কাগজের বাঘ মানুষখেকো

সরোজ দরবার

পাপ কিংবা পুণ্য- দুটোকেই আজকাল জীবনে বাড়তি মনে হয় অভিরামের। আগেও যে এ-দুটোকে খুব গুরুত্ব দিত, তা নয়। তবু মানুষের মাথায় কিছু কিছু জিনিস গেঁথে-ই থাকে। যেমন বদ লোকে গাছের গায়ে পেরেক বিঁধিয়ে দেয়; তাতে যন্ত্রণা হয়, কিন্তু মুক্তি নেই; যতক্ষণ না অন্য কেউ বের করতে সাহায্য করছে। পাপ-টাপ নিয়েও সেই একই ঝামেলা।
অভিরামকে অবশ্য মুক্তি পেতে কেউ হাতেনাতে সাহায্য করেনি। বয়স খানিকটা বেড়েছে; ফলে জীবন গড়িয়েছে। আর, সত্যি বলতে মৃগেন মজুমদারকে বেশ কয়েক বছর হল সে কাছ থেকেই দেখছে।
হাজার বিশেক টাকা হুট বলতে কে বার করে দেয়! বিশেষত তার মতো চালচুলোহীন, মজুরকে ধার দিতে কারোরই হাত ওঠার কথা না! মৃগেন কিন্তু দিয়েছিল। কন্‌স্ট্রাকশনের কাজে কোম্পানির সঙ্গে এখানে ওখানে ঘুরতে হয় অভিরামকে। যেখানে যায় সেখানেই বেশ মাসকয়েকের আস্তানা। যাদবপুরের দিকে এরকমই একটা কাজের সময় মৃগেনের সঙ্গে আলাপ।
মায়ের সেইসময় খুব অসুখ। অভিরাম বুঝতে পারছিল না, অসুখটা কী! এমনকি, তার নাগালের মধ্যে যে ডাক্তারবাবু, তিনিও ধরতে পারছিলেন না। বড়ো ডাক্তার দেখানো দরকার। কিন্তু টাকা কোথায়! কন্ট্রাক্টর তো হারামির গাছ! হাত উপুড় করবে না! ভগবানের খেলা বা লীলা যাই-ই বলা হোক না কেন, ঠিক এমন সময়েই মৃগেনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল অভিরামের।
- লেখাপড়া না করেই দিবেন?
- তুই জানিস লেখাপড়া?
- নাম সই করতে পারব!
- আচ্ছা আচ্ছা হয়েছে। অত বিদ্যে জাহির করতে হবে না। সময় করে শোধ দিস। আর, দরকার পড়লে একটু পাশে এসে দাঁড়াস।
মৃগেনকে মহাপুরুষ মনে হতেই পারত। কিন্তু অভিরামের তা মনে হয় না। জীবনে হোঁচট খেতে খেতে এরকম ভাবাভাবির বিলাসিতা পেরোতে শিখেছে সে। তার টাকার দরকার। আর, মৃগেনেরও তাকে দরকার। সে জানে; আজ নয় কাল, ঘর তোলা না-হোক, ঘর ভাঙার কাজে। মোদ্দা কথা- এটা লেনদেন। কৃতজ্ঞতার কিছু নেই এতে। তবু স্বাভাবিক ভদ্রতাবশে একটা বিড়ি সে অফার করেছিল। মৃগেন হেসে সেটা নিয়ে পকেটে পুরেছিল। বদলে সোনালি-প্যাকেট থেকে দুটো সিগারেট বের করে, একখানা অভিরামের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, নে ধরা।
**
টাকাগুলো জলের মতো বেরিয়ে গেল। মায়ের অসুখটা তবু ভালো হল না। না-সারুক, কী হয়েছে অন্তত সেটুক তো ধরা পড়বে! তা-ও পড়ল না। অভিরাম কিন্তু চোখের সামনে দেখতে পায়, মা আর আগের মতো নেই। কী যেন একটা হয়েছে। সেই একই মানুষ, তবু যেন এক নয়। অথচ মা, তার মা-ই তো!
মা এখন তাকে বারবার বলে, আমাকে দেশে রেখে আয় বরং। তোর এত কাজ। আমার অসুখ। সামলাবি কী করে!
