শুধু প্রাণ ধারণের গ্লানি

রুমা মোদক

বাড়ির কোনে বাঁশঝাড়,মাটিতে গোড়ায় গোড়ায় গলাগলি, উপরে পাতায় পাতায় ঘর্ষণে শনশন আওয়াজ। এদের ছায়ায় রোদ কেঁপে কেঁপে ওঠে, যাত্রাদলের প্রিন্সেসের মতো কোমর বেঁকিয়ে নাচে।

একটা বাঁশ কাটতে দেন না কাউকে। কতোজন বিপদে আপদে একটা বাঁশ চাইতে আসে। ঘরের খুঁটি কিংবা বাঁশের বেড়া। মধ্যম আয়ের দেশে ইট সিমেন্টের কালেও বাঁশের দরকার ফুরায়নি গ্রামের মানুষের। কেউ মারা গেলে কাঁধে করে নিতেও বাঁশ লাগে। পারলে নগদ টাকা দিয়ে বিদায় দেন। না পারলে খালি হাতে মুখ ঝামটায়। বাঁশ কাটতে দেননা। তাঁর অনেক দিনের বিশ্বাস এই বাঁশঝাড়ের নীচে গুপ্তধন আছে। সেবার রায়ট লাগলে দেশ ছেড়ে যাবার সময় আত্মীয় পরিজনেরা সোনা গয়না, কলসি ভরা হীরে জহরত এই বাঁশঝাড়ের নিচে মাটিচাপা দিয়ে রেখে গেছে। একদিন তিনি সব পাবেন।নিরিবিলি একা খুঁড়ে বের করবেন। কাউকে জানতে দেবেন না। তাঁর মা নাকি মৃত্যুর সময় কানে কানে বলে গেছেন। নিরিবিলি একলা রাতের অপেক্ষায় বয়স তাঁর আশি ছুঁইছুঁই। বাঁশ কেটে নিলেই সব বেহাত হয়ে যাবে। এই বাঁশঝাড় তিনি পাহারা দিয়ে রাখেন নিঃসঙ্গ বুড়োর মতো। এই বয়সে হীরে জহরত দিয়ে করবেনটা কী,এই প্রশ্ন কেউ তাঁকে করে না, তিনি নিজেও ভাবেন বলে মনে হয়না। কিছু পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর তাঁর বর্তমান দিনে কেউ বিশেষ উৎপাত করে না। ভাবে বোধহয়, ব্যাটা আর বাঁচবেই কয়দিন!

পাশেই মাচাঙ টানিয়ে মিষ্টিকুমড়া শাক। মিষ্টি কুমড়ার শাক মহেন্দ্রনাথের বিশেষ প্রিয় খাবার। বাঁধা কাজের মানুষ অঞ্জলির ছেলে পুকুরে দাপাদাপি করে কুঁচো চিংড়ি ধরে আনে। মহেন্দ্রনাথের স্ত্রী কিরণবালা পিঁয়াজ কুচিয়ে, কাঁচামরিচ ফেঁড়ে দিয়ে রান্না করে। আর বিড়বিড় করে, জমিদারের বংশধরের নাকি মিষ্টি কুমড়ার শাক পছন্দ! পায়েস না, পিঠা না, মিষ্টি কুমড়ার শাক! সেই বউ হইয়া আইসা থেকে খালি শাকই রাইন্ধা গেলাম! জমিদারি খালি মুখে।

