ভাঙাচোরা সায়াহ্নের আলো ও কয়েকটি কথা

পার্থজিৎ চন্দ

‘যতই বয়স বেড়েছে
ততই আরো সুন্দর হয়ে উঠেছেন
রবীন্দ্রনাথ
-বলেছেন মৈত্রেয়ী দেবী,
-বলেছেন বুদ্ধদেব বসু।‘ (রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্য/ সুজিত সরকার)

সুজিত সরকারের এই কবিতাটি এর পর অন্য দিকে বেঁকে গেছে। কিন্তু এক দুপুরে সুজিতের কবিতা ও রবীন্দ্রনাথের শেষ বয়সের এক ‘রাজকীয়’ ছবির সামনে বসে মনে হয়েছিল মৈত্রেয়ী দেবী বুদ্ধদেব বসুর এই দেখা অসামান্য। সুন্দরের এক বদ্ধমূল ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অবশ্য এ নতুন কিছু নয় তাঁর কাছে; তিনি তো ব্যক্তিমানুষের বিস্তারের সীমাকেই ভেঙে দিয়েছিলেন। তাঁর পক্ষে সবই সম্ভব।
জীবনের অপরাহ্নে এসে কি এমনই দেখতে হয়ে উঠেছিলেন বুদ্ধদেব প্লেটো গ্যালিলিও কিংবা লালন শাহ? চিন্তন ও বিপুল কাজের মধ্যে দাঁড়িয়ে তাঁদের মাথা কি স্পর্শ করত আকাশ? যে সৌন্দর্য মহাজাগতিক তাই কি ছুঁয়ে থাকত তাঁদের?
এখন হয়তো মনে হবে এঁরা কোনও দিনই ‘প্রাক্তন’ হননি। কেউ কেউ হননি অবশ্যই। আবার কোনও কোনও মানুষকে সিস্টেম গ্রহণ করেনি। ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল নগরসীমার বাইরে।
এঁদের অসীম ক্ষমতা। সিস্টেমকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে ছুটে যেতে পারেন এঁরা। বারবার ক্ষতবিক্ষত করেও এঁদের স্তব্ধ করা যায় না। ক্রুশকাঠ কাঁধে বয়ে বধ্যভূমির দিকে যে হেঁটে যেতে হবে তা এনারা জেনেই জন্মান বা জন্মাবার কিছু পরেই জেনে যান। কিন্তু এর বাইরে তো রয়ে গেল কোটি কোটি ‘সাধারণ মানুষ’, যাঁরা একই রকমভাবে বৃদ্ধ হচ্ছেন। সিস্টেমের কাছে ক্রমাগত উদবৃত্ত হয়ে উঠছেন। প্রতিদিন আমরাই একটু একটু করে হত্যা করছি তাঁদের।
কিন্তু আমাদের তো অন্যরকমই হবার কথা ছিল। আমাদের দর্শনের সিংহভাগই তো জীবনের উপান্তে এসে অর্জিত আত্মোপলব্ধির সমাহার। উপনিষদের শ্লোকের পর শ্লোক ব্যাখ্যা করে প্রমাণ করে দেওয়া যায় মৃত্যুর ইশারা দেখে ক্রমশ গাঢ় হয়ে উঠেছিল আত্মপ্রশ্ন। জীবনের আলোছায়া কামক্রোধ হিংসা-ভালোবাসা অন্ন-অন্নহীনতার মধ্যে কেটে গেল অনেকটা সময়। এবার মৃত্যুর ছায়া গাঢ় হয়ে উঠছে। ঘনিয়ে উঠছে এই বোধ – এর পর কী!
এই মহান প্রশ্ন থেকেই তাবৎ শিল্প-সাহিত্যের সৃষ্টির শুরু।
এবং অনেক সময় আরেকটি আশ্চর্য প্রবণতাও লক্ষ করা গেছে। জীবনের উপান্তে এসে ঘনিয়ে ওঠা যে বোধ তাকে অনিবার্য মেনে (অর্থাৎ মৃত্যুকে অনিবার্য জেনে) কিছু তরুণ-তরুণী তাদের যৌবনেই ছুঁতে চেয়েছেন সেই সায়াহ্নের আলো। নচিকেতা যমের সঙ্গে কথোপকথনের সময়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন সেই সায়াহ্নে।
কৃচ্ছতা সাধনের মধ্যে দিয়ে ক্রমশ নিজেকে রিক্ত করে তোলা... যৌবনের উচ্ছ্বাসকে প্রথমে অবদমন ও পরে সে অবদমন অতিক্রম করে এক গূঢ় সত্যের সন্ধান - তা তো একটি অনিবার্য ইশারা বয়ে আনে।
আমি ক্রমশ এক শীর্যবিন্দুতে পৌঁছাতে চাই... যে শীর্ষবিন্দুতে তোমরা পৌঁছেছ অনেকটা বয়স অতিক্রম করবার পর... আমি সেখানে আরও দ্রুত পৌঁছে যেতে চাই। সেখানে যেন যাপনের উন্মার্গগামিতা না থাকে, সেখানে যেন শুধু ফুটে থাকে মনন ও ‘দেখার আনন্দ’। আমি সে কারণে শরীরের সব উদ্দামতা ও উণ্মুখ গ্রন্থিগুলিকে ধীরে ধীরে হত্যা করে হয়ে উঠতে চাই ‘অকালবৃদ্ধ’। কারণ একমাত্র সে শান্ত উপত্যকা অতিক্রম করেই আমি ছুঁতে পারব অতি-শান্ত এক শীর্যবিন্দুকে।
হাজার হাজার বছরের এই অবদমনকে অনেকে নস্যাৎ করে দিতে পারেন। কিন্তু সায়াহ্নের প্রজ্ঞাকে ছুঁয়ে থাকার পিছনে এই প্রণোদনা কাজ করেছিল।
মানুষই একমাত্র জীব যে অবলীলায় শান্তভাবে বলতে পারে, স্থবিরতা, কবে তুমি আসিবে বলো তো। এটি কথিত হল বিংশ শতাব্দীতে, কিন্তু এর বীজ মানুষ তার মেধা ও মননের মধ্যে বপন করেছিল হাজার হাজার বছর আগে। কেউ যদি মনে করেন এই উচ্চারণ ‘আধুনিক’ মানুষের ধ্বস্ত ও খণ্ডিত সত্তার কান্না তা হলে সেটি সর্বৈব ভুল। কারণ এই স্থবিরতার বোধ... ক্রমশ স্থবির হয়ে ব্রহ্মাণ্ডের এক গানের কাছে কান পেতে থাকা... এটি তার হাজার হাজার বছরের ইচ্ছা। শুধু এক সময়ে এই বোধকে আমরা সম্মান করতাম হয়তো। আজ আর করি না নিশ্চিত।


