ভয়

শতাব্দী দাশ

রাজিবুলকে তুলে নিয়ে গেছে গত রাতে। ভোর তিনটের দিকে মোবাইলের এক তীব্র আর্তনাদের পর খবরটা পেলাম৷ ঘুমের মধ্যে ফোনের আওয়াজকে কলিংবেলের আওয়াজ বলে ভুল হল। শুকনো গলায় জয়ন্তীদিকে ডেকেছিলাম মনে হয় । সিঁড়িতে বুটের শব্দও পেয়েছিলাম যেন৷ কেউ সাড়া দিল না৷ বাজতেই থাকল বেলটা৷ ঘুম চটকে গেল৷ উঠে বসলাম৷ ঘামছিলাম। বেল নয়, মোবাইল। কেটে যাওয়ার আগের মুহূর্তে সোয়াইপ করে ধরলাম।

মায়ের ঘুম ভেঙেছে পাশের ঘরে৷ কাশির শব্দ পাওয়া গেল। ওঘরে পালঙ্ক ছাড়া আরেকটা চৌকি আছে। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে ওঘরে জয়ন্তীদির শোওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। নাক ডাকছে সে। ডাকাডাকিতে জেগে উঠলে তা লজ্জার হত।

ওয়ারেন্ট ছিল না৷ জিজ্ঞাসাবাদের নাম করে তুলেছে৷ তারপর জানা গেছে, অ্যারেস্টেড। ফোনটা শালিনী করেছিল। ওরা ভোরে থানায় যাচ্ছে, জানালো আমায়৷ আমি কি যাব? আমার...আমার...মায়ের কাশির শব্দের মধ্যে অজুহাত খাড়া করি… জরুরি ডাক্তারি অ্যাপো আছে। শালিনী জোর করে না৷ কিছু সতর্কতা বিষয়ক পরামর্শ দেয়৷ যারা যারা ছিলাম সেদিনের জমায়েতে,তাদের যে কোনো কাউকেই হয়ত…কাল থানায় গেলে বোঝা যাবে, কী ব্যাপার৷ প্রয়োজনে কিছুদিন গা ঢাকা দিতে হতে পারে,সে বলে।

বাথরুমে গেলাম। শিড়দাঁড়া বেয়ে একটা সরিসৃপ চলাচল করে ইদানিং। তাকে শিশ্নপথ দিয়ে নামিয়ে দিতে চাইলাম কমোডে। ফ্লাশ করলাম। পুনঃফ্লাশ৷ মায়ের ঘরে আলো জ্বলল। কাশির পর মা জল হাতড়াচ্ছে। কিংবা লবঙ্গর কৌটো৷ দুয়েক মিনিট পর আবার অন্ধকারে ডুবে গেল ঘরটা৷

সিগারেট ধরালাম। অন্ধকারে ছাইদান খুঁজে পাওয়া গেল না৷ বারান্দাটা মায়ের ঘরের লাগোয়া। বারান্দায় বিকেলে বসে মা। বাবার চেয়ারে।

বারান্দা বা ছাইদান কিছুই হাতের কাছে না পেয়ে জানালা খুলে সিগারেট ধরা হাতটা বের করে দিলাম। মৃদু টোকায় ছাই উড়ে গেল৷ ফুরফুরে একটা হাওয়া ঢুকল ঘরে। মাথার ভিতরে বুটের শব্দ এতক্ষণে থামল মনে হয়৷

সরিসৃপটা শিরদাঁড়া বেয়ে চলাচল করছে সেদিন থেকেই, যেদিন জমায়েতে হুজ্জুতি হল৷ নাকি তারও আগে থেকে? বিএসসির পর একটা প্যাথোলজিকাল ল্যাবে ঢুকেছি ৷ বাবার পেনশনের অর্ধেক মা পায় ৷ নিজের ওষুধপত্রের খরচ তাতে চলে যায় মায়ের। হাতখরচাও৷ জয়ন্তীদির মাইনে, বাজারহাট, কেব্ল কানেকশন ,ইলেকট্রিসিটি...চালিয়ে নিচ্ছিলাম৷ সপ্তাহান্তে বুড়ো সাধু, নীল ছবি, দুচারটে ট্যুর, সেসবও ।