একটু বেশি বয়সে পাশের গ্রামের কমবয়সী সুন্দরী কিরণবালাকে বিয়ে করেছিলন মহেন্দ্রনাথ। মহেন্দ্রনাথের ভূসম্পত্তির পরিমাণ পাঁচ গ্রামে মিথের মতো। কিরণবালাও শুনেছে। গরীব বাপের ঘর ছেড়ে আসতে তাই খুব বেশি আপত্তি করেনি। পাত্রের বয়স বেশি জেনেও। কিন্তু বাপের ঘরে কুঁচো মাছ আর শাক খেয়ে বড় হওয়া কিরণবালা বিয়ের পর টের পায় গল্পে শোনা যে ভূসম্পত্তি তা মাটি সংলগ্ন। জীবন যাপনে তার ছায়া পড়েনা। বেচলে লাখ টাকা,রাখলে কানাকড়ির মূল্যও নেই। কেবল "আছে" এই পরিতৃপ্তিটুকু ছাড়া। নিত্য খাবার জন্য দু পয়সা বেতনের চাকরিই ভরসা।চাকরি শেষ হবার পর, পেনশনের টাকায় কেনা সঞ্চয়পত্রের সুদ। টেনেহিঁচড়ে চলা। পর্যাপ্ত প্রাপ্তি, সম্পন্ন দিন আসেনি তাঁর জীবনে, একদিনও। চেপে রাখতে রাখতে শখ আহ্লাদ ধূসর হয়েছে, ইট চাপা দেয়া ঘাসের মতো। এখন ক্ষীর পায়েস খেতেও সাধ হয়না, কারো শরীরে জরিপার নায়লনের শাড়ি দেখলেও পরতে সাধ হয়না। সাধেরা বড় অভিমানী। অল্পদিনেই এদের অপেক্ষা ফুরায়। তপ্ত আগুন থেকে তরল জল হয়ে বয়ে চলে যায়, বোধহয় নতুন প্রাণের সন্ধানে। সাধেরা আত্মার মতো, জীর্ণ দেহ ছেড়ে নবীন দেহ খুঁজে ফিরে।

ঘুম থেকে জেগে সারাবাড়ি হাঁটেন মহেন্দ্রনাথ। লাউশাকের নুইয়ে পড়া ডাঁটা পরম যত্নে মাচাঙে তুলে দেন। নিজ হাতে লেবুগাছের তলায় মাটি ঠিক করে দেন। পেঁপে গাছের চারপাশ ঘুরে ঘুরে পেঁপে গুনেন। পুকুরপারে বসে আন্দাজ করার চেষ্টা করেন, রাতে কেউ জাল ফেলে মাছ ধরলো কিনা। প্রতিবেশী বউ ঝিরা হাসাহাসি করে মুখ টিপে। ব্যাটার এক পাও শশ্মানে এখনো কী বিষয়ের মায়া!
বিশাল বাড়িটি ঘুরে ঘুরে দেখাই তাঁর জীবনের একমাত্র শান্তি, একমাত্র তৃপ্তি। এতেই যে তাঁর পূর্বপুরুষের নামধাম, স্মৃতি ঐতিহ্য। তারপর তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা বাঁশঝাড়ের চিরল ছায়ার নিচে জলচৌকি পেতে সরিষার তেলে মাখা মুড়ি আর চা খান। খেতে খেতে ভাবেন, একদিন এই বাড়ির ভাগ্য ফিরে যাবে। আবার কাঠের দোতলা উঠবে। প্রজারা নববর্ষের দিনে কলাপাতায় পায়েস খাবে। তাঁর জীবদ্দশায়ই ঘটবে সব। দেশান্তরি ছেলেটাও দেশে ফিরবে, ফিরবে ইন্ডিয়ায় চলে যাওয়া স্বজনরা, ছোট ছেলেরে তিনি বাজারে ভিটে কিনে ব্যবসা দিয়ে দিবেন। মোবাইল ফোনের ব্যবসা। যে সময়ে যে জিনিসের চাহিদা বেশি!

