নকশিকাঁথার রাত

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

১.
স্মৃতি ও স্বপ্ন

দাদা : মনির উল্লাহ চৌধুরী
দাদি : সুফিয়া খাতুন
বাবা : দিলওয়ার হোসেন চৌধুরী

নানা : সিদ্দিক আহমদ
নানি : ফিরোজা খাতুন
মা : লায়লা বেগম আরজু

স্ত্রী : কুসুম
কন্যা : তরঙ্গিণী

নশ্বর পৃথিবীতে কুসুমের কখনোই জন্ম হয় না
তার জন্ম হয় না বলে তরঙ্গিণীও অপার্থিব

আট জনের নাম লিখলাম
প্রথম ছয়জন স্মৃতি
শেষ দুইজন স্বপ্ন

মানুষ মূলত স্মৃতি ও স্বপ্নের মধ্যখানে থাকে
থাকে জোছনা ও রৌদ্রের মধ্যবর্তী রূপ নিয়ে


২.
কান্না

মা আমি শরীর হতে একটি কাঁটা তুলে ফেলেছি
তুই এসে দেখ চিনিস কিনা
এই কাঁটাভার বর্ণগন্ধহীন লাবণ্যসুর কোমলগান্ধার
তোর জরায়ূতে বিঁধেছিলো নুন
এর নাম অশ্রু
চোখময় ফুটেছিলো
এখন নেই
সমুদ্রপ্রশান্তি নিয়ে গিয়েছে ডুবে চোখের ওপারে
তোর চোখে এখনও বিঁধে আছে একই কণ্টক

মা তুলে ফেল সমূল
এবং সমূলে ছিন্ন হই নাড়ি অশ্রুসন্ধি রক্ত হাহাকার
চল যাই ছিন্ন হই রোদে পোড়া বাতাসে আবার


৩.
পিতা

ভুলের বয়স কতো তিনি জানতে চাইলেন
আমি কামনার শীতে ফিরে গেলাম
হাতড়ে পেলাম বনছাপ ধুতির পুরাণ
তাকে বললাম বয়সের জিবে ধনুকের বিষ
তিনি আনমনে চোখ বুজে ভিজে গেলেন
তার ভেজা ত্বকে কিরীট ঝিলিক
তার দাঁতে মাংসের হাড়
বিপণন শেষে জায়নামাজ বিছানা
বালিশে রুপালি আযানের দাগ
তার শিরায় মেঘডম্বর

পিতা এই বর্ষায় তোমার রক্তের রং শাদা



নকশিকাঁথার রাত

কদিন ধরে তোমাকে চিঠি লিখছি। প্রতিদিন দুলাইন লিখে মুছে ফেলি। আর লিখতে পারি না। চোখে কেমন কুয়াশামতো এসে চোখ ঝাপসা হয়ে যায়।

প্রিয় মৃন আমার জন্মান্তরের কুয়াশা, তুমি তো জানোই আমারও একটা মা ছিল কোনোদিন। শীতরাত্রি এলেই মাকে মনে পড়ে যায়। শীত মানে কখনো আমার কাছে থোকা থোকা দুঃখ-মা আর শ্বাসকষ্ট। শীতের রাতে কাঁথার ভিতর ঢুকলেই মাকে মনে পড়ে। মনে হয় মায়ের গর্ভের ভিতর চুপিচাপ লুকিয়ে আছি।

হুঁ, শীতে এখনো কাঁথাই গায়ে দিই। সেই ছোটবেলার শীতে কুয়াশার ভিতর আমাদের বাড়িতে থাকতো তিন প্রকারের কাঁথা। নকশিকাঁথা, ছোটকাঁথা আর বড়কাঁথা। সব মা বানিয়ে বানিয়ে রেখে দিতো। শীতের আগে আগে বানাতো। নকশিকাঁথা দুটো পুরনো লালপাড় শাদা শাড়ি দিয়ে হতো, সুতা আর সলমা জরি, পুতি দিয়ে মা ফুল পাখি লতা পাতা ঘর বাড়ি এইসব আঁকতো। ছোট কাঁথাও শাড়ি আর পুরনো কাপড় জোড়াতালি দিয়ে, কোনো নকশা থাকতো না। বড় কাঁথা হতো মোটা, দুপাশে কাপড় আর মাঝখানে থাকতো মোটা চট। চটের বস্তার সেলাই খুলে এই চট নেয়া হতো। এই কাঁথা শীতের জন্যে। নানা রঙের ছোট বড় কাপড় জোড়া তালি দিয়ে লাগানো হতো চটের দুপাশে।

