আপনার ডেবিট কার্ড হামেশা আপনার সঙ্গে রাখুন

নীলাব্জ চক্রবর্তী

তখন ও ব্যাঙ্কের দোতলায় কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ একটা লাইন। দীর্ঘতর হয়ে যাচ্ছে শনিবারের দুপুর। বাড়িতে কী রান্না হয়েছে কিছুতেই মনে পড়ছে না। আর কাউন্টারে বোর্ডে আটকানো ব্যাঙ্কের স্লোগান জ্বলজ্বল করছে
‘ আপনার ডেবিট কার্ড হামেশা আপনার সঙ্গে রাখুন ’। একটা ধাক্কা দেয় ওকে। আর কিছুনা। ঐ হামেশা শব্দটা। ডেবিট কার্ড লিখবে না তো কী ? কিন্তু হামেশা শব্দটা কিরকির করতে থাকে । এক্ষুনি সরিয়ে ফেলতে হবে মাথার মধ্যে থেকে । কাউন্টারের দ্রুত মেয়েটির দিকে তাকায় ও। ওড়না দেয়নি আজ মেয়েটি ? একটা লাল ফ্রেমের চশমা তারপর চোখে পড়ে ওর । আজ তো শনিবার । মেয়েটির যেকোনো একটা গালে আর অন্য স্তনে খানিকটা করে মৌসিনরাম মাখিয়ে দিতে ইচ্ছে করে ওর । বেশী না। এই তিরিশ চল্লিশ গ্রাম মতো। একটা ভেজা ভেজা ইমপ্যাক্ট তৈরি হচ্ছে । হ্যাঁ । টের পায় ও। Two horizontal forces acting in a vertical plane in opposite directions and separated by a distance, will produce a vertical moment . This moment will be about a horizontal axis and it may or may not be in clockwise direction depending upon the magnitudes and directions of the forces . এইটুকু মনে হয় ওর । আশ্চর্য ব্যাপার । উল্টো দিকেই বা হতে হবে কেন ফোর্সদুটো ! আলাদা আলাদা মানের হলেও তো মোমেন্ট তৈরি হবে। কিছু পরে ওর মনে হয়। ততক্ষণে একটু এগিয়েছে লাইন। আসলে couple শব্দটার মোহে আটকে যায় ও। পুশ আর পুল। অর্থাৎ দুটো ফোর্স একই মানের হলে ভালো হয়। এখন কথাটা হোলো বামস্তন আর ডানগাল নাকি ডানস্তন আর বামগাল? মানে, মোমেন্ট-টা কোন অভিমুখে তৈরি করা ঠিক হবে? ক্লকওয়াইজ নাকি কাউন্টারক্লকওয়াইজ ?


ওর মনে হয় এক অনন্ত সেলাই কারখানার ঠিক মাঝখানে একটুখানি জেব্রা ক্রসিঙে ও দাঁড়িয়ে আছে। এরকম শীতশীত করে। চারদিকে নানা সাইজের অদৃশ্য টবে নানারকম ফুলগাছ। আস্তিন থেকে বাইরের দুপুরের ভাপ কখন ঝরে পড়ে গ্যাছে। মূলবিন্দু কোথায় মূলবিন্দু ? আরে ধুর , সব কি আর বইতে লেখা থাকে যে বই পড়ে সব জানতে হবে ? নিজে নিজে বানিয়ে নিয়েছিল সে । মূলবিন্দুতে দাঁড়িয়ে কোনও অক্ষের অভিমুখে তাকালে যদি মোমেন্টটা ক্লকওয়াইজ হয় তাহলে পজিটিভ আর , বলাই বাহুল্য , তবুও না বললে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ হয় না বলে বলা , যদি মোমেন্টটা কাউন্টারক্লকওয়াইজ হয় তাহলে নেগেটিভ । এখন কথা হোলো মূলবিন্দু কোথায় ? কি মুশকিল ! এখন সে করে কী ? আচ্ছা। না হয় মূলবিন্দু মেয়েটির কাছে । আর তার দিকে হোলো অক্ষের মাথার তীরচিহ্নের দিকটা। তার মানে দাঁড়াল ... মনে মনে সে মেয়েটির জায়গায় দাঁড়ায় , হাত ঘুরিয়ে বুঝে নিতে চায় ঐ অক্ষ আর মোমেন্টের অভিমুখ । হ্যাঁ। হয়েছে। বামগাল আর ডানস্তন । অল্প করে একটু একটু মৌসিনরাম। ব্যাস। তার পজিটিভ মোমেন্ট তৈরি। তার দিক থেকে দেখলে অবশ্য এটা কাউন্টারক্লকওয়াইজ মোমেন্ট। নেগেটিভ। কিন্তু কাউন্টারে তো মেয়েটি। নাম-না-জানা। তার কাছেই তো মূলবিন্দু। অর্থাৎ গ্লোবাল পজিশনিং অনুযায়ী এটা পজিটিভ মোমেন্ট ।




