গুলজাহান

নিবেদিতা আইচ

পায়ের পাতা থেকে গলগল করে হলদে সবুজ রঙের পুঁজ বেরিয়ে আসছে। ধৈর্য ধরে গজ দিয়ে চেপে চেপে জায়গাটা পরিষ্কার করছে ডা.নওরোজ। আয়োডিনের দ্রবণে জীবাণুমুক্ত গজ ভিজিয়ে নিয়ে ক্ষতস্থানে বসাতেই ছেলেটা ছটফট করে ওঠে প্রতিবারই। ব্যথার তীব্রতায় চোখ মুখ কুঁচকে যায়। পাশে দাঁড়িয়ে থাকে তার মা, আজ যেমন আছে, ছেলের চেয়ে দ্বিগুণ জোরে চেঁচায় সে।

হৈচৈ এর মাঝেই একমনে কাজ করে নওরোজ। পরিচিত ডাকটা তাই সাথে সাথে শুনতে পায়নি সে। যখন শুনতে পেলো তখন ভীষণ চমকে গেলো। সামনে দাঁড়ানো মানুষটিও অবাক চোখে তাকিয়েছিল ওর দিকে। অথচ বেশ ক'বছর ধরেই নওরোজের কাজের জায়গা এটি৷ তবু নার্গিস আরা বোধ হয় ভাবতে পারেনি এভাবে দেখা হয়ে যাবে ওদের।

নওরোজ এরপর আরো ধীরেসুস্থে ড্রেসিংটা শেষ করলো। যদিও মাথা কাজ করছিল না। সবগুলো বেডের কাজ শেষ হতে হতে আর সময় পাওয়া গেল না, নার্গিসের কাছে যাবার আগেই ওয়ার্ডে রাউন্ড শুরু হয়ে গেলো।

সার্জারি ওয়ার্ডে সকাল থেকে ছয়টা ড্রেসিং এর রোগী ভর্তি হয়েছে। নয়টায় প্রফেসর টেরানসিকো রাউন্ডে আসবার আগে সবাইকে একবার করে ফলো-আপ দিয়ে ফেলা চাই। নওরোজ আহসান সদ্য এমবিবিএস পাশ করে এই হাসপাতালে ট্রেনিং শুরু করেছে। এই ওয়ার্ডেই আজকে ডিউটি তার।

আজ প্রফেসরের কথাগুলোয় মন দিতে পারেনি সে। বারবার দু'বছর আগের সেই নার্গিস আরাকে মনে পড়েছে ওর। ওটাই তো শেষ দেখা ছিল, তারপর আর কথা হয়নি ওদের। সত্যি বলতে নার্গিসের সাথে কখনো দেখা হয়ে যাবে ভাবতে পারেনি সে।

বছর চারেক আগে ময়মনসিংহ শহরে ওদের পাশের বাড়িতেই ঘর বাড়া নিয়েছিল নার্গিস আরার পরিবার। কলকাতায় ১৬ আগষ্টের দাঙ্গার পর অনেক মুসলিম পরিবার পূর্ব পাকিস্তানে চলে এসেছিল। নার্গিসের বাবা নাদির আখতারও সেই ঘটনার পর আর থাকতে চাননি। সবাইকে নিয়ে চলে এসেছেন পূর্ব পাকিস্তানে।

ময়মনসিংহে তাদের আত্মীয় ছিলেন নার্গিসের ফুপু। কলকাতা থেকে নাদির আখতার সরাসরি ময়মনসিংহে বোনের কাছে এলেন এবং নওরোজদের প্রতিবেশীর বাড়িটি ভাড়া নিলেন।

নওরোজ তখন মেডিকেল কলেজের ছাত্র। নীলক্ষেত ব্যারাকে থেকে পড়াশোনা করছিল। দুই তিনমাসে একবার বাড়ি যাওয়া হতো তার। নার্গিসের সাথে ওর পরিচয় হলো বকরি ঈদের ছুটিতে।

