দিশা

সুমী সিকানদার

জানালা দিয়ে দুই ইঞ্চি আকাশও দেখা যায় না। তবে উঠোন আছে। চাইলে দরজা খুলে বের হলেই হলো। বেড়ানোর জায়গাগুলো ক্রমশ: কমে আসছে। কোথায় যাবে ভাবতে ভাবতে যাবার ইচ্ছে ফুরিয়ে যায়। এছাড়া আছে কৈফিয়তের ফ্যাকরা। ইদানিং প্রচুর কথা বলেন। কথা বেশী বলেন দেখে কেউ আজকাল তেমন দাঁড়াতে চায় না। 'ভালো আছেন খালা''? বলেই শশব্যস্ত ভঙ্গীতে দৌড় দেয়।


অলকা বেগমের আজ আনন্দের দিন। আজ তাঁর জন্মদিন। কততম যে! ৭৩/৭৪ হবে। তাঁর আর ছোটভাই জাকিরের জন্মদিন বাবা লিখে রেখেছিলেন বলে রক্ষা। নইলে ছোটগুলোরটা তার জানা থাকলেও নিজেরটা জানা থাকতো না। আজ তার ভাইবোনেরা আসবে। অনেক দিন বাদে তিন ভাইবোনে তিন জায়গা থেকে আসবে।দেখা হবে। তারা সর্বমোট ছিলেন ৬জন । ছোটবেলাতেই জাকিরের ছোট জাহিদ চলে গেছে ক্যান্সারে। আরেকজন পুকুরে তলিয়ে।


মুন্নি মাত্র তখন তিন বছরের । গ্রামে গেলে যা হয় মায়ের খুশীর সীমানা থাকে না। কোন বাচ্চাটা মোরগের পিছে ,কোন বাচ্চা শিম তুলতে ক্ষেতে গেছে খেয়ালী খালার সাথে এত সব খেয়াল রাখা লাগতো না। মুন্নিকেই বরং মা খেয়াল করতেন । পুকুরের পাড়ে বসে কাপড়ক’টা ধুয়ে মুন্নিকে নাইয়ে দিয়ে পরিস্কার কাপড় পরিয়ে ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। নিজে দুটো ডুব দিয়ে শাড়ি বদলে ঘরে ঢুকে নানুর কাছে কেবল জিজ্ঞেস করেছে মা , ''মুন্নি কই''? নানু বললো মুন্নিবুড়ী তো তোর সাথে ছিলো। মুন্নি ঠিক কার হাত থেকে ছুটে জলের ঘোরে জলের ঘরে চলে এসেছিলো কেউ জানে না। ঘন্টা খানেকের মধ্যেই লাশ ভেসে উঠেছিলো। অলকার ্মনে আছে মা বছর খানেক অপ্রকৃতিস্থ ছিলেন।


অলকা দেখলেন তারা ঢাকায় আছেন তিনজন। আসবে জাকির আর বেবি। বিনু কানাডায় । সকাল সকাল স্নান করে ফর্সা হয়ে নিলেন অলকা । তিনি সবার বড় বোন, সব চাইতে সুন্দরী ছিলেন।। ক্রিম রঙের জমিনে সবুজ পেড়ে শাড়ি পরে নিলেন যে বোন আসবে বেবী, তারই দেয়া।


ছোটবেলায় বেবীটা খুব ছিদকাঁদুনে ছিলো। কেউ মায়ের হাতে মার খেলেই সে তারস্বরে চিৎকার করে কাঁদতো। তার ভাইবোনদের কাউকে মারধোর করা যাবেনা। একবার জাকিরকে গরুতে কিভাবে যেন গুঁতিয়ে দিয়েছে , রক্তারক্তি কান্ড। দৌড়ঝাপ ,ডাক্তার চাচার চেম্বার। কিছু না দেখেই বেবী ফিট। ঐ যে জাকির 'মা’ গো বলে চিৎকার দিয়েছে, তাতেই তার খবর হয়ে গেল। দেখা গেল একজনের জায়গায় দুই ভাইবোনকেই চেম্বারে নেয়া লাগলো।


