পুরাতনী

শতাব্দী দাশ

দাদু আজ চলে গেল। চলে গেলে মানুষের কদর বাড়ে৷ আজ দাদুর মাথায় হাত বোলাতে ইচ্ছে করছিল অনেক কাল পর। বেডপ্যানটা সরানো হয়নি বলে ঘরে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। তবু বসেছিল ইলা বেশ কিছুক্ষণ৷ দাদুকে নিয়ে সবচেয়ে বিরক্ত ছিল মা। মা আজ মুখে আঁচলের খুঁট চেপে কাঁদছিল। বস্তুত, চলে যাওয়াটা অনভিপ্রেত ছিল না, বরং থেকে যাওয়াটা এতই গতানুগতিক ছিল যে ইলা মাঝে মাঝে ভুলে যেত, দাদু আছে। ডাক্তারবাবু খসখস শব্দে কিছু লিখছে৷ ক্লাবের ছেলেরা খাট কিনতে গেল৷ ছোটকাকা দমদম থেকে এসে পৌঁছলেই রওনা দেওয়া যাবে। পায়ের ছাপ নেওয়া চাই তার আগে।


তেতলা থেকে নেমে নিজের দোতলার ঘরে ঢুকে, ইলা দোর দিল। শোকের বাড়ি নজর করল না। সিগারেট ধরানো দরকার। জয়েন্টও আছে একটা। শোক নয়, ম্যাদামারা একটা অবসাদ হচ্ছে ৷ অবসাদ হলে ইলার দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে শুতে ইচ্ছে করে, বা অন্ধকারে সেঁধিয়ে যেতে । দোনোমনো করে শেষে জয়েন্টই ধরালো ইলা৷ লম্বা টান। লাল আগুন। চুল্লির মুখের মতো।


দ্বিতীয় টানের পর সে দেওয়াল ভাবতে চাইল। একটা মেরিন গ্রিন ম্যাড়মেড়ে দেওয়াল, যার দিকে পাশ ফিরে শোবে আর বিছিন্নতার একটা ভ্রান্তি তৈরি হবে। ঘরটা পর্দা টেনে অন্ধকার করা যায়। তবে তাতে গাঁজার গন্ধ থেকে যাবে বহুক্ষণ ঘরে।


কয়েক টানের পর অন্ধকারও এল। অন্ধকার...অবসাদ...দাদু... ক্যালাইডোস্কোপে ভাবনারা খুব দ্রুত নক্সা বদলাচ্ছে। অন্ধকার...অবসাদ...দাদু... এইসব ছুঁয়ে বাসন্তী টকিজের নকশায় স্থিত হয় ক্যালাইডোস্কোপ। ধূলোসিঁড়িতে একটা দুটো পদচিহ্নের নকশা। দেওয়ালে পানের পিকের গ্রাফিতি৷


টিকিটের রঙ ছিল গোলাপি। মূল্য চল্লিশ টাকা। ব্যালকনি৷ পারফোরেশন বরাবর ছিঁড়তে গিয়ে আধবুড়ো এক লোকের হাতে জ্যামিতিক আয়তক্ষেত্র চিরকাল এবড়ো-খেবড়ো হয়ে যেত। চেয়ারদের ক্যাঁচকোঁচ ফাজলামি। দাদু নিয়ে যেত ছোটবেলায়। দাদুর ধারণা ছিল, সস্তা বলিউড-টলিউডের চেয়ে ইংরিজি ছবি শিশুর পক্ষে স্বাস্থ্যকর। অথচ মফস্বলে জুরাসিক পার্ক বা অ্যানাকোন্ডা ছাড়া আসেই বা কী? তেজিয়ান যৌবন ডায়নোসর, হাঙর, অজগর আরও কীসব যেন পেড়ে ফ্যালে। সুবিশাল যত প্রাগৈতিহাসিক, তারা ফোঁসফাঁস শেষে মাথা নত করত। বিজাতীয় প্রতিপক্ষ পাল্টে পাল্টে যেত ছবি থেকে ছবিতে। কিন্তু চুমু থাকতই। তীক্ষ্ম সিটির উদযাপন থাকত নিচের তলায়।


অনেকদিন পর তনুময়কে নিয়ে একবার বাসন্তী-তে এসে পড়েছিল ইলা৷ গায়ের উপর তীব্র আলো পড়লে আদরে ব্যাঘাত ঘটছিল। হিন্দি ছবি। চুমুটুমু নেই। নায়িকায় খোলা পিঠের উদ্দেশেই সিটি ছুটছিল। নাইটশোয়ে নীলছবির আগে বুভুক্ষুদের সমষ্টিগত ওয়ার্ম আপ। ব্যক্তিগত যৌনসঙ্গী থাকলে অবশ্য উপরের তলায় বসার রেওয়াজ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে। বাসন্তী টকিজ ততদিনে আরও বুড়িয়েছে। তার পলেস্তারা খসা সিলিং-এর তলায় বড় বেমানান বেশরম শীৎকার। সেই যেদিন বাড়ির ছাদে চুমু খাচ্ছিল ইলা আর তনু...কাশির দমক শুনে বুঝেছিল, দাদু কফ ফেলতে উঠেছে ঘর ছেড়ে৷ দাদু কি দেখে ফেলেছিল?


