বয়স হওয়ার মানেই বোধহয়...

হিন্দোল ভট্টাচার্য

আমার মায়ের কথা দিয়েই শুরু করি। তাঁর বয়স ৬৬। ছ বছর আগে পর্যন্ত তিনি তাঁর স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ পদের কাজ সামেলেছেন। অবসর গ্রহণের পরেও তাঁর উপর দিয়ে বয়ে গেছে প্রচুর ঝড়। যখন ধরা পড়ল তাঁর সন্তানের দুটি কিডনিই খারাপ হয়ে গেছে, তখন এই ৬৪ বছর বয়সেও তিনি তাঁর সবল কিডনিটি ছেলেকে দেবেন বলে স্থির করেন। অপারেশনের পর তার ধকল পড়ে শরীরেও। অবসর গ্রহণের পরে একধরনের একঘেয়েমি গ্রাস করে। কিন্তু তিনি এখনও লড়ে যাচ্ছেন নানা বিষয়ে। নানান নতুন বিষয় জানবার জন্য, পড়ার জন্য আগ্রহ তাঁর কম নয়। অবসর নেওয়ার পরে হিমালয়ের বিভিন্ন ট্রেকিং রুটে ঘুরেও এসেছেন। আচ্ছা, আমার মায়ের কথা থাক। হিমালয়ের কোলে হাঁটতে হাঁটতে দেখি এমন অনেক বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে, যাঁদের কাছে বয়স একটা সংখ্যাই। মহা উদ্যমে তাঁরা হেঁটে চলেছেন কঠিন রাস্তায়। এমন অনেক বৃদ্ধ বৃদ্ধাকেও দেখেছি, যাঁরা তাঁদের সর্বস্ব দান করে দিয়েছেন একটি হাসপাতাল বা একটি স্কুল গড়ে তোলার জন্য। দেখেছি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত-র মতো মানুষকে, যিনি এই পঁচাশি পেরিয়েও সমান কাজ করে যাচ্ছেন। এমন সব ভাবনার দিক উন্মোচন করে যাচ্ছেন, যে সব ভাবনায় আমরা হয়তো পৌঁছতেই পারতাম না।
হয়তো আমি আবেগ বশতই এই সব লিখে চলেছি। আমার হয়তো সাধু সাধু জানানোর কথা ইউরোপের নন্দিত সব দেশের সিদ্ধান্তকে, যে ষাট বছরের অধিক হলে কেউ কোভিডে আক্রান্ত হলে, তাঁদের আর চিকিৎসাই দেওয়া হবে না, তাঁদের চেয়ে বরং চিকিৎসার সুযোগ পাবেন তাঁরাও যাঁরা নবীন। কারণ তাঁরা ভবিষ্যৎ। আর এই সিদ্ধান্ত ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই পদ্ধতি দেখেই বড় আশ্চর্য লাগছে। কারণ ইউরোপের যে সমস্ত দেশ বিশ্বের জ্ঞানচর্চার আর্কাইভ, সেই সমস্ত দেশে জ্ঞানের এত অভাব! রুচির এত অভাব! সৌজন্য এবং শিক্ষার এত অভাব!
আসলে এই কোভিড-১৯ আমাদের বিশ্বায়ন এবং পুঁজিবাদের একটা মারাত্মক কদর্য দিকের সামনে এসে দাঁড় করিয়ে দিল আবার। এ যে প্রকৃতই সভ্যতার এক সংকট, সে বিষয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়। কিন্তু ভাবুন একটু, পুঁজির কাছে যারা উৎপাদিকা শক্তি নয়, বা উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়, যাদের তেমন শ্রমের কোনও অবদান নেই, তারা হয়ে পড়ছে অপ্রয়োজনীয়। অর্থাৎ, মানুষ হিসেবে আমি সারাজীবন ধরে শ্রমদান করলাম, ভোগ করলাম, ক্রয় করলাম, অর্থনীতিকে সচল রাখলাম, সমাজকেও সচল রাখলাম, তার পর একটা সময় আমার কর্মক্ষমতা কমে এল। এখন আর বাণপ্রস্থে যাওয়ার উপায় নেই। তাই, আসলে তুমি অপ্রয়োজনীয়। তোমাকে ছেঁটে ফেলছি না কারণ উদ্বৃত্ত অর্থ যথেষ্ট আছে। কিন্তু যখন উদ্বৃত্ত অর্থে টান পড়বে, তখন তোমায় আর দরকার নেই। কারণ তোমার আর কোনও অবদান নেই।
