সময়ের ভাষ্য চর্যাপদ ও হাবাযুবকের দল

পার্থজিৎ চন্দ

মহামহোপাধৠযায় শ্রী হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সম্পাদিত ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙলা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’ গ্রন্থটির বেশ কয়েকটি অংশ, বিশেষ করে চর্যাপদের অংশটি প্রায় নিয়মমাফিক আরও একবার শেষ করেছিলাম। তারাপ্রসন্ ন ভট্টাচার্য -কৃত পাঠসংস্কাঠ° ও ব্যাখ্যা আমার ভীষণ প্রিয়। ব্যক্তিগত সংকটের সময়ে ব্যক্তিমাঠুষের কাছে এসে দাঁড়ায় তার প্রিয়তম বইগুলি। ঠিক সে-সময়েই হয়তো সব থেকে ভালো বোঝা সম্ভব, ভাষার ক্ষমতা ও আশ্রয় দেবার বিপুল বিস্তার।

এই বইটি সম্পর্কে দু-একটি ব্যক্তিগত কথায় পরে আসা যাবে। কিন্তু কী বিশেষত্ব ছিল, এবার আরও একবার এই বইটির অসামান্য অংশটি শেষ করার মধ্যে?

আসলে এক মেঘলা দুপুরে ওই অংশটুকু শেষ করবার পর আমি উঠে পড়েছিলাম এক দূরগামী বাসে। এবং আবিষ্কার করেছিলাম হাবাযুবকেঠ° একটি দল। বাসটি ছুটে চলেছে শহরের দিকে। ভীড় ও ফাঁকা – এই দুই বিশেষণের মধ্যবর্তী এক অবস্থা বাসটির ভিতর। অনেকেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন, ঝুঁকে পড়েছেন মোবাইল স্ক্রিনে। অদ্ভুতভাবৠব্যালেন্স রাখতে শিখে গেছে মানুষ; হাতের à¦®à§‹à¦¬à¦¾à¦‡à¦²à¦Ÿà¦¿à¦•à ‡ আড়াল করতেও।

পাশের সহযাত্রীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে সতর্ক বাসযাত্রীঠা তাদের স্বর নামিয়ে ও উঠিয়ে নিচ্ছিল। প্রায় সবাই আজকাল সেলফ-à¦‡à¦®à§à¦ªà§‹à ¦œà¦¡ সেন্সরশিপৠঅভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

প্রথমে চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল একটি ভাষার চলন; সম্পূর্ণ ‘সংকেত’ ও ‘চিহ্ন’-à¦¶à¦¾à ¦¸à¦¿à¦¤ ও আশ্রিত এক ভাষা। হাবাযুবকরঠনিজেদের মধ্যে ‘কথা’ চালিয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ লক্ষ্য করার পর আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম, এই যুবকরা তাদের স্থানিক অবস্থানের মধ্যে তৈরি করে নিয়েছিল আরেকটি অবস্থান। সে অবস্থান পারিপার্শ্ বিক অবস্থা-নিরঠªà§‡à¦•্ষ কিনা বলা সম্ভব নয়। কিন্তু এই ‘সাইন ল্যাঙ্গুয়ৠ‡à¦œâ€™ তাদের এক অদ্ভুত ক্ষমতার অধিকারী করে তুলেছে। এই সাইন-গুলি তাদের এক প্রতিরোধ। এক ‘অক্ষমতা’ তাদের অতি-à¦¬à¦¿à¦¶à§‡à¦·à¦­à ¾à¦¬à§‡ সক্ষম’ও করে তুলেছে কিছুটা। কারণ বাসের ভিতর তৈরি হয়ে থাকা সিস্টেম তাদের গ্রহণ করেনি। আবার তারাও বাসের ভিতর তৈরি হওয়া সিস্টেমটিঠে প্রতিরোধ করতে পেরেছে।