রামগড়ে একটা একতলা আছে আমাদের৷ পাড়াটার চরিত্র বদলেছে । ক'বছর আগে ভোর চারটে নাগাদ মিঠু গলা সাধত৷ চায়ের দোকানে আঁচ পড়ত। বরের বাড়ি থেকে ফেরত আসার পর আজকাল মিঠু ডালহৌসির দিকে কাজ নিয়েছে৷ পল্টুর চায়ের দোকানে গ্যাস বসেছে, ইন্ডাকশনও। খবর কাগজের একটা বোর্ড ঝুলত। সেখানে এখনও কাগজ চিটিয়ে যায় কেউ৷ কাগজের নাম বদলায় সরকার বদলালে। ক্লাবঘরে এখন ঠাণ্ডা মার্বেল মেঝে৷ আমিও যেতাম মাঝেসাঝে ক্যারাম পিটতে৷ স্বাধীনতা দিবসে পতাকা টতাকা ওড়ানো হলে বোঁদে বিলি করতাম৷ এমন নয় যে ইস্কুলে গাছ-টাছ লাগাইনি। ফাঁকা ফ্ল্যাটে কোনো বুড়ো মরে গেলে শেষকৃত্য করতেও দৌড়েছি৷ তবে ব্যাস, ওটুকুই। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর পুড়কি আমার ছিল না তত । দুবেলা বাড়ি বাড়ি ঘুরে গু মুত বয়ে আনি। সিরিঞ্জে রক্ত টানতেও শিখেছি৷ রায়চৌধুরি ডায়গনস্টিক সেন্টার আমাদের থেকে ঝাঁ-চকচকে৷ সেখানে একটা চাকরি লাগিয়ে দেবে বলেছিল বাসুদা৷

তারপর কী করে যেন এসবে জড়িয়ে গেলাম। প্রথমে কেমন একটা চাপা উদ্বেগ দেখা গেল এলাকায়। তারপর ফিসফাস। তারপর সবাই ঢ্যাঁড়া পেটাতে লাগল, সে ভয় পায়নি, তার কাগজপত্র আছে ঠিকঠাক। অথচ মনে মনে ভয় পেল সবাই। এই যেমন, মা।

মা একদিন বন্যার কথা বলল। ওপার থেকে এসে জলপাইগুড়িতে বসত গেড়েছিল দাদু। সে বসতও বন্যায় ভেসে গেল। একটা হড়কা বান দিদাকে টেনে নিয়ে গেছিল৷ সঙ্গে আলমারি, খাট, আর যা কিছু। মাকে কাঁধে বসিয়ে দাদু জল সাঁতরেছিল। বছর বারো পর মায়ের পিসি একটা স্টিলের ছাঁকনি দিয়ে বলেছিল, 'তর মা-র এই একখানই জিনিষ পাইসিলাম, জল সরে গ্যালে পর।' আর কিছু না? নাঃ। আলমারিতে যেসব দরকারি নথি ছিল, তাও না। দাদু নাকি পাগলপারা হয়ে গেছিল বউ হারিয়ে। সে লোক বিকল্প কাগজপত্র খুঁজবে কী করে?

মায়ের ভোটার কার্ড আছে। আধার কার্ড আছে৷ মা মাঝে মাঝে সেসব জাহির করে জয়ন্তীদির কাছে৷ আবার মাঝে মাঝে ভয় পায়৷ জয়ন্তীদি বলে,পনেরদিনের ছুটি নিয়ে দেশবাড়ি যাবে। আধার কার্ড সংশোধন করতে হবে। মা অস্থির হয়। ও গেলে সংসার চলবে কী করে? আজকাল মা অসংলগ্ন বকে। হয়ত গুরুতর বিষয় ভুলে ততটাও গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন বিষয় নিয়ে সি শার্পে একটানা বেজে গেল। মায়ের কথা নাগরিকপঞ্জী থেকে ছিটকে, ভেসে আসা ছাঁকনিতে আটকেছিল। ছাঁকনিটা কোথায় কে জানে! এখনই ওটা খুঁজে পেতে হবে। অন্তত দেশবাড়িতে চলে যাওয়ার আগে যেন জয়ন্তীদি ওটা খুঁজে দিয়ে যায়। যেন পিতৃপুরুষের দলিলে নয়, ওই ছাঁকনিতেই মায়ের শিকড়ের সুলুকসন্ধান আছে।

