ফেরা

দেবদ্যুতি রায়

এক

বর্ডারটা পার হয়ে এসে একটা বড় করে শ্বাস নেন রওশন সাহেব। যেন একটা জন্ম পরে এ মাটিতে পা রাখলেন তিনি। একটা জন্মই তো, পাক্কা ষাট বছর পরে। রওশন সাহেবের শক্ত সমর্থ শরীরটা দেখে বয়স আন্দাজ করা গেলেও সেই ঊনষাটে যখন এ মাটিতে শেষবার পা ফেলে চলে গিয়েছিলেন ওপারে, তখন তার বয়স চৌদ্দ। রওশন সাহেবের কেমন মায়া লাগে এ মাটির জন্য, একটু হয়তো নিজের জন্যও। চারপাশটা তাকিয়ে দেখেন তিনি।

দাদাজান, আসেন। এখানে এতক্ষণ দাঁড়ানো যাবে না। বিএসএফ ঝামেলা করবে।

পিঠের বড় ব্যাকপ্যাকটার সাথে দাদার বড় ট্রাভেল ব্যাগটা সামলাতে সামলাতে অণিক পেছনে ফিরে বলে।

হা হা। তুই যা না, আমি কি আর অত জোরে হাঁটতে পারি?

বলেন বটে, তবু সামনের দিকে পা বাড়ান রওশন সাহেব। কে জানে, বিএসএফ যদি সত্যি সত্যিই ঝামেলা করে কোনো। আজকালকার লোকজনকে তিনি এমনিই ভালো বুঝতে পারেন না, তার ওপর আবার কাঁধে বন্দুক থাকলে তো কথাই নেই। অণিক গিয়ে দাঁড়িয়েছে একটা চালা ঘরের সামনে। ব্যাগপত্তর নিয়ে সেখানে আরও কয়েকজন কী করছে কে জানে। তিনি ধীর পায়ে সেই চালার সামনে গিয়ে দাঁড়ান। অণিক পাসপোর্ট দুটো দিয়েছে ওদের, পিঠের ব্যাগটা নামিয়ে রেখেছে টেবিলের ওপর। রওশন সাহেবের দিকে এক নজর তাকিয়ে ওরা পাসপোর্টে চোখ ফেরায়।

বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ির এই বর্ডারটা খুলে দিয়েছে বছর তিনেক হয়। এর আগে সব সময়ই তিনি বর্ডার দূরে, বয়স হয়েছে আরও নানান অজুহাতে তিনি নিজের মনকে চোখ ঠেরেছেন। এবার আর পারলেন না। অণিক বেড়াতে যাবে, নিজে আসবেন না আসবেন না করেও পাসপোর্টটা করালেন আবার, ভিসাও করালেন। মাহবুব অবশ্য হেসেছে, বলেছে-

যাক, বাবা। এতদিনে আপনার মন সায় দিলো!

রওশন সাহেব বলেননি কিছুই। ঠিকই তো, ছেলেমেয়ে কতবার করে বলেছে একবার এপার থেকে ঘুরে যেতে, সময়কালে তিনি শোনেননি সে কথা। মিনারারও একটা সুপ্ত ইচ্ছে ছিলই শ্বশুরের ভিটেটা চোখে দেখার। মিনারার কথায় রওশন সাহেবের বুক ভারি ভারি ঠেকে। এই ইচ্ছেটা আর বছর পাঁচেক আগে করলেই মিনারার সেই সাধ অপূর্ণ থাকত না।! কিন্তু কী করবেন! এই চুয়াত্তর বয়সে এসে মনটা কেমন বাগড়া দিয়ে বসল পুরনো ভিটায় আর কোনোদিন ফিরবেন না, সেই পণে।

ইমিগ্রেশন, কাস্টমসের ঝামেলা একের পর এক মিটিয়ে তারা ঈষৎ হলদেটে সাদা দালানটার বাইরে এলেন। অণিক চটপটে ছেলে। সব কেমন একা হাতে সামলে নিচ্ছে, তার কাজ কেবল ঐ কীসব ক্যামেরা না কি তার সামনে গিয়ে চোখ সোজা করে তাকানো।