এবার মেয়েটি পর্যন্ত পৌঁছোবার জন্য রাস্তাটা তো বানাতে হবে। চারটে বা তিনটে বিন্দু নিয়ে নিয়ে চারকোণা বা তিনকোণা এলিমেন্ট বানাতে হবে ফ্লোর প্লেট হিসেবে। তবে না একটা নিখুঁত স্ট্রাকচারাল অ্যাপ্রোচ ! বিন্দু জুড়ে জুড়ে প্লেট বানাবার কনভেনশনটা অবশ্য আলাদা ।







কাউন্টারক্লকওয়াইজ জুড়তে হবে বিন্দুগুলো। তাহলে প্রতিটি প্লেটের উল্লম্ব-অক্ষটা ওপরের দিকে থাকবে। তাই করবে ও। কোনও ভুল হবে না। ব্যাঙ্কের ফ্লোরের একপাশে কবে – থেকে - যেন খারাপ হয়ে পড়ে থাকা কয়েন ভেণ্ডারিং মেশিনটা থেকে গলে পড়ছে ফেনা ফেনা নিস্তব্ধতা। আর তার ভেতর নিবিষ্ট হয়ে একটা একটা করে চারকোণা প্লেট এলিমেন্টস জুড়ে যায় ও। পরপর। কাউন্টারক্লকওয়াইজ কায়দায় । ক্রমান্বয়ে ক – খ – গ – ঘ ... এইভাবে। এক একটা বিন্দুতে এক একটা শব্দ লেখা। ও দেখতে পায়। কোনোটায় সময়, কোনোটায় অর্থনৈতিক সাম্য , কোনোটায় কুয়াশা , কোনোটায় নেমড্রপিং... এইরকম সব। এদের জুড়ে জুড়ে প্লেট তৈরি করে যেতে থাকে ও। ফুরিয়ে আসবে ঐ দূরত্ব ...


প্রতি সারিতে তিনটে করে। এভাবেই গড়ে উঠতে থাকে স্তর। মাঝের দূরত্বটা ফুরিয়ে আসবে শিগগিরই। দ্বিগুণ উৎসাহে কাজ করে যায় ও।



আর দ্যাখে , ওর স্থাপন করা প্লেটগুলোতে একটা একটা করেই ক্রমশ ফুটে উঠতে থাকে জ্ঞানশাখা , সমাজবিদ্যা , ফেসবুক , পরিবিষয় , নতুন , যোগাযোগ , ভাষা , বিপ্লব , সিনেমা , আগুন , শরীর , যতিচিহ্ন ... এইসব । একটা প্লেটের গায়েও কি কবিতা শব্দটা ফুটে উঠবে না শেষপর্যন্ত ? মাথা নীচু। অতো ভাবার সময় নেই ওর। ওর কাজ যেন একটার পর একটা প্লেট জুড়ে যাওয়াই । শেষপর্যন্ত কি কবিতা শব্দটা ফুটে উঠবে না? যেকোনো একটা প্লেটের গায়ে ? অথবা ওটা ফুটে উঠলেই ফুরিয়ে যাবে এই খেলাটা ? কোনও ভুল হচ্ছে কোথাও ? ঐ ক্লকওয়াইজ মোমেন্ট আর কাউন্টারক্লকওয়াইজ তৈরি করা প্লেট এলিমেন্টস ... এই পরস্পরবিরোধী কনভেনশন কি উভয়কেই নালিফাই করে দেবে ?






অফিসের প্যান্ট্রি । জানলা দিয়ে দ্যাখা যাচ্ছে উড়ালপুলের অর্ধেক আর তার গায়ে আটকে থাকা ওই বিশেষ ব্যাঙ্কটার বিজ্ঞাপন । পরিষ্কার পড়া যাচ্ছে এখান থেকে , ‘ আপনার ডেবিট কার্ড হামেশা আপনার সঙ্গে রাখুন ’। জল ভরার অন্যমনস্ক শব্দ বেড়ে উঠছে ... প্যান্টের ভেতরটা সুড়সুড় করে ওর ... একটু নড়ে ওঠে যেন ... আজ কত তারিখ ? কবে মাইনে হবে ? আজ হবে ? আজ তো সোমবার ... অন্তত অর্ধেক ? গতমাসে ...




হ্যালোওওওও প্রিয় সম্পাদক আর প্রিয়তর পাঠিকাপাঠক। এই টেক্সটটির সহিত ব্যাকগ্রাউন্ডে একটি গুনগুন যাইবেক। সুমন (তখনও কবীর নন)-এর একটুর জন্য কতকিছু হয়নি / ক্ষয়ে যাওয়া আশা তবু পুরোটা ফুরোয়নি... এই গানটার এই প্রথম দুটো পঙক্তি শুধু । বারবার বারবার ... আরে ! আপনারা কী ভাবছেন ? শুধু কি গুলমোহর - ই রিপিট হয় ? মিসটেক মিসটেকেন... ইত্যাদি প্রভৃতি...।