করোনাকালে

শাহনাজ নাসরীন

ঘুম ভাঙার পর থেকেই ভীষণ বিষণ্ণ লাগছে। কী সব খারাপ স্বপ্ন যে দেখি আজকাল! মৃত সব আপনজনদের দেখি। তারা আমার বাসায় ভীড় করেছে। খুব হৈচৈ রান্না খাওয়া। আমার বাড়িতে কি কোন অনুষ্ঠান চলছে? সেরকম কিছু বুঝে উঠার আগেই ঘুম ভেঙে যায়। একই স্বপ্ন কেন ঘুরে ফিরে দেখি? কেন পিছিয়ে যাই দশ পনের বছর? এও কি করোনার ফজিলত?
অসম্ভব না। করোনায় বয়স্কদের ঝুঁকি বেশি তাই হয়তো অবচেতন মন বলছে আহা পনের বছর আগে হলে তো আমার রিস্ক কমে যেতো! এখন যারা জড়িয়ে আছে ভালোবেসে আমি বা তারা থাকবো কি করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে? আচ্ছা সারারাত তো ঘুমাই-ই না। ভোরের দিকে একটু চোখ লাগে এরমধ্যে এত স্বপ্ন কেন দেখি? আগে তো দেখতাম না। অথচ এই বয়সেও সাত/আট ঘন্টা কওে অবলীলায় ঘুমিয়েছি কিছুদিন আগেও। ঘুমকাতুরে বলে বদনামও আছে আমার।
কী অর্থ এইসব স্বপ্নের। আমাদের ছোটবেলায় সবাই নানুকে স্বপ্নের কথা বলতো। নানু খাবনামা দেখে অর্থ বলতো। আমার আফসোস লাগতো স্বপ্ন দেখি না বলে। আমাদের বাসায়ও খাবনামা ছিল মনে আছে। যদিও আম্মার এসব চর্চা তেমন ছিল না তবুও হয়তো ভয় পেলে মাঝেমধ্যে দেখত। তখনও আমি স্বপ্ন দেখতাম না। আমারা বান্ধবীরা মাঝে মাঝে খেলতে ইচ্ছে না করলে বসে বসে গল্প করতাম। সে সময় অবধারিতভাবে আগের রাদে কে কি স্বপ্ন দেখেছে সেই গল্প হতো। একটু যারা ডেঁপো তারা পছন্দেও ছেলেটিকে স্বপ্নে দেখার গল্প করতো আর আমরা তা গিলতাম। আমি কেন স্বপ্ন দেখি না সেই কথা আম্মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম মন খারাপ করে। আম্মা বলেছিল ঘুম গভীর হলে স্বপ্ন দেখে না। এটা ভালো। আচ্ছা আম্মাই কি বলেছিল স্বপ্নে মৃতমানুষদের খেতে দেখলে ‘মৃত্যু সন্নিকটে জানিবে’? নাকি নানুকে বলতে শুনেছি। কিন্তু আমার এখন জানা দরকার। কিভাবে জানব?
বাসায় একটা খাবনামাও নেই। গুগল করে মিলবে কিছু? মনটা খুব দুর্বল হয়ে গেলে সবই বিশ^াস করতে ইচ্ছে করে। আহা এত বই একটা খাবনামা যদি রাখতাম বাড়িতে কিইবা হতো। ফেসবুক খুলি। দেখি কারও কাছে কোন পরামর্শ পাওয়া যায় কিনা। অঙ্কিতা অনলাইন। কিন্তু ওকে একথা বলা যাবে না। বয়স কম আমার সমস্যা ও বুঝবে না। এখন হেসে উড়িয়ে তো দেবেই যদি বাঁচি যতদিন বাঁচব ট্রল করতেই থাকবে। ওকে বললাম কয়েকদিন ধরে অনলাইন দেখি না যে কী খবর?
খুব খারাপ। রক্তারক্তি।
অঙ্কিতা বিয়ে করেনি জানি। মাকে নিয়ে থাকে। ওর পরিহাসপ্রিয়তার কথা জেনেও জিজ্ঞেস করলাম, মানে? গৃহবন্দীত্বের দিনে রক্তারক্তি কী করে হলো?

