হরিণ

জয়দীপ মৈত্র

সোনার হরিণ ।তার গায়ে লেপ্টে থাকা অপরাধ আর আবদার ।মেয়েটি ডিস্কোথেকে চললো ।দূরে রাবণের চিমটে কমন্ডলু,ছদ্ম ভিক্ষাপাত্র । গন্ডীর বাইরে হাইহিল সীতা । গন্ডীর ভেতরে উনুনে পুড়ছে সীতা।আমরা রামের হাতকে নিয়ে যজ্ঞ করছি , রামের হাত দিয়ে কবিতা লিখছি । রামের হাত ক্ষমতায় আসছে।সীতার পা বেড়াতে যাচ্ছে রাবণের শরীরে ।চাপা পড়েছে দিল্লীর বাসে ।মধ্যমগ্রামে সীতার পা উল্টে যাচ্ছে , থেঁতলে যাচ্ছে যোনী বরাবর । তবু পোড়া কাঠকয়লার তলায়,অশুদ্ধ সীতা খেলতে গেল আগুনের সাথে , উনুনের সাথে,মাটির নিচে।সীতার সোনার হরিণ হস্তিনাপুরের জঙ্গলে এলো।দ্রৌপদী গেছেন সীতার মোমবাতি মিছিলে । দ্রৌপদীর পাশেই দাঁড়িয়ে দুঃশাসন ।মোবাইলে “ রাগিনী এম.এম.এস ২” , আমরা বলছি “ বড়ো ভুল হয়ে গেছে ” ।উনুনের আগুন ডিস্কোথেকে এলো । টাকিলার গ্লাস পাঁচভাগে ভাগ হচ্ছে । ডিজের আঙুলে মিক্স হচ্ছে “ মুন্নী বদনাম্
হুয়ী ”_“ আঁখো কো কিঁউ সেঁকে , হাতো সে কর মনমানী ” - ষাঁড় বেয়ে বেয়ে নেমে আসছেন বিকিনি পরিহিতা করিনা কাপুর । কুন্তী পেছন ফিরলেন ।টাকিলার গ্লাস পাঁচভাগে ভাগ হচ্ছে । পান্ডব - গৃহিনী দ্রৌপদী ।আমরা বলছি “ বড়ো ভুল হয়ে গেছে ” ।সোনার হরিণ ঘাস খাচ্ছে দূরে । ধৃতরাষ্ট্র আর প্রিয়াম পাশা খেলছেন । হেলেন আসছেন প্যারিসের সাথে । হরিণের লোম উড়ছে ট্রয়ের সমুদ্রে ।সীতার গর্ভে জন্মাচ্ছে পান্ডবসন্তান । রাম আসছেন সমুদ্র পেরিয়ে । হরিণের লোম উড়ছে ভারতের সমুদ্রে ।এখন যুদ্ধবিরতি , যেখানে যুদ্ধ নিজেই নিজেকে একটি বিশ্রাম - কৌশলে পরিণত করছে।ডিস্কোথেকের বাইরে অন্ধ হোমারের চোখে ঘুম নেমে এলো । মেয়েটি বেরিয়ে এলো চিরকালীন গন্ডীর বাইরে।সে সীতা।সে দুঃশাসনের বুকের রক্ত।সে প্যারিসের যৌন লালসা । দূরে পাখির রক্তে তীর ডোবালো ব্যাধ । “ মা নিষাদ ” - আমরা বলছি , ” বড়ো ভুল হয়ে গেছে ” ।

মহাকাব্যের নির্মাণ শুরু হয়েছিলো এভাবেই । একটি বিন্দু । একটি ভুল । একটি হরিণ ।মৃগনাভী । সেই গন্ধ রামায়ণে , মহাভারতে , ইলিয়াডে ।গন্ধে পাগল হলেন হোমার ।ব্যাসদেব উন্মত্ত হলেন । একিলিস তার রথের পেছনে বাঁধলেন হেক্টরের মৃতদেহ । বীর হয়েও রাবণ , রামের হাতে নিহত হন । সীতাও পাতালে প্রবেশ করেন রামের সন্দেহে ।