কী করে সামলাবে অভিরাম জানে না। বিয়ে-থা’র পথ মাড়ায়নি সে। তা হলেও না-হয় মায়ের পাশে কেউ একজন থাকত। কিন্তু সে-কথা আলাদা। কথা হল, দেশ বলতে মা যা বলছে, সেই দেশ-ই তো আর নেই। অর্থাৎ দেশের বাড়ি। মা জানে না, যে-দোতলা মাটির বাড়িখানায় ফিরে যাওয়ার জন্য তার মন আনচান, সে-সব কবেই ভেঙে, ইট-কাঠ-টালি বিক্রি করে একেবারে পাট চুকিয়ে এসেছে অভিরাম। তার কাছে তাই দেশে ফেরা বলতে আর-কিছু হয় না। যদিও এসব একচুল-ও জানে না বলে মায়ের কাছে এখনও একটা দেশ আছে। কার কাছে কীভাবে যে দেশ থেকে যায়, কেউ জানতে পারে না। ভাবতে-ভাবতে শুধু বড়ো একটা নিঃশ্বাস গোপন করে অভিরাম।
কিন্তু মায়ের অসুখটা যে কী, তা শালার শালা ডাক্তার কিছুতেই ধরতে পারল না। মায়ের কি কোনও গভীর অসুখ ছিল? অভিরামের মনে পড়ে, তার বাপ মরার সময় তাকে বলেছিল, তোর মা-রে চোখে চোখে রাখিস, দেখিস, ও যেন চলে না যায়।
মা কোথায় যাবে! মা-র কি তবে কোথাও যাওয়ার ছিল! অভিরাম আজও সে-কথার মানে বুঝে উঠতে পারে না। বরং এক-একদিন এরকম ভাবনাচিন্তা সবকিছু গুলিয়ে গেলে, সে বেদম মদ গিলে ফ্যালে। যেমন আজ খেয়েছে; একটু বেশি-ই। নেশা জমে এলে অভিরামের মনে হয়, ঝুপ করে সন্ধে নামছে পাড়ায়। আর অনেকগুলো পাখি গল্প করতে-করতে ঘরে ফিরছে। অভিরামের ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তার ঘর নেই। কুচুটে বাড়িওয়ালার ভাড়াবাড়িতে তার ফিরতে ইচ্ছে করে না। সে জানে, এ-জন্মে তার ঘর করার মতো পয়সা হবে না। উলটে মৃগেনের কাছেই ধার হয়ে গেছে বিশ হাজার টাকা। শোধ না-করলে কি পাপ হবে! যদিও আজকাল পাপ-পুণ্য কোনোটারই কোনও মানে নেই তার কাছে। জীবনে দুটোকেই বাড়তি লাগে তার। বরং খুব দরকারি মনে হয় নিরবচ্ছিন্ন ঘুম। যেন একান্ত নিজের ঘর। একবার ঢুকে পড়লে শান্তি। খুব আয়াস করে সেই গভীর ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ে অভিরাম।
২)
- কাজটা কিন্তু তোকে করে দিতেই হবে অভিরাম।
- আর অন্য কিছু কাজ পেলে না?
- কেন এটা বুঝি কাজ নয়?
- ক-টা মেয়েলোক চুপ মেরে বসে থাকে, তাদের সামনে গিয়ে কি হম্বিতম্বি করব?
- হম্বিতম্বি করবি কেন? বুঝিয়ে বলবি, এভাবে বসে থাকতে নেই, উঠে যাও।
- উঠে কোথায় যাবে?
- যেখান থেকে এসেছে।
- সে কোথায়?
- ওদের দেশে।
- সে কোন দেশ?
- তা তো তোর জানার দরকার নেই। তুই কি চাস, তোর দেশ অন্য কেউ জবরদখল করে থাকুক?