আমি কলকাতা বাদে শহর দেখিনি। রামগড় থেকে যাদবপুর, বাঘাযতীন, বাঁশদ্রোণী, নাকতলা, টালিগঞ্জ-এর মধ্যেই পাক খেয়ে গেলাম। বিশ্বাস করতে চাইলাম, আমার কোনো ভয় নেই। কিন্তু শিরদাঁড়ায় কিলবিলটা আটকানো গেল না৷ এক বুড়িকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল ৷ টিভিতে। বুড়ি বলছিল, 'মরেই তো যাব কদিন পর, আমারে ছেড়ি দাও৷' মা কেমন ভেবলে গেল দেখে।

ফিসফাস থেকে গুনগুন শুরু হয়। তারপর ক্ষোভ বাড়ে। চিৎকার। পোস্টার পড়ে বাজারে দোকানে ফেসবুকে৷ আজকাল পথের মোড়ে সভা টভা দেখলে দু মিনিট দাঁড়াই৷ বোঝার চেষ্টা করি,এরা কাগজ দেখানোর পক্ষে না বিপক্ষে। বাড়ি ফিরে নিয়ম করে তোরঙ্গ হাতড়াই৷ মায়ের স্কুল সার্টিফিকেট পাই না৷ বাবার নামে জমির দলিল পেয়েছি বটে, তবু নিশ্চিত হতে পারি না। ভোটার তালিকা খুঁজে ঠাকুরদার নাম বের করব কি নির্দিষ্ট আপিসে গিয়ে? সেখানেও মেলা ভিড়। বুঝভুম্বুল মুখে সব দাঁড়িয়ে। সাহায্য করার চেষ্টা করছে কর্মচারীরা, কূলকিনারা পাচ্ছে না৷ আমার শিরদাঁড়ায় সরিসৃপের চলাফেরা গাঢ় হয়৷

একদিন গড়ফার দিক থেকে ফিরছি৷ হঠাৎ, একটা মিছিল। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো। কী জোশ! শাল্লা! নিজেকে খাটো লাগে। খাটো হতে হতে মাটির সঙ্গে মিশে যাই। বুক ভর দিয়ে চলি। মিছিল মুখের উপর বলে দিচ্ছে, কাগজ দেখাবে না৷ আমার মুখে কথা সরে না৷ কখনও স্লোগান দিইনি। লজ্জা হয়৷ গলা বুজে আসে। কে না জানে,আমার ঠিক উপরে যে ম্যানেজার, তাকেও সমঝে চলা আমার কর্তব্য? রাজা উজিরের সঙ্গে পাঙ্গা নিতে আমি চাইনি। কিন্তু নেশা লেগে যায়৷ মানুষের সম্মিলিত গর্জনে নেশার মতো কিছু থাকে৷ যেন আশ্চর্য অঘটন ঘটবে একটা কিছু৷ যেন সমুদ্র বুক চিরে পথ করে দেবে ওরা তর্জনী তুললে৷ মানুষ মানুষকে ঘিরে ধরলে যেন আর ভয় নেই৷