শুনে বড় ছেলে আর বউ মুখ লুকিয়ে হাসে,বাপের মাথাটা গেছে। সময়ের চাহিদা বোঝেন আর সময়ের চাকা যে উল্টা ঘুরে না এটা বোঝেন না!
মহেন্দ্রনাথ ছেলের অবিশ্বাস বুঝেও চুপ করে থাকেন,তাঁর বিশ্বাসে ফাটল ধরে না। একদিন তাঁরা সব বিশ্বাস করবে, যেদিন সত্যি এমন ঘটবে।
কিন্তু মেজোছেলের সাথে ইদানিং পেরে ওঠছেন না। সারাবছর খোঁজ খবর থাকে না। আমেরিকার সাথে সময়ের হেরফের। মিলে না। কিন্তু বাড়িটা রিসোর্ট করে ফেলার তাগাদা দিতে তার টময় সময় লাগে না। রাত ১ টায়ও ফোন দেয়। ঘুম ভাঙিয়ে ভালোমন্দ ওষুধ বিষুধ, প্রেসার হার্ট ডায়াবেটিসের খোঁজ নিয়েই আসল উদ্দেশে চলে যায়। এতো বড় বাড়ি আনপ্রোডাক্টিভ ফেলে রাখা ঠিক হচ্ছে না।

জমি বিক্রি করে সম্প্রতি মহেন্দ্রনাথ রায়ের হার্টে দুটো রিং লাগানো। মধ্যরাতে তাঁকে ইদানিং ফোন ধরতে দেয় না বড় ছেলে হীরা,হীরেন্দ্র। মেজোকে কষে ঝাড়ি দেয়, তুই আয়,আইয়া কর। দূরে বইসা পরামর্শ দেওন সহজ। মেজো দুর্বল স্থানে আঘাত করে আহত করতে চায়। আমি আসবো ক্যান? তুমি তো বাপের সম্পত্তি ভাইঙ্গা খাইতেছো। তোমারেইকরতে হবে। অন্তরে গভীর রক্তাক্ত ক্ষত হয়, কিন্তু হীরা কিছু বলতে পারে না। বাপ দাদার মূল্যবোধের উত্তরাধিকার কিছুটা হলেও আছে তার। মুখের উপর উচিত কথা সে প্রায়শই বলতে পারে না। বলতে পারে না আমি না থাকলে এই বৃদ্ধ বাপ মাকে দেখতো কে! কে দেখে রাখতো এই বিশাল ভূসম্পত্তি। সব তো বেদখল হতো! প্রায় প্রতিদিন পাড়া পড়শীর সাথে ঝগড়াঝাটি করতে হয়। কেউ রাতের অন্ধকারে পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরে তো কেউ সীমানা বেড়া এক হাত ঠেলে দেয় মহেন্দ্রনাথের বাড়ির দিকে। হীরাও বুঝে এ বাড়ি সবার লোভী নজরের তীক্ষ্ণ তীরের সামনে টিকিয়ে রাখা কঠিন। কিন্তু যতোদিন মহেন্দ্রনাথ জীবিত ততোদিন কিচ্ছু ভাবার উপায় নেই।