সাদা দালানটার বাইরেই একটা বসার জায়গা। লম্বা বড় চাতালমতো একটা ঘর। তাতে কয়েকটা সিমেন্টের বেঞ্চি পাতা। দাদাজানকে সেখানে বসিয়ে রেখে অণিক পাশেই কোথাও টাকা ভাঙাতে যায়। রওশন সাহেব কাঁধের ছোট ব্যাগটা থেকে একটা ছোট পানির বোতল বের করেন। অল্প অল্প করে পানি ঢালেন গলায়। মন কেমন করা অনুভূতিটা তার যাচ্ছে না কিছুতেই। সত্যিই তিনি ষাট ষাটটা বছর পরে এলেন এপারে? সেই যে বাবা-মা আর দাদা, চাচাদের হাত ধরে এ মাটির মায়া ডিঙিয়ে চলে গিয়েছিলেন, তার পর এই প্রথম? অথচ কী আশ্চর্য! ঠাকুরগার বঠিনা গ্রাম আর এই ফুলবাডির মাটি কি আলাদা? আর সেই সলসলাবাড়ি? আলিপুরদুয়ার শহরের খুব কাছে সেই গ্রামটার মাটি- সেও কি আলাদা? কিংবা আলাদা হয়ে গেছে এত বছরে? আচ্ছা, আলিপুরদুয়ার কি খুব শহর হয়ে উঠেছে আজকাল? তাদের নির্জন বনপাহাড়ি এলাকা সলসলাবাড়ি, সেও কি এখন বন্দরের মতো ব্যস্ত হয়ে উঠেছে?

পাশের বেঞ্চিতে বসা বৃদ্ধা পানের পিক ফেলে পিচিক করে, তারপর আবার মুখ বন্ধ করে চিবোয়। পুরনো সুতির মেটে রংয়ের শাড়ি পরা এই বৃদ্ধার সারা শরীর জুড়ে পানের গন্ধ, সে বুঝতে তার পাশে বসতে হয় না। রওশন সাহেব এক দৃষ্টে সেই পান চিবোতে থাকা বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে থাকেন। বৃদ্ধার মেয়ে মনে হয় পাশে বসা, তার দিকে একবার কড়া দৃষ্টি হেনে বৃদ্ধাকে বলে-

মা, কতবার করি কছু তোমাক আস্তাঘাটোত এ্যংকা করি পিক ফ্যালান না!

মেয়ের ভর্ৎসনায় বৃদ্ধা তটস্থ হয়ে ওঠেন। মুখের ভেতরে আধচিবোনো পান চিবোতে ভুলে যান এক লহমার জন্য। রওশন সাহেব মুখ ফিরিয়ে নেন। পানির বোতলটা ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলেন আবার। অণিক ফিরলেই এখান থেকে রওনা দিতে হবে। আলিপুরদুয়ার, সে অনেকটাই পথ বটে, পৌঁছাতে রাত হয়ে যাবে নিশ্চয়ই।

রওশন সাহেবের এখন আলিপুরদুয়ারের কথা মনে পড়ে, সলসলাবাড়ির কথা মনে পড়ে। গদাধর নদীর বুক উপচানো জলে তুমুল সাঁতারের কথা পড়ে। তোর্সার স্রোত দেখতে যাওয়া স্কুল পালানো দিনগুলোর কথা, বনের ধারে লুকিয়ে পিকনিকের কথা মনে পড়ে। এই চুয়াত্তর বছর বয়সে এখনকার কত কথাই ফিকে হয়ে গেছে তবু সেই দিনগুলো এখনো কেমন সজীব! নিরাপদকে খুব মনে পড়ে হঠাত এই একলা চাতালে বসে থাকতে থাকতে। নিরাপদ বেঁচে আছে? অরিন্দমের সাথে কত বছর পরে কথা হলো সেদিন, এই আসা উপলক্ষ্যেই, অরিন্দমের বাড়িতেই উঠবে ওরা এবার, খুব করে বলেছে। ওর কথা হয়নি কিছু। নিরাপদ কী ডানপিটেই না ছিল! একবার গদাধরের মেলায় সাঁতার দিতে দিতে চলে গিয়েছিল বহুদূর। সে কী একটা কান্ড!
আচ্ছা, সে কেমন আছে? সেই যে, যার এক মাথা কালো চুল, যার কথা মনে পড়লেই নিতাইয়ের ঠাকুরঝির মুখটা ভেসে ওঠে এক ঝলকে, সে কি এখনো আগের মতোই চোখে কাজল দেয় ঘন করে? রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে? বৃষ্টি পড়লে একা একা দৌড়ে বেড়ায় মাঠের পর মাঠ, আলপথের আঙিনা জুড়ে? সারাটা জীবন পার করে এই শেষ বয়সে এসে কদিন থেকে তার কথা কেন আবার খুব করে মনে পড়ছে রওশন সাহেবের? কেন?

