কবিতায় সময়ের স্বর

ফরিদ ছিফাতুল্লাহ

মারজুক রাসেলের অলটারনেটিভ কবিতা নিয়ে খুব আলোচনা সমালোচনা চলছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে একটি কবিতা ছবি আকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখতে পাচ্ছি। কবিতাটি এরকম-
"তোমার দেখা পাচ্ছি না; তোমাদের দেড়-তলা বাড়িটাকে দেখতেছি। বাদামি পর্দা-ওড়া-হালকা-খোলা জানালা দিয়ে যত ভিতর দেখা যায়, ছাদে শুকাতে দেয়া কাপড়চোপড়, 'ফিরোজা+পিংক'- কম্বিনেশন ড্রেসে তোমাকে একদিন মার্কেটে দেখছিলাম; ওই ড্রেসটা কি ভিজাই থাকে, শুকাইতে দাও না, ছায়াতে শুকাও? গোপনে শুকাও?
তোমার এলাকার হোটেলগুলায় নাশতা; দুপুর, রাতের খাবার, টং-দোকানের চিনি-ছাড়া-কাঁচাপাতি-দু ধ-বেশি চা; চানাচুর,আপঝাপ, মিনারেল পানি, চুইংগাম, ক্র্যাকজ্যাক, খাচ্ছি প্রশংসা করছি। তোমারে খাইতে পারতেছি না।
তোমার এলাকার রোদ, বৃষ্টি, ধুলাবালি, প্যাঁক, ময়লা-টয়লা লাগায় বেড়াচ্ছি; তোমারে লাগানো হয়েই উঠতেছে না, হবে....
তোমার এলাকা ছাইড়া যাচ্ছি;
তোমারে ছাড়ার ফিলিংস হচ্ছে, হোক-
আমি অনেক - কিছুই - ছাইড়া - আসা - লোক।"
অনেকে সংশয় প্রকাশ করে বলছেন- এটিকে যথার্থ কবিতা বলা যায় কি না। অনেকে বলছেন-এটি অশ্লীল কবিতা। এস্টাবলিশমেন্টের অনুগত প্রোটোটাইপ কবিতা-লেখক বা পাঠকদের পক্ষেই কেবল এই কবিতার এরকম সমালোচনা সম্ভব। সময়ের ভাষ্য ধারণ করা এই কবিতাটি কবিতা হয়ে ওঠার সকল বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট। ছন্দ,আঙ্গিক, শিল্প সৌকর্য, ইঙ্গিতময়তা সকল দিক থেকেই এটি একটি চমৎকার কবিতা। তবু কেন এটিকে কবিতা বলে স্বীকার না করার প্রবণতা? কারণ - এস্টাবলিশমেন্টের বিরোধীতা করতে না পারা। আউট অব দ্য বক্স চিন্তা করতে পারার অক্ষমতা। নতুন-পুরাতনের চিরকালের দ্বন্দ্ব। সময়ের সাথে নিজেকে গতিশীল রাখতে না পারা। তাই সহজেই এই কবিতার সমালোচনাকে প্রগতি-বিরোধীতা বলে অভিহিত করা যেতে পারে।
ভাষা ও সাহিত্যের ক্রমবিকাশের ইতিহাস আমাদের কী বলে? আমাদের প্রাচীনতম চর্যাপদের কাব্যকলা কি ভাব-ভাষা, উপমা-উৎপ্রেক্ষা, বিষয়-আশয়ে মধ্যযুগীয় কাব্যকলা থেকে ভিন্ন নয়? আবার মধ্যযুগীয় শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বা পদাবলী থেকে আধুনিক যুগের কাব্যকলা কি সকল বৈশিষ্ট্যে ভিন্নভাবে বিশিষ্ট নয়? ভাষা ও সাহিত্য তো নদীর স্রোতের মত কাল প্রবাহের সাথে গতিশীল। সময় তার পদচিহ্ন রেখে যায় ভাষায়, সাহিত্যে। জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, রাজনীতি, দর্শন আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে চলেছে। পাল্টে দিচ্ছে আমাদের জীবনযাপন। আমাদের ঘুমোবার ধরণ, ঘুমোবার উপকরণ, খানা-খাদ্য, হাঁটা-চলা, প্রেম, যৌনতা সব কিছুতেই আসছে পরিবর্তন। আসছে নতুন চিন্তা। আজকের সময়ের কবিতায় এই পরিবর্তন বা নতুন চিন্তা, নতুন বস্তু নিচয়, প্রপস,, নতুন নতুন প্রকাশভঙ্গীর আগমন কি আমরা ঠেকিয়ে রাখতে পারব? নাকি ঠেকাবার চেষ্টা করা উচিত?