ক্লিনিক ফেরতা আরও কয়েকটা মিছিলে হাঁটলাম এরপর। এখন স্লোগানের সঙ্গে ঠোঁট আলতো নড়েচড়ে। মিছিলের পর মিছিল হাঁটলে কিছু চেনামুখ দেখা দেয়৷ তারা ডাকে পরের মিছিলে। এভাবেই শালিনীর সঙ্গে আলাপ। শালিনীর বাড়ি গোবরডাঙায়৷ আমার মতো নয় ও৷ কলেজ থেকে পার্টি করা মেয়ে। ওর সঙ্গে মিছিল বাদেও হেঁটেছি কয়েকদিন৷ কলেজস্ট্রিট থেকে শিয়ালদা পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে ট্রেনে তুলে দিয়েছি৷ শালিনী মায়ের কথা জানতে চায়, বাড়ির কথাও ৷ কেন এসব জানতে চায়, তা ভেবে এক রাতে আজব শিরশিরানি হল। হয়ত কোনোদিন ও আমাকে ভালোবাসার কথা বলবে। নাকি আমিই বলব? সঙ্কোচে গলা বুজে আসে, আবারও।

শালিনীর পাল্লায় পড়েই সেদিনের জমায়েতে গেছিলাম। এসপ্ল্যানেডের মেট্রো-সুড়ঙ্গের পাশে বক্তৃতা চলছিল। গানও। শালিনী চমৎকার গায়! আমি কিছুই পারি না৷ পুলিশবাহিনী নজর রাখছিল দূর থেকে, যেমন রাখে।

হেলমেট পরেছিল তারা কোন ভয়ে কে জানে! মুখহীন রোবট ফৌজ ৷ ত্রস্ত হওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পাইনি আমরা৷ এরপর মিছিল করে রাজভবনের দিকে যাওয়ার কথা৷ ভিড়টা সারিবদ্ধ আকার নিয়ে চলমান হতেই ফৌজকে যেন কেউ প্রাণপণ দম দিয়ে ছেড়ে দিল । তখনই শালিনীর হাত ধরে বলেছিলাম, 'চলো, মেট্রো ধরে ফিরে যাই'। শুনল না৷ মিছিল এগোতে লাগল। দুপাশে গার্ড আর লাঠি হাতে পুলিশ। আমার সমগ্র অস্তিত্ব সান্দ্র হয়ে আবার রাজপথে গড়িয়ে গেল৷ সরিসৃপের আকার নিল। মিছিল গলে বেরিয়ে যেতে চাইছিলাম৷ একটা ঢপ দিতে হল। ভান করলাম, যেন ফোন এসেছে বাড়ি থেকে।


'হ্যাঁ, কী হয়েছে? কী? মায়ের বুকে কষ্ট? কতক্ষণ? সেকী?'

শালিনী ঘুরে তাকাল আমার দিকে, যেমন আশা করেছিলাম। জিজ্ঞেস করল, 'কী হয়েছে?'

বলল, বাড়ি ফিরতে। ওকে ফেলে আসতে আমার সত্যি অপরাধবোধ হয়েছিল৷ কিন্তু যত দ্রুত সম্ভব মেট্রোর গভীরে সেঁধিয়ে গেছিলাম, তাড়া খেয়ে সাপ যেভাবে গর্তে ঢুকে পড়ে। মেট্রোর পেটের ভিতর মোবাইল টাওয়ারের ছুটি। যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে নিশ্চিন্ত বোধ করেছিলাম৷ ডাকার উপায় না থাকলে ডাকে সাড়া না দেওয়ার দায় নিতে হয় না৷

মেট্রো থেকে নামার পরেও কোনো ফোন পাইনি। রাতে খবরে দেখেছিলাম মারপিট, হাতাহাতির ক্লিপিংস। এলোপাথাড়ি লাঠি। মেয়েদের মাটিতে ফেলে পেটে পা তুলে দিচ্ছিল৷ শালিনীকে খুঁজছিলাম৷ দেখতে পাইনি। রাজিবুলকে দেখা গেছিল ধ্বস্তাধস্তি করতে। চ্যানেল বারবার দেখাচ্ছিল একই দৃশ্য। কখনও মন্থর করে, কখনও স্বাভাবিক গতিতে৷ অকুস্থলের সাংবাদিক আর স্টুডিওর পরিবেশক উত্তেজিত হয়ে কী যেন বলাবলি করছিল নিজেদের মধ্যে। তারপর সব ধোঁয়া হয়ে গেল বিজাতীয় গ্যাসে।

