ছাপার ভুল

সুগত সিংহ

সত্তরের শেষের দিক।কলেজে উঠেই সব বাঙালিকে যে রোগে ধরে আমিও সেই ছোঁয়াচ থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারলাম না । কয়েকজন বন্ধু মিলে একটা লিটল ম্যাগাজিন বার করে ফেললাম । অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে বিনয় ঘোষের একটা লেখা পাওয়া গেল । তাতে লেখকের নাম বিনয় ঘোষের বদলে ছাপা হল - বিনয় ঘোঘ ! ! একেবারে শিরোনামের বোল্ডে এধরণের ভুল মানে প্রায় বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা । ওই ভুলটা যে কি করে চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল তা আজও আমার কাছে রহস্য । আমাদের স্কুলের সিনিয়র বামাদা মানে বামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় লেখালেখি করে।গল্পটা শুনে নির্বিকার মুখে বলল - ও আর এমন কি ? মনোজ বোসের নাম - বনোজ মোষ ছাপা হয়ে
গিয়েছিল । এটা সত্যি না গল্প আমার সন্দেহ আছে । কারণ ছাপাখানায় এমন এমন ভুল হয় যে তা নিয়ে অনেক জোকসও চালু আছে । সেগুলো ছাপার ভুল না বলে ছাপার গুলও বলা যেতে পারে ।

তবে নামের বানান ভুলে শুধু ছাপাখানা নয় সিনেমার ক্রেডিট টাইটল ও পিছিয়ে নেই । ফ্রান্সের প্রখ্যাত পরিচালক ফ্রাঁসোয়া ক্রফোর একটি বিখ্যাত ছবির ফরাসী নাম - La Sirene du Mississipi. নদীর নামের ঠিক বানান
হলো - Mississippi । ছবিটির ইংরেজি টাইটেলে অবশ্য ভুলটা শুধরে করা হয় - Mississippi mermaid . বানানটা যদি বাংলায় ঠিকঠাক লিখতে যাই তাহলে কি এই দাঁড়াবে - মিসসিসিপ্পি ।
State of the Union ছবিতে চল্লিশের দশকে এক মারকাটারি অভিনেত্রীর নাম হোমেজ হিসাবে একটি আলাদা কার্ডে হাফ স্ক্রিন জুড়ে লেখা হলো - Katherine Hepburn. কিন্তু তাঁর নামের বানান আসলে - Katharine. আমাদের দেশে বসে মনে হতে পারে এটা আর এমন কি ভুল ? কিন্তু অমিতাভ বচ্চনের নাম যদি
Amitabha Bacchan বা Amitabh Bachpan

লেখা হয় তবে ফ্যান মহলে যেরকম হিস্টিরিয়ার ঢেউ উঠে যাবে ওদের দেশেও তাই হয়েছিল ।
তবে দুঃখজনক ঘটনা হলো Alec Guinness এর নাম Alec Guiness হয়ে গিয়েছিল বলে বেচারা এক্কেবারে অস্কারের নমিনেশন থেকে বাদ হয়ে গিয়েছিলেন । ভুলটা হয়েছিল
Bridge on the river Kwai ছবির টাইটেলে ।

নামে কি রকম ভুল হয় তার একটা ঘটনা নিজের চোখে দেখে খুব মজা পেয়েছিলাম । যীশু দাশগুপ্তের পরিচালনায়
ই - টিভিতে একটা সিরিয়াল হত - তিথির অতিথি । যার চিত্রনাট্য আমি লিখতাম । একদিন সেই শুটিং এর মধ্যে যীশুদার জন্য কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের কার্ড এল , তাতে নাম লেখা TISU DASGUPTA
রেগেমেগে যীশুদা প্রতিবাদ করায় সংশোধন হয়ে নতুন কার্ড এল ISU DASGUPTA
আমরা বললাম তুমি ওই কার্ড নিয়েই ছবি দেখ নাহলে এরপর হয়তো HISU DASGUPTA ও এসে যেতে পারে । যীশুদা রেগে বলল - তোরা ইয়ার্কি মারছিস ? আমার কত বড় আইডেন্টিটি ক্রাইসিস হয়ে যাচ্ছে জানিস !