মৃগেনের প্রশ্নে মাথা নিচু করে অভিরাম। এতক্ষণ ধরে তাকে মৃগেন বুঝিয়ে চলেছে, দেশ বাঁচাতে মহিলাদের যে-ধরনা চলছে, সেটাকে তুলে দিতে হবে কায়দা করে। আর তার নেতৃত্ব দিতে হবে অভিরামকেই। কিন্তু অভিরাম-ই কেন? সেটা তার মাথায় না-ঢুকলেও, মৃগেনের নিশ্চিত-ই কিছু ভাবনা আছে। যেমন সে এখন অভিরামকে বোঝাচ্ছে,- এই যে তুই নিজের দেশে ভবঘুরে হয়ে আছিস, এ কাদের জন্যে বল? এদের মতো লোকের জন্যই নয় কি? যারা বাইরে থেকে এসে এদ্দিন ধরে খাচ্ছে-পরছে, আবার দেশের কথা ভাবছেও না, তাদের সামনে গিয়ে যদি একটু হম্বিতম্বিই করিস, তাতে কি তোর পাপ হবে, নাকি পুণ্য? ভেবে দেখিস।
দেশ না বাপের জমিদারি! মনে মনে হাসে অভিরাম। আসলে দুটো কথা মৃগেন জানে-ই না। যেদিন থেকে দেশের বাড়িটা বেচে দিয়েছে, সেদিন থেকে অভিরামের আর-কোনো দেশ নেই। আর, দ্বিতীয়ত, পাপ-পুণ্য নিয়ে তার আর কোনও মাথাব্যথা নেই। যতক্ষণ ছিল, ততক্ষণ দেশের জমি-বাড়ি বেচা নিয়ে তার মন খিচখিচ করত। কিন্তু মাথা থেকে ওসব ঝেড়ে ফেলতেই দেখল, শান্তি এসেছে। এসব মৃগেনের জানার কথাও নয়। সে টাকা দিয়েছে; তাই কাজ বুঝে নিতে চাইছে। যদিও সেই টাকায় যে-কাজ হওয়ার কথা ছিল, তা আর হয়নি। মায়ের অসুখটা আর সারল না। শুধু ডাক্তারের পকেট ভরল। আর এখন মৃগেনের কাজ হাসিল হচ্ছে, এই-ই যা।
মৃগেন দেশ-ফেশ নিয়ে আরও লেকচার দিচ্ছিল; যথা, এরা জাতীয় সংগীত গায় না, বন্দে-মা-তরম বলে না, এমনকি গুচ্ছের বাচ্চা পয়দা করে গোটা দেশটাকে নিজেদের ধর্মের করবে বলে গোপনে কসম খায় ইত্যাদি প্রভৃতি। অভিরামের বিরক্ত লাগে। সে-ও বন্দে-ফন্দে বলতে পারে না। পেটের দায়ে নিজের ভিটে-ও বেচে দিয়েছে; তো! তারও কি তবে দেশ নেই!
হাত তুলে মৃগেনকে থামিয়ে সে তাই বলে, আচ্ছা আচ্ছা, থামো। যাবখ’ন সন্ধেবেলা। তবে বেশি বাওয়াল করতে পারব না।
‘এ মা বাওয়াল করতে বলেছি নাকি!’ জিভ কাটে মৃগেন, ‘সেরম হলে তো ক্যাওড়া লোক পাঠানো যেত। আমি কি তা করেছি! তোরা যারা সত্যিই ভুক্তভোগী, তাদেরই সমস্যার কথাটা বুঝিয়ে বলতে বলেছি। সত্যিই তো বল, এই যে তোদের ঘর নেই, পেটের দায়ে হেথা-হোথা ঘুরছিস, আর ওরা কেমন বাইরে থেকে এসে মৌরসিপাট্টা গেড়ে ফেলেছে। তোরা শুধু গিয়ে শান্তিমতো এটুকুই ওদের বুঝিয়ে বলবি। তারপর ওরা যা ভালো বোঝে, তা-ই করবে!’
কিন্তু এমন শান্তির কথা যে মৃগেনরা নিজে গিয়ে কেন বুঝিয়ে বলছে না, সেটাই মাথায় ঢোকে না অভিরামের। এদের হাতে এত ক্ষমতা, অথচ ক-জন মহিলাকে না-তুলে শান্তি নেই। শালা বোকাচোদার দল! যাই হোক, তার দায় সে মিটিয়ে দেবে, ব্যস।

৩)
প্রথমে জাতীয় সংগীত বাজল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকে অভিরামেরা। একে একে মাঠের মধ্যে বয়স্ক মহিলারা আসছেন; অনেকে আগে থেকেই এসে বসে আছেন। কমবয়সিরাও আসছে। কাঁখে ছেলেপুলে নিয়ে আসছে। বড়ো করে আলো দেওয়া হয়েছে। মাইকে গান হচ্ছে। কিন্তু এসব করে কী হবে! এতে কি আর দেশ ফিরবে!
