রাত –বেহাত

শুভংকর গুহ




ক্রমশ সরে যাওয়া রাত ।ফিরে যাওয়া রাত । জানি না । জানালার ওপাশে দিঘি থেকে নিশাচর বক ডানা মেলে ক্রেংকার তুলে উড়ে গেল । সম্ভবত সাঁড়াশির মতন ঠোঁটে চেপে একটি মাছ । গুমোট শহরে ঘরের ভিতরে বনবাস উঠে আসছিল না গ্রামচিত্র জানি না । বারান্দার সামনে ইট ভাঙ্গা রাস্তা ধরে কাঁচা খিস্তির ঢেউ তুলে চলে গেল নিশাচর লক্কা পায়রার দল । পাশের বাড়ির সমকামী চৈতন্যবাবু এত রাতে ফুল ভল্যুমে গান শুনছিল । তুমি আমারি তুমি আমারি ...তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা ...... আজ নিশ্চিত কোনো টাইট পোক্ত কিছু পেয়েছে চৈতন্যবাবু । আনন্দে এখন তাই শ্রবণ উৎসব যাপন করছে ।
সেই বিকেল থেকে বৃষ্টি হয়েই চলেছে । গত তিন চার দিন ধরে মরসুমি মেঘ যেন শ্রাবণ গিলে খাচ্ছে ।
কিছুক্ষণ আগে দরজায় টোকা পড়েছিল । বন্ধ দরজার সামনে আছড়ে পড়েছিল মধ্য রাতের মদ্যপ অভিশাপ । এখন শব্দহীন । জমাট অন্ধকার । বিকেলে এক রাষ্ট্রক্ষমতার ফেউ বা নরকের কীট এসে অশালীন ভাষা বলতে বলতে চুম্বক দিয়ে ঘরের ভিতরের সমস্ত আসবাব টেনে নিয়ে গেছে । লোহার খাট , স্টিলের চেয়ার , থালা বাসনপত্র , এমনকি জানালার লোহার শিকগুলো পর্যন্ত বেঁকে গেছে । কেমন যেন তছনছ হয়ে আছে চারধার । খাটের নিচে লোহার কড়াই , কোদাল খুরপি , এমনকি আমার স্টিলের ফ্রেমের চশমা জানালার কপাটের আঙটার সঙ্গে বেমালুম ঝুলে আছে । হাত বাড়িয়েছি চশমাটি আনব বলে – ঠিক তখনই রাত গভীর প্রচ্ছন্ন আলোতে দেখলাম দেওয়াল ঘড়ির কাঁচের ওপরে , একটি মাকড়শা দৃশ্যমান মিনিটের কাঁটার ওপরে স্থির , অনেকটা রহস্যময় রাতের সময়কে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে বলছে ।
আমাকে সর্বস্বান্ত করে দিল । ঘরের ভিতরে ঘরগুলি খা খা করছে । অন্ধকারে জোনাকি গৃহস্ত হাতরে যাচ্ছে । বৃষ্টির ভেজা বাতাসে জানালার ভাঙ্গা কাঠের পাল্লা সন্দেহজনক হাপরের মতন বন্ধ হচ্ছিল আর খুলে যাচ্ছিল । গোটা বাড়িটা রাত শেষে মোমের মতন গলে যাবে কিছুক্ষণ পরে । কদম গাছের পাতায় যেন বৃষ্টির টুপ টুপ জল । শুধু আজকে কেন বেশ কয়েকদিন ধরে আকাশ বড়ই বান্ধবহীন । কিন্তু না, ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের আড়াল টপকে কয়েকটি উজ্জ্বল তারা ধ্বংসপ্রায় সুতোকলের পাঁচিলের ওপরে বসে যেতে চাইছে ।
ও তুমি এসে গেছ ? কখন এলে ? বাঃ । বেশ তো । টের পেলাম না ? ইসস কতটা শব্দহীন তুমি ? অথচ দেখ একবার , আমি সেই সন্ধ্যে থেকে তক্তপোষে শুয়ে আছি , গোটা শহর জুড়ে কত শব্দ অথচ আমি এখানে আমার ঘরে শব্দহীন ।