সেই যে, বাবা যখন একেবারে রাশভারি গলায় বলেছিলেন- এ দেশে আর একটা দিনও নয় আব্বা! চারদিকের এইসব ঝামেলা আর সহ্য করা যাচ্ছে না। যে কোনো দিন আমাদের এখানে যে একটা কিছু হবে না, তারই বা ঠিক কী?

তার পরের দিন সবাই মিলে চলে গিয়েছিলেন তারা। সত্যি তো, দিনে দিনে ঝামেলা বেড়ে যাচ্ছিল তখন। বাবার চিন্তাকে তাই কেউ ভুল বলে থামিয়ে দিতে পারেনি। গদাধরের বুনো জল, দূরের বক্সার হাতছানি আর সলসলাবাড়ির শ্যামল ছায়ার সাথে সাথে একটা ছলছলে চোখের শ্যামল মায়াকেও ছেড়ে গিয়েছিলেন তিনি, সারা জীবনের মতো। আজ কয়দিন কেন তবে সে মায়া আবার পিছু ডাকে? কেন?

অণিক ফিরে আসায় চিন্তায় ছেদ পড়ে রওশন সাহেবের। অণিক একটা গাড়ি ভাড়া করে এনেছে, সোজা আলিপুরদুয়ার যাবে। শিলিগুড়ি গিয়ে নাকি ওখান থেকে গেলে ভাড়া কিছু কম পড়ত কিন্তু সে হ্যাপা ও নেয়নি আর। রওশন সাহেব হারিয়ে ফেলা অনেকগুলো মুখ সঙ্গে নিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসেন।

দুই
রাতের খাওয়াটা বড্ড বেশি হয়ে গেছে আজ। অরিন্দমের বউমা, স্নেহময়ী শুনল না কিছুতেই, জোর করে পাতে তুলে দিল খাবারদাবার। অনেকদিন থেকে খাওয়াদাওয়া একটু সামলে চলেন রওশন সাহেব। এই বয়সেও শরীর ভালো থাকার মূলে তো ঐ খাওয়া দাওয়ার নিয়ন্ত্রণ আর একটু হাঁটাচলা। অণিক আশপাশটা ঘুরে দেখতে গেছে শৌণকের সাথে, অরিন্দমের বড় নাতি সে। কাল আলিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনারটা সেরে পরশু ভোরে দার্জিলিং রওনা দেবে অণিক, ওর বন্ধুরা কাল যাচ্ছে ওখানে। রওশন সাহেব এ কটা দিন এখানেই থাকবেন। দার্জিলিংয়ের চেয়ে ঢের বেশি দেখার জিনিস তার এখানেই পড়ে আছে।

উঠানে মাদুর পেতে দুই বন্ধু বসেন। কত বছর পরে! সেই চৌদ্দ বছরের কিশোরেরা আজ সত্তরোত্তর বৃদ্ধ। তবু তাদের বুকের ভেতর জমানো কথাগুলো এত বছরের শেকড় ছেড়ে বেরোতে চায়। অরিন্দম আজ কী কান্নাটাই না কেঁদেছে তাকে দেখে। এমন ঝুম কান্না ও কেঁদেছিল সেই ছয় দশক আগেও, যেদিন তারা এ পাড়ার পাততাড়ি গুটিয়েছিল ভিন দেশের বিনিময়ে। রওশন সাহেবের চোখের জলও বোধহয় সেদিনের পর আজ এমন আগলছাড়া কান্না হয়ে বেরোল।

বড় রাস্তার ধার ঘেঁষে অরিন্দমদের বাড়িটা। বাড়িটা আসলে বরাবর এখানেই ছিল, রাস্তাটাই বাড়ি ঘেঁষে চলে এসেছে এখন। বাইরে থেকে টুকটাক ট্রাক লরির শব্দ আসছে। সে শব্দে ছন্দপতন ঘটে না তাদের গল্পে। আকাশ ভরা জোছনা, আধখানা চাঁদ আলোয় ভরিয়ে দিয়েছে এ বাড়ির উঠান, ঘরের চালা, বাইরের গাছপাতাদের সংসার। সে আলোয় রওশন সাহেব চতুর্দিকটা দেখেন ঘুরে ফিরে।

রসু, আচ্ছা, ভিনদেশ কেমন হয় রে? নিজের মতো হয়?

