করোনা দিন, করোনা রাত

রুখসানা কাজল

‘মারী ও মড়ক, মন্বন্তর, ঘন ঘন বন্যার, আঘাতে আঘাতে ছিন্নভিন্ন ভাঙ্গা নৌকার পাল, এখানে চরম দুঃখ কেটেছে সর্বনাশের খাল’---
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় প্রথম পড়েছিলাম মড়কের কথা। এরপর শরৎচন্দ্রের কোনো লেখায়। তারপর বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং আলোকচিত্রে দেখেছিলাম অতিমারি জ্বর, কলেরা এবং মন্বন্তরের ভয়াবহ করুণ এবং ছমছমে গা চমকানো দৃশ্য।
মফঃস্বলের ধারা বৃষ্টিতে নদীর গন্ধ থাকে। নতুন জল, মাটি আর ধোয়া পাতার আড়ালে নতুন কুঁড়ি আসার গল্প থাকে। থাকে নির্মল আকাশের অনিমিখি চাউনি। লাগাতার বর্ষণ শেষে প্রকৃতি মনের দরোজায় এসে বলে যায়, নতুন করে বেঁচে ওঠার মন্ত্র খুঁজতে।
ব্যক্তিগত দায়দায়িত্ব, প্রেম ভালবাসা, ঈর্ষা অহংকার, ত্যাগ তিতিক্ষার হিসাব টিসাবগুলো পানসে এখন। তবে নিত্যকার বাঁচার ছন্দে অহর্নিশ অপেক্ষা রেখেছিলাম। নিজের মত করে বাঁচার এক লুব্ধ স্বপ্ন। নিভন্ত এই জীবন ব্যেপে ওই এতটুকু আগুন তাতিয়ে রেখেছি মনের ভেতর। সংসারের সোনারুপার খাঁচা ভেঙ্গে একদিন না একদিন মুক্ত আমি হবোই ।
দিন মাস বছর বছর পেরিয়ে মুক্তি পেতে যখন শেষ প্যাচটা খুলতে পারলাম এ বছরের প্রথম সপ্তাহে, দেখি কোভিড১৯ এসে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়ে গেল আমার মুক্তির পথে। হোম কোয়ারেন্টাইন। থাকো ঘরে। থাকলেই চলবে না। ঘরে থেকেও পৃথক থাকতে হবে ঘরের মানুষদের। বেশি বাড়াবাড়িতে লকডাউন। লালপতাকা।
মানলে ভাল। নইলে রক্তচোষা কোভিড১৯এর ভোগে বেঘোর মৃত্যু। অবধারিত।
ভয় ত্রাসে আধমরা হয়ে আছি। ভাবতে বসে খুঁজে পাই না ভয়টা কিসের। সন্তানকে ছেড়ে যাওয়ার ? গাবদাগোব্দো কয়েক ভরি সোনার গহনার ? প্রমিন্যান্ট এরিয়ার প্রশস্ত এই ফ্ল্যাটের জন্যে ? সন্মানজনক চাকরীর লোভে ?
ডর না মাত বিটিয়া। বড়কি বুজি প্রতিটি আপদ বিপদে এ কথাটি বলতেন। খেলতে গিয়ে পা মচকে গেছে। চুন হলুদের গরম প্রলেপ দিয়ে বলতেন ডর না মাত্‌ । ধুতরা ফল খেয়ে ছাগলছানা মরো মরো । ওষুধ দিতে দিতে বলতেন, এ বকরি, ডর না মাত বেটা। কোন মেয়ের গোপন গর্ভপাত হবে, তার মাথা কোলে নিয়ে বড়কি বুজি বলতেন, বিটিয়া ডর না মাত। এ ফুল খেলনেওয়ালো ফুল নেহি হু—
ভারতবর্ষে কবে কোন যুগে প্লেগ হয়েছিল। বিহারের গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে গেছিল প্লেগে। এরপর এসেছিল ভয়াবহ জ্বর। ভয় আর বাঁচার আকাঙ্ক্ষায় ওরা পালিয়ে এসেছিল বাংলা মুলুকে। পথে পথে হারিয়েছে আপনজন। খসে গেছে কত চেনাপরিচিত গাঁও কা দোস্ত। তবু ওরা পালিয়ে আসা থামায়নি। কে যেন ওদের বলেছিল, পৃথিবীর শেষ হচ্ছে পূবে। সেখানে কেবল জল আর জল। সাদা জল, নীল জল। ঘোলা জল। কালো জল। সে জলের তল নেই। সেখানে যেতে পারলে বিমার ভি খতম। অর কুছ ডর নেহি ।
তাই পুবে আরও পূবে ওরা পালিয়ে এসেছিল। পালাতে পালাতে আমাদের ছোট্ট শহরে এসে ঠেকেছিল ওদের মহলা। সেখান থেকে কেউ চলে গেছিল খুলনা, দৌলতপুর। ফুলপুর। কেউ কেউ ফরিদপুর। বহতা নদী সব মাইলি (ময়লা) ধুয়ে নিয়ে যায়। পেলেগ, বুখার খতরনাক বিমার ভি। কিন্তু এখন নদী কোথায় ? তাছাড়া কোভিড১৯ কি ধুয়ে ফেলার মত কোন বিমার !
