দুটি কবিতা

সুব্রত সরকার

আমার পূর্বজন্ম ভ্রমণ

যদি আবার জন্ম নিই,যেন বাংলা কবিতা লিখি। লজ্জা বলতে দেহে থাকবে শুধু প্রাণ। শরীরের পোকার ভয়ে মেনে নিয়েছে নিঃসঙ্গ আহার।
পূর্বজন্মের পথ খুবই বিপজ্জনক। একবার পা পিছলে গেলে আমার আর্ত চিৎকার ফাঁসির দড়ির মতো এই জনমানবহীন প্রান্তরে কিছুক্ষণ লাট খাবে,তারপর অদৃশ্য হয়ে যাবে।
বিকালের আলো যেন গাছের আত্মা। ভূপর্যটনে বেরিয়েছিল। দিন শেষ হবার আগে লম্বা পা ফেলে ফিরছে। আসলে যতটুকু কুয়াশা ঠিক ততদূর অবধি পৃথিবী। তারপর শূন্য,তমস,ভুর্বলোক। জল-বাতাসা খেয়ে কুয়াশা হয়েছে। পৃথিবী হলো পাপের ভাণ্ড। জন্ম মানে দণ্ডভোগ।
মনে হয় পরকাল কুশ,মৃত্তিকা কিছু চাই না। শুধু এক সম্পর্কের সুতো ধরে ঝুলতে ঝুলতে চলে যাই নরলোকে। অভিজ্ঞতা থেকে নদী বেরিয়ে ভবিষ্যতের দিকে মিলিত হতে চলে যায়। লোকে বলে,এ হচ্ছে পুরাণের করুণাধারা। এর জল অমৃত। কিংবদন্তী,দৈত্যেরা সর্বদা পরাজিত হবে।
আমি যেন অজগর জংগল। ভিতরে কি আছে – জানি না। এখানে পুস্প ফোটে,কিন্তু গোপন রাখা হয়। পূর্বাপর সমস্ত গ্রন্থে বারণ করা আছে। নিষেধ না মেনে বিভূতি প্রকাশিত হলে দোষ লাগবে। পূর্বধারণা,এই হচ্ছে যৌবন। খালি চোখে কিছু দেখা যায় না। কিন্তু পৃথিবী থেকে আড়াইশো মাইল অবধি এর স্তর। বাতাসে বংশবৃদ্ধি,বাতাসেই ক্ষয়।



দেবতাদের ভাই

দেবতাদের ভাই মর্নিং-স্কুলে যেতো,দেবতাদের ভাইয়ের হেলানো মেঘের
পাশে তৃণময় প্রান্তরে স্কুল,অল্প হাওয়ায় ভাসছে –
জন্ম,পূর্বজন্ম,আরও পূর্বে
পূর্ব-দক্ষিণ এশিয়ায়।

বাংলাভাষা সবুজ,বাংলাভাষায় প্রজাপতি ওড়ে,বাংলা কবিতায় অজস্র রঙিন,নতুন ফুল,সে
দুপুরে,একা কবরখানার নির্জনতায় লাল ফড়িং, নীল
ফড়িং-দের সঙ্গে বাংলায় কথা বলতো,তরুণ
শঙ্গখচূড়ের ফণায় আঁকা দুটি
খণ্ড-ত
বিষণ্ণ বাংলা অক্ষর,তার দুচোখ জলে ঝাপসা হয়ে আসে।
আর এয়ারপোর্টে ঢোকার রাস্তাগুলি ছিলো খুবই পরিচ্ছন্ন ও সোজা,কিন্তু
গভীর বেদনাতে ভরা,একটা দীর্ঘশ্বাস,দুপাশের
মহা-মহা বৃক্ষদের মাথায় অন্ধকার নেমে এলে পাখির কাকলিতে
মুখরিত হয়ে উঠতো জীবন,যেন ওরা আসলে বাংলাতেই
কথা বলতো,খুব পবিত্র ও বন্ধনহীন মনে
হতো নিজেকে, শুধু কোথায়
একটা বিষাদ ধীরে ধীরে ভেসে চলেছে,দূরে।

তারপর সেই ভয়ানক সত্তর দশকের শুরু হবে,ক্রমে
দেবতাদের ভাই এখন ইংরেজী বলে,হিন্দি
বলে,আর বঙ্গোপসাগরের ঢেউ এসে তাকে ধাক্কা দেয়,সে
টলে পড়ে যেতে যেতে আঁকড়ে
ধরতে চায় প্রাইমারী স্কুলের শূন্যতা,তৃণ ও অসীম,কারণ
প্রৌঢ-বয়সে বাংলার দিদিমণিকে এখন আর
তেমন সুন্দর মনে হয় না,তবু
বাড়ি ফেরার সময় চাঁদ,তার পিঠে হাত রাখলে
সে দেখতে পায় এক পরিচ্ছন্নতা ও বিষাদ
কীভাবে নেমে আসছে বাংলা
কবিতায়।