হ্যাঁ মাঝে মাঝে মনে হয় , এই নিঃসঙ্গ জীবন অনেকটা সেই ব্যর্থ চিত্রকরের আঁকা স্টিল লাইফের মতন , ভাঙ্গাচোরা কিছু নমুনা রেখে স্টাডি করেছে , তাই হয় , লোকে জানতে পারলে সেই ভাঙ্গা ব্যর্থ বেদনাময় জীবনকে নিয়ে রচনা করে শিল্পকলা । বিন্যাসটি এমন ,- মাটির কলসির ভাঙ্গা কিছু টুকরো , শুকনো ফুলের এলানো ফুলদানি , তালপাতার পুরানো হাত পাখা , চুইয়ে চুইয়ে আলো এসে পড়েছে জানালার ভাঙ্গা কপাট অতিক্রম করে সাবজেক্টের ওপরে । এমন একটি জীবন , আঙ্গুলের ডগায় ছুঁয়ে নিলে , ব্যক্তিত্বের পালিস কমে যায় । ব্যক্তি তখন সত্ত্বাহীন । অথবা ...অথবা নগ্ন একটি মানুষ মিকেল অ্যাঞ্জেলোর ভাস্কর্যের মতন শুয়ে আছে । শুকিয়ে যাওয়া নদীর শরীরের ওপরে ডিঙ্গি কাৎ হয়ে পড়ে আছে এমন পাথুরে শরীর যেমন ।
একটা কিছুর শব্দ হল না ? তুমি শুনতে পেলে ? কেমন ধাতব ঝন ঝন , গুছিয়ে তোলা সংসারের ভেঙ্গে যাওয়ার শব্দ । তুমি শুনতে পেলে ? আমাকে এরকম শব্দের থেকে চিরকাল তুমি সচেতন করেছ । অথচ দেখ এই শব্দের পতনের সাথে তুমি এলে , অনেকদিন পরে আমার আত্মহননের দিনে । কি আশ্চর্য ! আমাকে তুমি সচেতন করা সত্ত্বেও তোমার নিজের হাতে গড়ে দেওয়া সংসার কেমন এলোমেলো হয়ে গেল , ভোকাট্টা । তুমি চলে গেলে । বলে গেলে নতুন অনুভবের সন্ধানে ।
আচ্ছা বলো তো , জন্ম মানেই কি আত্মহনন ?
দেখ আমি কি বোকা ?
অপূর্ব তোমার যুক্তি । আসলে তোমরা বোধ হয় এমনই হয়ে থাকো । হ্যাঁ , অবশ্যই তোমরা ? তা ছাড়া আবার কারা ? কোনো যুক্তি মানো না । প্রথাগত নির্দেশ মানো না । অথচ আমরা যদি প্রথাগত কিছু ভাঙ্গতে চাই , তখন তুমি নিজে নীরব থেকে , প্রতিবাদী হয়ে ওঠো ।
মনে নেই , সেই সময়ে একটি রাইফেল এনে বিছানার তোষকের নিচে রেখে দিয়েছিলাম । তুমি বলেছিলে আমার মাথা না কি খারাপ হয়ে গেছে । একদিন সে কি তোমার বিরক্তিকর চেল্লামেল্লি । অসহ্য । তুমি বলেছিলে , একদিন কাক নীরব দুপুরে রাইফেলটি নাকি ঘরের ভিতরে পায়চারি করছে । কেউ এসে দেখে ফেললে না কি সর্বনাশ হয়ে যাবে ।