আর দেখা করিনি শালিনীর সঙ্গে। সরিসৃপটা জানান দিত। একটা পিচ্ছিল, ল্যাদল্যাদে দলা হয়ে কোনো রকমে আটকে থাকতাম দেওয়ালের সঙ্গে৷ দেওয়াল থেকে পড়ে না যাওয়া ছাড়া আর কোনো মহত্তর অভিযানে আমার মতি ছিল না৷

দীর্ঘ দুটো দিন পেরিয়ে শালিনী ফোন করল সেদিন ভোর তিনটেয়। ওদের ডিটেইন করেছিল সেদিন, ছেড়েও দিয়েছিল৷ কিন্তু তারপর আবার রাজিবুলকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার কী কারণ থাকতে পারে, তা নিয়ে বিস্মিত ছিল সে। অথচ আমি পরদিনও ওদের সঙ্গে যেতে চাইলাম না৷ মার্কড হতে চাই না৷ মিছিলে হাঁটা যায়, ভিড়ে মিশে৷ মিছিলের মুখ হতে চাই না আমি। লফড়া চাই না৷ ভয় করে৷

জানলা দিয়ে গিলোটিনে কাটা প্রত্যঙ্গের মতো আমার হাতটা ঝুলছিল। তাতে লাল অগ্নিবিন্দু৷ একটা কুকুর ঘেউ বলে সুর তুলতেই আরও অনেকে তার সঙ্গে গলা মিলিয়েছিল। তন্দ্রাটাও কেটে গেল। ভীষণ ভয় পেলে আমার ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। যেন ঘুমোলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। জেগে উঠে দেখব, কাগজপত্রের ঝক্কি নেই, মারপিট-ধ্বস্তাধস্তি নেই। যেন মাকে নিয়ে জলপাইগুড়ি বেড়াতে গেছি। শুখা নদীর চরে মা গত জন্মের টুকিটাকি খুঁজছে, খুঁজে পেয়ে খুশি হচ্ছে।

মায়ের ঘুম আবার ভাঙাতে চাইনা বলে অন্ধকারেই প্লাস্টিকের ছোট বাক্সটা হাতড়াই৷ একটা ওষুধ বের করি মোবাইলের আলোয়৷ খাওয়ার পর যে আধঘন্টা লাগে ঘুমিয়ে পড়তে, তার মধ্যে শালিনী আসে। শালিনীকে কি আমরা নিয়ে যাব জলপাইগুড়ি? যাবে ও? ও জানেনা, সেদিন আমি পালিয়েছিলাম। আমি জানি। প্রতারক সরিসৃপকে তাড়ানোর আগেই ঘুমিয়ে পড়ি৷


সকালে আবার ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙে। ফোন না কলিংবেল? নাহ্, এবার সত্যি কলিংবেল৷ ধড়মড়িয়ে বসি। পিঠে কিলবিলিয়ে ওঠে সে৷ কে এল? জয়ন্তীদি জানায়, তেমন কেউ নয়, ইস্ত্রিওয়ালা। অথচ মাথায় আবার ধাঁই ধাঁই বুটের শব্দ। সক্কাল সক্কাল মাথা যন্ত্রণা শুরু হলে সারাদিন কাটবে কীভাবে? ফোন ঘেঁটে সেন্টারের মেসেজ দেখি। ফাস্টিং-এর রক্ত আনতে যেতে হবে অমুক ঠিকানায়৷ রক্ত টানার আগে বেকুব মানুষের মুখে ভয় দেখি। আমোদ পাই। অথচ তারপর পিঁপড়ে-কামড় সয়ে যায়। ফাস্টিং-পিপি-ফাস্টিং-প িপি। বারবার সূঁচ বেঁধালে ভয় কেটে যায় নাকি ভয়ের অভ্যাস তৈরি হয়?