পরে বিষয়টি আরও চমকপ্রদ হয়ে ওঠে যখন জানতে পারি, এ-যুবকরা যে জনপদে থাকে সেখানে প্রথাগতভাঠে ‘সাইন-à¦²à§à¦¯à¦¾à ™à§à¦—à§à§Ÿà§‡à¦œâ€™ শেখানোর কোনও ব্যবস্থা নেই। এ-যুবকেরা তিন-চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধৠর মধ্যে বসবাসকারী, যারা একদিন আবিষ্কার করছিল তারা মূক ও তাদের নিজেদের ‘ভাষা’ তৈরি করে নিতে হবে নিজেদেরই।

যেহেতু সাইন-à¦²à§à¦¯à¦¾à¦™à à¦—à§à§Ÿà§‡à¦œà§‡à¦° যে সিস্টেম, তারও বাইরে অবস্থান করছে এ-যুবকদের ভাষা সেহেতু মূক ও বধীরের দেশেও এরা, অন্তত প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বাধীনতর জীবন কাটাতে পারবে।

তাদের এই স্বাধীনতা অর্জন ঘটেছে একটিই পথে, বারবার সিস্টেমকে ভেঙে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। চর্যাপদের পদকর্তাদেঠ° গূঢ় রহস্যময় সাংকেতিক উচ্চারণের সঙ্গে এ-যুবকদের উচ্চারণের এই একটি জায়গায় খুব মিল।

মূল স্রোত যাকে স্বীকার করতে ভয় পায় বা ঘৃণা করে সেই মূল স্রোত থেকে বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থেকে, সাংকেতিক ভাষায় সময়-ক্যাপসৠà¦²à§‡à¦° মধ্যে পদকর্তারা লুকিয়ে রেখেছিলেন বারুদের সম্ভার। একটি জাতিকে পঞ্চাশটি পদের মধ্যে ধরে রাখার এমন নিদর্শন ইতিহাসে বিরল। আজ, এতদিন পর সে-বারুদ আমাদের মস্তিষ্কেঠ° কোষে কোষে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে চলেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী অন্ধকারে শায়িত থেকেও তাদের আক্রান্ত করবার ক্ষমতা বিন্দুমাত্ র নষ্ট হয়নি।

আমার ব্যক্তিগত মত, চর্যাপদে সময়ের ভাষ্য যে বহুমাত্রিঠতা নিয়ে বর্তমান তার সমতুল্য নিদর্শন পাওয়া দুষ্কর।

২
ভাষা তো প্রথম ও শেষ পর্যন্ত চিহ্ন’ই। কিন্তু ভাষাকে নিষ্প্রাণ জড়-চিহ্নের সমাহার হিসাবে গণ্য করা ও জড়বাদী দৃষ্টিভঙ্ঠি থেকে তাকে বিশ্লেষণ করবার প্রক্রিয়াঠি বেশ সন্দেহজনকॠ¤ ভাষাখুনীরঠ¾ প্রথমেই ভাষার ভিতর থেকে উপড়ে নিতে চায় তার হৃদপিণ্ডটি কে। স-প্রাণ চিহ্নময়তার অপরূপ আলপনাকে বাতিল করে তাকে একটি জড় কাঠামোর মধ্যে ধরে রাখবার প্রচেষ্টা আসলে ভাষার সঙ্গে ‘ইনফরমেশন⠙কে গুলিয়ে দেবার অপচেষ্টা। সময়ের ভাষ্য হিসাবে ভাষার ভিতর জোর করে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া এই সব ‘ইনফরমেশন⠙-এর হাতে ভাষা সব থেকে বেশী ধর্ষিত হয়। ভাষা যে নিজেই বারবার তার সব কাঠামোকে চৌচির করে, (এমনকি) সময়ের কল্পিত-ব্রঠ¹à§à¦®à¦¤à¦¾à¦²à§ ফাটিয়ে চলে যেতে পারে এটাই এক বড় অংশের মানুষ ও ক্ষমতার কাছে সব থেকে বড় ভয়ের কারণ।

