নোঙর

নিবেদিতা আইচ

কোকন আলীর মাথা ভর্তি উকুন। সারাদিন মাথা চুলকে যখন বিরক্তির চূড়ান্ত হয় তখন সে একটা অদ্ভুত কাজ করে। একমুঠো চুল খামচে ধরে হাতের তালুর উপর গোটাকয়েক উকুন এনে ফেলে। তারপর সরাসরি মুখের ভেতর চালান করে দেয় আর এক বিচিত্র ভঙ্গিতে চোখ বুঁজে বসে থাকে, যেন ক্রমশ খুব গভীর কোনো ধ্যানে ডুবে যাচ্ছে।
এসময় আশেপাশে কেউ থাকলেও টুঁ শব্দ করবার উপায় নেই। কোকন আলীর নিশানা মারাত্মক, কখনো লক্ষ্যচ্যুত হতে দেখেনি কেউ ওকে। ধ্যানমগ্ন অবস্থাতেই যে কারো দু'চোখের মাঝ বরাবর বসিয়ে দিতে পারে শক্ত এক ঘা! তবু মাঝেমাঝে দুষ্টু ছেলেপুলে দুয়েকটা ঢিল ছুঁড়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। কোকন আলী তখন উদাস ভঙ্গিতে নিজের হাড় জিরজিরে শরীরে হাত বুলাতে থাকে কিংবা পুকুরঘাটে গিয়ে বসে।
দোয়াইগাঁও এলাকায় আরো একটা পুকুর আছে। সেও প্রায় দেড় দু'মাইল দূরে। তবু কেউ কাজে বা অকাজে কেরামতির পুকুরে নামে না। যত তাড়া থাকুক এপথ মাড়ায় না। পুকুরের খাদেম হিসেবে কোকন আলীর চোখকে ফাঁকি দেয়া কঠিন। শুধুমাত্র মাসের শেষ বৃহস্পতিবার এর ব্যতিক্রম হয়। প্রতিমাসে এই দিনটিতে আশেপাশের গ্রাম থেকে লোকজন আসে পুকুরের পানি সংগ্রহ করতে।
প্রায় চল্লিশ বছর ধরে এই রেওয়াজ চলছে। তার আগে এই পুকুরের কোনো নাম ছিল না। কোকনের মনে আছে তখন সবেমাত্র মুজিব সরকারের পতন হয়েছে। 'খন্দকার মুশতাক নয়া রাষ্ট্রপতি', 'ঐতিহাসিক নবযাত্রা', ‘দেশে সামরিক শাসন জারি হয়েছে’- এইসব খবর পত্রিকায় এসেছিল। কোকন আলীর মাথার ভেতর কুয়াশাটাও তখন থেকে জমাট বেঁধেছে। কী অদ্ভুতভাবে সময়টা বদলে যাচ্ছিল। এই পুকুর আর দোয়াইগাঁও তার সাথে সাথে বদলে গিয়েছে।

সেই দোয়াইগাঁওতে আজ অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটেছে। শেষরাতে বাতেন মোল্লার দুই নম্বর ঘরের ছেলের বৌকে যে জ্বীনে ধরেছে তা এরই মধ্যে পাঁচ কান হয়ে গেছে। বিস্তারিত জানতে সকাল থেকে সবাই জড়ো হচ্ছে বাতেন মোল্লার বাড়ির উঠোনে।

মাত্র একমাস আগেই পাশের গ্রামের মোহসীন মৃধার মেয়ে বাতেন মোল্লার ছেলের বউ হয়ে এই গ্রামে আসে। ফজরের আযানের সময় ল্যাট্রিন থেকে ফেরার পথে রক্ত হিম করা এক দৃশ্য দেখে মেয়েটা পড়িমরি করে ছুট দেয়। তারপর বাড়ির উঠোনে এসে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সাথে সাথে দাঁত কপাটি লেগে মুখ দিয়ে গ্যাজলা বের হয়েছে ওর।

মেয়েটার 'মিরগি রোগ' আছে কিনা কেউ একজন তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলো। সেই থেকে মোল্লাবাড়ির সবার মুখ ভার। দুয়েকজন করিৎকর্মা লোক মজু ফকিরকে ডেকে আনতে গেছে। মেয়েটার অবশ্য জ্ঞান ফিরতে দেরি হয়নি। কিন্তু সেই থেকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। উঠানে জড়ো হওয়া মহিলারা বেশ ডাকাডাকি করেছে। কিন্তু সে সাড়া দেয়নি একবারও।

এবার শাশুড়ী তৎপর হলেন। কথা বলার চেষ্টা করলেন ছেলের বৌয়ের সাথে।
অই আকলিমা, কী দ্যাকছস রে তুই ?