সেপ্টেম্বরের তেইশ তারিখ,১৯৪৭ সাল। তারিখটা ভালো করে মনে আছে নওরোজের। খাওয়া দাওয়ার পর গদিঘরে পাটি বিছিয়ে গানের আসর জমেছে সেদিন। নাদির আখতার চমৎকার গজল শোনালেন। উপস্থিত সকলে বিস্মিত! ছটফটে আমুদে লোকটা গুরুগম্ভীর স্বরে গান গাইতে জানে কেউ ভাবতে পারেনি। ফাতিমার জোরাজুরিতে সেদিন নার্গিসকেও গলা খুলতে হয়েছে। নার্গিসের সাথে ফাতিমার বন্ধুত্বটা গাঢ় হয়ে গিয়েছে অল্প কয়েকদিনে।

নার্গিসের গান শুনে নওরোজ প্রথমবারেই মুগ্ধ হয়েছিল। মেহেদী পরা আঙুল হারমোনিয়ামের পর্দাগুলো কী দারুণ ভঙ্গিমায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে-দৃশ্যটা চিরকালের জন্য ওর স্মৃতিতে গাঁথা হয়ে গেছে।

নার্গিস কি এখনো গান গায়? যেকোনো উপলক্ষে গান লিখে তাতে সুর দেবার চেষ্টা করে? ফুঁ দিয়ে বাদামের খোসা উড়িয়ে দিয়ে হেসে ফেলে? যেমনটা হাসতো নদীর পাড়ে বিপিন পার্কে কাটানো সেই বিকেলগুলোতে!

এসবের কিছুই আজ জিজ্ঞেস করতে পারে না নওরোজ। রাউন্ড শেষে নার্গিসের সাথে যখন ওর কথা হলো তখন মেয়েটার চোখেমুখে ভীষণ দুশ্চিন্তার ছাপ। রোগী নার্গিসের স্বামী। সম্ভবত এপেন্ডিসাইটিসে ভুগছেন লোকটা। নওরোজ ওকে আশ্বস্ত করবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু নার্গিস প্রথম থেকেই বড্ড গম্ভীর হয়ে আছে। তাই দুয়েকটা জরুরি কথার পর আলাপ ফুরিয়ে যায় ওদের।

-বাড়িতে সবাই কেমন আছে? আগের মতো জলসা হয় এখনো?

ফিরে আসছিল নওরোজ। এই দু'টো প্রশ্ন যেন বদলে যাওয়া সময়ের বরফটাকে গলিয়ে দিল। আটকে রাখা নিঃশ্বাসটা ছাড়তে পারলো নওরোজ। একটু দাঁড়ালো সে।

-ভালো আছে সবাই। তোমার মা কেমন আছেন?

ঘাড়টা একটু কাত করলো নার্গিস। নওরোজ এবার ভালো করে তাকালো ওর দিকে। মাথার আঁচলটা সরে গেছে , চুলগুলো উস্কোখুশকো, চোখে ক্লান্তি। গোলগাল মুখটা ঈষৎ রোগাটে দেখাচ্ছে। ও কি অসুস্থ? এত ম্লান লাগছে ওকে!

-আব্বার কথা শুনেছেন?

নওরোজ মাথা নাড়লো। নাদির আলীর মৃত্যুর খবরটা ওরা জেনেছে বেশ কিছুদিন পর।
-ফাতিমা? ওর কি…

-হ্যাঁ। গত বছর বিয়ে হয়ে গেছে, দিনাজপুরে আছে বরের সাথে।

একটু হাসির আভাস দেখা গেল এবার। নার্গিসকে এই ফাঁকে জিজ্ঞেস করলো
নওরোজ- তুমি কেমন আছো? ওখানে কেমন পরিস্থিতি?

-ওখানেও শান্তি নেই। আমার ভালো লাগেনা, কতবার উনাকে বলেছি চলুন ঢাকায় চলে যাই! আমি শুধু উনার বদলির অপেক্ষায় আছি।

-ঢাকায় কবে এলে?

-বড় ভাইজানের বিয়েতে এসেছি আমরা। দুই সপ্তা পরেই কাবিন। এর মধ্যে উনার এই অবস্থা। কেমন থাকি বলতে পারেন নওভাই?