প্রথম জীবনে বিনয় ঘোষকে বিনয় ঘোঘ ছেপে যে পাপ করেছিলাম তার মাসুল আমায় পরে অহরহ দিতে হয়েছে । সত্যজিৎ রায় পথের পাঁচালির পরই মহানগর করতে চেয়েছিলেন । কিন্তু নারী স্বাধীনতা নিয়ে এরকম রূঢ় ও বাস্তব ছবি দর্শকরা নিতে পারবে কি না এই দোলাচলে তখন প্রযোজক পাওয়া যায়নি । এটা বলতে গিয়ে লিখেছিলাম -মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় একটা তিক্ত প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে যাবে , এই ভয়ে প্রযোজকরা পিছিয়ে গিয়েছিলেন । সেটা ছাপা হল - তথ্যচিত্র সম্প্রদায় একটা তিক্ত প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি । সমালোচনা কি হওয়া উচিৎ বলতে গিয়ে আর একটি প্রবন্ধে লিখেছিলাম - ভাবগত গুণপনার দিক থেকে শিল্পীর সমকক্ষ হলে তবেই সঠিক সমালোচনা করা যায় , নইলে তা আলোচনা হয়ে দাঁড়ায় । ছাপা হলো- ভাগবত গুণপনার দিক থেকে শিল্পীর সমকক্ষ হলে ইত্যাদি ইত্যাদি । তুলসী চক্রবর্তীকে নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম যার একটি লাইন ছাপা হলো এইভাবে- তাঁর যে বডি ল্যাংগুয়েজ , কথার ফাঁকে ফাঁকে চোখ , মুখ , নাকের যে ছোট ছোট কুঞ্চন তা যেন তার সামগ্রিক একটিং স্কিমের মধ্যে , একটা সামগ্রিক সুরের বিস্তারের মধ্যে ছোট ছোট গিরগিটির মত খেলে যায় ।সম্পাদককে ফোন করে বলেছিলাম কোনো পাঠক যদি গিরগিটি শব্দটা আসলে কি তা বলতে পারেন তাঁকে একলাখ টাকা পুরস্কার দেব । শুধরে নিয়ে আরও বলেছিলাম -না না! পাঠককে এক আর প্রুফ রিডারকে একলাখ দেব কারণ তাঁর উদ্ভাবনী শক্তিও কিছু কম নয় ।শব্দটা আসলে ছিল গিটকিরি । তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয়ের মধ্যে ছোট ছোট গিরগিটি খেলে যায় - উৎকট এই লাইনের কোনো মানে আছে ? এইসব শুনে বামাদার শোক উথলে ওঠে । কোনো একটা ছোট গল্পে বামাদা লিখেছিল - কলতলায় মুখ ধুচ্ছি । ছাপা হয়েছিল কলকাতায় মুখ ধুচ্ছি। এর মধ্যে মানে না থাকলেও একটা মজা আছে । আবার এমন ভুলও হয় যাতে মানেটা পাল্টে আর একটা মারাত্মক মানে
দাঁড়িয়ে যায় । এব্যাপারে সাহেবরা আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে আছে । ক্রিশ্চিয়ানরা বিশ্বাস করে অথরাইজড্ কিং জেমস বাইবেল হচ্ছে বাইবেলের একটি নির্ভরযোগ্য ভার্শন । কিন্তু তার বিভিন্ন এডিশনে যা ভুল থেকে গেছে তা ভেবে আঁতকে উঠতে হয় । এদের ১৩৬১ সালের এডিশনে এক্সোডাস পর্বে —"Thou shall not commit
adultery " র " not " টা বেমালুম উবে গিয়ে ছাপা হল" Thou shall commit adultery " !
কিং চার্লস প্রচন্ড ক্ষেপে সব কপি বাজেয়াপ্ত করে নষ্ট করে দিলেন । বিভিন্ন মিউজিয়ামে এই এডিশনটির মাত্র এগারোটি কপি সযত্নে রক্ষিত আছে । কিং চার্লস তিনশো পাউন্ড জরিমানাও করেছিলেন যা সেই জমানায় একজন প্রিন্টারের সারাজীবনের রোজগার । এই দাওয়াইয়ের পর একশো সত্তর বছর এরা মন দিয়ে ঠিকঠাক বাইবেল ছাপার পর ১৮০১ সালে আবার এক কেলেংকারি করে বসলেন । ' These are murmures ' এর বদলে ' These are murderers ' এবং ' let the children first be killed ' ছাপা হয়ে গেল ।এডিশনটি এমন মৃত্যুমুখী বলে ঠাট্টা করে তার নামকরণ করা হয়
The Murderers Bible. সাহেবদের রসবোধ আছে ।এদের অন্য একটি এডিশনে যে ভুলটি হয় সেটি ছাপার ভুল নিয়ে শেষ কথা । Princes have persecuted me without a cause ছাপা হয়।প্রিন্টাররা লেখককে কেন ঈশ্বরকেও বিনা কারণে খুন করে ফেলতে পারে । আমাদের বাইবেল তো রবীন্দ্রনাথ । কথা ও কাহিনীর মানী কবিতাটা ছেলেবেলা থেকে পড়ে আসছি । ক্লাস টেনের সিলেবাসেও ছিল।তার শুরুটা এরকম।
আওরংজেব ভারত যবে
করিতেছিল খান খান
মারবপতি কহিলা আসি
' করহ প্রভু অবধান
গোপন রাতে অচল গড়ে
নহর যারে এনেছে ধরে
বন্দী তিনি আমার ঘরে
সিরোহীপতি সুরতান । '
কোনোদিন মনে হয়নি সেদিন পড়তে গিয়ে খটকা লাগল। নহর মানে তো খাল যার থেকে নেহেরু পদবীর উৎপত্তি । খালবিল অধ্যুষিত অঞ্চলে ওরা বংশানুক্রমে বাস করতেন । হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ উল্টে আর একটা মানে পেলাম - আমোদ-সামোদ, রঙ্গরস। দাশরথি রায় থেকে হরিচরণ এই দ্বিতীয় প্রয়োগটির একটি উদাহরণ দিয়েছেন - এ নয় তেমন সহর , যে করিবে নহর , লয়ে কুলাঙ্গনা ।