ঠিক তিনপুরুষ আগে এই পরিবারে একজন জমিদার ছিলো। সেই ঘিয়ের গন্ধ এখনো মহেন্দ্রনাথের হাতে। গন্ধ মেখেই ভাত খাচ্ছেন একজীবন, সে শাক দিয়ে হোক কিংবা পুঁটি মাছের ঝোল। সুযোগ পেলেই বলেন,আমরা জমিদারের বংশ। লোকে যে মুখ টিপে হাসে, মহেন্দ্রনাথ বোঝেন না। কেউ যে ফিসফিস করে, ইংরেজের পা চেটে জমিদার হইছে তার আবার বাহাদুরি। কিন্তু কারো কারো সমীহটা এখনো যে টিকে আছে ভালোই টের পাওয়া যায়। বিশেষ করে বয়স্করা। ক্ষমতাবানকে ইজ্জ্বত দেয়া এই জাতির রক্তমজ্জায় মেশা। তা সে ক্ষমতা যে উপায়েই অর্জিত হোক। বর্তমান থাকুক কিংবা না থাকুক। মাথা নুইয়ে সেলাম ঠুকে অভ্যাস হয়ে গেছে তাদের।
পূর্বপুরুষদের শান শওকতের কথা রোমন্থন করে অসুখী দিনের হিমে উষ্ণতার আঁচ লাগালেও মহেন্দ্রনাথের নিজের জীবন সংগ্রামমুখর। উপজেলা পরিষদের সামান্য কর্মচারি ছিলেন নিজে। ছেলেপুলে বিশেষ মানুষ করতে পারেন নি। ঠিকমতো মাস্টার,বই,বেতন কিছুই দিতে পারেননি ঠিকমতো। এরাও একেক ক্লাসে দুই তিনবছর থেকে থেকে কোনরকমে পা হীন খোঁড়ার মতো ক্রাচের ভরে স্কুল ডিঙিয়েছে বটে, এর বেশি আগাতে পারে নি। মহেন্দ্রনাথের এ নিয়ে খুব আক্ষেপ আছে এমনটাও বুঝা যায় না। সে বিভোর থাকে তাঁর জমিদারির গালগল্প আর গুপ্তধনের আশায় বাঁশঝাড় পাহারা দিয়ে। তাঁকে সুখী দেখে বরং ভাঁপের আঁচে জ্বলতে থাকা চামড়ার মতো অসহ্য জ্বলুনি ধরে কিরণবালার।

তিন ছেলের দুটোই কাছে নেই, একটা এক বাচ্চাসহ বিধবা মহিলাকে বিয়ে করে আমেরিকা প্রবাসী, আরেকটা চোরাচালান মামলায় আজ বছর দুই জেলখানায়। কাছে আছে বলতে গেলে শুধুই বড় ছেলেটা। মহেন্দ্রনাথের পেনশনের টাকা আর বাড়ির গাছের আম-জাম বিক্রি করে কোনরকম চলে যায় সংসার৷ খুব দরকারে ধানী কোন জমির টুকরো বিক্রি করে দেয় এলাকার উঠতি ধনী মোজাম্মেল মেম্বারের কাছে। হার্টে রিং লাগানো, বড় ছেলের বিয়ে বার কয়েক বড় অংকের টাকা দরকার পড়েছে তাঁর।

মোজাম্মেল মেম্বারের কিসের ব্যবসা কে জানে, তবে মেম্বার হওয়ার বছর তিনেকের মধ্যেই বাড়িতে তিনতলা দালান উঠেছে। যদিও লোকের ঠোঁটেমুখে কোন কথা আটকায় না। বলে বেড়ায়, সীমান্তে সেই ফেনসিডিল চোরাচালানের মূল হোতা। যে ফেনসিডিলের নেশায় গ্রামের যুবসম্প্রদায় বলতে গেলে ফুটো হওয়া নৌকার মতো ডুবন্ত প্রায়। মহেন্দ্রনাথের ছোট ছেলেকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়ে নিজেকে বাঁচানো এই মোজাম্মেলেরই কৌশল। কিন্তু এই এলাকায় জমি কেনার মতো সামর্থ্য একমাত্র তারই আছে। তার কাছে বিক্রি না করে উপায় নেই।

পেনশনে জি বি ফান্ডসহ লাখ দশেক টাকা পেয়েছিলেন মহেন্দ্রনাথ। এই টাকায় সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন। এর সুদেই বর্তমানে সংসার খরচ চলে তার। চাল ডাল মাছ চা পাতা চিনি ছাড়া তেমন খরচ নেই। বাসা ভাড়া লাগে না। অতিথি আপ্যায়ন নেই। গ্যাস বিদ্যুৎ আর ডিশ লাইনের টাকাটা নগদ দিতে গায়ে লাগে। কিন্তু এই তিনটি ছাড়া চলাও মুশকিল।