ওরা কেউ আর ফোন করে না৷ ওরা কি বুঝে গেছে যে ওদের এড়াচ্ছি? বিকেলের দিকে শালিনীকে ফোন করতে যাই। তারপর মনে পড়ে, ফোন ট্যাপ করা হতে পারে৷ কেটে দিই।


বাড়ি ফিরে ছটফট করি। কী হল রাজিবুলের? ফেসবুক দেখি৷ দেওয়াল থেকে দেওয়ালে ঘুরি৷ সাতটা ধারায় কেস দেওয়া হয়েছে, জানা যায়৷ বেশিরভাগ জামিন অযোগ্য। ছেলেটা মুখ-চেনা৷ আলাপ নেই। আমার চেয়ে বয়সে সাত-আট বছরের ছোট। সিড়িঙ্গে, শান্ত ছেলে। শালিনীর পাতানো ভাই। শালিনী বলছিল, পুরুষ পুলিশ ওর জামার গলাটা ধরে ঝাঁকুনি দিচ্ছিল যখন, তখন রাজিবুল ওর পাতলা শরীর নিয়ে ঢুকে পড়েছিল পুলিশ আর শালিনীর মাঝখানটায়৷ মেয়েদের গায়ে ছেলে পুলিশের হাত তোলা নিয়ে কিছু বক্তিমেও দিয়েছিল। বিরোধিতা বা স্পর্ধা সহ্য করলে উর্দির অপমান হয়। রাজিবুল মার খেয়েছিল ক'ঘা। ডিটেইন্ড হয়েছিল৷ থানায় গিয়েও তার বোলচাল কমেনি৷ তাকে মার্ক করা স্বাভাবিক ও সহজ ছিল৷

ইচ্ছে করল, অন্তত একটা লম্বা-চওড়া রাগি পোস্ট লিখি। শালিনী খুশি হবে৷ কিন্তু সরিসৃপের হাত ছোট হতে হতে বুকে সেঁধিয়ে গেছে৷ খবরটা শেয়ার করতেও হাত সরল না। আমার নিজস্ব শরীর অচেনা রূপান্তরের ধারাবিবরণী হয়ে উঠল৷ হাত নেই, আঙুল নেই, জিহ্বা দ্বিখণ্ডিত৷ বোবা সরিসৃপ মোবাইল জড়িয়ে শুয়ে আছে খাটের উপর। ওষুধ খাইয়ে তাকে ঘুম পাড়ালাম৷

পরের সকালে বেল বাজেনি। মোবাইলও না৷ মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙল৷ জয়ন্তীদি জানালার পর্দা সরাতেই রোদ ঝাঁপিয়ে পড়ল। বেলা দশটা। আজ গু মুত না রক্ত-কী আনতে যেতে হবে, মোবাইলে খোঁজার চেষ্টা করি। মা অনর্গল বকছে বলে সব গুলিয়ে যায়। মা বালিকার মতো উচ্ছ্বসিত আজ। হয়েছেটা কী? দিদিমার ছাঁকনিটা খুঁজে পাওয়া গেছে অবশেষে। মুখে শাড়ি চাপা দিয়ে হাসছে জয়ন্তীদি৷ অশীতিপর বালিকা মা আমার। আমার সামনে ছাঁকনিটা ধরে নাড়াচ্ছে গোল গোল চোখে। কী যে বলছে হাবিজাবি, মাথায় ঢুকছে না। ছাঁকনির ইতিহাস, ভূগোল, জ্যামিতি।

সেই মুহূর্তে স্থির করি, শালিনীকে ফোন করতে হবে একটা। করতেই হবে। মায়ের পিছনে সকালের জানালা। খাটের উপর ওষুধের বাক্সে আলো পড়েছে। শিশুর জমানো রাংতার মতো চকচকে হয়ে উঠেছে ট্যাবলেটের স্ট্রিপ। আর আমার মুখের উপর ছাঁকনি দিয়ে জলপাইগুড়ির রোদ চুঁইয়ে পড়ছে।