নওরোজ চোখ তুলে তাকায় ওর দিকে। ফাতিমার মতো নার্গিসও তাকে এই নামে ডাকতে শুরু করেছিল। সারা দেশে খুন, লুটপাট, দাঙ্গা ফ্যাসাদের ভয়ে রাত নেই দিন নেই সবাই তটস্থ । তার মাঝে ওই দিনগুলি বড্ড অন্যরকম ছিল। ময়মনসিংহে গেলে প্রতিবারই নওরোজ গানের জলসায় তবলা নিয়ে বসতো। নার্গিসের সাথে সঙ্গত ছিল সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্ত। সেই সঙ্গত কেটে গেছে বছর দুয়েক আগে। নার্গিসের বিয়ের পর।

বিয়ের সময় নার্গিসের বর লাহোরে অডিট অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ভদ্রলোক ওর বড় ভাইয়ের বন্ধু। বিয়েটা বোধ হয় আগে থেকেই পাকা ছিল। শুধু কলকাতায় না হয়ে বিয়ের আসর হলো ময়মনসিংহে। নওরোজ সে আসরে ছিল না। পেশাগত পরীক্ষার কারণে ঢাকায় ছিল সে। এই অনুপস্থিতির আরো কিছু গুঢ় কারণ ছিল। নার্গিস সবটুকু না জানলেও কিছুটা হয়তো জানতো।

-এর আগে কখনো এমন হয়নি উনার। নওভাই, সত্যি করে বলবেন, উনি সেরে উঠবেন তো?

নওরোজ বর্তমানে ফেরে। নার্গিসের দৃষ্টি অনুসরণ করে সে। ভদ্রলোক ব্যথায় চোখমুখ বিকৃত করে ফেলছেন একটু পরপর। এমনিতে বেশ তাগড়া দেখতে নার্গিসের বর। ওর সাথে দশ বারো বছরের ব্যবধান তো হবেই। তবু লোকটাকে ওর সাথে মানিয়েছে বেশ।
-খুব সিরিয়াস কিছু নয়। ব্যথা কমলে অপারেশন এর ব্যাপারে ভাবা যাবে। তুমি চিন্তা কোরো না...আমি তো আছি।

কথাটা বলেই নওরোজ ওর মুখের দিকে তাকালো একবার। সেই পুরনো ভঙ্গি! নার্গিসের মনে আছে। জলসায় প্রায়ই এমন হতো ওদের। গান গাইতে গাইতে কথা হতো,নিঃসাড়ে। সুর নড়ে যেতো, কথার ভুল হতো। এত বিব্রত লাগতো নিজেকে ওর! তখন রেডিওতে কাজী নজরুলের 'বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে' গানটা প্রায়ই শোনাতো। নওরোজের প্রিয় গান। তাই এই গানটাই বারবার শুনতে চাইতো ওর গলায়। এখনো মাঝেমাঝে রেডিওতে শুনতে পেলে নার্গিস কান পাতে সুরটায়, প্রতিবারই ভেতরটা দুলতে থাকে ওর।

'উদাসিন আকাশ স্থির হয়ে আছে
জলভরা মেঘ লয়ে বুকের কাছে।'

আজকে দেখা হবার পর থেকে সঞ্চারীটা মাথার ভেতরে গুনগুন করছে। খুব উচাটন লাগছে মন। নার্গিসের মনে হয় সত্যি যদি আকাশটা, সময়টা স্থির হয়ে যেতো। পরের মুহূর্তেই আবার এমন আবোলতাবোল ভাবনার জন্য মনে মনে লজ্জিত হয়।

দুপুরে আম্মা আর ভাইজান এলে সে হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। সব ঝেড়ে ফেলে ব্যস্ত হতে হয় ওকে। পুরনো কথার ঝাঁপি অবশ্য খুব তাড়াতাড়ি বন্ধ হয় না। দীর্ঘদিন পর নওরোজকে দেখে নার্গিসের মা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। সবার খোঁজখবর নিলেন তিনি। দুটো বছর পাশাপাশি বাড়িতে ছিলেন ওরা, একটা আত্মীয়তার মতো হয়ে গিয়েছিল। ঢাকায় চলে যাওয়ার পর শুরুর দিকে দুই পরিবারের যোগাযোগ থাকলেও ধীরে ধীরে সেটা কমে যায়। আফিয়া বেগম পানের বাটা খুলে বসে জিজ্ঞেস করলেন ওর মায়ের কথা।

ভাবী কি এখনো পান খায়?

