সংবেদন ও সময়

পার্থ কর

"সময়" আমাদের দেওয়া নাম। সে তার মত খালি এগিয়ে যায়, ধরা যায় না... ধরে রাখার তো প্রশ্নই নেই। না চাইলেও সে তার দাগ রেখে যাবে আমাদের ঋণপত্রের গায়ে হলদে ছোপের মতো। জড়ের থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে সেই সময়েরই পাকে পড়ে যে সংবেদন লাভ করেছে জীব— তার চাহিদা সেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই জটিলতা বাড়িয়ে চলেছে। আর আমাদের মানুষের ক্ষেত্রে তা অপরিমেয়, অনিশ্চিত, এবং কুয়াশাচ্ছন্ন। আমাদের অবচেতনের জটিলতা ও বহুমুখিতা একই পরিস্থিতিতে দুটি মানুষের প্রতিক্রিয়ার ধরন পাল্টে দিচ্ছে।

অন্যান্য জীবের চেয়ে আমাদের এই যে মননশীলতা,— এর বহিঃপ্রকাশও অন্য সমস্ত জীবের চেয়ে আলাদা। একমাত্র মানুষই তার জৈবিক প্রবৃত্তি পরিতৃপ্ত ক'রে বা না করেই তার মননে লালিত বাড়তি সংবেদন সে, পরিভাষায়,— 'শিল্প'-এর মাধ্যমে প্রকাশ করতে চায় ও করে। আর স্বভাব প্রকাশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত অস্ত্র সেই ভাষা। ভাষাকে সে আ-কারে ও-কারে দিয়ে লিখে ফেলতেও শিখেছে।

পাতার ঘরে সাপ ঢুকলে মা পাখি তার ভাষায় চিৎকার করতে থাকে, আর উড়ে আসে প্রতিবেশী দলবল... সময়ের হাতে পরিণতিকে ছেড়ে না দিয়ে যেমন চেষ্টা চলে পরিত্রাণের, মানুষেরও তা ভিন্ন কিছু নয়। কেবল তফাৎ এই যে, সে 'সাড়া' আরও ব্যাপকতর। সময়ের অভিঘাত কেড়ে নেয় অন্ত্যমিল, দাড়ি, কমা, ড্যাশ— কিন্তু শব্দশেষের তিনটি ডট সংখ্যা বাড়াতে বাড়াতে পৌঁছে যায় প্রান্তরের জনপদে, সূর্য ডোবার আগেই।

ঝড় উঠলে যেখান থেকে চিৎকার করলেও শোনা যাবে না, সেখান থেকে উড়ে আসে কথা—
"হে উতলা শোনো, কথা শোনো,
দুয়ার কি খোলা আছে কোনো?
এ বাঁকা পথের শেষে, মাঠ যেখানে মেঘে মেশে,
বসে কেহ আছে কি এখনো?"

সময়কে মেনে নেওয়া শিখতে শিখতে গুহামানবেরা শিখেছিল সময়ের আর পাঁচটা বায়নাক্কা মেনে না নিতে। পাথর ঘষে একটা পাস এমন চকচকে করে নিল যাতে সময়ের বরাভয়ে পুরু হয়ে আসা শ্বাপদের রোমশ চামড়াতেও রক্তক্ষরণ হয়।
জান্তব হুঙ্কার বুঝিয়ে দিল রক্তপাতহীন বিজয়ীর শৌর্য— কাছে এসো না, দূরে থাকো, অথবা পালিয়ে যাও।

সেসব হুঙ্কারের ভাষান্তর হয়েছে, সেসব শস্ত্রের অনুবাদ করা হয়েছে। আমরা আলোকবিলাসী, অন্ধকার-প্রেম কৌশলমাত্র,— ঋণাত্মকতাও।

নিচু বলেই গর্তে ভরে ওঠে জলে। আলোর চলাচলের পথেই আমাদের তাই যাতায়াত। প্রয়োজনীয় অন্ধকার কাটিয়ে উঠে আবার ঝুঁকে পড়ি আলোর দিকে। এর ব্যত্যয় হলেই নড়েচড়ে উঠি— যে যার মতো ক'রে। জলে ওঠে ঢেউ, মাটিতে ফাটল দেখা যায়।

এ দুর্বিপাক তো কেবল দেহের নয়, আরো গভীরের। সেখান থেকে তখন আসে সাড়া, তুলে নিই শস্ত্র, অনুবাদ করি চিৎকারের,
ভাষান্তর করি হুঙ্কারের।

বোধের এই স্বাভাবিক প্রতিবর্ত পেরিয়ে চেতনার সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত কিছু মানুষ তখনও আপাতস্থির— কিন্তু তাঁদের স্থিতপ্রজ্ঞ তন্ত্রীসকলে জেগে ওঠে রণন। তাঁদের গভীর চেতনার জলে দুঃসময়ের পাথর পড়লে উঠে আসে গম্ভীর দিঘীর ভরন্ত ছলাৎকার।

তখন আখরে আখরে লেখা হয় সময়ের দাবি— এসো অনিকেত আলো, অথবা দূর হটো, পালিয়ে যাও হে অন্ধকার। এই দেখো, শব্দে জ্বলছে শিখা— প্রান্তরে প্রান্তরে অপ্রয়োজনীয় আঁধারের গায়ে গায়ে দেখো আলোককণা... এরা এক জায়গায় হলে দিনের মতো আলো হবে আবার।

সাদায়-কালোয় ডোরা শব্দ নিঃশব্দ দৃঢ়তায় সু- ও দুঃসময়ের রথের সওয়ার হয়।
অবশেষে শেষ বিচারে ঈশ্বর রায় দেন, "যেহেতু এ যুদ্ধে কোথাও কোনো রক্তপাতের কথা উল্লেখ নেই, তাই সমস্ত কলমকারদের নিঃশর্ত দীর্ঘায়ুর নিদান দেওয়া যাচ্ছে।"