গল্পে নয়, আয়নায়...

অনিন্দ্য বর্মন


কলিং বেলের শব্দে দরজা খুলেই চমকে উঠলেন রমাদেবী। সিঁড়ির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছেন বরুণবাবু। পাদু’টো কাঁপছে, কপালে ঘাম, জামাটাও ভিজে উঠেছে। রমাদেবী লক্ষ্য করলেন, বরুণবাবু ধীরে ডানদিকে কাত হয়ে পড়ছেন। বিপদ বুঝে ছুটে গিয়ে না ধরলে মানুষটা টাল খেয়ে পড়ে যেতেন। ধরে এনে চেয়ারে বসানো, পাখা চালানো, টাওয়েলে ঘাম মুছে দেওয়া, নুন-লেবুর জল এগিয়ে দেওয়া – সবই ঘটতে লাগল দ্রুত। বরুণবাবু একটু ধাতস্ত হয়েছেন, এমন সময় ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এল আদিত্য। পেশায় স্কুলশিক্ষক, এতক্ষণ আন্তর্জালিক মাধ্যমে অনলাইন ক্লাস নিয়ে নিজের ওয়ার্ক ফ্রম হোম বজায় রাখছিল। পিতৃদেবের সাথে একচোট হয়ে যাওয়ার পর, পাশে বসে আলতো বকুনি এবং গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া। রমাদেবী ভেজা চোখ আঁচলের খুঁটে মুছে রান্নায় মন দিলেন।
বরুণবাবু ভাবছিলেন হাজারো ব্যস্ততা কাটিয়ে শেষ কবে পুত্রের স্নেহ ছোঁয়া পেয়েছিলেন। রমাদেবী দেখছিলেন গত সন্ধ্যার মতোই আজও ছেলের সাথে লুডো খেলার স্বপ্ন। আদিত্যর মন ভার; সত্যিই তো সারাদিনের পর মা-বাবাকে দেওয়ার মতো সময় তার হাতে নেই।
লকডাউনের আজ উনবিংশতম দিন। এই সর্বনাশা মারণরোগ এক লহমায় পৃথিবী স্তব্ধ করে দিয়েছে।

উপরের ঘটনাটি সত্য না কল্পনাপ্রসূত, তা নিয়ে দ্বন্দে লাভ নেই। আমরা বর্তমানের কঠিন নিষ্পেষণে আবদ্ধ। রাজ্য, দেশ, মহাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে এই অতিমহামারি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যার পোশাকি নাম দিয়েছে প্যান্ডেমিক কোভিড-১৯ ভাইরাস অথবা করোনা ভাইরাস – একে একে গ্রাস করে চলেছে দৈনন্দিন এবং অদূর ভবিষ্যৎ। প্রাথমিক নানা জল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ বিশ্বের প্রায় ২৫ লক্ষ্ম মানুষ করোনা আক্রান্ত। একদিকে যেমন সেরে উঠেছেন দেড় লক্ষ্ম মানুষ, তেমনি প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ প্রান হারিয়েছেন। ভারতের জনবসতির ঘনত্ব অনুযায়ী করোনা এখনও অতটা থাবা বসাতে পারেনি। প্রায় ৫ হাজার মানুষ আক্রান্ত, মৃত প্রায় ২৫০। কিন্তু সংক্রমণ প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। তাল মিলিয়ে বেড়ে চলেছে লকডাউনের মেয়াদও।
রাষ্ট্র এবং সরকার আপ্রান চেষ্টা করে চলেছে করোনার প্রকোপ থেকে দেশবাসীকে বাঁচাতে। বিভিন্ন আইন, গরীবদের জন্য সামাজিক সংস্কার, নীতি, খাদ্য সামগ্রী বণ্টন – সবই করা হচ্ছে। প্রাণপণে লড়ছেন ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ এবং আম-জনতার একাংশ। তাঁদেরই আপ্রাণ চেষ্টায় এখনও সচল রয়েছে দেশের অর্থনীতি, সমাজব্যবস্থা, আইন এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা।
কিন্তু, যাদের স্বাস্থ্য ইতিমধ্যেই ভঙ্গুর, যারা বরুণবাবুর মতোই অসহায়, তাদের বর্তমান অবস্থাটাও ঠিক কিরকম??

সরকারী তথ্য জানাচ্ছে ভারতবর্ষে ১৩৫ কোটির মধ্যে প্রায় ৮.৫% হলেন প্রবীন নাগরিক, অর্থাৎ যাদের বয়স ষাটোর্ধ। এই ৮.৫%এর মধ্যে প্রায় ২৮% মানুষ বাস করেন বৃদ্ধাশ্রমে। যাদের বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল ব্যাঙ্কে গচ্ছিত সামান্য অর্থ থেকে প্রাপ্ত সুদ।
প্রতি বছর অন্তত ০.৫% হারে ব্যাঙ্ক সুদ কমায়। গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারি বেশিরভাগ প্রবীন নাগরিকই ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং সম্মন্ধে অজ্ঞ। এরা কোনও মেডিক্লেমের আওতায় আসেন না। রোগভোগ, পীড়া, ব্যাধি এবং সামাজিক দুরত্ব যাদের বাধ্য করেছে নির্ভরশীল হতে। করোনায় সর্বাধিক মারা যাচ্ছেন প্রবীনেরা কারণ তাদের শারীরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনায় ক্ষীণ। যারা এক সময় দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত ছিলেন, আজ দেশ সর্বপ্রথমেই তাদের অস্বীকার করে। যেমন করোনা আক্রান্ত কিছু দেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তাদেরই বাঁচানোর চেষ্টা করা হবে যাদের বাঁচানো সম্ভব। পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হল যে প্রবীণদের যদি সম্ভব না হয়, তাহলে মরতেই হবে।
কি হবে এই মানুষগুলোর? আর্থিক, সামাজিক কোনও খাতেই এরা মানিয়ে উঠতে পারেন না। সামাজিক অবক্ষয় গ্রাস করেছে তাদের মানসিকতা, শারীরিক দৃঢ়তা এবং অর্থনৈতিক অবস্থান থেকে তারা প্রতিদিন পঙ্গুত্বের দিকে এগিয়ে চলেছেন। যুবাদের কাছে তাদের পরিশ্রম এবং মনস্তত্বের কোনও দাম নেই। বাতিলের খাতায় নাম উঠে গেছে বহুদিন। শুধুমাত্র মৃত্যু প্রতীক্ষা, সন্তানের স্মৃতি আঁকড়ে জীবনের শেষ ক’টা দিন কাটিয়ে দেওয়া...?
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে দেখতে ভয় হয়। বর্তমান একদিন দেওয়ালে পুষ্পাআবৃত ছবি হয়ে উঠবে। যারা সমাজ গড়েছেন, আমরা কি পারি না তাদের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে? নাকি ব্যবস্থাপনা নাকচ করে, মানবদরদী আমরাই ভেঙে দেব সেই নীড় যা একসময় সময়কে ধারণ করেছিল? কতো প্রবীন ওই বরুণবাবুদের মতোই পড়ে যাবেন? সমাজের স্বার্থে, আমাদের স্বার্থে তাদের প্রয়োজন, যারা আমাদের মনুষত্ব গড়ার কর্মে সক্ষম বানিয়েছেন।