নওরোজ হেসে ফেলে প্রশ্নটা শুনে। মাথা নেড়ে উত্তর দেয়। ওর মনে আছে আম্মার সাথে পান খেতে খেতে কত গল্প করতেন ইনি। সেই সুন্দর দিনগুলি ফিরে পাওয়া গেলে বেশ হতো। তাহলে অবশ্য অনেককিছুই অন্যরকম হতে পারতো।

একটু পর নার্গিস কাছে এসে দাঁড়াতেই নড়েচড়ে বসে নওরোজ । ওর কোলে বছর দেড়েকের স্বাস্থ্যবান এক শিশু, হাতপা নেড়ে খেলছে। আফিয়া বেগম হাত বাড়াতেই কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো তখুনিই।

'আমার নাতনি, নার্গিসের মেয়ে।' চোখের ইশারায় আফিয়া বেগম বললেন।
তখুনিই একবার নার্গিসের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলো ওর। তারপর ব্যস্তভঙ্গিতে উঠে পড়লো নওরোজ । হাতে কত কাজ ওর। দুপুরে আরেকবার রোগীদের ফাইলগুলো দেখতে হয় ওকে। এই ওয়ার্ডে আরো দু'জন ট্রেইনি আছে ওর সাথে। সবাই মিলে এসময়টায় আরেকটা রাউন্ড দেয়। তারপর পালাক্রমে দুপুরের খাবার খেতে যায় ব্যারাকে, আলী মিয়ার হোটেলে।

বারান্দা থেকে একবার ভেতরে তাকায় নওরোজ। কাঁধে ফেলে মেয়ের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে নার্গিস। মুখে আঙুল পুরে দিয়েছে বাচ্চাটা। বোধ হয় ঘুমোবে। কী ফুটফুটে চোখমুখ! মায়ের মতোই হয়েছে দেখতে।

বিকেলে নওরোজের ডিউটি শেষ হলো। এত ক্লান্ত সে আজ, হোস্টেলে ফিরে সাথেসাথেই বিছানায় গা এলিয়ে দেয় তাই। অথচ ঘুম আসে না, শুধু এপাশ ওপাশ করে। চোখ বুজলেই নার্গিসের মুখটা ভেসে উঠছে।

ঘুমঘুম চোখে নার্গিসের কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পায় সে। মারামারি,রক্তপাত ও সহ্য করতে পারেনা। মনটা ভীষণ নরম ওর।

-আচ্ছা নওভাই, আমরা যখন থাকবো না তখন আমাদের পরের জেনারেশনের কী পরিচয় হবে বলুন তো? দেশটা কি তখন একেবারেই অন্য কিছু হয়ে যাবে?
নওরোজ বলে- হয়ত অন্যকিছু হবে। কিন্তু এত হিংসা , এত রেষারেষি যেন না থাকে,এখন এই দোয়া ছাড়া আর কিছু চাইবার নেই।

-আমার প্রায়ই ভবিষ্যতটা দেখতে ইচ্ছা করে, জানেন তো? চোখ বন্ধ করলেই যদি দেখা যেত সবটা!

-চোখ বন্ধ করলে আমি কী দেখি জানো?

-কী দেখেন নওভাই?

-তোমার কোলে ছোট্ট একটা দেবশিশু, তার হাসি যে একবার দেখেছে সেই সব হানাহানি ভুলে যাচ্ছে। একে অন্যকে বুকে টেনে নিচ্ছে। কে হিন্দু কে মুসলিম সেই ফারাকটা কেউ মনে রাখছে না।

নার্গিসের মুখটা মুহূর্তের জন্য আরক্ত হয়ে উঠলেও নওরোজের কথাগুলো যেন জাদুমন্ত্রের মতো শোনায়। চোখ বুজে সেই অদ্ভুত শিশুটিকে কল্পনা করে নার্গিস। আর ভাবে সত্যি যদি এমন হয়!