আকলিমা নিজের নাম শুনে একবার মুখ তোলে। তারপরই ভয়ার্ত চোখে চারপাশে তাকায়। কিন্তু মুখ দিয়ে শব্দ বেরোয় না ওর। উঠানভর্তি লোকজন, সবার দৃষ্টি ওর দিকে নিবদ্ধ।
শাশুড়ীর রোখ চেপে যায়। গায়ে ধাক্কা দিয়ে বললেন - ওই ছ্যাড়ি, কথা ক কইলাম!

আকলিমা দুর্বলভাবে আঙুল তুলে পুবদিকে ইশারা করে। ওর কথাগুলো জড়ানো, তবু উপস্থিত সবাই 'লাশ' শব্দটা শুনতে পায়। নড়েচড়ে বসে সবাই। পুবদিকে ল্যাট্রিনের ঠিক পেছনে পিপুল গাছের সারি। তার শেষ মাথায় কেরামতির পুকুর। কয়েকজন ব্যাটাছেলে সেদিকটা পরীক্ষা করতে চলে গেল তখুনিই।

কেরামতির পুকুরের উল্টোদিকে শান বাঁধানো ঘাটটা এখান থেকেই চোখে পড়ে। শত বছরের পুরনো ঘাট ওটা। সাদা পাকুড় গাছের ছায়ায় পুকুরের জলটা আরো বেশি রহস্যাবৃত দেখায়। কোকন আলী এই সময় ঘাটে দাঁড়িয়ে মেসওয়াক করে। লাশের খোঁজ নিতে যাওয়া লোকগুলো বেশিক্ষণ সেদিকে তাকায় না। কোকন আলীর দৃষ্টি বড় রহস্যময়, একটা সম্মোহনী ক্ষমতা আছে তার। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই কেমন একটা অস্বস্তি হয়।

সবাই যখন নানারকম জল্পনা কল্পনা করছে তখন বাড়ির ছোট ছেলেটা ছুটে আসে। এসে বলে সত্যি সত্যিই একটা লাশ দেখে এসেছে সে। কাঁটাঝোপের ওদিকটায় গাছের সাথে উল্টো করে ঝুলিয়ে রেখে গেছে কেউ, সে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে। যারা এখন পর্যন্ত ভাবছিল মেয়েটা ঘুমের চোখে ভুলভাল দেখেছে এবার তারাও মানতে বাধ্য হলো। আর বর্ণনা শুনে মানুষটি কে সেটা কারুর বুঝতে বাকি রইলো না।

লাতু মুন্সীর ছেলেটার নাম রবিন মুন্সী। সে বেশ কিছুদিন এলাকায় ছিল না। বোধ হয় দু’দিন আগেই বাড়ি ফিরেছে। ওকে নিয়ে কানাঘুষা চলছিল। তার কারণও ছিল অনেক। মুন্সীর ঘরে বেশ কিছুদিন ধরে অচেনা লোকজনের আনাগোনা দেখা গেছে। লোহার টুকরা, ভাঙ্গা কাঁচ, ছোট পেরেক আর বারুদ মজুদ করা হচ্ছে বাড়ির এককোণে। বোধ হয় এসব জিনিস সাপ্লাই দেয় রবিন।

এই তো গত মাসেই যখন টানা তেরো দিন অবরোধ হলো সারা দেশে, পেট্রোল বোমা আর ককটেল ফাটানো হলো প্রায় সব জেলা শহরে, 'বোমা হামলায় নিহতের সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়ে গেছে'- পত্রিকায় শিরোনাম হলো। তখন এদিককার বাজারে ভানু সাহার দোকানের সামনে চলন্ত লেগুনায় কারা যেন পেট্রোল বোমা মেরেছিল। প্রায় সব যাত্রীই আহত হয়েছে । শিকদার মুদির দোকানটাও পুড়েছে তখন। ভানু সাহাসহ সাতজনকে মেডিকেল কলেজে পাঠাতে হয়েছে। ভানুর অবস্থাটা বেশি খারাপ, শরীরের অনেকটা অংশ পুড়ে গেছে লোকটার।

