কতিপয় প্রাক্তন

অপরাহ্ণ সুসমিতো

প্রাক্তন-১

আমার ছয় বছর বয়সে আমার মা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। বেশ মনে আছে বিয়ের হলুদ হচ্ছে,সবাই হলুদ শাড়ি পরে মা’র কপালে, চিবুকে আলতো হলুদ লাগিয়ে দিচ্ছে আর একটু করে কেটে কেটে মিষ্টি তুলে দিচ্ছে মুখে। মাকে অপূর্ব লাগছিল হলুদ হলুদাভায়। আমি মায়ের আঁচল ধরে বসে ছিলাম অনেক ক্ষণ।

বিয়ের আগের দিন ছোট কাকু আমাকে নিয়ে বের হলেন। সৌম্য সরকারের ব্যাটিং সুন্দরের মতো বৃষ্টি দাপুটে দিন। কোথাও গরমের ছানা পোনা নেই। একটু শীত শীত করছিল আমার। ছোট কাকু একটা রিক্সা নিলেন। উঠেই বললেন;
: সম্রাট টিপু সুলতান, শীত করছে?
: হুম
: সুলতানদের শীতে কাবু হতে হয় না। যুদ্ধে বাঁশের কেল্লায় তাহলে থাকবি কি করে? চল আজ তোকে নিয়ে চাংপাইতে পৃথিবীর সেরা স্যুপ খাব।

মন ভালো হয়ে গেল রিক্সার হন হন ছুটে মাখার গতিতে।

অল্প আলো আঁধারে কাকু আর আমি স্যুপ খাচ্ছি। মা সব সময় বলতেন খবরদার কোনো সময় শব্দ করে খাবি না। শব্দ করে না খাওয়ার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। ছোট কাকু জোরে সোরে আমাকে ধমকে উঠলেন ছাত্রলীগ ছাত্রদলের সভাপতির মতো।

: ভদ্রলোকদের মতো এরকম নি:শব্দে খাচ্ছিস কেনো? জানিস জাপানে সবাই শব্দ করে নুডলস স্যুপ খায়। আয় সুলতান শব্দ করে খাই। বলে হো হো করে হাসতে লাগলেন।

আমরা দুজন শব্দ করে মুখ টুখ মাখিয়ে ওয়ানথুন স্যুপ খেতে লাগলাম। আহা যেন আমরা দুজন জাপান সফরে ..

চারপাশের টেবিলে লোকজনদের চেহারা দেখা যাচ্ছে না। তবে মানুষের অস্তিত্ব টের পাচ্ছি। ফস করে ছোট কাকু আমার দিকে ঝুঁকে বললেন;
: তোর পাশের টেবিলে যে লোকটা খাচ্ছে ,তোর নতুন বাবা। খবরদার সরাসরি তাকাবি না। তেরসা করে তাকা..

আমি ঘামতে শুরু করি। স্যুপ খেতে আর ভালো লাগছিল না।

বাসায় ফিরছিলাম আবার দুজন। রিক্সায় উঠেই আবার ঠাণ্ডা লাগছিল বেশ। আমি কাকুর গা ঘেষে বসে থাকলাম। ঘুম ঘুম গন্ধ।
: কিরে সুলতান ব্যাটা ঘুম পাচ্ছে?
কোনো জবাব নেই আমার। কাকুর গায়ে সেই কোন ছোটবেলার বাবার গন্ধ পাচ্ছি। ঘুম ঘুম ঘোরে বাবার কথা ভাসছিল;
: শোন টিপু সুলতান ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা আসল স্বপ্ন না। যে স্বপ্ন তোকে ঘুমাতে দেবে না, জাগিয়ে রাখবে; সেটাই স্বপ্ন

বাসার কাছে আসতে দেখি আমাদের বাসার পুরোটা আলো দিয়ে ময়ূরপঙ্খী সাজানো। কত অমল বর্ণ আলো। এত আলোর দ্যুতি শাহানায় আবার আমার ঘুম ঘুম পেল। কাকুকে শক্ত করে ধরে রাখলাম। কাকুটা চুপ করে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

ছোট কাকু ডুকরে কেঁদে উঠলো মনে হলো।

*

প্রাক্তন-২

আমি যখন থার্ড ইয়ার তুমি তখন চৌকস। ক্যাম্পাসে তোমাকে সব্বাই চেনে। তোমার জিন্সের পকেটে টাটকা কবিতা। তুমি সাম্যবাদ, শ্রেণি সংগ্রাম নিয়ে কী সুন্দর প্রবন্ধ লেখো। দারিদা, এডওয়ার্ড সাঈদ তোমার রেফারেন্স। আমি শ্যামলা তোমার অবয়বে মুগ্ধ হই। আনমনে তোমার পৌরুষে আমি আমার তামান্না সাজাই।

