এক গুচ্ছ কবিতা

জুয়েল মাজহার

।। কূর্মের বেদনা ।।

১.
আমি এক শক্তখোল কূর্মের ভিতরে সুকোমল
'হৃদয় লইয়া থাকি' কর্দমাক্ত আবছা জলাশয়ে

শ্যাওলাঢাকা খর্ব দেহ। যেন এক কিম্ভুত সসার
বিকল এঞ্জিনসহ মুখ থুবড়ে পড়েছি ডাঙায়
আদিম জলার পাশে। সঙ্গীহীন। একা নিঃসহায়!

২.
আমাকে জড়িয়ে আছে লক্ষবাহু লতাগুল্মজাল;
অনেক কচ্ছপবর্ষ কাটিয়েছি বিস্মরণ-মেঘে ডুবে
জন্তুদের মলে ও পুরীষে

৩.
তারপর একদিন ঊর্ধ্বাকাশ থেকে আচানক
ভীষণ ভীষণানাং একচক্ষু দৈত্য তাকাল
তেতে উঠল আণবপ্রতাপে আর অগ্নি-হল্কায়

নির্বিরোধ কূর্মপৃষ্ঠে হানলো সে দৃষ্টিঅগ্নিবাণ।

আর আমি বন্ধ করে দিয়ে ক্লান্ত বুকের হাপর
অচেনা গুহায় গিয়ে ভয়ে লুকালাম। যেন কেউ

না পায় আমার ভীরু হৃদয়ের নিশ্বাসের স্বর

৪.

তবু হায়! তাদের চাহনি পারে
স্ক্যানারের মতো সব ভেদ করে যেতে


৫.
আমাকে ভেবেছে তারা প্রদোষের আশ্চর্য মোহর
আমাকে খেলনা ভেবে মাতলো খেলায়
ভাঙতে চাইল তারা অভঙ্গুর শক্ত খোলটিকে

গুহাটির নিরেট দেয়ালে তারা আমাকে ফেলল ছুড়ে
মারল আছাড় বারবার


৬.
তবে তারা অসফল। তাহাদের আয়ুধ বিফল


৭.
আমার সমস্ত দেহে ক্ষত আর মর্মে রক্তপাত
আমার নাভিতে জ্বলে হুতাশন লক্ষ নিনেভার

আঘাত উজিয়ে তবু হামা দিয়ে ফের আমি চলি;
নিজেকে বানিয়ে চাকা বাইরে আসি গড়াতে গড়াতে

ইশারা-রূপকে আমি নিজেকে 'সাবাশ' বলে উঠি


৮.
এসে দেখি, প্রকাণ্ড-প্রকাণ্ড এক বুদ্বুদের ভেতরে জগৎ;

এর সর্ব দিকে শুধু পেঁচানো নরক
হিংসার দীর্ঘ এক নদী তাতে চলে একেবেঁকে


৯.
হিরোনিমাসের আঁকা ছবি যেন; ---তাতে
মাকড়জালের মতো পাতা-ফাঁদে প্রাণীরা কাতরায়।

কেউ কেউ বিঁধে আছে অগ্নিশলাকায়
কারো কারো নাসারন্ধ্র ভরে আছে হিলহিলে সাপে



১০.
এরপর স্বপ্নের আয়না ভেঙে আচানক হলো খান খান !

কিমাশ্চর্য! কী দারুণ
হিমশৈলশিরে দেখি লালিগোরাশের মাথা দোলে






।। বিলজিবাব ।।

যেইখানে গাড়বা তুমি ঠাইন
তোমার পিছন নিবে
তিন লক্ষ সাতশো কোটি
পেত্নি-পিশাচ আর ডাইন।


এ-তোমার দেহের বাগানে আর কলিজায়-দিলে
তারা আইসা পুঁইতা দিবে
আলগোছে মাইন;

#
প্রচুর উখের রসে, ঘন লাল তাম্বুলের রসে
ভিজায়া-রাঙায়া দুই ঠোঁট
বলবে তারা মিহিস্বরে আহলাদে ভরা মিঠা বোল:

তুমি বড়ো ভালা, মিয়া
আইসো, নিকটে আইসো
আইসো বুগলে, সদাগর।


পরম আদরে আমরা আইজ
তোমারে ঝুলায়ে দিব শিকে

হের বাদে আইজকা এই তেরোই আগস্টে এই
ব্রহ্মাণ্ডের অচিন, প্রাচীন আর গহন সন্ধ্যায়
আমারই ভিতর থিকা বাইর হ'য়া আসবে বিলজিবাব।

সে আমারে বলবে কানে কানে:

মিয়া সা'ব ডরায়ো না!
বানায়ে তুলব আমি তোমারে ক্রমশ

স্বাদুতম
মধুতম
সদা-ঝলসিত এক

প্রকাণ্ড কাবাব!




।। নিশিডাক ।।

সর্পদুষ্ট এক মায়াবন থেকে
কে যেন ডাকছে নিস্বর ইঙ্গিতে;


সাড়া দিতে ভয়। নীরবে পালাই, আর,
ঝাঁপ দিয়ে পড়ি অন্য ঘুমের ঘোরে।


এই পলায়ন তবু অসফল, বৃথা!
অতিকায়-ডানা গরুড় পেছনে ওড়ে;

কুহক-জটিল জাল পাতে ডাইনিরা


প্রেতযোনীদের আচমকা খল হাসি
ছল্কে পড়ছে শ্রবণের পেয়ালাতে;


অনেক নখর, অগণিত বাঁকনল
আংটার মতো ঝুলছে ওপর থেকে।


দশ দিকে আর সব দিকে ভয়ানক
রজ্জুর মতো সাপ পড়ে থাকে পথে



বুনো ক্যাকটাস, মায়াফুল মাথা নাড়ে!


ডাইনির আঁকা শ্মশানে ঝিঙুর পোকা
ডেকে মরে আর পাগল পাতারা ওড়ে


মরণফুলের বিভ্রমে দিশেহারা
জীবিতরা সব মরে গেছে কতো আগে


বুনো ক্যাকটাস, মায়াফুল মাথা নাড়ে!


আংটায়, ফাঁদে, বল্লমে, আঁকশিতে
কে কাকে শিকার করবে আজকে রাতে?


আততায়ী ঘোরে সখার ছদ্মবেশে
বুনো ক্যাকটাস, মায়াফুল মাথা নাড়ে!