প্রসঙ্গক্রমে আরেকটি কবিতার কথা উল্লেখ করছি-
'টিভি না হলে
দেখতে পেতাম না
কভার ড্রাইভের পর
বিরাট কোহলির ব্যাট কেমন দুলে ওঠে"
- তপেশ দাশগুপ্তঃ স্লো মোশন রিপ্লে।
এই কবিতাটিও আমাদের সময়কে ধারণ করেছে। কিন্তু এটি নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য হবে না বলে ধরে নেয়া যায়। কেন? কারণ এটি তথাকথিত 'অশ্লীল' নয়। এখানেই আমাদের অনেকের চিন্তার অনগ্রসরতা। আমাদের কেউ কেউ ভাবতেই পারেন না - জগতে অশ্লীলতা বলে কিছু নেই। আর যদি অশ্লীল বলে কিছু থেকেও থাকে তা হলো- মানুষের জন্য যা কিছু অকল্যাণকর , জুলুম, নিপীড়ন, অসহিষ্ণুতা ইত্যাদি। যৌনতা কিছুতেই অশ্লীলতা হতে পারে না। যৌনতাকে যদি অশ্লীলতা মনে করি তাহলে ভাত খাওয়াকেও অশ্লীলতা বলতে হবে। ফ্রয়েড মনে করতেন যৌনতাই মানুষের জীবনের চালিকাশক্তি। সুতরাং একে লুকিয়ে কোন ফায়দা নেই। বরং এর বহুমাত্রিক প্রকাশ প্রয়োজন। প্রয়োজন এর সকলমত্রিক বহুল চর্চার। কিছুতে আলো ফেললেই তার সবটা দেখা যায়। ময়লাটাও, সৌন্দর্যটাও। আজকের জগতের সিংহভাগ অনাচারের পেছনে আছে যৌন অবদমন। যৌন অবদমন নানাভাবে ব্যক্তির ব্যক্তিত্বে ফুটে ওঠে যা তার অযৌন কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলে। ব্যক্তির উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করে। সমাজের সাথে তার মিথস্ক্রিয়ার উপর অভিঘাত সৃষ্টি করে।
মারজুক রাসেলের কবিতার "তোমারে লাগানো হয়েই উঠতেছে না" লাইনটায় কি আপত্তি আপনার?
সেক্স করা অর্থে 'চুদা' বা 'লাগানো' কি আমরা কথ্য ভাষায় ব্যবহার করি না? আর যদি আপনি 'সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স' বুঝাতে কোন বাংলা শব্দ ব্যবহার করতে চান তাহলে কোন শব্দটি বেছে নেবেন? 'যৌন মিলন' নাকি 'রতিক্রিয়া'? গুরুগম্ভীর কোন প্রবন্ধ যা কোন পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হবে সেখানে হয়তো আপনি 'যৌন মিলন' বা 'রতিক্রিয়া' ব্যবহার করবেন। কিন্তু আমাদের প্রতিদিনের জীবনে কথ্য ভাষায় এই শব্দগুলি কি ব্যবহার করি? করি না। তাহলে সাহিত্যে এই কথ্যশব্দ কেন ব্যবহৃত হবে না? সাহিত্য তো সময়ের ভাষ্য। সমকালে ব্যবহৃত শব্দ এড়িয়ে আপনি সময়কে ধারণ করতে পারবেন কীভাবে? ভাষার দেহ শব্দ দিয়ে গড়া। আর শব্দগুলিই সময়কে ধারণ করে। আর যদি আপনি কবিতায় কথ্য ভাষার আটপৌরে শব্দ ব্যবহারের বিরোধিতা করেন তাহলে আপনি চলে গেলেন প্রাচীন সেই যুগে যে যুগে মানুষের মুখের ভাষা আর বইয়ের ভাষা ছিলো পৃথক। শুধু তাই নয়-- বড় কবিদের অসংখ্য ভালো কবিতাকেই আপনাকে ফেলে দিতে হবে যা আপনি ফেললেও পৃথিবী ফেলবে না।