এই নহর আসলে লহর শব্দের দেহাতি উচ্চারণ । লেবুকে নেবু , লুচিকে নুচি বলে আমাদের জিব এখনো একটা আরাম পায় ।এই অর্থেও মানী কবিতার নহরকে ঠিক খাপে খাপে ফেলা যায় না ।শব্দটা কি তাহলে নফর হবে ?
' গোপন রাতে অচল গড়ে / নফর যারে এনেছে ধরে ...
এরকম হলে মানে একটা দাঁড়াল ।আমার পক্ষে যেকটা সংস্করণ ঘাঁটা সম্ভব সবেতেই দেখি নহর ।আমার পরিচিত রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞদের জিজ্ঞেস করে তেমন কোনো সদুত্তর পাওয়া গেলনা । খটকাটা রয়েই গেল ।

এসবতো গেল বেসরকারি ভুল । এবার সরকারি ভুল । ইন্টারনেট এর অনলাইন অকশনে ঢুকলে বিভিন্ন দেশের ভুল কারেন্সি চড়া দরে বেচাকেনা হতে দেখা যায় । সিরিজ এবং নম্বর ছাড়া হাজার টাকার একটি ভারতীয় নোটের দাম উঠেছে এগারো হাজার টাকা । সিরিজ ছাপা হয়েছে নম্বর ছাপা হয়নি । নম্বর ছাপা হয়েছে সিরিজ
ছাপা হয়নি । দুইদিকে অশোকস্তম্ভ ছাপা হয়ে গেছে , এসব আকছার হয় ।
তবে ১৮৫৪ সালে একটি স্ট্যাম্পে রানী ভিক্টোরিয়ার মুখ উল্টো ছাপা হয়ে গেছিল । ব্রিটিশদের পক্ষে সেটা প্রায় গণেশ উল্টোনোর বাড়া ছিল । ১৮৪৭ সালে মরিসাস থেকে রানী ভিক্টোরিয়াকে নিয়ে একটি স্ট্যাম্প বেরোয় যাতে
- POST PAID এর বদলে POST OFFICE ছাপা হয়।
শোনা যায় ঐ স্ট্যাম্প সম্বলিত দুটি চিঠি কলকাতায় আসে ।একটি হাটখোলার দত্ত বাড়িতে অপরটি প্যারীচাঁদ মিত্রের নামে ।
খুঁতধরা বেগুন পটল কেউ কিনতে চায় না । কিন্তু আমার চেনা এক কালেক্টর হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে দত্ত বা মিত্তির বাড়ির লতায় পাতায় কাউকে পটিয়ে ঐ স্ট্যাম্প এর একটি যদি জোগাড় করা যায় । তার জন্য যত টাকা লাগে সে দিতে তৈরী । কারণ এ হল দুর্মূল্য ভুল । মনে পড়ে যাচ্ছে দাদাঠাকুরের একটি গান - কলকাতা কেবল ভুলে ভরা। গানটা এভাবে ভুল গাইলেও কোনো ভুল হয়না - ছাপাখানা কেবল ভুলে ভরা ।
আর বাড়াব না কারণ ভুলের ফিরিস্তির কোনো শেষ নেই । বরং একটা আপ্তবাক্য দিয়ে শেষ করাই ভাল ।
' কাজ করলেই ভুল হয় , কাজ না করলে কোনো ভুল নেই ' ।