একদিন পৌষের রাতে আমি আমার বড়কাঁথাটা নিয়ে মায়ের কাছে এলাম। আমার সেই বড়কাঁথাটায় অতো রঙের কাপড় ছিল না। একপাশ নীল ছিল, আর পাশে সবুজ। যেনো একপাশে আকাশ অন্য পাশে ধানক্ষেত। মাকে বললাম, ‘এইটাতে তুমি নকশিকাঁথার মাঠ এঁকে দাও।’ তখনো রাত্রি তেমন জমে উঠেনি, কিন্তু শীতকাল বলে সবাই সকাল সকাল শুয়ে পড়তো। কেবল আমি রাত জেগে বইটই পড়তাম বলে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকতাম। আর মা। নানা হাতের কাজ করতো, ফুল তোলা, পাটি বানানো, উল বোনা আরো নানা কাজ, আমার মা সবই করতে পারতো। তোমাকে আরেকদিন আলাদা চিঠিতে বলবো মা কী কী কাজ পারতো, আরও কী কী কান্নার ভিতর থেকে খুঁজে আনতো আনন্দের ঘ্রাণ, শব্দ আর উড়াল।

সে রাতে মাকে বললাম, ‘সেই যে জসীম উদদীনের নকশিকাঁথার মাঠ এঁকে দাও।’
মা বললো, ‘দেখ, এখন তো কারেন্ট নাই।’
আমি বললাম, এই হারিকেনের আলোতেই হবে। আমিও আঁকবো।’
‘তাহলে, যা আমার খাটের তলায় যে ঝুড়িটা আছে ওখান থেকে সুতার বলগুলি নিয়ে আয়। বলের গায়েই সুইঁ গাঁথা আছে।’

আমি আর মা বড়কাঁথার গায়ে নকশি কাঁথার মাঠ আঁকছি। মা প্রথমে একটা ফিগার আঁকলো সবুজের ওপর হলুদ সুতোয়। বললো, ‘এইটা রুপাই।’
আমি বললাম, ‘আমি তবে সাজুকে আঁকি?’
‘না, সাজুকে আঁকবি অন্য পিঠে।’
মা একটা বটগাছ আঁকলো। তারপর বটের ঝুরি। আমি বললাম, ‘মা এইসব কী?’
মা বললো, ‘বটের ঝুরি। আমি একদিন এমন বটের ঝুরির মধ্যে লুকিয়ে ছিলাম।’
‘কেন?’
মা আমার প্রশ্নের উত্তর দিলো না। আমি আর মা সারারাত জেগে হারিকেনের আলোয় বড়কাঁথার দুইপিঠে মাঠ ঘর বাড়ি সাজু রুপাই খড়ের গাদা, ফুল পাখি লতা গাছ পাতা ক্ষেত নদী সব এঁকে প্রায় শেষ করে ফেললাম। আযান পড়লে মা উঠে পড়লো নামাজের জন্যে। আর আমি সেই কাঁথা গায়ে জড়িয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।

পরে নানা কারণে সেই কাঁথার কাজ পুরো শেষ হয়নি। মায়ের একটা হার্ট ফেইলিউর হলো, তারপর দীর্ঘদিন অসুস্থ। আমি ইশকুলের হোস্টেলে চলে গেলাম। কাঁথাটা আমার চিঠি রাখার সিন্দুকে ভাঁজ করে রেখেছিলাম। তারপর কলেজের সময় বাড়ি ছিলাম যখন দুবছর শীতে ওটাই গায়ে দিয়েছিলাম। ভার্সিটিতে যাওয়ার পর ওটা সঙ্গে নিলেই পারতাম। একদিন বাড়ি গিয়ে দেখি সিন্দুকের তালা ভাঙা। কাঁথাটা নেই। কেবল চিঠিগুলি পড়ে আছে।

প্রিয় মৃন, আমি এখনো বুঝি না, মা সেদিন কাঁথার উল্টাপিঠে কেন সাজুকে আঁকার কথা বলেছিল। হয়তো দুপাশে দুজন থাকলে নকশায় ভারসাম্য থাকবে এটাও হতে পারে। আমি আর ভাবতে পারি না। আজ থেকে তুমি ভাববে কেন বলেছিল। ঠিক আছে?