যে নদীটা আমার

সাদিয়া সুলতানা

ওপাশ থেকে অন্তু ফিসফিস করে ডাকছে, ‘বাবলু দরজা খোল, দরজা খোল...আমি।’

অন্তু নিরবচ্ছিন্নভাবে ডেকে চলছে। নৈঃশব্দ্যের পর্দা ভেদ করে আসা কণ্ঠস্বরটি চিনতে আমার ভুল হয় না। তবুও আমি দরজা খুলি না। আমি জানি, অন্তু আসেনি। ঠিক এই মুহূর্তে অন্তুর আসার কথা না।

অন্তুর আসার কথা ছিল সন্ধ্যায়। ওর সঙ্গে আজ আমার মনির বাসায় যাবার কথা ছিল। যদিও আমি নিশ্চিত ছিলাম অন্তু আসবে না।

ও কখনোই কথা দিয়ে কথা রাখে না। প্রতিজ্ঞা করেও প্রতিজ্ঞা রাখতে পারে না। অন্তু শুধু একটা প্রতিজ্ঞাই রেখেছিল।

অন্তু প্রতিজ্ঞা করেছিল, অভিজিৎ রায়ের হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত ও কোনোদিন বইমেলায় যাবে না। অন্তু যায়নি। আমিও না।

আমরা দুজন মাঝেমাঝে পরস্পরের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই। কিছু কিছু প্রতিজ্ঞা ভীষণ হাস্যকর। ভেঙে না ফেলে কোনো উপায় থাকে না। আমি ভাঙি না। অন্তু ভাঙে।
অন্তু প্রতিজ্ঞা ভেঙে কবিতা লেখে। মিছিলে যায়। প্রেমও করে।

অন্তুর প্রেমিকার নাম মনি। সেই মনি, অন্তুর সঙ্গে আজ আমার যেই মনির বাসায় যাবার কথা ছিল। মনির বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে সদ্য নিয়োগ পাওয়া একজন মূল্যবান পাত্রের সঙ্গে দিন পনেরো পরেই মনির বিয়ে হবে।

অন্তুর সঙ্গে মনির বিয়েটা হচ্ছে না। অথচ দুজনের মধ্যে গভীর প্রণয় ছিল। আমাকে না জানিয়ে ওরা কয়েকবার সীমান্তের বাড়িতে দেখা-সাক্ষাৎ করেছে।

সীমান্ত আমাকে সব বলে দিয়েছে। সীমান্ত ওর পড়ার ঘরের দরজার লকের ফুটো দিয়ে দুজনের শরীরী আখ্যান দেখে মজা নিতে নিতে আমাকে ফোনে সব জানিয়েছিল। সেদিন অন্তুর ওপরে আমার খুব অভিমান হয়েছিল। সীমান্তর মতো এমন নোংরা মানসিকতার ছেলেকে বিশ্বাস করে ওর বাড়িতে অন্তু প্রেম করতে গিয়েছিল। অথচ আমাকে বিশ্বাস করেনি।

মনির সঙ্গে অন্তুর প্রেমের শুরু হয়েছিল আমার সূত্র ধরে। ব্র্যাকের আইনগত সহায়তা কার্যক্রমে হুট করে চাকরিটা হয়ে যাবার পর মনিকে পড়ানোর কাজটা আমাকে ছাড়তে হয়েছিল। তখন মনিকে পড়ানোর জন্য আমি অন্তুকে অনুরোধ করেছিলাম। এত ভালো একটা টিউশন হাত ছাড়া করা ঠিক হবে না বলে ওকে আমি একদিন মনিদের বাসায় নিয়ে গিয়েছিলাম। যদিও আমি জানতাম অন্তুর আগের দুই ছাত্রীর মতো মনিও ওর প্রেমে পড়বে।

অন্তু ছেলেটাই এমন। মেয়েরা এমন সব ছেলেরই প্রেমে পড়ে।
অন্তুর লম্বাটে গড়ন। শিশুসরল মুখ। ঘন পাপড়ির গভীর দুই চোখ। চুলগুলো অবাধ্য। কথায় কথায় অন্তু ফুকোর ডিসকোর্স, জঁ পল সার্ত্রর অস্তিত্ববাদ থেকে বুলি আওড়ায়। ভাঙা গলায় রবীন্দ্রনাথ আর আবুল হোসেনের কবিতা আবৃত্তি করে। উদ্ ভ্রান্ত দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকাতে তাকাতে কবিতার পঙ্ক্তি রচনা করে।

দরজার ওপাশ থেকে আবার ফিসফিসানি শোনা যাচ্ছে। অন্তু কাতর স্বরে ডাকছে, ‘বাবলু, দরজাটা একটু খোল...আমি...আমি অন্তু, নাইমুল হাসান অন্তু।’

অন্তুর ডাকে আমি বিভ্রান্ত হই না। দরজা খুলি না। দরজার নিচের আর ওপরের ছিটকিনি ভালো করে আটকে দিয়ে ঘরের বাতি নিভিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ি।

অন্তু ডেকেই চলে, ‘বাবলু...বাবলু...।’