কে আবার দেখবে ? চারদিকের পরিস্থিতি ভালো নয় । র‍্যাডিক্যাল.... র‍্যাডিক্যাল ... র‍্যাডিক্যাল । বিপ্লবীদের খামার । হাঃ হাঃ হাঃ ...এসব তোমাদের কারসাজি । রাষ্ট্রক্ষমতা এমন ......বটতলার রগ রগে যৌনতা বিষয়ক গ্রন্থেও বিপ্লবের গন্ধ খোঁজে , অভিসন্দি খোঁজে । মনে নেই মোটা কাঁসার চাদরের গ্লাসটি তোমার হাত থেকে পড়ে গিয়ে গড়িয়ে গেল একেবারে ঘরের চৌকাঠ পার হয়ে বারান্দার উঠোনে , তুমি গ্লাসটি কুড়িয়ে আনতে গেলে , মাথা তুলে দাঁড়াতেই , তোমার চোখের সামনে , লাল বুটজুতো তারপরে গোটা খাকি পোশাকের কদাকার নিসর্গ ... উঠোন পেরিয়ে পাঁচিলের ওপারে তখন ছায়া রোদে ভাসছে ননসেস্ন ...রাসকেল... বেজন্মা আরও কত কত ভোঁতা জং পড়ে যাওয়া শব্দ ।
তুমি রাইফেলটিকে আঁচলে লুকিয়ে আমার দিকে এমন তাকালে , যেন আমি তোষকের নিচে রাইফেলটিকে রেখে খুব অপরাধ করে ফেলেছিলাম । বিশ্বাস করো সেদিন তোমাকে দেখে আমার করুণা হয়েছিল । আমাকে আড়াল করতে গিয়ে নিজেই তুমি একশো শতাংশ ঝুঁকি নিলে । পরবর্তী অধ্যায় তোমার একেবারেই ভুলে যাওয়ার কথা নয় । প্রবল বৃষ্টিতে ভেসে আসা নদীর জল ছোপ ছোপ লাল লাল বাকিটা তো মায়াময় রাষ্ট্রক্ষমতার শুকনো জবা ফুল আর করবী গাছের বিষাক্ত শিকড় ।
হ্যাঁ , রাইফেল , কত বছর আগে ? রাষ্ট্র বিপ্লবের যন্ত্র , আর আজ তোলাবাজি আর বুথ দখলের হাতিয়ার । সাব্বাস , সেই সব কলমগুলি যারা আত্মসমর্পণ করেছিল তারাই সেই কবে থেকে এখনও ছদ্মবেশ ধরে আমার তোষকের নিচে রাখা রাইফেল নিয়ে কি চমৎকার রোমান্টিক গল্প উপন্যাস লিখে চলেছে প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে । একটি সময় অতীতের আচমকাই সরে গেল জানালার কপাট পার হয়ে , রেখে গেল কালো লোমশ লেজের নেমে যাওয়ার গাঢ় অন্ধকারের বিমূর্ত স্মৃতি ।
হ্যাঁ , আমাকে নিয়ে তোমার পরেশানি কম ছিল না । আমার চিন্তায় মগ্ন হয়ে , নিজে প্রায় মরা টিকটিকির মতন হয়ে যাচ্ছিলে । আমাকে তুমি বারে বারে বলতে , -
একদিন যাও । যেই নদী ঘাট থেকে , রক্তাক্ত জলের প্লাবন আমাদের বাড়ির উঠোনে এসে উচ্ছসিত ছল ছল, সেই ঘাটে একবার গিয়ে ডুব দিয়ে এসো ।
আমি হতবাক হয়ে এখন তাকিয়ে আছি দেওয়ালের দিকে । একটি পাখি ক্রমশ টি টি করে রাতের শহর পার হয়ে যাচ্ছে, চোখের সামনে ভেসে উঠছে ব্রাউন রাইফেল । টেবিলের ওপরে জল ভরা গ্লাসের পাশে স্তব্ধ জোনাকি , ঘড়ির কাঁটার টিক টিক শব্দ । দেওয়ালে ঝোলানো বাবার সামরিক বাহিনির কম্বল কাপড়ের টুপি , বেল্ট ঝুলছে হুক থেকে , দু দুটো যুদ্ধ পার হওয়া চামড়ার কালো জুতোর ভিতরে ইদুর খস খস । আমার ছাত্র জীবনের জ্যামিতির বাক্সের ওপরে পোকা উড়ে টোকা দেওয়ার টং টং । ঘরের ভিতরে তোমার জর্দা পানের গন্ধ । বহু দূর থেকে ভেসে আসছে রিক্সার পাম্প টেপার পু পু শব্দ , রাতের শেষ ট্রেন এখনো