ভাষার শুদ্ধাশুদ্ধ রক্ষা করার চেষ্টাও একটি অপ্রগতিশীল ব্যাপার। কেননা ভাষার শুদ্ধাশুদ্ধ ইতিহাসে কেউ ধরে রাখতে পারেনি। আমরাও পারব না। ভাষা প্রবহমান নদীর মতো। নানা স্রোত এতে মেশে। বিভিন্ন সময়ের নুড়িপাথর, বালুকণা, রঙ, রূপ এই ভাষা-নদী বুকে করে প্রবাহিত হয়ে আসছে যুগযুগ ধরে। তাই জিওফ্রে চসারের সময়ের ইংরেজি আর আজকের ইংরেজি, চর্যাপদের বাংলা আর আজকের বাংলার মধ্যে আকাশ পাতাল তফাত। কলকাতার রাস্তায় ভ্রাম্যমাণ রেস্তোরাঁর বিক্রয়কর্মীও ক্রেতাদের বলছে- 'এখানে ভেজ/ নন ভেজ পাওয়া যায়'। বাংলা ভাষায় কি 'ভেজ' শব্দটির প্রবেশ রুদ্ধ করা গেল?
তবে কথা হলো ইংরেজি, হিন্দি থেকে যে পরিমাণ শব্দ বাংলায় প্রবেশ করছে সেই পরিমাণ শব্দ কি বাংলা থেকে হিন্দিতে বা ইংরেজিতে প্রবেশ করছে? সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও অনুমান করা যায় যে বাংলা থেকে সেই পরিমাণ শব্দ ঐ ভাষা দুটিতে যাচ্ছে না। এর কারণ- মার্ক্স বলে গেছেন। অর্থনীতি মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরাশক্তিগুলির উপর দুর্বল রাষ্ট্র ও সমাজগুলির যে নির্ভরতা, যে মুখাপেক্ষীতা, যে নতজানুতা সেটাই এই পথ সৃষ্টি করে দেয় যার ফলে উজানে থাকা ভাষার শব্দগুলি ভাটির ভাষায় প্রবেশ করতে থাকে অবাধে। ভাষা-নদীর এই স্রোতকে উল্টো দিকে প্রবাহিত করতে হলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে ক্ষমতাশালী হওয়া দরকার। দরকার উজানে বসবাস। তা না করে শুধু পৈতেওয়ালা ব্রাহ্মণ বা টুপিওয়ালা মৌলভীর মতো জাত গেল জাত গেল বলে চেঁচিয়ে কোন লাভ নেই।
আমি অবশ্য সকল প্রকার আধিপত্যবাদের বিরোধী। পরাশক্তি বা দুর্বল শক্তি ইত্যাদি বৈষম্যের বিরোধী। এমনকি ভৌগলিক বা ভাষাগত জাতীয়তাবাদেরও বিরোধী। আমি বিশ্বাস করি পৃথিবীর সকল ভাষাই আমার ভাষা, পৃথিবীর সকল ধর্মই আমার ধর্ম, পৃথিবীর সকল মানুষই আমার ভাই। দেশ-কাল-ধর্ম-ভাষার সীমারেখাগুলো অস্বীকার করতে পারলে যে সাম্য প্রতিষ্ঠা পায় তাই আমার কাম্য। এই একীভূত পৃথিবীতে তাই 'অনুপ্রবেশ' 'আধিপত্য' বলে কিছু থাকবে না। একটা বাড়িতে যেমন অনেকগুলো ঘর থাকে, একটা বাবা-মায়ের, একটা ভাইয়ের, একটা বোনের, একটা চাচার, একটা দাদুর। বাড়ির বাসিন্দাদের সবারই সব ঘরে প্রবেশাধিকার থাকে। এই আন্তর্জাতিকতাই আমার ধর্ম। এই সমকালীনতাই আমার কর্ম।