মানুষকে মানুষের শত্রু করে দেওয়া এ কোন ধরণের বিমার এসেছে পৃথিবীতে ? মানুষ তবে যাবে কোথায় ? কার কাছে পালাবে ?
নারায়ণগঞ্জ লকডাউন করার পর প্রায় দেড়শ জন মানুষ পালিয়ে চলে গেছে বরিশাল। এর আগে ঢাকার মিরপুরের টোলারবাগ লকডাউন করার পর লোকজন পালিয়ে যাচ্ছিল বিভিন্ন পাড়ায়। আইসোলোশনে থাকা পেশেন্ট সুযোগ খুঁজে পালিয়ে যাচ্ছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। যেতে যেতে ছড়িয়ে যাচ্ছে করোনার জীবাণু। মড়ক বুঝি এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে।
হোম কোয়ারেন্টাইনে থেকে প্রতি মুহুর্তে মৃত্যুভয় নিয়ে দেখছি, মড়ককে।
অতিমারি বা মহামারির চাইতে মড়ক শব্দটার জোর বেশি লাগে। শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যয়ের কোন এক উপন্যাসে কলেরা মহামারিতে গরীবদের বাঁচাতে ছুটে যাওয়া নায়ক সম্ভবত ডাক্তার ছিলেন। আরেকটি গল্প শুনেছিলাম। এক শাশুড়ি মা খেতে বসা জামাই লেবু চাইতে ঘর থেকেই লম্বা হাত বাড়িয়ে বাগানের লেবু ছিঁড়ে এনে দিয়েছিল। জামাই ত ছুটতে ছুটতে লোকালয়ে এসে জানতে পারে, বছর কয়েক আগে মড়ক লেগেছিল অই গ্রামে। মরে সবাই ভুতপেত্নি হয়ে গেছে। অই গ্রাম এখন ভুতের গ্রাম। মামাবাড়ির উঠোনে বসে শুনেছিলাম বলে ভাবতাম এটা মামাবাড়ির কাছেরই কোন গ্রাম হবে। তাছাড়া পাকিস্তানী আর্মি এবং তাদের দোসর রাজাকাররা অনেক মানুষ মেরেছিল। জমিতে লাঙ্গল চালাতে, ঘরের ভিটে খুঁড়তে, নদীর চর বা পাড় ভাঙ্গলে মাথার খুলি, বা কংকাল পাওয়া যেত। মায়ের কোলে, বোনের কোলে ভাইয়ের কাঁধে বসে যুদ্ধ দেখেছি । কিন্তু মড়ক ত দেখিনি।
এ কোন মড়ক যেখানে মরে গেলে শেষ গোসল করাতে কেউ আসে না। জানাযা হয় না। মসজিদ কমিটি বা গ্রামের মানুষ লাশ বইবার খাটিয়া দেয় না। শ্মশানে পোড়াতে ভাই বেরাদার পাড়াপড়শি কেউ আসে না। করোনায় মৃত অন্তঃসত্ত্বার লাশ বাপের বাড়ি বা শ্বশুরবাড়ির কবরে জায়গা পায়না। আহারে বাপ। মেয়ের লাশ নৌকায় রেখে ভাসিয়ে রেখেছে মেঘনা নদীর বুকে। রাস্তায় পড়ে আছে লাশ। হাসপাতালের সামনে, বাড়ির বারান্দায়, জঙ্গলে লাশ রেখে কাঁদছে স্বজন। কোটি কোটি মানুষের দেশে, কোটি কোটি মানুষের পৃথিবীতে মানুষ কো নেই মানুষকে সাহায্য করার ! মার্কিন শীর্ষ বিজ্ঞানী ডাক্তার এন্থনী ফসি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পৃথিবীর মানুষ হয়ত করোনার আগের স্বাভাবিক জীবন আর ফিরে পাবে না। প্রতিদিন দেশে দেশে বাড়ছে লাশের বোঝা। প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। বিজ্ঞান ব্যর্থ। না এখনও কোন ওষুধ নেই করোনা সারাবার।