সুকৌশলে নারীচরিত্র অবদমিত হন স্বয়ং ইশ্বরের মাধ্যমে ।সফল হলেন বটে , কিন্তু অর্জুন জিতলেন না । তলায় তলায় চোখ ভিজল । রুমালে কর্ণ । দাঁতে দুর্যোধন । তাঁর যুদ্ধধর্ম নিয়ে নিন্দে শুরু হলো । তাঁর শুদ্ধ প্রতিহিংসা চাপা পড়ে গেল দ্বৈপায়নে ।শকুনির হাসি পৌঁছলো রাবণের কানে ।অশ্বত্থামা তার মাথার ক্ষত নিয়ে অমরত্ব পেলেন ।রামের যজ্ঞে রাবণ পুরোহিত হলেন । আমরা বলছি “ বড়ো ভুল হয়ে গেছে ” । পাশার দান উল্টে যাচ্ছে ।কিংবা একটা পাশাকেই হয়তো আজীবন ঠেলে বেড়াচ্ছে মানুষ ।পাশার ভেতর যুগযুগ ধরে খেলে বেড়াচ্ছে ষড়রিপু।টিকটিকি।ধর্ময ুদ্ধের শুরু হচ্ছে জুয়া দিয়ে ।ধর্ম নয় , ধর্মের আচরণ করছে চরিত্ররা । তাই যুধিষ্ঠিরের মিথ্যাশ্রয় মহৎ উদ্দেশ্যের নীচে চাপা পড়ে যায় । কিন্তু অশোকবনে রাবণের ছদ্মবেশ আমাদের টার্গেট হয়ে যায় ।শত্রুপক্ষের হয়েও কর্ণ কুন্তীর সন্তান হওয়ার সুবাদে সমস্ত কান্নার আলো মাথার ওপরে পান । আসলে এও এক জুয়া । দুঃশাসনের দ্রৌপদী লাঞ্ছনাও ধর্মাচরণ ।দুর্যোধনের কৌশল ,অহংকারও তাই।কর্ণের চাকা কাদায় তলিয়ে যাওয়াও একটা নীতি ।কৃষ্ণ অমোঘ । রাম অমোঘ । জিউস অমোঘ । ঈশ্বর আসলে সেই স্পটলাইট , যিনি মহাকব্যের মাধ্যমে একটি সিস্টেমকে দৃঢ় করেছেন।তাই অভিমন্যু বধ ভুলের আখ্যা পায় ।আর কর্ণ বধ আখ্যা পায় ধর্মনীতির।ভুল আর ঠিকের মাঝে এভাবেই ধর্মের কেওস ঘনিয়ে ওঠে । আর ঈশ্বর শুধু তার কেন্দ্রটি একটু ঘেঁটে দেন ।ফলে ভুল আর ঠিকের বিন্দু থেকে লক্ষলক্ষ সোনার হরিণ দৌড়ে বেড়িয়ে আসে । তৈরী হয় পৃথিবীর দীর্ঘতম কিছু উপাখ্যান। তৈরী হয় যুদ্ধের নিজস্ব দর্শন । শুধু ভালোবেসেই মেনেলাসের হাতে মারা যান দূর্বল প্যারিস। আর দূরের প্রাসাদে হেলেনের চোখের জল নিভৃতে ঝরে পড়ে । আমরা বলে উঠি “ বড়ো ভুল হয়ে গেছে ” । বাল্মিকী , হোমার বা ব্যাসদেব আসলে একটা আয়না নির্মাণ করেছেন । যার ফ্রেমে বসিয়েছেন ঈশ্বরকে , আর কাচের জায়গায় মিশিয়েছেন ধর্ম । দ্রৌপদী এসেছেন , হেলেন এসেছেন , সীতা এসেছেন , আর তাঁদের লাল টিপ গেঁথেছেন আয়নার ওপরে ।ব্যস , সেই মুহুর্ত থেকেই সেই আয়না সার্বজনীন হয়েছে । আধুনিক হয়ছে । আবার সমকালীনও হয়েছে । যুদ্ধের আগেই যুদ্ধের ফলাফল নির্দিষ্ট হয়েছে।