ভুল সে তো শুরুতেই

সৌমিত্র চক্রবর্তী

দাউদাউ করে জ্বলছে কাঠের দরজা , জানলা , পাতি আসবাব , কাগজপত্র , কংক্রিটের দেওয়াল । হু হু করে চারপাশ থেকে হাওয়ার দল দৌড়ে আসছে বাইসন স্পীডে । উস্কে বাড়িয়ে দিচ্ছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে আগুনের শিখাগুলো । দেওয়ালের ফাঁকফোকর মোটা গরাদে ঢাকা । ছোট ছোট জালঘেরা খাঁচায় অপ্রাপ্তমন আদমসন্তানেরা জন্তুর মত ছটপট করছে একটু হাওয়ার জন্যে, বাঁচার জন্যে। দেখাশোনা করার কেউই তখন মজুত নেই । মাইনেকরা কর্মচারীর দল বেতনলব্ধ সময় থেকে সময় বার করে নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত । সবখেকোর খিদে যখন মিটলো , ধ্বংসস্তুপের মধ্যে পোড়া কাঠকয়লা ছাপ্পান্নটা লাশ । বিগত মানুষ ।

এ কোনো বানানো গল্প নয় । কবিকল্পনা বা হরর মুভির গা ছমছম ওকে - কাট করা সিন নয় । আমাদের এই হতভাগ্য দেশে বেঙ্গালুরুতে ঘটে যাওয়া এক অপ্রকৃতিস্থ মানুষদের হোমের ঘটনা । জন্তুর মত রাখা হত সেখানে সেই মৃতভাগ্যদের । খাঁচার ভেতর রেখে দেওয়ার অজুহাত সেই একই , ওরা ভারসাম্যহীন । খাঁচা থেকে বেরোনোর আপ্রাণ চেষ্টায় জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়াদের লাশ হয়ে যাবার খবরেও খুব একটা হেলদোল হয়নি সমাজের মাথার মণিদের । ওরা তো ছিল সমাজের বোঝা ।

অথচ , আমরা কি একবারও ভাবি যে এদেরও প্রাত্যহিক চাহিদা থাকে আমাদের মতই ! এরাও ভাবে , এরাও কাজ করে নিজেদের বৃত্তের ভাবনা অনুযায়ী । আর আমাদের মতই হাত পা চোখ মুখ নিয়ে এরাও মানুষ হয়েই জন্ম নিয়েছে । আমাদের ভাবনার যে মস্ত বাওবাব শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে আমাদের মননে বিস্তার করেছে , মনের ভারসাম্যতা নষ্ট হলেই সে আর মানুষের পর্যায়ে পড়বে না , সেটাই এক বিশাল ভুলের মাটির ওপরে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের অজান্তেই । ওই অসহায় মানুষদের সঙ্গে যাখুশি করার অধিকার আমাদের প্রত্যেকের যেন জন্মগত ।

অপ্রকৃতিস্থ মানুষ রাস্তায় বেরোলে তাকে দেখে হাসব , ঢিল ছুঁড়ব , পিটিয়ে মারব । ছোট থেকেই আমাদের শেখানো হয় , “ ওর কাছে যাসনা । ও , কামড়ে দেবে ”। তারমানে মনের স্বাভাবিক তরঙ্গ হারানো মানুষগুলোর স্বভাবই নাকি হিংস্র । তারা আর যাই হোক মানুষ নয় । আমাদের ভদ্রজনোচিত ব্যবহার তাদের সঙ্গে করার জন্য নয় । ওদের আর পাঁচটা স্বাভাবিকের থেকে আলাদা করে রাখতে হয় । সময়ে সময়ে হাতে পায়ে বেড়ি দিয়ে বেঁধে , গরাদের গন্ডীর মধ্যে রাখতে হয় । আর যদি সেই কেটে দেওয়া গন্ডী পেরিয়ে কেউ সুস্থ , স্বাভাবিক জীবনে আসার চেষ্টাও করে তাহলে তাকে পিটিয়ে মারতে হয় ।

