অপেক্ষা

নাহিদা নাহিদ



ওই দক্ষিণের ঘরটা বুড়ো পিটারের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশের টয়লেট আর ছোট্ট বারান্দাটাও। সপ্তাহান্তে চার্চে আর যেতে হচ্ছে না তাকে। সেলফের উপরের তাকে রাখা যিশুর ক্রুশবিদ্ধ মানব শরীর ছুঁয়ে দেখাই এখন তার প্রার্থনা। জেনি একটা ফটোফ্রেম রেখে গেছে পাশে। পিটারের কাঁধে ছোট্ট জেনি। তারা সমুদ্রসৈকতে কাঁকড়া দেখে হাসছিলো খুব। পিটার ভেবে অবাক হয় এই মেয়েটা তখন কত ছোট ছিল। ফ্রক পরে ঘুরতো, থপথপ করে হাঁটতো। পোঁকা দেখলে দৌড়ে ছুটে আসত বুকে, ঝাপিয়ে পড়ে আধো-আধো বোলে বলতো 'পাপা পাপা ভয়অঅয়'! জেনির মা দীনা মারা যায় বাচ্চাটাকে এই এইটুকুন রেখে, ঠিক যেন বেড়ালের বাচ্চা। পিটারের শখ হলে আঙুল চুবিয়ে দুধ তুলে দিতো ওর ঠোঁটে। চুকচুক করে খেতো কেমন। এদেশে ওরা সংখ্যালঘু বলে উৎসব এলে মুশকিলই ছিল বলা যায়। কাছেপিঠে কাউকে পাওয়া যেত না জেনিকে সাজাবার। পিটার নিজেই মেয়ের লম্বা গাউনে ফিতা বাঁধত আর গুনগুন করে গাইত 'মেরি হ্যাড অ্যা লিটল ল্যাম্ব' সেই ছোট্ট জেনি। একসময় পিটার এদেশের শীর্ষ পত্রিকার ক্রাইম রিপোর্টার ছিল, চাইলেই যৌবনের পুরোটা খরচ করে দিতে পারত অপরাধের অলিতে গলিতে। পিটারের পছন্দও ছিল ওসব রোমহর্ষক কাজ তারপরও দীনার অনুপস্থিতিতে সে জেনির গ্রেট পাপা হওয়ার চেষ্টা করেছে পুরোদমে। ক্যাঙারুর থলের মত বুকে-কাঁধে-পেটে বাচ্চা বেঁধে নিয়ে ঘুরেছে এদিক-সেদিক। বাপের সম্পত্তির দুটো কামরায় বানিয়ে দিয়েছে প্লে-জোন। ঘোড়া, গাড়ি আর বাইসাইকেলের হুলুস্থুল। জেনিকে কখনো একা হতে দেয়নি সে। একটু বড় হলে জেনি ও তার বন্ধুর আবছায়া যৌথশরীর, আলিঙ্গন শীৎকার শুনেও ভেতো বাঙালি বাপের মত তর্জনীর শাসন তুলে বিব্রত করতে চায়নি মেয়েকে। মেয়ে যা করতে চেয়েছে করেছে। পিটার কেবল কলুর বলদের মত মুখে রক্ত তুলে যুগিয়ে গেছে অর্থের যোগান। জেনি তার অচেনা হয়েছে সেই কবেই যেদিন ওই হুলোমুখো বেড়ালটাকে বিয়ে করলো আবার বছর ঘুরতেই ছেড়ে গেলো ছেলেটা সেই সময় থেকেই। নিঃসঙ্গ জেনি যখন রাত হলে হরর কিংবা অ্যাডাল্ট মুভি নিয়ে বসত, সময় সময় পিটার চাইতো আলগোছে ওর পাশে বসতে, পিঠে হাত রেখে বলতে কিছু স্নেহের কথা। অথচ ওই বুড়ো পিটারকে ওর মন আর ঠিক বন্ধু হিসেবে নিতে পারতো না। পিটার বুঝতো তার উপস্থিতি ওকে আর আনন্দ দেয় না একটুও। সেই অন্ধকারেও সে টের পেত তার কোঁচকানো ভ্রু, তোবড়ানো গাল। এখন আর ওসবের বালাই নেই। সব দুঃশ্চিন্তা একদম হঠাৎ করেই
ফুরিয়েছে তার। নিজেকে খুব ভারহীন লাগে এখন। কী একটা ভয়াবহ ভাইরাস ওলট-পালট করে দিচ্ছে পৃথিবী, একা করে দিচ্ছে মানুষ- তার ভালই লাগছে। পৃথিবীতে কেন শুধু সে একাই নিঃসঙ্গ হবে, সবাই হোক। সবাই আটকে থাকুক চারদেয়ালের চাপে। দূরত্বের তাপে পুড়ুক ছেলে-বুড়ো সব৷ কারো কিছুতে তার আর কিচ্ছু যায় আসে না।