ঢাকা শহরে প্রকৃতি এসে কখনো ডাক দেয় নি। ঘুম ভাঙ্গে অসংখ্য হর্নের শব্দে। বাতাসে সীসা। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। সমুদ্রে গিয়েও জলে নামি না। এই কি জল ? এ কেমন জল ? নোংরা অস্থির। মানুষের গন্ধে বিবমিষাময় ফেনাস্ফুট।
দূরে ফেনায়িত ঢেউয়ের গর্জন শুনে আঁতকে উঠি, দেখে নেব মানুষ। তোদের দেখে নেব।
সমুদ্র শাসন করে গড়ে উঠছে হোটেল মোটেল। ঝাউগাছ নেই। নেই রাস্তা জুড়ে পাহাড়ি বৃক্ষ। অনামি বৃক্ষরাজির গভীর হাতছানিসহ নেই নাতিদীর্ঘ পাহাড় সারি। জলজ বুক থেকে টেনে তুলে খুন করা হচ্ছে সামুদ্রিক প্রাণী। মানুষে মানুষে ক্ষমতার ঔদ্ধত্য । ধরা জ্ঞানে সরা ভেবে প্রকৃতিকে পেনড্রাইভে ভরে ফেলেছি আমরা। কে ঠেকাবে মানুষকে ?
প্রকৃতি পালিয়ে গেছে মহাসমুদ্রের মহাজলের মহাতলে । হু হু ভাইডি। মাইনসের সাথে পারা অত সহজ না। ড্রোন ছাড়ি মারি ফেলাবিনি যাকে তাকে ।
হ্যালো ট্রাম্প, টেপাদা, হাই পুতিন পুটুদা, টিং টং টিং শি জিনপিং ওরে ও নাকে খ্যাদা সেজদা এটা কি হলো গো এবার ? বাঁচবো ত ?
আমার যে কিছু স্বপ্ন ছিল। গরীব ছেলেমেয়েদের জন্যে একটি ইশকুল করার ইচ্ছে ছিল। বেনারসের ঘাটে গুটিসুটি বসে নেমে আসা কুসুম কুসুম ভোর দেখার স্বপ্ন ছিল। এ ফর আপেল শুধু বইতে পড়েছি আর কিনে খেয়েছি। গাছ থেকে পেড়ে খাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল। অন্তত একবার পুরীর মন্দির আর আজমীর শরিফের মসজিদের সামনে বসে ভিক্ষে করব। পশ্চিমবঙ্গের যে কালিমন্দিরের পান্ডা আর পুরোহিতকে হিন্দু বলে ঢপ মেরে ঢুকে পড়েছিলাম একেবারে পুজোস্থলে সেখানে আবার যাবো । লেনিনগ্রাদ বেড়াবো। রাশান কোন গ্রামে হাতে বানানো ঈষদুষ্ণ ভদকা খেতে খেতে গল্প করবো। করাচির কোন এক গোরস্তানে মোনাজাত করার ইচ্ছে ছিল। সেখানে ঘুমিয়ে আছে আমার বড় বোন। প্যারিসের রাস্তায় স্ট্রীট সিঙ্গারদের গান শুনবো । বানজারাদের সাথে ঘুরবো নাচবো। শেষ বয়সে ঘুরে আসবো মক্কামদিনা। আর অন্তিম সময়ে বিছানা ভর্তি বইয়ের মধ্যে পাখির মত ছোট্ট শরীরটা ঘিরে থাকবে স্বজন প্রিয়জনরা। এক জীবনের ধর্ম অধর্মের অসঙ্গতিতে চরম সঙ্গত রেখে আমি চলে যাবো অন্তর্যামীর উদ্যানে।
যারা সাহসী তাদের হাত ধরে রাখি। কিন্তু বেশিক্ষণ পারিনা। ভয় এসে হাত ছাড়িয়ে নেয় । আমি করোনা আতঙ্কে ডুবে যাই। ঘুমহীন, স্বস্তিহীন। দিনরাত। রাতদিন।
-------------------------------------