অভিরাম জানে, এরা একটা দেশ আঁকড়ে ধরতে চায়। দেশ কখনও কাগজের প্রমাণ চায় না। সরকার চায়। সরকার ভোটার, রেশন কার্ড দেয়। কিন্তু সেই সব কার্ড তো আর মানুষ নয়, সরকার-ও দেশ নয়।
অথচ আসামে নাকি এমন হয়েছে। প্রমাণ না-পেয়ে অনেক মানুষকে সরকার নিজের দেশেই জেলে ঢুকিয়ে দিয়েছে, শুনেছে অভিরাম। কিন্তু সে কখনও আসামে যায়নি। দেখেনি, সত্যি কী হয়েছে। কিন্তু এটা তো সে সত্যি সত্যি দেখেছে যে, যেখানে যেখানে তাদের কোম্পানির কাজ হয়, সেখানে কীরকম রাতারাতি বস্তি ফাঁকা করা হয়। বরোর কাছে জানতে চাও, বলবে, এ-বিষয়ে তাদের নিশ্চিত কিছু জানা নেই। বলবে, নাইট শেল্টারের ব্যবস্থা তো আছে। আছে না কচু! রাতারাতি শয়ে শয়ে লোক ঘরহীন হয়ে যায়। আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। সব পুড়ে ছাই।
আর, গরিব মানুষের জমিয়ে রাখার মতো থাকেই বা কী! এক স্মৃতি ছাড়া!
সেই পোড়া ছাইয়ের উপর অট্টালিকা বানায় অভিরামেরা। তার ভিতর বসে আবার দেশ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করে বড়োলোক মানুষরা।
আর, সেই দুশো-পাঁচশো মানুষ!
তারা আজ এখান থেকে ওখান, এই-ই করতে থাকে। কত-কত-কত্ত এমন মানুষকে জীবনে দেখেছে অভিরাম। সরকার তাদের দেখে না। দেশের মধ্যে তবু এমনিই তারা মাথা গুঁজে থাকে। অথচ সরকার খালি কাগজ চায়। একবার সবকিছু কেড়ে নিয়ে, পরক্ষণেই বলে- দেখাও যে, সবকিছু ছিল! সবার আগে তো মানুষগুলোকে সরকারের কৈফিয়ৎ দেওয়া উচিত। কেন সব কেড়ে নিল, কেন একভাবে থাকতে দিল না! কিন্তু কে দেবে! সরকার বদলে যায়! মানুষের কপাল বদলায় না।
সেবার কে যেন বলছিল, পশুদের জঙ্গল নেই, তাই বাঘ-টাঘ মাঝেমধ্যেই মানুষের এলাকায় ঢুকে পড়ছে। কেন-না মানুষ-ই জঙ্গল কেটে ফেলছে। এদিকে মানুষেরও থাকার জায়গা নেই। মানুষই মানুষের থাকার জায়গা খেয়ে ফেলেছে। ফলে সারা দেশে একদল মানুষের কাছেই বাড়তি হয়ে গেছে আরও বহু বহু মানুষ। নদিয়ায় নাকি পুরুলিয়ার লোকেদের সেই কত্ত বছর আগে নীল চাষের জন্য ধরে এনেছিল নীলকর সাহেবরা। তাদের সক্কলের পদবি ‘রাজোয়াড়’। তা নীলকর সাহেবরা যে কী দয়ালু ছিল, সে সবাই জানে। কাজ মিটে গেছে, এদেরও ফেলে চলে গেছে। বেচারাদের ভিটে বলতে যা-ছিল সবই গ্যাছে তদ্দিনে। জমিদারের দয়ায় ওই এলাকাতেই থাকার আশ্রয়টুকু পেয়েছিল। সেই মতো চলছিল। এই বছর পনেরো আগে সরকারের লোক স্থির করেছে যে, তাদের তো ‘পাট্টা’ নেই, ফলে তারা দখলদার। তাদের ধানজমিতে বাবুরা ইউক্যালিপ্টাস বুনে দিয়েছিল তাই।
সে-গল্প শুনে শিউরে উঠেছিল অভিরাম। সে কল্পনা করে তার এক ছটাক জমিতেও যদি কেউ এরকম করত, তাহলে কি সে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারত। যদিও এ-ভাবনার পরের মুহূর্তেই সে নিজেকে থুতু দিয়েছিল। কারণ, ছটাক জমিও সে আসলে বেচেই দিয়েছে। সে স্বেচ্ছায় ভিটেমাটি খুইয়েছে।
তবে লোকটি বলছিল, জমির দরকার। সরকারের অনেক জমির দরকার। মাটির তলা খুঁড়ে ফেলা দরকার। জঙ্গলের নিচ থেকে সব তুলে আনতে হবে। এখন, জঙ্গল, কৃষিজমি কারা আগলে রাখে? যারা রাখে তাদের কিছু একটা নামে দাগিয়ে দিলেই হয়। ধরা যাক, বলা হল, তুমি মাওবাদী। তারপর ‘রেড করিডর’ নাম দিয়ে দিলেই একটা এলাকায় মাটি আগলে যারা আছে তাদের উপর গুলি চালানো জলের মতো সহজ হয়ে যায়। এরকম চলতেই থাকে। আর একে একে জঙ্গল দখলে চলে আসে। খনি-খাদানের বেআইনি মুখ সব খুলে যায়। কী নতুন একটা ফার্ম তৈরি হয়। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ... যজ্ঞ চলছে। তাই নরবলি।
আর যে-এলাকাকে সরাসরি এভাবে দাগিয়ে দেওয়া যায় না, অথচ সে-জমিও দরকার, সেখানে হয় বস্তিতে আগুন দাও। আর নয় সে ভূমির অধিবাসীকে স্রেফ বলে দাও, তুমি এ-দেশেরই কেউ নয়; ফোটো। তখন সে পালটা বলবে, আমি তো দেশেরই। তাকে তখন বলা হবে, প্রমাণ আছে? প্রমাণ? কাগজ আছে?
