কুয়াশা

চন্দন ঘোষ

বাঁ হাত দিয়ে বুক চেপে ধরে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেতে যেতে সৌম্য অনুভব করল মাথার ভেতর একরাশ কুয়াশা পাকিয়ে উঠেছে। আর সেই কুয়াশার মধ্য দিয়ে বহুদূর চলে গেছে একটা সরু রাস্তা। সৌম্য হাঁটতে থাকল। কোনো ব্যথা-যন্ত্রণা আর নেই এখন। পথটা কিছু দূরে গিয়ে দুদিকে ভাগ হয়েছে। সৌম্য ডানদিকটা নিল। অনেক পায়ের ছাপ এই পথে। কিছুদূর গিয়ে একটাই মাত্র কুড়েঘর আরো কুয়াশার মধ্যে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সৌম্য বুঝতে পারল এখানেই তাকে ঢুকতে হবে।
#
দরজায় টোকা দিল সে। খোলাই ছিল। ক্যাঁচ করে খুলে গেল। ঘরের ভেতর আরো ঘন কুয়াশা। অন্ধকারেরও যে একটা আলো আছে বুঝতে পারল সৌম্য। কুয়াশা ভেদ করে গম্ভীর একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, এলি তাহলে?
#
সৌম্য উত্তর দিল, "অ, আগে থেকেই সব জান দেখছি। তা এতরাতে এই নকশা করার কী দরকার ছিল।"
#
"সেসব তুইই ভালো জানিস। ওকে দুপুরে অত ধমকানোর, আর চোখ পাকানোর কী দরকার ছিল। কোনোদিন ভালোবেসে মিষ্টি করে ছাড়া তো কথা বলিসনি। তা এতদিন পরে এই ভীমরতি হল কেন তোর? তাই একটু কষ্ট দিতেই হল। এখন থেকে আমার কাছে থাকতে হবে তোকে।"
#
সৌম্য দমল না। রীতিমতো তেরিয়া হয়ে বলল, "বুড়ো ভাম, সব জান আর এটা জান না। বিকেলেই তো আমি ওকে কতো আদর করলাম। চোখ মুছিয়ে দিলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। সেসবের কি কোনো দাম নেই? চোখে তোমার ছানি পড়েছে গুরু। ডাক্তার দেখাও।"
#
কুয়াশার পর্দা ভেদ করে গুড়গুড় করে একটা হাসি ভেসে এল। "ওইটুকুর জন্যেই তো এযাত্রা পার পেয়ে গেলে চাঁদু। যাও আর নক্কাছক্কা করতে হবে না। এবার তুমি ফোটো। একটু টাইট দিয়ে দিলাম আর কি!"
#
সৌম্য হা হা করে কী একটা বলতে যাচ্ছিল। অমনি ওদের দশ বাই বারো ঘরটার এল-ই-ডি ল্যাম্পের আলো একেবারে বাঘের মতো লাফিয়ে পড়ল ওর চোখে, গায়ে, বুকে। সৌম্য দেখে ওর সামনে দুই ছলাৎছল চোখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাধুরী। পাগলের মতো ওকে ধরে ঝাঁকাচ্ছে আর বলছে, কী হল, ওগো, কী হল তোমার।
#
সৌম্য জড়ানো স্বরে বলে উঠল, ভয় নেই। ব্যথাটা কমে গেছে। কেঁদো না। এযাত্রা আর কিচ্ছু হবে না।(৩১৪)