বেবী কোনও সময় বড় হয় নাই। এখনও চঞ্চল । মায়ের আদর বেবী পায়নি। মা অসুস্থ ছিলেন। অলকাই কোলে কাঁখে করে বেবীকে পেলেছে। কোমরে বোনকে নিয়ে রান্না করেছে। সংসারের ভাল সময়ে ভাল কাপড়টা বেবীকেই সেলাই করে দিয়েছে। বিনু তাই নিয়ে কত রাগারাগি করতো মায়ের কাছে। আজ বড় পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ছে।


আরেকবার জাকির তার জীবনের বড় রকম বিপদ সামলিয়ে ছিলো। অলকা অর্নাস পড়তে পড়তেই পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন ছাত্রনেতা হাবিবুরকে। সে সময় যুদ্ধের সময়। উথাল পাথাল দেশ , কে কাকে দেখে। কিন্তু বিয়ে তখনই করা লাগবে। নইলে হাবিবুর যদি যুদ্ধ শেষে ফেরার পর অলকাকে না পায়। তারা যদি গ্রামে বা অন্য কোথাও চলে যায় ! বাবা মায়ের পছন্দ ছাড়া বিয়ে। এরকম মানসিক অবস্থায় ভাই সাহারা হয়েছিলো বোনের। ছোট ভাই , বড় ভাই সেজে একজন বন্ধুসহ সাক্ষি দিয়েছিল কাজী অফিসে। বিয়ে করে হাবিবুরের সাথে গা-ঢাকা দেন অলকা। বছর খানেক পালিয়ে পালিয়ে বাঁচা। যুদ্ধ জয় করে হাবিবুর ফিরেছিলেন ঠিকই কিন্তু বিয়ের পাঁচ বছরের মাথাতেই রোড এক্সিডেণ্টে মারা গেলেন। ব্যাস অলকার কাহিনী খতম।


ছোট ভাইবোনেরা সকলে বিয়ে না করা পর্যন্ত পুরোনো ঢাকার এক তলা বাড়িতে সব ভাইবোন একত্রে ছিলেন। মা যতদিন ছিল বড় গামলায় সব বাসি তরকারি একত্রে মেখে কাঁচামরিচ পেঁয়াজ দিয়ে ডলে লেবু চিপে গালে গালে খাইয়ে দিতেন। এভাবে তিনি বাসি তরকারিকে অমৃত বানিয়ে ফেলতেন। সকলে আনন্দ নিয়ে কাড়াকাড়ি করে মায়ের হাতের লোকমা বেশী পাবার জন্য মারামারি করে খেয়ে নিতো। আহা , এত যত্নের মধুমাখা দিনগুলো সোনা রূপা কোন খাঁচাতেই রইলো না।


বেবী খুব ভাল পড়াশুনাতে ছিলো। ইন্টার্ন করতে গিয়েই তার সানির সাথে প্রেম এবং বিয়ে। চমৎকার জুটি। বিনুও সংসারে সুখী ছিল। কিন্তু তাকেও এত দিনের সঙ্গীহারা হতে হয় । পরে বিনুর ছেলেরা তাকে কানাডায় নিয়ে যায়, সেখানে শুনেছি সময় দেয় না তারা মা'কে । ছেলেরা,জাস্ট মাকে দেখছে এটাই বিনুর ভাগ্য।


তাহলে কি অলকা ভাল আছে? জাকির বিয়ের পরও কিছুদিন ছেলে নিয়ে একসাথে সংসারে ছিলো। এক পর্যায়ে তুচ্ছ অজুহাতে জাকির বউ নিয়ে আলাদা হয়ে গেলে , অলকা দুই ছেলে নিয়ে সরকারি কোয়াটারে ওঠেন। স্বামী চলে যাবার পর তাঁর স্থলে চাকরীটা সময়ে পেয়েছিলেন বলেই সে যাত্রা রক্ষা । পুরো সংসার তার একার উপর।সরকারী কোয়ার্টারে থেকে কিছুটা কম খরচে তিনি ছেলেদের স্কুল কলেজ শেষ করাতে পারেন। সুখ বেশী দিন টেকে নাই। দ্রুত গোল্ডেন হ্যান্ড শেক করিয়ে তাকে ফোর্স রিটায়ারমেন্ট দেয়া হয়।