নির্দিষ্ট হয়েছে চরিত্রের পরিণতি ।এভাবেই কাহিনীর বাইরে বেরিয়ে এসেছে ঘটনা । আর চরিত্র অতিক্রম করেছে ঘটনার বেড়াজাল ।কারণ সেই ধর্ম অধর্মের কেওস থেকে কেন্দ্র ঘেঁটে দেওয়া সোনার হরিণ ।দশবছরের পৃথিবীর সমস্ত খবরের কাগজকে এক জায়গায় করলেই মহকাব্যের অধুনা নির্মাণ বোঝা যাবে । কাহিনী থেকে ঘটনা অতিক্রান্ত হলেই তার আর কোনো যাত্রাপথ থাকে না । সে নিজেই সময়ের ভূমিকায় রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হয় । বা হয়তো রঙ্গমঞ্চই নেই । শুধু নাটক আছে ।
স্ক্রীপ্টহীন , কিন্তু সযত্নে পরিচালিত হচ্ছে সময়ের দ্বারা । আমরা কোনো চলমান মহাকাব্যের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ ছাড়া আর কিছুই নই । তাই ডাইনি অপবাদে মেয়ে পোড়ানো হয় ।পণপ্রথা রমরমিয়ে চলে।চলন্ত বাসে যৌনাঙ্গে রড প্রবেশ করানো হয় ।সাম্রাজ্যবাদ গ্রাস করে পৃথিবীকে।গাজা নরক হয়ে ওঠে। বাবা ছেলেকে খুন করে । হাতখরচের টাকা না পেয়ে মেয়ে খুন করে মা - কে । না খেতে পেয়ে আত্মহত্যা করেন কৃষক । এবং আমরা অমোঘের দিকে চেয়ে থাকি । কবে রামের বনবাস ভঙ্গ হবে। কবে পান্ডবেরা অজ্ঞাতবাস থেকে ফিরবেন ।কবে একিলিস ফিরে আসবেন তাঁর স্বেচ্ছাবসর ভেঙ্গে। এই পৃথিবীতে যতদিন রক্ত থাকবে ততদিন ভুল থাকবে । রক্তপাত থাকবে । এবং “ বড়ো ভুল হয়ে গেছে ” বলা ছাড়া আমরা আর কিছুই হয়তো করবোনা আদপে । তাই গান্ধারী দাঁড়াবেন চিরকালীন আদালতে দাঁড়িপাল্লা হাতে ।অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রও ক্ষমাধর্ম পালন করবেন যুদ্ধ শেষে । কৃষ্ণও মারা যাবে ব্যাধের হাতে । “ মা - নিষাদ ” । আমরা বলব , বড়ো ভুল হয়ে গেল । সোনার হরিণ দাঁড়িয়ে থাকবে । ছায়াটি ঘোড়ার ।
ট্রয় পুড়ছে । মহাভারত পুড়ছে । সীতা পুড়ছেন । ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে চরাচর । এই ধোঁয়াও কেওস । বিন্দু ঘেঁটে যাচ্ছে । কাহিনী থেমে আসে । মহাকব্যের সম্প্রসারণ হয় । ভুল বেঁচে থাকে । রক্ত বেঁচে থাকে । জীবন বেঁচে থাকে । আর একটা রথ বেঁচে থাকে চিরকাল, যার চাকা কখনো মাটি ছোঁয়না। এই চাকা টুকুই শুধু নির্ভুল থেকে যায় । থেকে যায় ভুল ঠিকের ওই অলৌকিক বিন্দু থেকে সমদূরত্বে ।