সিগন্যাল অতিক্রম করে নি , রাত গভীর হচ্ছে । শব্দহীন , স্মৃতির তুখোড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে মস্তিস্ক জুড়ে । মহাকাশে কৃষ্ণগহ্বর গিলে ফেলছে তারা নক্ষত্র গ্রাম । আমি ক্রমশ বিবস হয়ে যাচ্ছি , কতক্ষণ হয়ে গেল রান্নাঘর স্নানঘর বৈঠকখানা মায় দুই তিনটি ঘর থেকে কোনো শব্দ ভেসে এল না । আসলে কেউ বেঁচে নেই । এমনকি তুমিও নও ।
তুমি কি এসে গেছ ? আমার পাশে বসবে না ? একটু বোসো । আজকে আমার কিছু বলার আছে । তোমাকে ? হ্যাঁ তোমাকে ? তোমাকেই বলছি । কিছু কথা বলার আছে । আজকে যদি তোমাকে কথাগুলি না বলি , তাহলে আগামীকাল কেউ এসে , ফ্রিজ থেকে জমানো বরফগুলিকে নোংরায় ফেলে দেবে । আমার ভিতরে শীতল কথাগুলিকে আজ তোমার উষ্ণতা দিতে চাই ।
ভয়ংকর হীম শীতল , অনৈতিক , বেহিসেবি , পৌরসভার বেশ্যাপাড়া অতিক্রম করে আসার পরে , বুঝতে পারলাম , হয়তো কেউ মারা গেছে । স্বাভাবিক অস্বাভাবিক বা হত্যাও হতে পারে । তেল চোয়ানো লাইটপোস্টে হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম । জিজ্ঞাসা করলাম একজনকে । সবাই কি রকম অতিরিক্ত হাসছে । আমি জানতে চাইলাম । দালাল বিক্রেতা ক্রেতা গলির মাতব্বর সবাই আমাকে কি রকম সন্দেহের চোখে দেখছিল । জানি মহল্লার সবাই আবার সকালে নদীতে স্নান করতে যাবে সাবান দিয়ে ধুয়ে সাফ করে দেবে সন্ধ্যা নেমে যাওয়ার আজকেরা ঘটনাটি ।
এই সব বা এমন নানান ঘটনা তো রোজই ঘটত বা ঘটে যেত । কিন্তু আজ সকাল থেকেই কাক ডাকা থেকে শুরু করে , চড়াই পাখির চিউ চিউ , শহুরে ময়লা শূন্যতায় করবী গাছের ফুল , ভাঙ্গা দেওয়াল উপছে রোমান্টিক কদম ফুল , সাইকেলচারির প্যাডেল ঘোরানো , বিদ্যালয়ের পাঁচিল টপকে এসে ঘণ্টার ঢং ঢং শব্দ , সাইনবোর্ড , ট্রেনের হুইসেল , চায়ের দোকান এই সমস্ত কিছুই অন্য অর্থ সংগ্রহ করতে ব্যস্ত ছিল ।
তার মধ্যে হাসপাতাল থেকে চূড়ান্ত রিপোর্ট নিয়ে বাড়িতে ফেরা । তারপরে আমি ব্যাকুল , বাড়িতে ফিরে কল বাথরুম করে , তক্তপোষের ওপরে বিছানায় বসে আজকের সংবাদপত্রটিকে দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলাম । আসলে কোনো প্রকার বর্তমানের সাক্ষ্য সরিয়ে ফেলতে চাইছিলাম, আর নিজেই এক গভীর গোপন আশ্রয়ের সন্ধান চাইছিলাম । বইয়ের তাকে নাক রেখে অনেকক্ষণ ধুলোর গন্ধ নাকে নিলাম । জানি না , কবে শেষ একটি বই তাক থেকে তুলে নিয়ে পড়েছিলাম ।
শুয়ে পড়লাম । ধান ক্ষেতের বিকেলে ভেসে আসছে শ্যালোর ভুট ভুট শব্দ । পারিযায়ী মরসুমের আগে , একটু রাস্তা ধরে হেঁটে যাওয়া ।