কাগজ নিয়ে তখন যুদ্ধ বাধবে। কাগজই তখন বাঘ হয়ে মানুষকে খাবে।
আমাদের কি তাহলে পাপ হচ্ছে? প্রশ্ন করেছিল অভিরাম। লোকটা বলেছিল, পাপ-পুণ্য নিজের নিজের ব্যাপার ভাই। সে শুধু মানুষকে জ্বালায়। সরকারের ওসব পাপ-পুণ্য নেই।
আর, কাগজের বাঘ? আবার জিজ্ঞসে করে অভিরাম। লোকটা সেদিন বলছিল, জানো তো, মানুষ বাঘ মারতে শিখেছে অনেকদিন, কিন্তু কাগজের বাঘ তো কাগজ নয় ছিঁড়ে ফেলবে, বাঘও নয় যে তির ছুড়ে মারবে। তাহলে? অভিরেয়াম অবাক হয়। লোকটা ঠোঁট-টানা হাসি হেসে বলে, সেই জন্যেই তো কাগজের বাঘ খতরনাক চিজ।
চমকে উঠেছিল অভিরাম। সেই লোকটার সঙ্গেও আর কখনও দেখা হয়নি। কথাগুলোও যে তার মাথায় তেমন ঘাই দিয়েছে তা নয়। সরকারের মতোই সে পাপ-পুণ্যের বোধ শিকেয় তুলে দিয়েছল। বেশি জ্বালা ধরলে একটু মদ খেয়ে নিত। ব্যস, তাতেই শান্তি। কিন্তু কী যে পাপের শাস্তি, আজ আবার তাকে সেই চক্রেই এসে পড়তে হল। আর পড়বি তো পড়, কেন কে জানে, আজ এই মহিলাদের সামনে দাঁড়িয়ে সেই লোকটার কথাগুলোই মনে পড়ে গিয়েছিল তার।
অভিরাম তাই কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না, এইসব মহিলাদের এখন ঠিক সে কী বোঝাবে! কোথায় যেতে বলবে এদের! যদি তার মা-ই এখানে বসে থাকত, তাহলে তাকেই-বা কোথায় চলে যেতে বলত সে! মরার আগে বাপ বলেছিল, দেখিস তোর মা যেন চলে না যায়!
ঠিক কোথায় চলে যাওয়ার কথা ছিল মায়ের! কেন সারছে না মায়ের অসুখ!
ভাবতে ভাবতে মাথায় রক্ত চড়ে যায় অভিরামের! সরকার খেতে দিতে পারে না, থাকতে দিতে পারে না, অসুখ সারাতে পারে না- তা-ই সই; কিন্তু দেশ তো কাউকে দিতে হচ্ছে না। তাহলে এত গাত্রদাহ কীসের! কেন প্রত্যেকের নিজের দেশ কেড়ে নেওয়ার জন্য সবাই এত উলসে উঠেছে! কাগজের বাঘ, তার এত গায়ের জোর কেন!