প্রতিদিন বাজারের ব্যাগ নিয়ে বের হওয়া অভ্যাস মহেন্দ্রনাথের। এটা ওটার সাথে পেলেই দশ টাকার লাউশাক কিনেন, আর শাক বিক্রেতার সাথে একশোটা কথা বলেন, কীটনাশক দেস নাই তো, কয়বার পানি ছিটাইছস? রঙে চুবাইছস?
বাজারে ঢোকলেই বিক্রেতারা তাঁকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য অন্য ক্রেতা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, কেউ বিরক্ত হয়ে বলেই ফেলে, কাকা নিবেন তো দশ টেকার শাক, এত কথা কন ক্যান! কথার আড়ালে উপহাস, বিরক্তি তিনি ধরতে পারেন না শাক বাছতে বসেন৷ বিক্রেতারা দাঁতে দাঁতে কিড়মিড় করে,শুধু ঘাড়ে ধরে সরিয়ে দিতে পারেনা।

বেশ কদিন লাউশাক খাওয়া হয়না।কুঁচি চিংড়ি দিয়ে লাউশাক। খুব প্রিয় খাবার তাঁর। আজ একমাস। নিজের মাচাঙের পাতাগুলো এখনো খাওয়ার যোগ্য হয়নি। আরেকটু ছড়াক! কিন্তু কিনতেও বের হতে পারেন না। বড়ছেলে আটকায়। কি নাকি লকডাউন! বয়স্কদের রিস্ক বেশি।

আর শাক খাবেন কি! কয়েকদিন থেকে ফিসফাস শুনছেন ঘরে ভাত রান্নার চাল নেই, ডাল নেই, তেল নেই। আসলে মাসের হিসাবে আনা হয়। গত মাসের পর এমাসের প্রথম সপ্তাহটা টেনেটুনে গেছে বটে, আর চলবে না। হার্টের রোগী বলে তাঁকে বেশি শুনতে দিতে চায়না কেউ। বউ, ছেলে,ছেলেবউ সবাই ফিসফিস করে। শহরে যাওয়ার গাড়ি বন্ধ,অফিস আদালতও বন্ধ। টাকা তোলা যাচ্ছেনা,বাজারও করা যাচ্ছে না।

বাধ্য হয়ে ছেলে কাল রাতে ভয়েভয়ে মহেন্দ্রনাথকে জানিয়েছে, বাঁশ কিনতে চায় মেম্বার। অসুবিধা না থাকলে সবগুলোই। পাড়ায় পাড়ায় পথ আটকে দিতে হবে। লকডাউন। উপরের নির্দেশ। গ্রামে তিনজন করোনা পজেটিভ পাওয়া গেছে। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কথাগুলো বলেছে বড়ছেলে, কড়া মাস্টারের হাতে জালিবেত আর সামনে পড়া না শেখা অপরাধী ছাত্রের মতো। এর আগে জমিদারি শান শওকতের প্রায় মুখস্থ হয়ে যাওয়া গল্প আগ্রহী শ্রোতার মতো মনোযোগ দিয়ে শোনার অভিনয় করেছে। সেই কোনদিন জমিদার পূর্বপুরুষ ছেলের অন্নপ্রাশনে পাঁচ গাঁয়ের মানুষকে এমন খাইয়েছে যে তাদের আর তিনদিন খেতে হয়নি। কিংবা খাজনা দিতে না পারা প্রজাকে বেঁধে আনতেই সে ভয়ে হার্টফেল। শাস্তি দেয়ার আর সুযোগ পাওয়া যায়নি। এসব গৌরব বা নিষ্ঠুরতার গল্প যতোই অতিকথনে বিরক্তিকর হয়ে উঠুক, হীরা আবার শুনেছে মহেন্দ্রনাথকে শীতল রাখার প্রয়াসে। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।
ভীষণ রেগে গেছেন মহেন্দ্রনাথ। তাঁর সারাজীবনের স্বপ্ন এই বাঁশঝাড়। সবাই জেনেও এটাতেই হাত দিতে চায়! সবার বদ উদ্দেশ্য নিয়ে তাঁর কোন সন্দেহ থাকে না। তিনি রাগে গজ গজ করতে করতে অঞ্জলিকে ডেকে চেয়ার আনিয়ে বাঁশঝাড়ের নিচেই বসে থাকেন গুম মেরে। ঘরে ভাত খাওয়ার চাল নেই। এসময় এই অযৌক্তিক রাগ কার ভালো লাগে! তবু সবাই চুপ করে যায়। অপেক্ষা করে মহেন্দ্রনাথের মেজাজ ঠান্ডা হওয়ার। হার্টের রোগী। বেশি ক্ষেপাতে চায়না তারা।