কলকাতায় আশির দশকে বিজন সেতুর ওপরে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল দশজন মানুষকে। সংবাদ মাধ্যমের কাছে কর্তাদের কৈফিয়ত ছিল , ওরা ওরা মানসিক ভারসাম্যহীন । কারন তারা নাকি মৃত মানুষের মাথা খুলি নিয়ে নেচেছিল । কিন্তু কেঁচো খুড়তে বেরোল কেউটে । আসলে ওই লোকগুলো নাকি ছিল অন্য রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ । তাহলে আইনের চোখ যখন এমনিতেই বাঁধা , তখন সমাজের বাকী অংশের চোখে ধুলো দিয়ে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি রাখার জন্যেই এই পাগলপ্রলাপের অবতারণা । আর এই ভুলের ধুলো আমজনতার চোখে ছিটানো নৈমিত্তিক ব্যাপার ।

দেখা যাচ্ছে একজন , যে কিনা এই সমাজেরই অংশ , আর সে তার মতাদর্শ কিম্বা কাজ দিয়ে অন্য সব মানুষদের প্রভাবিত করে চলেছে , যাতে ক্ষতি হচ্ছে অন্য কোনো মতাদর্শের অনুসারীদের, স্পষ্ট ভাষায় বলা ভালো সব দেশ-কাল-জাতি-ধর্ম-রাজন তি নির্বিশেষে শাসকদলের , তাকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যই ঐ প্রাগৈতিহাসিক অপবাদ দিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে । এক বীভৎস অস্থিরতার সৃষ্টি হচ্ছে জনজীবনে । ইচ্ছাকৃতভাবে এই ভুলের ধোঁয়াশায় রাখার চেষ্টা অবিরাম চলে আসছে প্রাচীন যুগ থেকেই । গণশত্রু বিশেষণ দিয়ে গণপ্রহারে মেরে ফেলতে পারলে নির্দিষ্ট কেউ দোষী সাব্যস্ত হয়না ।

অথচ মজার ব্যাপার হলো , যখন একটা মানুষকে গণপ্রহারে মেরে ফেলা হচ্ছে তখন তাতে অংশ নেওয়া যূথের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বিকট হিস্টিরিয়া । সুস্থ অবস্থায় কোনো মানুষ আর একজন মানুষ কে মেরে ফেলতে পারেনা । তাহলে ঐ খুন করতে যাওয়া মানুষেরাও সেই মুহূর্তে অসুস্থ , অপ্রকৃতিস্থ । কিন্তু সেই অমোঘ সত্যিটা তারা নিজেরাও জানেনা । সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়েও তারা ভাবতেও পারেনা যে তারা নিজেরাও মানসিক অসন্তুলনের শিকার । খুনী যখন নিজেকে সুস্থ , স্বাভাবিক ভাবে , তার চাইতে বড় ভুল আর কি হতে পারে ?

গণহিস্টিরিয়া তৈরি করার রীতিমত কৃৎকৌশল আছে । প্রথম হচ্ছে , যে আসল স্বার্থকে গোপন করার জন্যে এই হিস্টিরিয়া তৈরি করতে হবে , একটা সত্যির মত দেখতে -
শুনতে - বুঝতে ভুল ধারণা গড়ে তুলে তাকে আড়াল করতে হয় আমমানুষের মধ্যে । একটা ভুলের সুযোগ খুঁজতে হয় যাকে শিকার করা হবে , তার । যদি সে কোনো ভুল নাও করে তবে তার যেকোনো একটা কাজকে ভুল , জনবিরোধী , স্বার্থান্বেষীর ভুল তকমা লাগিয়ে দিতে হবে । তারপর কোনো এক মাহেন্দ্রক্ষণে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে সদলবলে হারেরেরেরে করে । এভাবেই মারা গেছেন জিওদার্ণো ব্রুণো, জোয়ান অব আর্ক, বেঞ্জামিন
মোলায়েজ , লোরকা, হেমন্ত বসু আরও কত মহারথী।