প্রশ্ন- অবদান কীসের নিরিখে মাপা হচ্ছে? শ্রমের নিরিখে। যে শ্রমের বিনিময়ে প্রচুর পরিমাণ উদ্বৃত্ত অর্থ লাভ করবে পুঁজি। অর্থাৎ, এই অবদান মাপা হচ্ছে লাভের প্রেক্ষিত থেকে। তাই, ভেন্টিলেটর বাড়ানর কথা ভাবা উচিত বিশ্বজুড়ে। কিন্তু তার বদলে, বুড়োবুড়িদের মরে যেতে দিতে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রই নিচ্ছে। কী ধরনের উদাহরণ আগামী প্রজন্মের কাছে তাহলে রাখছে এই তথাকথিত উন্নত দেশগুলি? যাদের কাছ থেকে তুমি লাভের কড়ি পাবে না, তাদের প্রয়োজনে তুমি হত্যা করতেও পারো। বিশ্বায়নের এই কদর্য সংস্কৃতি, পুঁজিবাদের এই জঘন্য মানসিকতা তাদের আগামী দিনে এক মনস্টার বা দৈত্য হয়ে ওঠার ইঙ্গিত। যে দৈত্যের কোনও নীতিই নেই। যে দৈত্যের মানবিকতা নেই। যে অনেকটা নরমাংসভোজীর মতো বা সেই বিদেশি ডিসটোপিয়ান ছবিতে দেখা জোম্বিদের মতো। যারা বড় বড় হাঁ আর রক্তাক্ত মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে মৃত এক নগরীতে।
এখানে মৌলিক অধিকারের প্রশ্নটিও আসতে পারে। একজন ষাটোর্ধ ব্যক্তি নিজে থেকেই যদি মরতে চান, তাহলে বলার কিছু নেই। কিন্তু তাঁর ইচ্ছে না থাকলেও, তাঁর অনেক কিছু দেখার জানার ইচ্ছে থাকলেও এবং সমাজকে অন্য রকম ভাবে কিছু দিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা থাকলেও, রাষ্ট্র তাকে বলছে তুমি মরে যাও। তোমাকে আর প্রয়োজন নেই। সারাজীবন ধরে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে সেবা করল কেউ, কাজ করল কেউ। তার বদলে সে পেল শেষ জীবনে রাষ্ট্র, দেশ এবং পরিবারের মানুষদের চূড়ান্ত অবজ্ঞা, হিংসা এবং শেষমেশ খুন হতে হল তাকে সকলের হাতে। তার মৌলিক অধিকার বলে কিছু নেই কারণ তার শারীরিক শ্রম দেওয়ার ক্ষমতাও আর নেই।
তবে কি আমরা সেই জায়গাতেই চলে যাচ্ছি, যেখানে যেমন আমরা পুরনো হয়ে যাওয়া ক্ষয়ে যাওয়া নাটবল্টু ফেলে দিয়ে নতুন কিছু লাগাই, তেমন মানুষের কর্মদক্ষতা ক্ষয়ে গেলে তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করব?
হয়তো এই পুঁজিবাদ তাই করবে। তথাকথিত উন্নত দেশগুলি সেটিই করবে। তার পর বিশ্বায়নের এই সংস্কৃতি অনুসরণ করবে উন্নয়নশীল দেশগুলি। কোভিডের এই আবহে, পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলিতে এই আদিম প্রথার বীজ দেখতে যে পাচ্ছি আমরা, তাও কম ভয়ের নয়।
কেন লোচের একটি ছবি আছে। আই, ড্যানিয়েল ব্লেক। এই ড্যানিয়েল ব্লেক একজন হার্টের রুগী। অসুস্থ। রাষ্ট্রের কাছে সে হয় কাজ চায় নয় চায় ভাতা । কারণ সে ষাটোর্ধ। তার কেউ নেই। কিন্তু রাষ্ট্র তাকে ক্রমাগত ঘোরায়। লাইন দিয়ে দাঁড়ায় সে। ফর্মের পর ফর্ম ফিল আপ করে। রাষ্ট্র তাকে প্রতিনিয়ত অপমান করে। তাকে ঠেলে দেয় এমন এক কোণে, যেখানে সে বুঝতে পারে, তার বেঁচে থাকার কোনও মূল্যই নেই রাষ্ট্রের কাছে।
হার্ট অ্যাটাকেই তার মৃত্যু হয়। কিন্তু তার আগে সে একটি চিঠি লিখে যায় সকলের উদ্দেশ্যে। সেই চিঠিটি এখানে তুলে দিলাম।
“ I am not a client, a customer, nor a service user. I am not a shirker, a scrounger, a beggar, nor a thief. I am not a National Insurance number or blip on a screen. I paid my dues, never a penny short, and proud to do so. I don’t tug the forelock, but look my neighbor in the eye and help him if I can. I don’t accept or seek charity. My name id Daniel Blake. I am a man, not a dog. As such, I demand my rights. I demand you treat me with respect. I, Daniel Blake, am a citizen, nothing more and nothing less. Thank you.”
ড্যানিয়েল ব্লেক-এর এই কথাগুলিই আজ সারা ইউরোপের ষাট বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের। কিন্তু এই আর্তি কে শুনছে?