কোনো রাতের অন্ধকারকে পাশে বসিয়ে আদর করে কোনোদিন কথা বলি নি । তাই আজ রাতের ঘরের অন্ধকার আমার সঙ্গে অনেক কথা বলতে চাইছে । প্রায় প্রতিদিন রাতের অন্ধকার আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইত । আর আমি তাকে প্রত্যাখ্যান করতাম । কিন্তু আজ রাতের অন্ধকারের কাছে আমি আত্মসমর্পণ করলাম ।
কি চমৎকার শব্দহীন মুছে যাওয়া আলোর রেশ নিয়ে কিছু বলছে হয় তো । কে জানে রাত্রি এমনই কথা বলে । আলো যখন কথা বলে , সে অন্ধকারের কথা কে আড়াল করে , অন্ধকার যখন কথা বলে তখন কোনো আলোর স্পর্শ থাকে না । আগে বুঝতে পারি নি , দিনের বেলা সারা জীবন ব্যস্ততা আর কাজ দিয়েছে । ব্যস্ত রেখেছে অনাচারে । অথচ বেচারা অন্ধকার , রাতের পর রাত যন্ত্রণা দিয়েছে । যত কাব্য কি দিনের অধিকারে ? আর যৌনতার অধিকারে রাত্রি । আসলে বিশ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি অন্ধকার । শব্দহীন , ঝি ঝি এক গভীর মগ্নতার মধ্য দিয়ে মরে যাওয়া মহাবিশ্ব কি নিপুণ হাতে বেহালা বাজিয়ে যাচ্ছে ।
উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের ওপরে হাত রাখলাম । অন্ধকারে কিছু ঠাহর করতে পারছিলাম না । কেন তুমি আমাকে আবার আলো জ্বালতে বলছ ? তুমি তো জানো আমি আজ আলো জ্বালবো না । ডেস্কটপের পাশে তোমার ছবির এ্যালবামটি রাখা আছে । হাত বাড়িয়ে তোমার ছবির স্পর্শ পাচ্ছি না । এ্যালবামের ছবির চতুর্থ পাতায় তোমার ছবি । ছবিটি যেন আমার মুখস্ত । কতবার যে জীবনে আমার বৈকালিক নিঃসঙ্গতায় তোমার এই ছবি আমার আশ্রয় ছিল । তুমি তা জানো নি । জানবে কি করে ? কোথায় এক সঙ্গতায় তুমি তখন এতটাই মগ্ন ও মুগ্ধ যেন নিজের জীবনকে তুমি অন্য পরিভাষায় সংজ্ঞায়িত করছ ।
আমি তো সাধারণ রক্ত মাংসের মানুষ , নিজের অক্ষম বোধের দ্বারা শীতকালের ঘাসের ওপরে শিশির ছুঁয়ে ছিলাম , জানি না , আমি সত্যি ছিলাম না মিথ্যা , বিশ্বাস করো - পাহাড়ের ওপরে গাছের মধ্যে যে সন্ধ্যা নেমে আসার বাসা থাকে আমি জানতাম তাই । পরে জেনেছিলাম তা মিথ্যে । আসলে সব নিসর্গই যে একরকম থাকে না । তুমি সেটা ভালো মতনই জানো । কিন্তু আমি আজও দেখো কি বোকা থেকে গেলাম , এখনও । আজও আমার শরীরের গভীরে যখন ম্যালিগন্যান্সি তুষার ঝড় তুলেছে , আমি তোমার ছবির এ্যালবামের আশ্রয়ে বেঁচে আছি ।