তুমি ইচ্ছে করে এলোমেলো থাকো, মেধাবী বলে ক্লাসে ভালো রেজাল্ট করো। আমি তোমার ক্রমশ: সিঁড়ি বেয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করি।

প্রেম আর দেহ নিয়ে প্রথম কন্সট্রাকশন ডিকন্সট্রাকশন থিওরি তোমার কাছে সবক পাই। একদিন আচানক আমার মধ্যবিত্ত পোশাক তোমার শিল্পিত শরীরের কামজ ভায়োলিন সুরে খান খান হয়ে যায়। বুদ্ধ পূর্ণিমার এক সন্ধ্যায় তোমার সাথে ফানুস দেখতে যাবার মূহূর্তে টের পাই আমি শ্যামাঙ্গিনী প্রেগন্যান্ট।

কী জানি কেমন করে আমাদের বিয়ে হয়ে গেল সৌরভে। বন্ধুরা বলাবলি করল আমি নাকি রাজকপালী, তোমাকে পেয়েছি। অনন্যা, সুনন্দা, ডিম্পল, মাধবী ওরা আমাকে ঈর্ষা করল পইপই করে। আমি গুনগুন করে গান গাই;

ধীরে চলো হে রাজনন্দিনী, হংস গমনে চলিল রাই...

তুমি হামদ শোনো না, কীর্তন শোনো। ইউসুফ জোলায়খার কাব্য তোমার কাছে জোলো লাগে কিন্তু পদাবলী শুনে মুগ্ধ হও। ভাষা, ডায়ালেক্ট নিয়ে তোমার ১৮ পৃষ্ঠার এক অসাধারণ প্রবন্ধ আছে।

আশ্চর্য কী চৌকস তুমি !

সেই তুমি একদিন কিনা আমার মায়ের বরিশালের আঞ্চলিক টানের উচ্চারণ নিয়ে খোঁচা দিলে। একবার প্রায় সবার সামনে হেসে গড়াগড়ি করলে যে আমার মা ‘প্রফেসর’কে পরবেসার, ’প্রথম’কে পেরথম বলে। আমি বিষণ্ণতায় ডুবে যাই, ও চৌকস স্বামী।

কোথাও বেড়াতে যাবার আগে আমি কতো মনোযোগ দিয়ে সাজি, নিজেকে কেঁচে কেঁচে সুন্দর করি। প্রমিত বাংলা বলি, কথার ফাঁকে ফাঁকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, হুমায়ুন আজাদ থেকে রেফারেন্স দেই। তোমার মুগ্ধতা আমার দিকে আর স্পর্শ করে না। এই চৌকস তুমি রাহেলা আপার লো-কাট ব্লাউজের দিকে জুলজুল তাকিয়ে থাকো। তোমাদের সহকর্মী জরিনা ওয়াহাবের ফিগার নিয়ে রসিকতা করো বন্ধু আড্ডায়।

আমি একদিন অক্ষম যন্ত্রণায় হু হু করে কেঁদেছিলাম যেদিন তুমি আমাকে তীব্র শারীরিক আদরে ফিসফিস করে জরিনা বলে ডেকেছিলে।

কাল রাতে ছোট মামা ফোন করে জানালেন আমার ফরেন সার্ভিস বিসিএসে হয়েছে। কী যে ভালো লাগল শুনে। তুমি একটাবারও কিছু বললে না, বন্ধ টেলিভিশনের মতো গম্ভীর হয়ে থাকলে। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে একা একা কাঁদলাম।

আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে...

চৌকস...আমার পোস্টিং হয়েছে অটোয়া। কানাডায় যখন সমস্ত আকাশ ভেঙ্গে তুষার পড়বে, বাড়ির চারপাশের আঙ্গিনা ভরে যাবে নরম তুষারে, তুহিনে। আমি জানালার ধারে দাঁড়িয়ে কফি মগে চুমুক করব, একা।


চৌকস, তুমি তখন ঢাকায়। তোমার বালিশের পাশে চ্যাপ্টা হয়ে পড়ে থাকবে তোমার প্রিয় সিগারেট। বালিশের নিচে কনডমের প্যাকেট আর একাকী ছায়া হয়ে থাকবে তুমি ও তোমার বিশ্রী করে শোবার ভঙ্গিমা।


শোনো, আমিও ১ এর মতো