এ তো গেল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্যে ইচ্ছাকৃত ভুল সৃষ্টি করা । দেখা যাচ্ছে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা সুবিধাভোগীরা সবচেয়ে বেশী এই হিস্টিরিয়া কে কাজে লাগিয়েছে । ধর্মের নামে আমরা দেখেছি , ইউরোপে , আমেরিকায় , এশিয়ায় , আফ্রিকায় ভুল মানসিকতায় হিস্টিরিয়া তৈরি করা হয়েছে । ডাইনি অপবাদের ভুল কালি লাগিয়ে এখনো গ্রামেগঞ্জে মেরে ফেলা হয় কত নিরাপরাধ কে। উড়িষ্যার কালাহান্ডির বোলাঙ্গিতে এক প্রত্যন্ত গ্রাম । সভ্যতার আলো খুবই কম ঢুকেছে সেখানে হয়তো দুর্গমতার জন্যে , হয়তো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সেরকম পরিমানে সিদ্ধি হবেনা ভেবে । বছরের এক নির্দিষ্ট মাসে একসঙ্গে গ্রামের সমস্ত মানুষ গণহিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত হন । যেহেতু সেই গ্রামে স্কুল নেই, নেই কোনো প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র , ডাক্তার , তাই ভাগ্যের হাতে নিজেদের ছেড়ে দিয়েছে আপামর গ্রামবাসী । ওঝাদের প্রতিপত্তি সেখানে অবিসংবাদী । বছরের ওই সময়ে ওঝারা এক মাস যাবৎ তাদের বিভিন্ন ভুতুরে কার্যকলাপ চালায় । আর কিচ্ছু না বুঝেই তাতে অংশগ্রহণ করে সবাই । তারা ঘোর ভুলের অন্ধকারে বাস করতে করতে নিজেদের সুস্থ ভাবে । কিন্তু অপ্রকৃতিস্থতায় সুদিনের আশায় মাতে ।

কিছুদিন আগেই খবরের কাগজে খুব হৈ চৈ হল কয়েকটা মানসিক রোগীদের হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে । জানা গেল এক হাসপাতালে নাকি এমনকি যুবতী রোগীদেরও পরার কাপড় দেওয়া হয়না । অথচ সরকার থেকে বরাদ্দ টাকা ঠিকই নেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, যা ভাগ বাঁটোয়ারা হয় কিছু ক্ষমতাশালীর মধ্যে । কাপড় না দেওয়ার অজুহাত , ওরা নাকি দিলেও নিজেদের গায়ে কাপড় রাখতে পারেনা । মুখে বলতে পারেনা , অভিযোগ জানাতে পারেনা বাইরের তথাকথিত সুস্থ জগতের কাছে বলে , ওদের জন্যে বরাদ্দ ওষুধপ্ত্র , খাবার , বিছানা বা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস কিছুই সঠিক পরিমানে বা পদ্ধতিতে দেওয়া হয়না । ওইসব মানসিক হাসপাতালে বা হোমগুলোতে দৈহিক লালসার শিকার হতে হয় বিভিন্ন বয়সের মেয়েদের । অথচ ভুল চেতনার অন্ধ কুঠরীতে বাস করে বোঝা ভেবে তাদের বাড়ীর লোকেরা , তাদের আত্মীয় স্বজনেরা কখনো একবারটির জন্যও খোঁজ নেয়না , সেই হতভাগ্যগুলো কেমন আছে । নিজেকে সেই জায়গায় বসিয়ে অবস্থাটা কল্পনা করলেও শিউরে উঠবে যেকোনো তথাকথিত সুস্থ মানুষ ।