দেওয়ালে পানের পিকের বিমূর্ত নক্সা। তনুকে দিতে দিতে ইলা ভাবছিল, দাদু আজকাল খুব থুতু ছড়ায় খেতে বসে। এত থুতু কোত্থেকে আসে! মা বিরক্ত হয়। বুড়ো সেকথা বুঝে খাওয়ার জায়গা আলাদা করে নিয়েছিল। তেতলার ছোট ঘর। কলিং বেলের ব্যবস্থা করেছিল বাবা। বেল বাজলে গোলটেবিলে খাবার দিয়ে আসত মালতী।


তনুময় চলে গেল একদিন। সম্পর্কের এক্সপায়ারি ডেট আন্দাজমতো সময়েই এল বলে আঘাত নিয়ে এল না। শুধু একটা, যাকে বলে ম্যাদামারা অবসাদ, এখনও যেমন হচ্ছে! তখনও মাঝে মাঝে সিনেমাহলে ঢুঁ মারত ইলা। একা। এক একটা দিন থাকে না? যখন শহরের রোদ গা পুড়িয়ে দেয়? আলো চোখে লাগে? অনেক হাঁটার পর বা পার্কে শূন্যমাথা বসে থাকার পর, হলের অন্ধকারে সেঁধিয়ে যেত ইলা। সেখানে মাতৃজঠরের নিরাপদ অন্ধকার। পা গুটিয়ে আরাম করে বসত ইলা, যেন গর্ভে ভ্রুণ।


ততদিনে আদর-অভিলাষীরা বাসন্তী টকিজ ছেড়ে মাল্টিপ্লেক্স অভিমুখে গেছে। অলস কেবিনের জানালার বাইরে প্রগলভ জীবন যেমন দেখায়, ইলার স্থবিরতা বনাম ছবিদের চলাচল ছিল তেমনই। ছবিদের গায়ে ছিল রঙ আর আলো। সাত্ত্বিক সাদা সেসব বিলিয়ে দেয়। ইলা গ্রহণে ব্যর্থ হয়। সব হ্যালুসিনেশন মনে হয়, যেমন এখন হচ্ছে। বস্তুত, রাস্তাঘাটের প্রকৃত ব্যস্ততাকেও ইলার হ্যালুসিনেশন মনে হয় মাঝে মাঝে। ইলা জানত, সে আর বুড়ো সিনেমাহল, কেউই ছবিতে মনোনিবেশ করে না। শুধু টিকে থাকে।


বাসন্তী টকিজ-কে আপন লাগত তাই। সমস্যা ছিল শুধু বাসন্তীর বাথরুমটা নিয়ে। বেজায় দুর্গন্ধ। যেমন দাদুর ঘরেও...মালতী না এলে, বেডপ্যান পরিষ্কার হত না...ঝাঁঝালো দুর্গন্ধ!


**********


শীর্ষেন্দুশেখর নন্দী। এজ -এইট্টি ওয়ান। কজ অফ ডেথ-এজ রিলেটেড কমপ্লিকেশনস। পারিবারিক মধ্যনাম কি ব্যক্তিত্বে বাড়তি ওজন যোগ করে? মেয়ে হওয়ার সে গুরুভার ইলাকে নিতে হয়নি৷


লোকটাকে অসীম দীর্ঘ আর জ্ঞানী মনে হত শৈশবে। শিশুকে মাথা উঁচু করেই দেখতে হয় বড়দের। চিরকাল। শখানেক রবীন্দ্রসংগীত গাইতে পারত লোকটা, খাতা না দেখে। সিনেমা ভালোবাসত। বলত, কলেজ পালিয়ে বেন হার বা লরেন্স অফ আরাবিয়া দেখার কথা। ছোটবেলায় কথা বলার লোক বলতে ছিল দাদুই।