চমকে উঠলে তুমিও । কাঁচের গ্লাস আমার আঙ্গুলের টোকায় বোধ হয় পড়ে গেল , কাঁচ ভাঙ্গার শব্দ বোধহয় এমনই তীক্ষ্ণ হয় । অন্ধকারে কোনো পতনের ছবি হয় না । কেন জানি আজ থেকে সাতান্ন বছর আগের মাতৃগর্ভের জমাট অন্ধকার চাইছি । চাইছি আবার সেই শুরু , আবার সেই সূচনা । যদিও পুনরায় সূচনা বলে কিছু হয় না , তবুও যদি সেই সূচনা আবার আবার , তবে কি ...তবে কি ... তোমার গর্ভের ভিতরে আমার বাসাবাড়ি ছিল সেই খান থেকে তুমি আমাকে বাহির করে দিলে । এই এইখানে আমার ঘরের ভিতরে , এ আমার ঘর নয় , চারদিকে ঘরের ভিতরে যা কিছু ছড়ানো , ঘরের অন্দরে বস্তুগত বিবরণ এই সব কিছুই অর্জন বা পাওয়ার মাঝে এক চূড়ান্ত বিভ্রম । আহা তোমার গর্ভ গৃহ , মহাকাশের মতন অন্তহীন । তোমার গর্ভ - মহাকাশকে কোমল করেছে । চারদিকে রক্ত স্রোতের জীবন উদ্যান । আর সে তুমি যার শরীরের গহীন স্রোতে জীবন চরাচর , সেই তুমি পাশের ঘরের মেঝে , রক্ত বমি করে ভাসিয়ে দিলে , ডাক্তার বাবু এলেন , আমরা সবাই বুঝতে পেরেছিলাম , আমাদের পরিবারে ভয়ংকর এক বিচ্ছেদ ঘটতে চলেছে । ডাক্তার বাবু পরিষ্কার জানিয়ে গেলেন , - ফুটো কলসিতে আর রক্ত ভরে কি হবে ? অপেক্ষা করুন । আমরা সবাই হেরে গেলাম । তুমি শরীরে হারিয়ে গেলে । শ্মশানে মধ্যরাতে জ্বলে যাওয়া চিতার আগুন , কাঁচা কাঠ পুড়ে যাওয়ার গন্ধ ।
তোমার দাহ কাজের পরে , আমরা শ্মশান যাত্রীরা ফির আসছিলাম বাড়ির পথে । ভোর হয়ে আসছিল । পিছন থেকে কে যেন বলল ,-পা চালিয়ে । বাড়িতে ফিরতে হবে তো । আমরা সবাই সরকারি প্রসুতি সদনের পাশ দিয়ে হেঁটে পার হয়ে যাচ্ছিলাম শ্মশানের ফেলে যাওয়া পথ । ওই সদনের ভিতরে সারাদিন সাররাত নিরন্তর জন্মের উৎসব । সব শিশুই নিজের ঘর ছেড়ে দিয়ে ......আমি হতবাক ! তাই তো , আমার আপন ঘর যেখানে আমার প্রথম জীবনের ধুকপুক তা আজ শ্মশানের চিতায় পুড়ে ছাই হয়ে গেল । আজ আমি প্রকৃতই দিশাহীন , নিসর্গহীন রিফিউজি । গৃহহীন দিশাহীন এক আমার আমি ।
সন্ধ্যার পরে রাত একটু একটু করে যখন আমার তক্তপোষের ওপরে এসে বসত , ঘরের চারদিকে ফোড়ন ,আর মশলার গন্ধ । তোমার জন্য রান্নাঘর একই আছে । এখনও তোমার রান্নার আয়োজনের ঠোকাঠুকির শব্দগুলি একই আছে । আর কারও কোনো শব্দের স্পর্শ আমি নিতে দিই নি । তাই রান্নাঘরটি একটি বাস্তু উপকরণের আদিম সংগ্রহশালার মতন । বেশ কয়েকবছর হয়ে গেল , রান্নাঘর একইভাবে , স্বাদহীন , উপকরণ বঞ্চিত , আগুন জল তেল ফোড়নের বাইরে । রাত গভীর হলে , আজকে যেমন আদিম পোকা পায়চারি করছে দেওয়ালে । আমার মা বলতেন আমার জন্ম হয়েছিল রাত্রি দেড়টার সময় ।
আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল একটি মোম জ্বালতে । হ্যাঁ , আর সাথে কে থাকবে ? একাই মোম জ্বালি , সঙ্গে কে থাকবে আমার – আত্মহননের দিনটিকে উদযাপন করি । রান্নাঘর থেকে নিয়ে বাকি ঘরগুলিতে , কি বিস্তর ব্যস্ততা ছিল , অফিস টাইম চা জল সাবান ফিনাইল , শব্দ হত রেডিও সংবাদের , সন্ধ্যার টেলিভিশন যুক্তিহীন তর্ক , রাষ্ট্রক্ষমতার হুমকি , শাসন , আলনায় তোমার নতুন বিয়ের কাপড় , ঝুড়ি ভর্তি সবজি রান্নাঘরে । তেলাপোকায় চেটে দেওয়া আলুর টুকরো । শতরঞ্চি । লোহার তোরঙ্গ । তোরঙ্গের ভিতরে মায়ের ওপার বাংলায় যাওয়ার পাসপোর্ট । বাবার ছিল না । কারণ তিনি সামরিক বাহিনিতে কাজ করতেন বলে , অনুমতি ছিল না । ক্লাসে ফেল করা আমার রেজাল্ট বইয়ের তাকের নিচে লুকানো । সেই কত বছর আগের মনে পড়ছে না । সম্ভবত কারও হাত হয় তো সেইখানে আজও পৌঁছয়নি । আজ রাত্রি ক্রমশ আমার বেহাত হয়ে যাচ্ছে । আমার সঙ্গে এক সংঘাতময় রাত্রি । যেন আত্মহননের জন্য বসে আছি তক্তপোষের ওপরে । শরীর ক্রমশ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাচ্ছে ।
রাত ক্রমশ মধ্য অবস্থান অতিক্রম করে নিশাচর বকের মতন কৃষ্ণপক্ষের রাতে ডানা মেলেছে । টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছে । কদম গাছের পাতায় কেমন জল বিন্দুর শব্দ , অন্ধকারের মেঘ যেন জলাশয়ের ওপরে নেমে এসেছে । নিঃসঙ্গ জলে ভেজা পাখি গাছের ডাল থেকে একাকী আর্তনাদ করে যাচ্ছে । কীসের যেন একটি শব্দ হল । বাবার সেই সামরিক বাহিনীর বুটের থ্যাবড়ানো শব্দের মতন । আমি উঠে দেখলাম , একটি ছায়ার মতন সরে গেল পাশের দরজার পাল্লা ছুঁয়ে ।
মনে পড়ছে , বাবা যদি একবার ডাকাডাকি শুরু করতেন , কিছুতেই থামতে চাইতেন না । দেখলাম একটি ছন্দহীন শব্দ , ক্রমশ এলোমেলো করে দিচ্ছে আমার স্মৃতিকে , ঠিক এমনই শব্দ হয়েছিল , দরজার পাল্লা জুড়ে যেদিন বাবার শব নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম , শ্মশানের দিকে । বাড়ি থেকে বেড়িয়ে বাবার শবযাত্রার পাশে , সব শব্দগুলি আজও যেন আমার মনে পড়ছে । শব্দস্মৃতি এত প্রখর হয় জানতাম না । রাস্তার নানান শব্দ , মানুষের ব্যস্ততার শব্দ ও নানান কত কিছু । আজ এই রাতে জীবনের শুধু একটি রাতে বুঝতে পারছি কী ভীষ নিঃসঙ্গতার মধ্যেও শব্দের কি প্রখর ভুমিকা থাকে ।
# # #
আর কিছুক্ষণ , মাত্র আর কয়েক ঘণ্টা ।