বেবী প্রতিমাসে তাকে কিছু টাকা দেবেই। অলকা তো নেবেন না। কিন্তু বেবী ভাগ্নাদের নাম করে জোর করে গুঁজে দিতো। মায়ের পর তার এই বোন যেন মা হয়ে গেছিলো। টাকাগুলো আলগোছে তুলে রাখতেন অলকা , খরচ করতেন না।


ড্রয়ার খুলে খাম বের করেন অলকা । ক’টা টাকা তিনি আলাদা রেখেছেন খরচ বাঁচিয়ে। আজ ভাইবোনদের উপহার দেবেন । তাদের জন্মদিনে যাওয়া হয় না। কোন দিন কোথা দিয়ে চলে যায় এই ব্যস্ত শহরে তার মনে থাকে না।।


সন্ধ্যা হয়ে এলো । ওরা কি আরো দেরী করবে? দরজায় টোকা দিচ্ছে আমেনা। সে এখানকার পরিচালিকা। ‘ খালাম্মা কি ঘুমিয়ে পরেছেন? আসেন আপনার মেহমান এসেছে।‘’


ধীরে ধীরে অলকা উঠে দরজা খোলেন, উঠোন পার হলেই অভ্যর্থনা কক্ষ। দুই পাশে সিজনাল ফুল লাগানো। চমৎকার সব রঙ ফুটে আছে। পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকেন অলকা। সাথে হাঁটে ম্লান কমলা সূর্য।


দিশা ‘নামের এই বৃদ্ধাশ্রমে উনি প্রায় দশ বছর হলো আছেন । এখানেই দেখা করতে আসে যারা কদাচ মনে রাখে। মাঝে মাঝে এখান থেকে বেবী বেড়াতে নিয়ে যায় পানাম সিটি কিম্বা পদ্মা রিসোর্টে। শেষ নিশ্বাসের আগে ছেলেদের দেখবেন বলে ভাবেন না। তারা ভালো থাকুক।


এই ঘরোয়া জায়গাটা অলকার খুব ভাললাগে। আসলেই লাগে? কিছু তো আর করার ছিলোনা। স্কলারশিপ পাওয়া ছেলের বিদেশে পড়াশুনার সুযোগ তিনি আটকাতে চাননি। চোখ পানি জমে ওঠে ইদানিং, একে বয়স বলে। ক্লান্ত পা এবং শ্রান্ত বেলা বিষন্ন হয়ে কথা বলে।
শুনতে পান বসার ঘরে অনেক আওয়াজ । ঠাস ঠাস শব্দে বেলুন ফুটছে । সেখানে আজ জন্মদিন পালিত হচ্ছে। ''দিশা''র অতিথি ঘর প্রায়ই এরকম পূর্ণ থাকে।


ছেলেরা প্রতিবারের মত কেক, চেক, ফুল এসব পাঠিয়েছে নিশ্চয়ই। এখন সিস্টেম কত উন্নত। দূর থেকে চাইলে সব পাঠানো যায়।
বেবী আগেই দৌড়ে বোনের কাছে চলে এসেছে, ‘’আপা। আপা।‘’
হঠাৎ চমকে জানালা দিয়ে বাইরে তাকান তাকান অলকা। শুনসান রাস্তা জন মানবহীন। কে কোথায় মিলিয়ে গেল মেঘের হাল্কা ভাসমান গতিতে। বেবীর গলার তিনি আওয়াজ পেয়েছেন তবে সে আসেনি। বেবী কেন কেউ আসেনি। এবার ফুল কেক ও আসেনি। কতকাল ধরে যেন মানুষেরা ঘরে আর ভাইরাসেরা দাপটে ঘরের বাইরে ঘোরাঘুরি করছে।