বয়ফ্রেন্ডের সাথে ব্রেকআপ হয়ে গেছে। ব্লকাব্লকি আরকি। সামনে থাকলে রক্তারক্তি হইত। শালা এমন ক্লিশে! তার স্বপ্নের দুইটা নোক্তা ব্যবহার কইরা একটা স্ট্যাটাস লিখছি তো হাউকাউ শুরু কইরা দিসে। আমি তার স্বপ্ন ছিনতাই করছি। আমি পারসোনালরে পাবলিক করছি ইত্যাদি ইত্যাদি। ইদানিং খালি ঝগড়া করে। তো দিলাম ব্লক কইরা।
এসময় শুনতে পাই আতিক পরপর দু’বার হাঁচি দিলো। বুকটা ধ্বক করে উঠতেই মনে পড়লো ড্রয়িংরুমে পাশের বাড়ির রান্নার ঝাঁঝ আসে বলে জানালা বন্ধ করে রাখতাম কিন্তু করোনার দিনে ঘরে আলো বাতাস খেলানো নাকি ভালো তাই খুলে দিয়েছি। এবার আতিক সত্যিই কাশছে সুতরাং মরিচ পোড়া কিনা পরীক্ষা করতে আমি ড্রয়িংরুমে ছুটি। আমাদের সেল্ফ কোয়ারেন্টাইন চলছে আজ আটদিন। দু’জন দু’ঘরে থাকি। আতিককে যেহেতু অফিস করতে হচ্ছিল তাই সে নিজেই এই প্রস্তাব দিয়েছিল। আজ চারদিন অবশ্য অফিস বন্ধ। কিন্তু চৌদ্দদিন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা। আতিক টিভির দিকে ইশারা করে, দ্যাখো কান্ড।
হ্যাঁ দেখলাম ফেসবুকে। ইশ বেচারা এতটা রাস্তা হাঁটতেছে চাকরি বাঁচানোর জন্য!
ক্যান সাধারণ ছুটিতে তো যার যার ঘরে থাকার কথা ছিল। ওরা কথা না শুনে বাড়ি চলে গেছে।
বেচারিরা ছুটি তো পায় না সারাবছর। একটু সুযোগ পাইছে তো স্বজনদের কাছে চলে গেছে আরকি।
হুম বুকের পাটা বটে। গণপরিবহন বন্ধ তো হাইটা রওনা হয়ে গেছে।
চাকরি বাঁচানোর জন্য এভাবে ফিরতে হচ্ছে। বলো বেচারিরা পুঁজিপতিদের লোভের বলি।
কি বেচারা বেচারি শুরু করলা? ওদেরকে করুণা করার সাহস দেখায়ো না। লড়াই করার মুরোদ আছে ওদের। যা আমার তোমার নাই। ওরা মরবে কিন্তু পিছাবে না। এই দেশ থেকে করোনা চলে যাওয়ার পর যারা বেঁচে থাকবে তাদেরকে এই ওরাই বাঁচাবে বুঝছ? দুর্ভিক্ষ শুরু হইলে সরকার কি গাছ থেকে টাকা ছিড়ে দিবে? এইবার তো ভিক্ষা দেয়ারও কেউ নাই।
তুমি এত বড়লোকদের ঝোল টানতেছ কেন তোমার যেন কয়েকটা গার্মেন্টস আছে?
ঝোল টানি না। তারা অমানুষ ঠিক আছে। কিন্তু মানুষ কই? এই মধ্যবিত্তের হিপোক্রেসিটা আরো ভালো চিনি। এত গালাগালি ওদের দুঃখে দিতেছে নাকি নিজের নিরাপত্তার জন্য? এই মানুষগুলিই প্রবাসীরা যখন ভয়ে নিজের দেশে আশ্রয় নিতে আসতেছিল তাদেরকে ঢুকতে দিতে চায় নাই, এলাকায় কোয়ারেন্টাইন করতে দিবে না বইলা অনশনের হুমকি দিছে, লাল পতাকা তুলে দিছে বাড়ির দরজায়, কবর দিতে দিবে না বইলা মিছিল করছে, রাস্তায় মরে পড়ে আছে মানুষ ধরে নাই। কবর দেয়ার জন্য জানাজার জন্য মানুষ পাওয়া যায় না। ওই নিষ্ঠুর মানুষগুলি এদের হাঁটার দুঃখে কানতেছে! সেলুকাস!
আমি অবাক হয়ে আতিককে দেখি। মান্তু মানুষটা কেমন ঝগড়াটের মতো চিৎকার করছে। আমার মুখে আর কথা জোগায় না। কান্না পাচ্ছে খুব।
নিজের ঘরে ফিরি। অঙ্কিতা এখনো বয়ফ্রেন্ডের বদলে যাওয়ার বিবরণ দিচ্ছে। আমার আর পড়তে ইচ্ছে করে না। ছোট করে লিখি, এসবই করোনা বিষ। দেখা নাই সাক্ষাত নাই কিভাবে কমবে বলো।