নার্গিস আরো শুনতে চায়, ভবিষ্যতের সবটুকু জানবার আগ্রহ হয় ওর। প্রশ্ন করে- আর কী কী দেখতে পান আপনি?

স্বপ্নস্বপ্ন ভাবটা দুম করে কেটে যায়। নওরোজ বিছানা ছেড়ে উঠে বসে। তখনো ওর কানে বাজতে থাকে নার্গিসের গলার স্বর। 'নওভাই,ওর নাম কী হবে?'

নাম একটা রেখেছিল বটে নওরোজ। নার্গিস মনে রেখেছে কিনা কেজানে কিন্তু তার নিজের খুব ভাল করে মনে আছে।

ভাবনাগুলো ছেঁড়া ছেঁড়া, বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরপাক খায়। বাইরে অনেক হল্লা। গলা বাড়িয়ে বাইরে তাকায় সে, বারান্দায় ক্যারাম খেলতে বসেছে জুনিয়র ছেলেপেলে। ঘরের ভেতর একা একা বসে থেকে ভীষণ গুমোট লাগে ওর। খোলা হাওয়ায় বেরিয়ে পড়ে সে।

একটু পর হাসপাতালে ফিরে নার্গিসের বরকে দেখে কিছুটা সুস্থ বলে মনে হলো নওরোজের। ব্যথার তীব্রতা খানিকটা কমেছে। বিছানায় উঠে বসেছেন তিনি। নওরোজ এদিক ওদিক তাকালো কয়েকবার, নার্গিসকে দেখা গেল না কোথাও।
কোথায় যে গেল মেয়েকে নিয়ে, বোধ হয় খাওয়াবে ওকে।

আপনি বসুন না- পাশে রাখা টুলটা এগিয়ে দিতে চাইলো ভদ্রলোক।

ঠিক আছে, আপনি ব্যস্ত হবেন না।

সারাদিনে এই প্রথম কথা হলো ওদের। অসুস্থ শরীরেও আতিথেয়তার কথা ভোলেনি, নিপাট ভদ্রলোক বটে! পরিচয় হতে না হতেই নওরোজের ভালো লেগে গেল লোকটাকে।

নার্গিস ফিরে এলো আরো মিনিট বিশেক পরে। হন্তদন্ত হয়ে এসে মেয়েকে বিছানায় বসিয়ে দিল।

-এত দুষ্টু হয়েছে, কিছুতেই ঘুমোচ্ছে না দেখেছো!

ভ্রুজোড়া কুঁচকে আছে বিরক্তিতে। নওরোজের দিকে তাকিয়ে তবু একটু সৌজন্যের হাসি হাসলো নার্গিস।

-কতক্ষণ? আমি কিনা একে নিয়ে বারান্দায় পায়চারি করছিলাম।

-ঠিকাছে, আমরা একটু আলাপ করছিলাম।

-কী আলাপ করছিলে?

-লাহোরের হালচাল শুনছিলাম ভাইয়ের কাছে।

নওরোজই উত্তর দিল। নার্গিস একটু যেন অবাক হলো। কথা বলতে বলতে টিনের কৌটো থেকে খাবার বের করে প্লেটে সাজাতে শুরু করলো সে।

-যতসব আবোলতাবোল কথা। সবাইকে একই কথা বলে বলে মুখস্ত করিয়ে ছাড়ে, জানেন?

