সময়ের ভাষা, ভাষার সময়

আসমা চৌধুরী

আমরা যখন বড় শহরে যাই কিছু নতুন ধারণা ও শব্দ মাথাকে পরিষ্কার করে। কখনো তছনছও করে। ছোট্ট মেয়েটি প্রথম ঢাকা গিয়ে অনেক মজার জিনিস দেখে।চিড়িয়াখানা দেখে, রাজু ভাস্কর্য দেখে, বইমেলা দেখে। সেইসাথে অবাক হয়ে একটা নতুন শব্দ শিখে 'জ্যাম'। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যান জটে থেকে তার অর্জন নতুন একটি বাক্য 'জ্যামে আটকা পড়েছি'। এভাবে গঠনগত দিক থেকে গ্রহন, বর্জনের ভেতর দিয়ে ভাষা এগিয়ে যায়, বদলে যায়। ভাষা এক গানের পাখি, সকালবেলার গান। সবাইকে মুগ্ধ করে, অবাক করে, চঞ্চল করে, ঘুম ভাঙায়, জাগায়। তাই মানুষ মাতৃভাষার জন্য পথে নামে। বুকের রক্ত ঢেলে দেয় রাজপথে।সালাম, রফিক, জব্বার, শফিক, বরকত চেতনার অংশ হয়ে ওঠে। মানুষ বুঝতে পারে বৈষম্য। উপলব্ধি করে নিজস্ব ভূমির প্রয়োজন। আসলে ভাষা হচ্ছে আপন হবার সূতো, ঐক্যের শক্তি।

একবার কলকাতা হয়ে 'করমণ্ডল ট্রেনে' চেন্নাই যাব চিকিৎসার প্রয়োজনে। গরমের দুপুর। দরদর করে ঘামছি। বসার জায়গাগুলো ভরে গেছে। ট্রেন আসছে না। প্লাটফর্মের মেঝেতে রুমাল বিছিয়ে ছাতু আর মোটা মোটা লাল মরিচ পোড়া ভাগ করে খাচ্ছে কয়েকজন শ্রমিক। শ্রমিক বুঝলাম ওদের পাশে রাখা যন্ত্রপাতি দেখে। দূরে কোথাও যাবে কাজের সন্ধানে। কী যে শান্ত তারা। ট্রেন এলে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে যায় নিঃশব্দে। আমি আমার সঙ্গীর দিকে তাকালাম, সে বললেন, শিক্ষকের শিক্ষক।শব্দদুটো মাথায় আশ্রয় নিলো।

গরমে কাবু হয়ে গেছি। দাঁড়িয়ে আছি তখনো। আমার পাশে হিন্দিভাষায় কথা বলা এক নারী দাঁড়িয়ে। আশে-পাশের সবার সাথে কথা বলছে কোন এক মন্দিরে দেবী দর্শন বিষয়ে। সামনের সিমেন্টের বসার জায়গায় আছে বাংলা ভাষায় কথা বলা এক ফ্যামেলি। মহিলা বার বার ছেলেকে পানি খাওয়াচ্ছে সেলাইন মিশিয়ে। ছেলের সাথে কথা বলছে বাংলায়। আমিও আমার সঙ্গীর সাথে কথা বলছি বাংলায়। পাশেরজন কথা বলছে হিন্দিতে। আমি মুসলিম, তারা হিন্দু ধর্মের। বসা মহিলার ট্রেন চলে এসেছে। সে এক ঝটকায় আমাকে তার বসার জায়গায় বসিয়ে ফিসফিস করে বলে, এখানে বসুন তা না হলে ওরা বসে পড়বে। বসে পড়ি এবং ভাবতে থাকি, একই ধর্মের, একই দেশের হয়েও হিন্দি ভাষার মহিলাকে বসতে না দিয়ে আমাকে বসতে দিলো কেন? উত্তর বের করতে সময় লাগেনি 'বাংলা ভাষার জন্য'। আমরা দুজনেই বাংলা ভাষায় কথা বলি, আমাদের সংস্কৃতিও অভিন্ন। তাই আপন। সময় আমাদেরকে বন্ধন দিয়েছে। প্রতিবাদ করার শক্তি দিয়েছে। অতীতকে কবুল করেও বর্তমানকে সাজিয়ে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনায়।

বাংলার আত্মপ্রতিষ্ঠার মহান ভাষা আন্দোলন আজও প্রেরণা দিয়ে যায় ভাষার পাশাপাশি এদেশের জাতীয় চেতনা সমাজ-সাংস্কৃতিক আত্মরক্ষা ও বিশ্বঅর্থনীতিতে। ভাষা আন্দোলনের আবেগ এর ভেতরের শক্তি আজও আমাদের রক্ষা করে যায় যাবতীয় অপতৎপরতা থেকে। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বদলে যায় ভাষার স্বাদ। শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রেই শুধু নয় সাহিত্য ক্ষেত্রেও বিদেশি ভাষার অপতৎপরতা নখের আচঁড় দিয়ে যায়। পৃথিবীতে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ রয়েছে যাদের মাতৃভাষা বাংলা।২১ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ, বাঙালির মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা, সম্মান,সংগ্রাম ও আত্মদানের ইতিহাসকে তুলে আনে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বিকাশ ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে দিতে পারে সেই ঐতিহ্য। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বন্ধন সফল করে তুলতে পারবে ভাষার মাধুর্য। ভাষার বিবর্তন থাকবে। কবিদের ভাষা তো তিন’শ বছর এগিয়ে থাকার ভাষা। আজও আমরা চর্যাপদের ভাষায় ঢুকে যাই, রবীন্দ্রনাথের গানে মন লাগাই, নজরুলে রক্তকে শুদ্ধ করি, জীবনানন্দে প্রকৃতি পাঠ করি, কখনো মনে হয় না 'এ কোন নতুন স্রোত, দাঁতের ঘর্ষণ।'

পৃথিবীতে আমরা কেউ থাকবো না। এই ছেড়ে যাওয়ার বেদনায় রবীন্দ্রনাথ লেখেন---

মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।

নজরুল লিখেছেন---

যেদিন আমি হারিয়ে যাবো বুঝবে সেদিন বুঝব।

জীবনানন্দ লিখেছেন---

আমি চলে যাব বলে চালতাফুল কি আর ভিজিবেনা শিশিরের জলে?

দাউদ হায়দার লিখেছেন---

এইভাবে পেতে হয় রাত্রির স্বাদ।

বদলে যাওয়া ভাষার তালে দুলুনি লেগে আমরা ঘুমিয়ে জাগি জ্যোৎস্নার সাম্পানে।সময়ের ভাষা চুম্বক হয়ে ওঠে। ভাষার সময় আজ নানা চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের উঠোন গুলোয় রোদ লাগুক ভাষার মায়ায়। কাঠচেরাইয়ের কঠিন দাগ সরে যাক দূরে।