এই ঘটনার পর পুলিশ এদিকটায় এসেছিল তল্লাশি করতে। মুন্সীবাড়ির অতীত ইতিহাস এমনিতেও সুবিধার নয়। পুলিশ তাই ওদের বাড়িতেও গিয়েছিল। লাতুকে পেলেও তার ছেলে রবিনের নাগাল কিন্তু পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনের যুগে খবর পাওয়া সবচেয়ে সহজ, রবিন মুন্সী তাই ঠিক সময়মতো গা ঢাকা দিতে পেরেছিল।
এরপর পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হতে না হতেই আজকের ঘটনাটা সবাইকে হতবাক করে দিল। রবিন মুন্সীকে যে কেউ মেরে ফেলতে পারে এমনটা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি কেউ। সবার চোখেমুখে আতঙ্ক আর বিস্ময়। উপস্থিত সকলের মধ্যে প্রবীণ যিনি, তিনি আরো বেশি চিন্তিত। অন্তত বছর চল্লিশ কি পয়তাল্লিশ আগের আরেকটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে তার। তখন দেশ মাত্র স্বাধীন হয়েছে। মুন্সী বাড়ির আরেক ছেলে, হীরু মুন্সী মানে রবিন মুন্সীর পিতামহও ঠিক এভাবে খুন হয়েছিল।

দোয়াইগাঁও নিরিবিলি জায়গা। কিন্তু বোমার ঘটনাটার পর আবার এই খুন পুরো এলাকার লোকজনকে ভড়কে দিয়েছে। এলাকার সবাই জড়ো হয়েছে এক জায়গায়। দুপুর নাগাদ পুলিশ এসে পৌঁছালেও ভিড় সামাল দিতেই অনেকটা সময় লেগে গেল।

এই খুনের ঘটনার পর কেরামতির পুকুরে লোক বিশ্বাসীদের সমাগম কিছুটা কমে গেলো। স্বাভাবিকভাবেই সবাই একটু ঘাবড়ে গেছে। কোকন আলী আজ কোথাও যায়নি। পাকুড়ের ছায়ায় বসে ঝিমাচ্ছে সকাল থেকে। অনেকদিন পর ঘুমে দু'চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে তার। যেন হঠাৎ করেই ক্লান্তিতে শরীরটা অবসন্ন হয়ে পড়েছে।

মাসের শেষ বৃহস্পতিবার আজ। অন্যান্য দিন কোকন আলী নিজেই ঘাটে বসে তদারকি করে, কখনো কখনো নিজের হাতে পানি তুলে দেয়। কথিত আছে কেরামতির পানির অনেক গুণ। এই পানি পান করলে রোগ বালাই দূর হয়ে যায়। তাই অনেকেই বোতল ভরে পানি নিয়ে যায় তদবির হিসেবে ব্যবহার করতে।
কোকন আলী হাতের ইশারায় সবাইকে দ্রুত কাজ সারতে বলেছে। এমনিতেও সে সহজে মুখ খোলে না। আজ সে একদম নিশ্চুপ। মুখটা বড় গম্ভীর আর চোখের মণি দুটো আরো বেশি ঘোলাটে, আরো ধূসর দেখাচ্ছে। মাথার ভেতর জমাট কুয়াশা তার। আর একটা বিরান মাঠ। মাঠটা বড় নির্লজ্জ রকমের ফাঁকা আর শুনশান। এই নিরবতাকে থেঁতলে দিয়ে মচমচ শব্দ শোনা যায় হঠাৎ করেই। ঘোলাটে মণি দুটো একবার চঞ্চল হয়ে ওঠে। তারপর আবার ধপ করে অন্ধকার নেমে আসে চারপাশে, যেন আকাশ থেকে মাটির অনেক তল অব্দি কয়েক পোচ আলকাতরা মেখে দিয়েছে কেউ।
এবার কোকন আলী ঘুমিয়ে পড়ে। পুকুরের খাদেমকে এরকম সময় কখনো ঘুমোতে দেখেনি কেউ। ঘাটের কাছে দাঁড়িয়ে তাই কয়েকজন ইতস্তত করে। তারপর নিজেরাই অনেকটা ধাপ নেমে গিয়ে বোতল ভরে পানি তুলে নেয়। তারপর সন্ত্রস্ত পায়ে সরে পড়ে ওখান থেকে।
কোকন আলী তখন ঘন জঙ্গলের ভেতরে বসে আছে। নিশ্বাস ফেলতেও ভয় হচ্ছে, যদি কেউ তার উপস্থিতি টের পেয়ে যায়! খুব সাবধানে পা ফেলে সে একটু একটু করে এগোয়। দূরে কুপিবাতির টিমটিমে আলো। সেই আলো তার শত্রুর অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। অল্প অল্প করে এগোলো কোকন, যতক্ষণ না পর্যন্ত আলোটা আরো উজ্জ্বল হয়ে ধরা দেয়, ঘরের জানালা দিয়ে শত্রুর আদলটা না স্পষ্ট হয়। এইবার শুধু মোক্ষম সময়ের অপেক্ষা। এক মিনিট, দুই মিনিট করে বোধ হয় অনন্তকাল পর্যন্ত কোকন অপেক্ষা করতে থাকে।
চারদিকে তখন কৃষ্ণপক্ষের নরম জোছনা আর হিলহিলে উত্তুরে হাওয়া। সে হাওয়ায় গায়ে কাঁটা দেয়। আর গাছের সারির ফাঁকে শত্রুর লাশটাও একটু একটু দোল খায়।