পিটারের এই অন্তরীনবাস কমিউনিটি নির্ধারিত। কী করেছিল সে? সকলের নির্দেশ মেনে চার্চে যায়নি, যায়নি রাস্তায়ও, কেবল এ বাসার দারোয়ানটা যখন রোগে ভুগে পড়েছিল ঘরে একা, সে তখন চুপি চুপি গিয়েছে দুচারদিন দেখতে।হুট করে বুড়োটা গেলে মরে অ্যাপার্টমেন্ট হলো লকডাউন। আর মাঝখান থেকে হাঁচি কাঁশির বদৌলতে পিটারও খেলো মেয়ের কাছে ধরা। যাক কী আর করা। মেয়ে গৃহবন্দি করেছে করুক, এটাও হয়তো ওর পূর্বেকার মত উচ্ছ্বাসহীন একপ্রকার ভালোবাসাই। প্রথম-প্রথম খুব ভাল আছে- ভালো আছে এমন একটা ভাব করেছে সে। কার কাছে করেছে সে জানে না, হয়তো নিজের কাছেই। একা থাকার অভ্যেস তো তার হয়েই আছে, এখন আর কি! এখন বরং নিজেকে খুব আপন লাগছে, কারো কথা ভাবতেই হচ্ছে না, না বিজনেস না মেয়ে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বেশি সময় এই ভাবটা থাকে না তার। রাত হলেই তৃষ্ণা জেগে ওঠে, কীসের যে তৃষ্ণা? অবরুদ্ধ দিনের একেকটা দিন যাচ্ছে আর আর তার তৃষ্ণার বোধটা গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে। তার মনে হচ্ছে কত দীর্ঘকাল সে পানি খায় না। কতদিন হলো?
দুদিন ধরে যখনই তার শ্বাসনালী খামচে ধরছে অদৃশ্য পোকা তখনই তার কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে, হাউমাউ করে কান্না, চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয় 'জেনি জেনি তুই কইরে মা, কাছে আয়, এই দেখ তোর পাপা মরে যাচ্ছে, আয়।
কেউ আসে না। কেউ না। জ্বরের উত্তাপে পুড়তে পুড়তে তবু সে স্বপ্ন দেখে যায় আবার তার সেই প্রথম যৌবন, দীনা আবার ফিরে এসেছে, তাদের ঘর ভরা ছেলেপুলে, সে অফিস যায়, দীনা ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ গোছায়। তাদের বড়মেয়ে-ছোটমেয়ে মায়ের স্কার্ট-শাড়ি নিয়ে কাড়াকাড়ি করে। ছেলেবাবুরা হাফপ্যান্ট পরে বাবল ফোলায়, ক্রিসক্রস খেলে। তাদের মেয়েরা বড় হয়, তাদের ছেলেরা হাতে বাড়ে,পায়ে বাড়ে। আর তারা দুই বুড়োবুড়ি পার্কে হাঁটতে-হাঁটতে স্বপ্ন দেখতে-দেখতে দিন ফুরিয়ে ফেলে। তারপর বাতাস এসে নিয়ে যায় সব। দীনা হারিয়ে যায়, জেনি হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় বাবল ফোলানো সেই ক্রিসক্রস দিন। সময় আর কাটে না। একেকটা মুহূর্ত পরে পিটার ভয়ে সেধিয়ে যায় তার নিজের পেটে। শব্দ শুনতে পায় হৃৎপিণ্ডের। ধুকপুক ধুকপুক ধুকপুক। এত জোরে বাজে মনে হয় স্নেক গেইমসের সেই রেগে থাকা অজগর। নিজেকে প্রবোধ দেয় পিটার, ভয় পেলে চলবে না এখন, সে একা নয় ;আজ হোক কাল হোক জেনি আসবেই, মাথায় হাত রেখে বলবে ভয় নেই পাপা, আমি আছি তো, এই দেখ রাত জেগে বসে আছি তোমার পাশে। ভয় নেই একদম। তোমার বাতাস লাগবে পাপা, অক্সিজেন, পানি? এই নাও, হা করো হা। পিটার হা করে শ্বাস নেয়, কোথায় পানি, কোথায় বাতাস? জেনি বলেছে ক্ষুধা লাগলে দরজায় টোকা দিতে। দিয়েছে তো কতদিন। জেনি কিছু শুনেছে, কিছু শোনেনি। দুদিন ধরে এই টোকাহীন দরজায় জেনি কী টের পায় না তার পাপার ক্ষুধা ফুরিয়েছে, ফুরিয়েছে বোধ। পেটের পোকারা, গলার, পোকারা গলে গলে যাচ্ছে তার, আর একটা বা দুটো দিন! অথবা হয়তো আজই - তারপর? পিটার খুব চায় এইসব পোকারা উল্লাস আয়োজনে জেনির দরজায় দ্রিম দ্রিম করে বাজাক বাজনা। নরম পালকের মত স্বস্তিকর ঘুম ওর কেটে যাক। উৎকন্ঠায় ছুটে আসুক সেই ছোট্ট পরীটার মত। জড়িয়ে ধরুক তাকে, পিটার টস করে আসবে জেনি? নাকি আসবে না? হয়তো আসবেই না। না আসুক। তার শরীরের ভারহীন অনুভব এখন নিশ্চিত জানে, এইতো আর একটু, আর একটু হলেই অন্যচোখে দেখতে পাওয়া যাবে সেই নির্দয় বালিকার মুখ, শোনা যাবে 'পাপা পাপা ভঅঅঅয়'।