দেখতে দেখতে হাঁপ ধরে গেছে তার। খবরে সব সময়ই বলছে করোনায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে বয়স্ক মানুষেরা। তার নিজেরও বয়স কম হয়নি। পঞ্চান্ন ছাড়িয়ে এবার ছাপ্পান্নোতে পড়লেন তিনি। কে জানে কী হবে! আজকাল যত দিন যাচ্ছে, মৃত্যুচিন্তা এসে জেঁকে ধরছে কেন জানি। মরতে হবে ভাবলেই আজকাল বুকের ভেতরটা শুকিয়ে যায়। কই আগে তো এমনটা মনে হয়নি কখনো!

টেলিভিশনের স্ক্রলে দেখাচ্ছে আমেরিকায় মৃতের সংখ্যা দশ হাজার ছাড়িয়েছে। অমিয়ার বুক ঢিপঢিপ করে। এত! শুভ্রদার কথা মনে পড়ে আবার। ওদেশেই তো আছে মানুষটা। শুভ্রদারও বয়স হয়েছে অনেক। তার চেয়ে বছর দশেকের বড় অন্তত। আমেরিকা কত বড় দেশ, তার বুকে কত লাখ বা কোটি মানুষ কিছুই জানা নেই অমিয়ার। কেবল সেই কোনকালে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া একটা মানুষের জন্য তার মন অস্থির হয়ে ওঠে।

শৌণক কী মনে করে ঘরে এসে তার পাশে বসে চুপচাপ। ছেলেটাকে সংসারের কথা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে না তার। এই ঘরবন্দী সময়েও কেমন নীরবে ঘর ভেঙে যাচ্ছে ছেলেটার! না, এসব ভাবনা ভাবতে চান না তিনি এখন। শৌণককে জিজ্ঞেস করেন- হ্যাঁ রে খোকা, শুভ্রদাকে চিনিস তুই?

শৌণক ফিরে মায়ের চোখে চোখ রাখে-

চিনবো না কেন মা? শিকাগোতে থাকেন তিনিই তো? শুভ্র মামা তো আমার হোয়্যাটসঅ্যাপে আছেন।

শৌণকের চোখেমুখ কী করুণ দেখায়, অমিয়া আস্তে করে বলেন- আচ্ছা।

সেই করুণ চোখে মেলে শৌণক বলে-

আচ্ছা, মা, কথা বলবে ওনার সাথে? দাও তোমার হোয়্যাটসঅ্যাপে নম্বরটা এ্যাড করে দিই।

না না খোকা, থাক- অমিয়া তাড়াহুড়ো করে বলে ওঠেন। এতদিন পরে শুভ্রদার সাথে কী কথা বলবেন ভেবেই পান না তিনি।

ছেলে তবু শোনে না। মার ফোনে নম্বর সেইভ করে শুভ্রাংশু চক্রবর্তীর হোয়্যাটসঅ্যাপ প্রোফাইলটা দেখায়। অমিয়া কত বছর পরে শুভ্রদার চেহারা দেখেন! এখনও, এই এত বয়সেও শুভ্রদার চেহারা কী সুন্দর আছে! সেই একই রকম লম্বাটে মুখ, তীক্ষ্ম চোখ, খাড়া নাক, কেবল বয়সের রেখাগুলো গাল, কপাল, হাত ছুঁয়ে গেছে।

ঘর থেকে শৌণক বেরিয়ে গেলে তার মন খারাপ লাগে। ওদের সংসারটা বোধহয় আর সত্যি টিকবে না। রিখিয়া আজকাল প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া কোনো কথাও বলে না ছেলেটার সাথে। এখনো অবশ্য এক ঘরেই শোয় ওরা। ছেলে, ছেলের বউ দুজনের জন্যই খুব খারাপ লাগে, দম বন্ধ হয়ে যেতে চায়।

সংসারের এই ঝামেলা থেকে একটু দম ফেলা দরকার। মোবাইলে শুভ্রদার প্রোফাইলটা দেখতে দেখতে অমিয়া একবার ডায়াল করেন, রিংটোন থাকতে থাকতেই কেটে দেন কলটা। থাকুক। আমেরিকায় এখন কটা বাজে কে জানে। তাছাড়া হঠাৎ করে শুভ্রদাকে বলবেনই বা কী তিনি? আর মানুষটা তাকে এত বছর পরে চিনবেই বা কেন? মোবাইলটা পাশে রেখে তিনি টেলিভিশনের চ্যানেল বদলান। এত একঘেয়ে মৃত্যুর খবর শুনতে আর ভালো লাগছে না।

রিখিয়া দরজা থেকে বলে- বাতিটা কি নিভিয়ে দেবো মা? আমি ঘুমাতে যাচ্ছি এখন।

আমিই নেভাবো, থাকুক- অমিয়ার কথা শুনে দরজা ভেজিয়ে দেয় রিখিয়া।

রিখিয়া!

তার কণ্ঠ শুনে রিখিয়া দরজাটা আবার খুলেছে।

বলুন মা!

তুমি কি সংসারটা আর সত্যি করবে না বৌমা? খোকা তো ঐ মেয়ের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করেছে বলো। তোমার কি আর ওর সাথে থাকতে খুব কষ্ট হবে?

রিখিয়া কেমন ম্লান হাসে। তারপর পূর্ণ চোখ মেলে বলে-

আমি এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি মা। কী জানেন তো, জীবন আসলে খুব অদ্ভুত!

অমিয়া জানেন জীবন সত্যিই খুব অদ্ভুত। নাহলে ওদের বিয়ের আড়াই বছর পর নিজেদের সম্পর্কে এই তিন জন মানুষের অনুভূতি এতটা বদলে যেতে পারতো না কোনোদিন। দুটো ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে রিখিয়া আবার বলে-

আমাদের সংসারটা না থাকলেও আপনাকে আমি মনে রাখবো মা। আপনি না থাকলে ঘর আর চাকুরি সামলাতে আমার অনেক কষ্ট করতে হতো। আর আপনার মতো এত ভালোও কেউ আমাকে বাসতো না বোধহয়।

বোধহয় চোখের জল আড়াল করতেই তাড়াহুড়ো করে চলে গেল মেয়েটা। রিখিয়া চলে গেলে শূন্য দরজার দিকে তাকিয়ে খুব কান্না পায় অমিয়ার। বুকের ভেতরের হু হু করা ভাবটা বাড়তে বাড়তে বুঝি আকাশ ছোঁয় এবার। তার দুচোখ বেয়ে অঝোরে জলের ধারা নামে। কতক্ষণ এভাবে ছিলেন জানেন না তিনি। হঠাৎ কানে আসে পরিচিত শব্দ, তার মোবাইলটা বাজছে। রিখিয়ার জন্য, খোকার জন্য এক বুক কান্না সামাল দিতে দিতে অমিয়া তার মুঠোফোন হাতে নেন, হোয়্যাটসঅ্যাপ কল। মোবাইল স্ক্রিনের অর্ধেকটা জুড়ে থাকা এক সুদর্শন মানুষের ছবির নিচে তার নাম লেখা- শুভ্রাংশু চক্রবর্তী!