কোকন আলীর ঘুম ভাঙে। ধড়মড় করে উঠে বসে সে। গুলির শব্দটা এখনো কানে বাজছে তার। মনে পড়ে মাটিতে পড়ে থাকা হীরু মুন্সীর শরীরটা তখনো ছটফট করছিল। ষোল বছরের কিশোর কোকনের বুকের ভেতরটা ততক্ষণে শান্ত হয়ে এসেছে। নির্লিপ্ত চোখে শরীরটাকে নিথর হতে দেখছিল সে। একদলা থুতু ফেলে কোকন বলেছিল- শালা রাজাকার!
একটু পর জঙ্গলটা আরেকবার নির্জন হয়ে গেলে হীরুর মৃতদেহটি জোছনার আলোয় একা একাই ঝুলতে থাকে। পরদিন সকালে দোয়াইগাঁও এ যুবকদের লাইন দেখা যায়। সবাই স্কুলের মাঠে অস্ত্র জমা দিতে গেছে। যাদের কাছে রাইফেল আছে তারা সবাই গেছে। শুধু যায়নি কোকন।

কোকন তখন পুকুর ঘাটে বসে বেড়ার ঘেরটার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে। তার আম্মা আর বুবু এই পুকুরে গোসল করতো। মিলিটারিরা যখন এদিকে ক্যাম্প করেছে কোকন তখন দোয়াইগাঁওতে ছিল না। সঙ্গীদের সাথে তুলাডাঙ্গায় গিয়েছিল ।
অপারেশন শেষ করে দু'দিন পর ফিরে এলো কোকন। আম্মা, বুবু কারো সাথেই আর দেখা হলো না। লোকমুখে শুনেছে সেদিন রাতে ওকে খুঁজতে হীরু মুন্সীরা এসেছিল। যাওয়ার আগে ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে ওরা।
আম্মার মুখটা ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে যায় কোকন। মনে পড়ে ক্যাম্প থেকে ফিরে আসার সময় কেউ একজন বলেছিল আবার যদি কখনো দেশের জন্য যুদ্ধে যেতে হয়, নোঙর ফেলা আছে এই ঘাঁটিতেই, কেউ যেন তা না ভোলে।
অর্ধশত বছর পেরিয়েও কোকন আলী মনে রেখেছে সে কথা। মগ্ন পায়ে প্রায়ই সে পানির কাছাকাছি গিয়ে বসে। বয়স্ক প্রতিবিম্বটা তিরতির করে কাঁপে ওর। কাঁপতে কাঁপতে স্থির হয় একসময়। তারপর ক্রমশ ষোল বছরের তরুণ একটা মুখ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
টুপ! কেরামতির জলে মৃদু আলোড়ন। কোকনের হাত থেকে প্রিয় রাইফেলটা পানির নিচে অদৃশ্য হয়ে যায়। এই একটা শব্দ, এই একটা দৃশ্য ধূসর করোটির ভেতরেও আলোড়ন তোলে বছরের পর বছর।
চারপাশে ছমছমে নীরবতা। উল্টোদিকের জঙ্গলে পাখি দম্পতিও বুঝি কয়েক সেকেন্ডের জন্য ডাকতে ভুলে যায়। ঠিক সেদিনের সকালটার মতোন। কোকন আলীর চোখমুখ যেন অদ্ভুত শান্ত এক ছবি। আর মাথার ভেতর সেই পুরনো গুনগুন-নোঙর..ঘাঁটি।



---------