অন্তুর কণ্ঠস্বর ভাঙা ভাঙা। জলের গানগুলো বেশ মানিয়ে যায় ওর কণ্ঠে। মলচত্বরে বসে খালি গলায় অন্তু গাইতো, ‘হরেক রঙের বাহারে/সকাল হল আহারে/চুলার পারে উড়ছে ধোঁয়া/এক কাপ চা/শিশির ভেজা দেহটাকে/ঢাকছে কুয়াশা... অই হই...তাইরে নাইরে...।’ গাইতে গাইতে অন্তু যখন হাতের পাতা দিয়ে হাঁটুতে তাল ঠুকতো আমি মুগ্ধ হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতাম।

অন্তু অনেক কিছু করতো। গান গাইতো। কবিতা লিখতো। পত্রিকা বের করতো। একটা কোমল কোমল প্রেমও করতো। আমি এসব কিছুই করতে না পারলেও অন্তুর গান আর আবৃত্তির মুগ্ধ শ্রোতা হতাম।

অন্তু টিএসসি ধরে হেঁটে যেতে যেতে মুখে মুখে কবিতা বানাতো। হলে ফিরে রাত জেগে জেগে ডায়েরিতে টুকে নিতো সেসব। বই পড়তো। ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে আবৃত্তি করতো।

অন্তুর পড়ার টেবিল বইয়ে ঠাসা থাকতো। পাঠ্য বইয়ের দেখা মিলতো না সেখানে। নীলক্ষেত গেলেই ফুটপাত থেকে অন্তু পুরনো সব বই কিনতো। আগে বইমেলা থেকেও ও সারাবছরের জন্য নতুন নতুন বই কিনতো।

যেদিন অভিজিৎ রায়কে হত্যা করা হলো সেদিন আমি আর অন্তু বইমেলায় গিয়েছিলাম। মেলা থেকে বের হয়ে বাংলা একাডেমির সামনের ফুটপাতে বসে দুই শলা সিগারেট টেনে দুজনে ধীরেসুস্থে টিএসসির দিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম। অন্তু লঘুস্বরে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করছিল।

হঠাৎ দুজনে দেখলাম বিক্ষিপ্তভাবে কিছু লোক ছোটাছুটি করছে। টিএসসির সামনের ভিড় ঠেলে দুজনে সামনে এগোতেই দেখতে পেলাম হলুদ ফিতে দিয়ে ঘিরে রাখা মাটিতে পড়ে আছে অভিজিৎ রায়ের রক্ত...মগজ।

হলে ফেরার পথে সেদিন খুব বমি করেছিল অন্তু। রুমে ঢুকেও মেঝে ভাসিয়েছিল।
ও রক্ত দেখতে পারতো না। শরীরের কাঁটাছেঁড়াও না। তাই অন্তু কখনো বিজ্ঞান বিভাগে পড়েনি। আমার অবশ্য বিজ্ঞান আর গণিতে পড়ার মাথা ছিলো না। অন্তুর ছিল। তবু অন্তু বরাবর মানবিক বিভাগে পড়েছে। পড়ার পাশাপাশি ভীষণ মানবিক সব লেখালেখিও করেছে।

অভিজিৎ রায়ের রক্ত আর মগজ দেখার পর থেকে অন্তু ব্লগে লেখালেখি করা ছেড়েছিল। কবিতা লেখাও ছেড়েছিল। অবশ্য অন্তু মনির প্রেমে পড়ে নতুন করে কবিতা লেখা শুরু করেছিল।

আমি ওর কবিতার খোঁজ জানতাম। বিসিএস পরীক্ষার রেজাল্টের খবর জানাতে আমি যেদিন ওর মেসে গিয়েছিলাম সেদিন ওর চৌকির ওপরে আমি কবিতা লেখার ডায়েরি দেখেছি।

ডায়েরিটা এখন নেই। মনিকে আমি জানিয়েছি, অন্তুকে ধরে নিয়ে যাবার সময় পুলিশ আলামত হিসেবে কবিতা লেখার ডায়েরিটাও নিয়ে গেছে।

অন্তুর ডায়েরিতে অনেক কবিতা লেখা আছে। আমি মাঝেমাঝে বলতাম, ‘তুই একটা কবিতার বই প্রকাশ কর। যতগুলো কবিতা আছে দিব্যি পাঁচ ফর্মার তিনটা বই হয়ে যাবে। আপাতত একটাই কর। দেখবি হৈ চৈ পড়ে গেছে।’

অন্তু ওর কপালজোড়া রেশম চুলের গোছা দুকানের পেছনে গুঁজতে গুঁজতে বলতো, ‘এইসব লেখা দিয়ে বই হয় না রে বাবলু।’

অন্তুর কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। ভাঙা ভাঙা কণ্ঠস্বর।

দরজার ওপাশ থেকে অন্তু এখন কবিতা আবৃত্তি করছে,
যে নদীটা আমার
যে নারীটা আমার
সেই নদী কিংবা নারী
এই জন্মের সুখের মতোন
পূর্বজন্মের আপন ছিল
এই জন্মের ব্যথার মতোন
সাতজন্মের গোপন ছিল।

না, আমি শুনবো না। অন্তুর অভিশপ্ত কণ্ঠস্বর আমি শুনতে চাই না। আমার গা কাঁপছে। হাতের তালু ঘামছে। আমি ছটফট করতে করতে মাথার ওপরে বালিশ চাপা দিই।

অন্তু এবার আমার খুব কাছে এসে ফিসফিস করে আবৃত্তি করতে থাকে, ‘যে নদীটা আমার...।’