এরপরে সব কিছুই হয় তো ... কেমন পড়ে থাকবে , অনেকটা জল ছড়ানো কাঁচের গ্লাসের মতন । কাত হয়ে । জীবন এমনই ক্ষয়ে যেতে যেতে শরীর একসময় বস্তু হয়ে যায় । নিজের সঞ্চিত আঁকার সরঞ্জামগুলি , কেমন বিশৃঙ্খল , বহুদিন আগে থেকেই এক এক করে কুড়িয়ে নিয়ে গেছে প্রতিবেশীরা । আর কিছু জল রঙের ছবি বৃষ্টিতে ভিজে গলে গেছে । ঘরদুয়ার , দরজার চৌকাঠে যেন আর সেই আবেগ পড়ে নেই , দেওয়ালে উইপোকার মাটির পথ , বইয়ের তাকে , সংগৃহীত গ্রন্থ উইপোকার দংশনে মাটি হয়ে আসছে ।
দীর্ঘ বছর ধরে সঞ্চিত গ্রন্থগুলির কোনো কোনো গ্রন্থকে মনে হচ্ছিল এক একটি পর্বত । চতুরঙ্গ , ম্যাজিক মাউনটেন , রেজারেক্সন , দি হাউস অফ দি ডেড , দি ইডিয়ট , দিবা রাত্রির কাব্য ও অ্যান্ড কোয়ায়েট ফ্লোজ দি ডন – আবার এই সময়ে আমার ভিতরে নির্মাণ করছিল চূড়ান্ত বিভ্রম ।
আমার অহেতুক সাহিত্য পাঠ , গ্রন্থ সঞ্চয় , তোষকের নিচে রেখে দেওয়া টাকা ভর্তি খাম , বহু বছর আগে ঘরের দেয়ালে আঁকা কিছু বিন্যাস এমনকি ঠাকুর ঘরে পিঁপড়ে মাটি তুলে রখেছে মেঝে ভর্তি – ঠিক এই সব কিছুর মতনই নিজের শরীরকে আলাদা করতে চাইছিলাম নিজের থেকে । বুঝতে পারছিলাম আমার শরীর নামক বস্তু দিয়ে আর যাই হোক ...হ্যাঁ ক্রমশ নুয় পড়ছি তক্তপোষের ওপরে বসে থেকে থেকে , খুব চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিল – কেউ আমাকে একটি ক্রাচ দিতে পারেন ... ক্রাচ ...একটি নিষ্প্রাণ নির্ভরতা যা মানুষের থেকে অনেক অনেক বেশি বিশ্বাসি । মানুষের রাস্তা বদল হয় , রাস্তার দুই পাশে বদলে যায় নিসর্গ বিবরণ , অনুভূতি ও অনুভবের পোশাক বদলে যায় ... ক্রমশ একজন অপরকে ময়লা করে দিয়ে যায় । ঠিক যেমন মন্দিরে যাওয়ার আগে পুরোহিত গত রাতের কাম তৃপ্ত লিঙ্গকে পরিষ্কার করে বসে মন্ত্রোচ্চারণ করে ভক্তদের বলে , - কাম ক্রোধ পরিত্যাগ করে ঈশ্বরের শরণাপন্ন হও ।
এসো । বসো । কিছু বলবে ?
না কিছু বলব না ।
হ্যাঁ । কিছু বোলো না শব্দে আর । কথায় না আর । মৌন থেকে নীরবে অনেক কথাই তো বললে , এই গভীর রাতে মাঠের ঘাসের মাঠে এনে দিয়েছে অবিশ্বাসী ঘ্রাণ । তোমার ঘরে ফিরে যাওয়ার অনন্য ইচ্ছা আমাকে মৃত্যুর আগে পরম প্রিয় শান্তি দিল । এসো যদি আমার হাত ধরায় কোনো সংকোচ না থাকে , একবার ফিরে তাকাও , দেখ হাসপাতালের বহির্বিভাগের দেওয়ালে লেখাতই দেখ ......
ক্যানসার ওয়ার্ড .........
আজকের রাতকে আমি কি করে বলি , একটু থাকো । কিন্তু না । ঠিক তোমার মতনই আকজকের এই রাত বেহাত হয়ে গেল ।