অনেক রাত টিভি দেখে ঘুমিয়েছে হীরা। ইদানিং সকালে নাস্তাপানি খাবার বালাই নেই। ওঠেই স্নান করে সরাসরি ভাতের টেবিলে। সহসা ওঠার সম্ভাবনা নেই ঘুম থেকে। সবার অলক্ষ্যে ব্যাগ নিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যান মহেন্দ্রনাথ। কেউ টেরও পায়না। বাকিতে তাঁকে চাল ডাল দেবে কেউ না কেউ। সবাই তাঁর পরিচিত। নিশিথের ছেলে। আজিজের ভাইগ্না, নিজামের মেয়ের জামাই সবাই তাঁকে সম্মান করে। না করবে না কেউ।

বাজার সুনসান। লাগানো শাটারের ভেতর থেকে থমকে থমকে আসছে হাসির দমক, সম্মিলিত। চায়ের গন্ধও ভেসে আসে। পুলিশের হুইসেলে কেউ হঠাৎ নামিয়ে দেয় অর্ধেক তোলা শাটার। মহেন্দ্রনাথের হাতে ব্যাগ দেখে পুলিশের কনস্টেবল দুজন দাঁড়ায়। ত্রান লাগবে আপনার? ইউনিয়ন পরিষদের অফিসে যান। বাজারে ঘুরাঘুরি করছেন কেনো?

মাথা নত করে বাসায় ফিরেন তিনি। ছেলের ততোক্ষণে স্নান শে। বারান্দায় গামছায় মাথা মুছছে। তিনি ছেলেকে কঠিনতম আদেশটি দেয়ার জন্য নিজেকে ভিতরে ভিতরে তৈরি করেন।
পরদিন মোজাম্মেল মেম্বারের প্রত্যক্ষ ততত্ত্বাবধানে বাঁশঝাড়ে কোপ পড়ে, কাটা বাঁশের গুড়ি খুঁড়ে একত্র করে কামলা একজন। একে একে বের হতে থাকে কাঠের খড়ম, ভাঙা কাসের থালা, একটা ভাঙা শাঁখ, ঘন্টা, একটা পিতলের বিষ্ণুমূর্তি। জহুরী চোখ মোজাম্মেল মেম্বারের। মূল্যহীন জেনেই সব ছুঁড়ে ছুঁড়ে স্তুপীকৃত করে উঠানের মাঝখানে।

মহেন্দ্রনাথ স্তব্ধ বসেছিলেন বারান্দায়। হঠাৎ চোখ তুলে দেখেন, হীরা, হীরেন্দ্রনাথের চোখে জল। মহেন্দ্রনাথ মনের ভেতরে হতাশার গভীর খাদে পতিত হন। বাঁশঝাড়ের জন্য নয়, গুপ্তধন না পাওয়ার বিষাদে নয়, হীরেন্দ্রনাথের চোখে জল দেখে। কাঁদছে কেন হীরেন্দ্রনাথ? তবে কী এই গুপ্তধনের আশায়ই সে বুড়ো বাপ মা কে পাহারা দিয়ে বসেছিলো এতোদিন? নইলে ঠিক বাকি দুটোর মতো নিজের পথ দেখতো?