শিরায় আগুন ছুটে যায় অভিরামের। চোখটা বন্ধ করে সে। তারপর গোপনে আনা একটা সাইকেলের চেনের একটা দিক হাতে জড়িয়ে এলোপাথাড়ি চালাতে থাকে মৃগেনের ছেলেদের উপর। সে জানে, মালগুলো আসলে কারা! মৃগেন তার মতো দু-চারটে ছেলেকে সামনে রেখে পাঠিয়েছে তার লেঠেলবাহিনী। দোষ হলে, তার মতো মজুরদের হবে। ফলে পরের যা চোটপাট, সে-ও তাদের উপর দিয়েই যাবে। আর মৃগেনের ছেলেরা ধোয়া তুলসীপাতা। খুন-জখম করে হাসতে হাসতে বেরিয়ে যাবে।
একবারও তাই চোখ খোলে না সে। মাত্র মিনিট কয়েক সাঁইসাঁই হাত চলে। কেউ আটকাতে পারে না তাকে। এমনকি উলটোদিক থেকে আসা কিল-চড় দু-একটা যেন তার গায়েই লাগে না। গায়ের সব শক্তি দিয়ে তার হাতের চেন চলে।
তারপর চোঁ চোঁ দৌড়। নিজের দেশে নিজেই পালাতে থাকে অভিরাম। কোথায়, তা অবশ্য জানে না।
৪)
কেন যে মাথায় এমন আগুন চড়ল, সে জানে না। এই এতটা মদ খেয়েও সে কিছু-ই বুঝে উঠতে পারছে না। মৃগেন মজুমদার নিশ্চিত তাকে ছাড়বে না। তার থেকেও বড়ো কথা, পুলিশ এবার তাকে কুত্তার মতো খুঁজবে। মৃগেন তো পুলিশ লেলিয়ে দেবেই। সত্যি বলতে সেই প্ল্যান করেই তাদের পাঠিয়েছিল। কেস খেলে যাতে তারা খায়, পার্টির পোষা কুত্তাদের গায়ে আঁচড় না-লাগে।
এসব ভাবতে ভাবতেই, তার ভীষণ জরুরি একটা কথা মনে পড়ে যায়। হয়তো তাকে এরপর মেরেই দেবে মৃগেনের লোকেরা। তার আগে মায়ের সঙ্গে দেখা করা দরকার। অন্তত শেষদেখাটা তো হবে।
তখন বেশ রাত। টলতে টলতে বাড়ির কাছাকাছি আসতেই দ্যাখে, সামনে একটা জটলা। তবে কি পুলিশ এসে গ্যাছে! চোখ কচলে দ্যাখে সে। সবাই আশেপাশের লোকজন। মামনির মা, আয়েশার ঠাকুমা, আরও কে কে যেন! কী হয়েছে জানতে চায় অভিরাম।
তাকে দেখে ডুকরে ওঠে আয়েশার ঠাকুমা; বলে, এতখ্‌ন কোথায় ছিলি রে বাপ!
আর-একটু এগিয়ে গিয়ে অভিরাম দ্যাখে, মা পড়ে আছে মাটিতে। সন্ধের পর কারা যেন এসে মেরে রেখে গেছে তার মাকে! তার মোবাইলে অনেকবার ফোন করেছিল। কিন্তু সে শালা কোথায় কখন পড়ে গ্যাছে, কে জানে!
হঠাৎ অভিরামের মনে হয়, সে নিজেই তার মাকে মারতে আসেনি তো! মদের খেয়ালে! তারপর নিজেই নিজেকে প্রবোধ দিয়ে বলে, না সে আসেনি। নিজের হাতে সে মাকে হত্যা করেনি। কিন্তু এ-ও ঠিক যে, সন্ধেয় সে যা করেছে, তার জন্যেই মৃগেনের লোকেরা এসে তার মাকে মেরে রেখে গেছে। সেই হিসেবে, সেই-ই তার মাকে মেরেছে।
ধপ্‌ করে বসে পড়ে অভিরাম। নিজের দু-হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দ্যাখে সে। না, তার হাতে কোনও কুঠার আটকে নেই। তবু সে মাতৃহত্যা করেছে। কিন্তু কারও বাপের হুকুমে নয়। অভিরাম মনে মনে বিচার করে দ্যাখে, সত্যিই, শুয়োরগুলোর উপর সেই সময় চেন চালনো জরুরি ছিল। নইলে অতগুলো বুড়ির উপর দিয়ে যে কী চলত কে জানে! উলটে তার মা-ই মরে গেল!
তার পাপ হল এতে! নাকি পুণ্য! ভেবে পায় না অভিরাম। পাপ-পুণ্য দুটোকেই আজকাল তার বাড়তি মনে হয়। কাগজের বাঘও তো মরে না। মায়ের ডেড বডিটার দিকে তাকিয়ে তবু সে বিড়বিড় করে বলে, দেশটা কারও বাপের নাকি শালা!
~~
ঋণঃ আমাদের চরাচর/জয়া মিত্র