এই কোলকাতাতেই এক বাবা তার মানসিক বিকলাঙ্গ ছেলেকে খুন করে নিজেও আত্মহত্যা করলো । হয়তো তার মনে হয়েছিল এ ছেলেও একদিন শিকার হয়ে যাবে তার অবর্তমানে । কিম্বা সেই বিকলাঙ্গতায় হয়তো সে নিজেই লজ্জিত ছিল। নিজের ছেলে, ভাই , বাবা, বোন যদি এরকম হয় , তাহলে আমরা তাকে বাড়ীর বাইরে বেরোতে দিইনা । হয়তো তার মানসিক অসুস্থতা ১৫ বা ২০% । তবুও যদি সে বাড়ীর বাইরে পা রাখে , তাহলে যদি প্রতিবেশীরা কিম্বা রাস্তার কেউ তাকে দেখে টিটকারি দেয় , হাসে , মারধর করে , তাহলে অপমানের তীক্ষ্ণ হুল বিঁধবে অলিভ অয়েল চর্চিত সযত্নলালিত তথাকথিত সুস্থ ভদ্র চামড়ায় । এই তথাকথিত শব্দটা বারবার ব্যবহার করছি কারন , এক বিশাল ভুলের গ্লোবে ঘুরপাক খেতে খেতে আমরা জানিই না যে প্রত্যেক মানুষই কিছু শতাংশ অপ্রকৃতিস্থ। তা না হলে, আমরা একসিডেন্ট দেখলে মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতাম না । ঝগড়ার সময় জিনিসপত্র ভেঙে রাগ দেখাতাম না । প্রতিবেশী বিপদে পড়লে মনে মনে খুশি হতাম না ।

সেই অসুস্থ রোগীকে সুস্থ সমাজ থেকে আলাদা করে রেখে ভুল চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োগ করি সম্পূর্ণ নিজের স্বার্থে কিম্বা নিছক মজায় কিম্বা প্রতিষ্ঠার ক্ষতির আশংকায় । মন ভারী বিষম বস্তু । কখন যে মস্তিষ্কের জটীল কুঠরীতে নিউরো ট্রান্সমিটার সেরাটোনিন ক্ষরণ কমতে থাকবে । স্নায়ুতন্তুর মাধ্যমের বিভিন্ন নির্দেশের তরঙ্গগুলো হারাতে থাকবে স্বাভাবিক সন্তুলন , তা কেউই জানেনা । কেনই বা হয় এটা তাও কেউ জানেনা সঠিকভাবে। তবু সৃষ্টি হয়েছে মনোবিদ্যার । বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা চলে মানসিক ভারসাম্যতা হারানো রোগীকে সুস্থতায় ফিরিয়ে আনার ।

কিন্তু বারবার আমরা ভুলে যাই সেই মানসিক অবসাদগ্রস্তও একজন পূর্ণ মানুষ । সেও দেশের একজন নাগরিক । সমাজের সব অধিকার সাংবিধানিকভাবে প্রদত্ত হয়েছে তার প্রতি। আমরা ভুলি সেই আজন্ম সযত্ন লালিত কুসংস্কারে যে , এও এক রোগ । যেমন একজন সুস্থ মানুষ হজমের গোলমালে, ক্যান্সারে, হার্টের রোগে আক্রান্ত হয়। যেমন পোলিও তে কিম্বা স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হয়ে একজন সুস্থ মানুষ বিকলাঙ্গ হয়ে যায় । ঠিক তেমনি এই মানসিক বিকলাঙ্গতাও এক রোগ । এই রোগের শিকারদের দরকার সহমর্মিতা। দরকার কিছু শুশ্রতা (Nurshing)। সেটাই ওদের জন্য সঠিক চিকিৎসা। কিন্তু তা না করে আমরা ওদের বোঝা ভাবি । অমানুষ ভাবি । জন্তু ভাবি । নিজেরাই জানিনা যে এ কত বড় ভুল আমাদের ।