আজকাল মনে হয় কারা এঁকে ছিলে সারা পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব গুহাচিত্র? অকল্পিত শিশুমৃত্যুর হার, গড় আয়ু বেশ কম। শিকার শেষে পশুর রক্তমাখা দেহ কাঁধে নিয়ে ফিরে আসছে যুবকের দল। তারপর তার শুশ্রূষা ও যৌনতা প্রয়োজন। তা হলে কি এইসব শিল্প আসলে প্রৌড়ত্ব ও সায়াহ্নের শিল্প? যাদের যুদ্ধে ও শিকারে যাবার দিন শেষ তারাই কি গুহার অন্ধকারে একদিন শুরু করেছিল এই চিত্রাঙ্কণ? নিশ্চিত কোনও উত্তর পাওয়া যাবে না জানি। কিন্তু এই প্রশ্নের কাছে আজকাল আমি ঘোরাফেরা করি।
যদিও বাজার অর্থনীতি ও লগ্নিপুঁজির কাছে এই অপরাহ্নের আলোর আলাদা কোনও মূল্য নেই। নন-প্রোডাক্টিভ এক রাক্ষুসে ধারণা থেকে তারা বাতিল, নির্বাসিত। কিন্তু মানুষের গড় আয়ু বাড়ার ফলে এই বয়সের মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। রাষ্ট্রের কাছে তাঁরা হয়ে উঠছে ‘বার্ডেন’।
মাঝে মাঝে অনেকে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা নামক এক ছাতার নীচে তাদের আনার কথা বলেন। কিন্তু সমস্যাটির সমাধান সেখানেও নেই। রাষ্ট্র তাঁকে একটা ‘ফ্রেম’ উপহার দিতে পারে। কিন্তু তার দরজা-জানালাগুলি খুলে আলোবাতাস প্রবেশ করবার সুযোগ করে দেবে কে প্রতিদিন? আমাদের মতো সামাজিক মানুষের কাজ সেটি।
কিন্তু মুশকিল হল, আমরাই তো সেই সামাজিক মানুষ যারা এতদিন ডাইনি ও রক্তচোষা দুষ্টূ আত্মাকে বিশ্বাস করে এসেছি।
আমরা এখন বিশ্বাস করি, সন্ন্যাসে যাবার সময়ে মানুষ বেশ দুষ্টু ও বোঝা হয়ে ওঠে। আরও আরও হত্যা কৌশল দরকার এই সাতকাল-গিয়ে-এককালে ঠেকা মানুষগুলোকে হত্যা করবার জন্য। সেগুলিকে আমরা আয়ত্ব করতে শুরু করেছি।
রাষ্ট্র আপনাকে সিনিয়র সিটিজেন হিসাবে ট্রেন-ভাড়ায় ছাড় দিয়েছে, কিন্তু আমাকে দিয়েছে ভীড় প্ল্যাটফর্মে আপনার অশক্ত শরীরকে ধাক্কা দিয়ে চলে যাবার ‘স্বাধীনতা’। আপনাকে বারবার ভার্বাল অ্যবিউজ করা আমার জন্মগত অধিকার, যদিও আমার বাবা-কাকা’কে হয়তো জন্ম দিয়েছেন আপনিই। ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বললে আমাদের সামনে নারী-নির্যাতনের ছবি ভেসে ওঠে। এর সঙ্গে সমাজের কাছে প্রাক্তন হয়ে যাওয়া ও সায়াহ্নের দিকে ঢলে পড়া মানুষদেরও যুক্ত করা দরকার আজ। কত কোটি মানুষকে যে প্রতিদিন অপমানের অন্ন গিলতে হয় তার প্রকৃত চিত্র আমাদের অজানা।
কিন্তু সায়াহ্নের আলোই কি সেই অপার্থিব আলো নয়, যার নীচে মায়াবী হয়ে আসে আমাদের পৃথিবী! এই পৃথিবীর বালুতট থেকে এক একদিন কি কোনও ‘প্রাক্তন’ হয়ে যাওয়া মানুষ তার নৌকা ভাসিয়ে দেয় না?
গভীর সমুদ্রের দিকে একটি মাছ তাকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে। সে তো সারাজীবন এমন কিছুর সন্ধানেই ছিল। ক্রমশ মাছটিও তার কাছে গৌণ হয়ে ওঠে।
সে সমুদ্রের কানে কানে বলতে চায় – আমাকে তুমি মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারো… ফেরাতে পারো শূন্য হাতে… কিন্তু আমাকে তুমি পরাস্ত করতে পারবে না।
সায়াহ্নের আলোর থেকে এই হার না-মানার গল্প শোনার দিন কি শেষ হয়ে আসছে পৃথিবীতে?