চাপা নিঃশ্বাসের সাথে বেরিয়ে আসা অরিন্দমের প্রশ্নটা রওশন সাহেবের বুকের ভেতর গিয়ে একটুখানি বাতাসের জন্য খাবি খায়। নিজের মতো? নিজের মতো? অরিন্দমের ভিনদেশের অভিজ্ঞতা নেই, ওকে বোঝানোর মতো ভাষাও তাই জানা নেই রওশন সাহেবের।

শুষ্ক মুখে তিনি বলেন- মায়ের মতো আর কেউ হয় রে অরি? সৎমা কিংবা ধর নিজের মাসিই?

অরিন্দম চুপ করে থাকেন। হয়তো কিশোরবেলার বন্ধুর বুকের ভেতর মা কিংবা দেশ হারানোর অনুভূতিটা নিজে অনুভব করতে চান। কে জানে। আধখানা চাঁদের আলোয় তখনও ভেসে যায় চরাচর। বহুকাল পরে দেখা হওয়া এই দুই বৃদ্ধের বুকের গভীরে কী অব্যক্ত ব্যথা জাগে, তাতে প্রকৃতির কোনো আগ্রহই জাগে না এতটুকু।

নিরাপদ বেঁচে আছে, অরি?

অরিন্দম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তারপর মাথা নাড়েন দু’দিকে-

না রে। বছর দুয়েক হয়ে গেল। ক্যান্সার।

তাদের আলাপে বাক্যগুলো বড় হতে পারে না যতিচিহ্নের অত্যাচারে। তবু অনেক কথা হয়। নিরাপদর ছেলেদের কথা, ওপাড়ার রহমান চাচার উত্তরপুরুষদের গল্প। আসামে এনআরসিতে এক পরিবারের শুধু একজনই নাগরিক বলে প্রমাণিত হয়নি সেই গল্প। এনআরসি আর সিএএ নিয়ে সারা ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের কথা আলাপ করেন তারা দু’জন।

বাইরে কাদের উল্লাস শোনা যায়। কান পেতে শুনেও কিছু বুঝতে পারেন না রওশন সাহেব। অরিন্দম জানান এ আজকের বাবরি মসজিদ বিষয়ক রায়ের উল্লাস। স্থানীয় হিন্দুদের বেশিরভাগই আনন্দিত এই রায়ে। রওশন সাহেব নীরবে শুনে যান। বছরের পর বছর অপেক্ষার পর এমন একটা রায় কী করে হতে পারে সেটা তার মাথায় খেলে না।

রাত বাড়ে। অরিন্দমের ঘরেই রওশন সাহেবদের শোবার জায়গা। কল্যাণী মারা যাবার পর থেকে তিনি একাই শোন ও ঘরে। স্নেহময়ী এসে কয়েকবার বলে গেছে ওঠার কথা। এবার সত্যিই উঠতে হয়। দীর্ঘ পথযাত্রার ক্লান্তিও ভর করেছে বুড়ো হাড়ে। অরিন্দম বলেন-

রসু, চল, ঘুমাবি। রয়েসয়ে এসব গল্প করা যাবে।

তাই তো, উঠতেই হয়। তবু, এতক্ষণ হাজারবার বলি বলি করেও যে কথাটা বলা হয়ে ওঠেনি অরিন্দমকে তাই জিজ্ঞেস করে ফেলেন তিনি আচমকা-

অরি, বিদিশার খবর জানিস? ও কোথায় আছে? কেমন আছে?

অরিন্দম সেই আলো আধারিতে বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন অপলক। তারপর হেসে বলেন-

বেঁচে আছে রে। তোরা চলে যাবার পর ও কেমন হয়ে গিয়েছিল। বিয়ে করল না সারা জীবন। শরীরটা খুব খারাপ নাকি শুনছিলাম, দেখতে যাবি কাল?

অরিন্দমের শেষ প্রশ্নের কোনো উত্তর দেন না রওশন সাহেব। ছোটবেলায় ছেড়ে যাওয়া বন্ধুকে তিনি বলতে পারেন না, এই যে এত বছর পর এদেশে এলেন তিনি, তাতে সেই বিদিশার নিশার মতো কালো চুলের মেয়েটার সাথে দেখা করার তীব্র আকাঙাক্ষাও মিশে আছে। চৌদ্দ বছরের এক অসহায় কিশোর যাকে ছেড়ে গিয়েছিল চিরদিনের মতো, এই শেষ জীবনে তাকে কী বলার আছে, তার কাছ থেকে কীই বা শোনার আছে তার কিছুই জানেন না রওশন সাহেব। শুধু জানেন, নিতাইয়ের ঠাকুরঝি তাকে ডেকেছে মন থেকে, তাই এই অসময়েও তিনি এতটা পথ না এসে পারেননি।