তারপর ইলা বড় হয়ে গেল৷ বেন হারের রথের দৌড়ের দৃশ্যে মাথার উপর এরোপ্লেন ওড়ার ভুল ধরতে শিখল। আর দাদু থমকে গেল। একটা সময়ের পর বয়স শুধুই বছর যোগ করে। আর যোগ করে বৈকল্য। দাদুকে স্মার্ট ফোন দিয়েছিল। সকাল সন্ধে গুডমর্নিং, গুডইভনিং মেসেজ পেত ইলা। ফুল, প্রজাপতি, শিশুর মুখ। আজব বচপনা! বুড়ো থেমে যায়নি শুধু, পিছু হটছিল । যদিও ইলা স্বীকার করত না, আরও বেশি পিছু হঠতে ইচ্ছে করে তার। ভ্রূণের মতো অন্ধকারে গুটিয়ে থাকতে ভালো লাগে। সে পশ্চাদপসরণ অতি নিভৃত৷



ম্যাটাডোর এসেছে৷ খই দেওয়া হল টুবাইদার হাতে৷ জেঠতুতো দাদা, যে খবর এনেছিল, বাসন্তী টকিজ বিক্রি হয়েছে৷ বিশেষ কোনো অভিঘাত হয়নি। ভালোই তো, ভেবেছিল ইলা। এবার ডিজিটাল স্ক্রিনিং হবে। বাথরুম ওয়াশরুম হবে। মন্দ কী! দাদুকে রওনা করে দিয়ে নিশ্চিন্ত বোধ করল ইলা। যেন ঠিকঠাক ব্যবস্থাপনায় রওনা করতে পারবে কিনা, তা নিয়েই ছিল যাবতীয় উদ্বেগ। মাকে ব'লে সে একটু হাঁটতে বেরোলো৷ বাসন্তী টকিজ। হেঁটে বাড়ি থেকে মিনিট দশ বৈ নয়। পার্কের পাশের রাস্তায় সদ্য ছড়ানো খই। দাদু কি সঙ্গেই চলেছে? পার্কের পশ্চিম কোণে বাসন্তী। ঝকমক করছে দূর থেকে।


পায়ে পায়ে কাছে যায় ইলা। নাম একই আছে, তবে ছোট হরফে লেখা। মাল্টিপ্লেক্স চেইনের নাম বড় হরফে বামপাশে। আধবুড়ো লোকটার ঘর ভেঙে 'ওয়াও মোমো'। কবে হল! সবাই এত অনায়াস, যেন কিছুই হয়নি। মাথা দিয়ে দ্রুতিটা টের পায় ইলা, যার সঙ্গে শরীর আর মন তাল রাখতে পারে না ।


জীবন যেমন তেমন বদলে যায়! মফস্বল হয় শহর। শহর শহরতর হয়। ক্রেতা জিনিষ ক্রয় করেন, উন্নততর জিনিষ এলে ফেলে দেবেন বলে। মার্ফির খারাপ হয়ে যাওয়া রেডিওখানা দাদু রেখে দিয়েছিল খবর কাগজে মুড়ে। বলেছিল 'মায়া পড়ে যায়'। মায়া বলতে ইলা বোঝে হ্যালুসিনেশন। সম্পর্ক, প্রেম, জগৎপ্রপঞ্চ, কয়েক টানের পর হ্যালু ছাড়া আর কী! মায়া পড়ে যায় কী ভাবে? মায়া যাতে না পড়ে, সেজন্যই তো মায়া সংক্রান্ত এত তত্ত্বকথা। তবু মায়া পড়ে যায়?


নতুন কাউন্টার। ভয় হয়। এসব কাউন্টার পেরিয়ে নিজস্ব অন্ধকারে পৌঁছনো যায় না৷ এমনই ভয় চোখে ইলার আশায় বসে থাকত মধ্যনাম যুক্ত ভদ্রলোক। স্নার্টফোন রিচার্জ করবে বলে৷ 'পাঠাবে তো সেই সাতশ চুয়ান্নটা ফালতু ফরোয়ার্ড মেসেজ,' গজ গজ করত ইলা। দেরি করত।


সূচীভেদ্য অন্ধকারকে নানা ভাগে ভেঙে নিয়েছে উজ্জ্বল কম্পিউটার স্ক্রিন৷ চোস্ত ইংরেজিতে কাউন্টারের ছেলে বলছে নিজস্ব চৌকো বেছে নিতে। লাইন ধরে একে একে মানুষ ভার্চুয়াল আসন দখল করছে৷


হলে ঢোকা হয়নি। সন্ধে নেমেছে তখন। ঈষৎ স্খলিত পায়ে ফিরতে ফিরতে টের পায় ইলা, শহরের বৃদ্ধরা বারান্দায় এসে বসেছেন একা ফ্ল্যাটে। এইবার তাঁরা 'গুড ইভনিং' মেসেজ ফরোয়ার্ড করবেন। পপ-আপ দেখে শহর বলবে-'উফ!'