চিড়ে ভাজা আর বরফির প্লেটটা ওর দিকে এগিয়ে দিল নার্গিস। একটু বিরক্তি আর একটু কৌতুকমাখা হাসি হেসে তাকিয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ড।

-তা নয়, আমার তো শুনতে ইচ্ছে করছে। পত্রিকায় কি সবকিছু লিখছে আজকাল? কেউ একজন নিজ চোখে দেখেছে জানলে ভরসা করা যায়।

-লাহোরে বসে আমরাও দিনরাত দেশের কথা, বাড়ির লোকের কথাই ভাবছি। কী বলুন তো, খবর জেনেই বা কী হয়ে যাবে, এইসব খুনোখুনি সহজে বন্ধ হবে না দেখবেন। একটা যুদ্ধ না বাঁধালে থামবে না এরা।

একটানা কথা বলে লম্বা একটা শ্বাস ফেলে নার্গিস। হায়দার ভাই মুখ কালো করে তাকিয়ে থাকে,যেন যুদ্ধটা উনিই বাঁধিয়ে দিচ্ছেন।

হায়দার আলী সদালাপী মানুষ। লাহোরের গল্প শোনালো নিজ থেকেই। জানবার কৌতূহল তো ছিলই নওরোজের। কিন্তু গল্পগুলো আশাব্যঞ্জক নয়। কোথাও একটু শান্তির আশ্বাস নেই। সত্যি রক্তারক্তি ছাড়া আর কিছুই বুঝি মানুষ কখনো করেনি আগে! শুনে শুনেও ক্লান্ত লাগে। নওরোজ এবার প্রসঙ্গ বদলায়।

- এযাত্রা ব্যথাটা মনে হয় সেরে যাচ্ছে, বুঝলে? কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে। এরকম আবার হতে পারে। সময় করে অপারেশনটা করিয়ে নিও।

-জি.. কাল একবার প্রফেসর সাহেব কি দেখবেন?

-নিশ্চয়ই দেখবেন। উনার পরামর্শ ছাড়া তো কিছু করা চলবে না। আমি আমার সামান্য জ্ঞান থেকে যা মনে হলো বললাম।

নার্গিস চিন্তিত মুখে তাকায় হায়দার আলীর দিকে। তারপর গায়ের চাদরটা ভাল করে জড়িয়ে দেয়। মেয়েকে মৃদু বকুনিও দেয়-লক্ষ্মী হয়ে বসো দেখি।

নওরোজ এবার ক্ষুদে মানুষটির দিকে মনোযোগ দেয়। ডল পুতুলের মতো মিষ্টি দেখতে, মাথাভর্তি কোঁকড়াচুল। কোলে উঠবে বলে মায়ের দিকে ছোট ছোট হাত বাড়িয়ে রেখেছে।

নার্স এসেছে ফাইলপত্র নিয়ে। হায়দার আলীর ওষুধের সময় হলো বোধ হয়। নওরোজ উঠে পড়লো। ওকেও ফিরতে হবে এবার। রাতে ইমার্জেন্সি ওটিতে ডিউটি আছে আজ। হোস্টেলে ফিরে খেয়ে তৈরি হতে হবে। নার্গিস পিছু পিছু এলো খানিকটা।
-কাল কখন আসবেন?

-আজ তো রাতে ডিউটি আছে। কাল আসতে একটু দেরি হবে আমার। তবু চেষ্টা করবো রাউন্ডে থাকতে।

-আপনি ছিলেন বলে বর্তে গেলাম, খুব টেনশনে পড়ে গিয়েছিলাম আমরা।
কোলের পুতুলটা কারণ ছাড়াই মিটিমিটি হাসছিল। নওরোজ ওর চুলে হাত দিয়ে একবার ঘেটে দিতেই হাসির ফোয়ারা ছোটালো।

-কী নাম হে?

-নাম বলতে শেখেনি। এই আশ্বিনে একবছর হয়েছে।

-কী নাম রেখেছো?

নার্গিস দু'সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তারপর বললো- আপনি জানেন।

নওরোজ খুব অবাক হতে গিয়েও হতে পারলো না। অবচেতনে সেও হয়ত এটাই শুনতে চেয়েছিল! হ্যাঁ, নামটা জানা আছে তার। নওরোজ অস্ফুটে উচ্চারণ করলো -গুলজাহান!

মায়ের কোলে গুলজাহান হেসে কুটিকুটি হচ্ছে। অবিকল সেই দেবশিশু! নওরোজ মনে মনে প্রার্থনা করে- এই হাসিটা যেন বিশ্ব জয় করে নেয়।