ভাষার যে ক্ষমতা রয়েছে à¦‡à¦¨à¦«à¦°à¦®à§‡à¦¶à¦¨à§‡à ° সে ক্ষমতা নেই। দুর্বল যেমন সবলের হাত ধরে বাঁচতে চায় à¦‡à¦¨à¦«à¦°à¦®à§‡à¦¶à¦¨â€™à ¦“ তেমন ভাষার সুরক্ষার মধ্যে নিজেকে স্থাপন করতে চেয়েছে বারবার। কিন্তু শুধু নিজেকে স্থাপন করেই সে ক্ষান্ত হয় না। ঘাতক পরজীবির মতো এক সময়ে সে ভাষার হৃদপিণ্ডটি কে আক্রমণ করে। তখন কিছুটা সময়ের জন্য আশ্রয় ও আশ্রয়ীর ভূমিকাদুটঠ¿ পরিবর্তিত হয়ে যায়। প্রতারক এক ছায়া ছেয়ে থাকে ভাষা-দ্বীপঠŸà¦¿à¦•ে।

যত সময় গড়িয়েছে ভাষা ততই হয়ে উঠেছে ব্যক্তি-à¦‰à¦ªà •à¦°à¦£à¥¤ যে কোনও ভাষার লিপি গড়ে উঠবার আগে ও পরের দুটি রূপ ও ভূমিকা এক থাকতে পারে না।

আমার ব্যক্তিগত মত, যে কোনও ভাষা তার আদিম পর্বে খুব বেশী নির্ভর করে থাকে ক্রিয়াপদেঠ° উপর। বিষয়টিকে এ-ভাবেও বলা যায় যে, মূলত ক্রিয়াকে ব্যক্ত করবার জন্যই মানুষ সব থেকে বেশী আঁকড়ে ধরে তার ভাষাকে।

কিন্তু সময় যত এগিয়ে যায়, অর্থাৎ ভাষা যত তার লিখিত রূপের দিকে এগিয়ে যায় ক্রিয়াপদেঠ° গুরুত্ব কমে না এলেও তার অভিঘাত কমতে শুরু করে।
ইনফরমেশন মূলত ‘বিশেষ্য’- ¦•ে বহন করে নিয়ে যেতে পছন্দ করে। ফলে ক্রিয়াপদগৠà¦²à¦¿ ঝুঁকে পড়ে বিশেষ্যর দিকে।

আজ প্রতি-মুহূঠ°à§à¦¤à§‡ যত জিবি ডেটা ইনফরমেশন হিসাবে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় রয়ে যাচ্ছে তার বেশীরভাগ এক concretized abstract-এর রূপ। কার্য-রহিত এক ক্রিয়াকে সূচিত করে চলেছে আমাদের ভাষা। এ প্রসঙ্গে দুটি বাক্য, ধরা যাক একটি কয়েক হাজার বছর আগের ও একটি সাম্প্রতিঠ, তুলে ধরা যেতে পারে। প্রথম বাক্যটি, ধরা যাক - ‘চল চল, ওই বাইসনটিকে মেরে আসি।’

দ্বিতীয়টি,ঠ§à¦°à¦¾ যাক – ‘যাও, বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াও, দেখ কী সুন্দর চাঁদ উঠেছে আমাদের মেট্রোপলিঠ¸à§‡à¥¤â€™

প্রথমটি অনেক বেশী ক্রিয়া-à¦¸à¦‚à¦²à —à§à¦¨à¥¤

দ্বিতীয়টি একটি ভার্চুয়াল বার্তালাপৠর অংশ। এখানে যিনি বার্তা পাঠাচ্ছেন তিনি অনুরোধ করলেও সেটি কিন্তু ততটা ক্রিয়া-à¦¸à¦‚à¦²à —à§à¦¨ হয়ে উঠছে না। যিনি বার্তাটি পাচ্ছেন তিনিও এই à¦…à¦¨à§à¦°à§‹à¦§à¦Ÿà¦¿à¦•à ‡ ততটা ‘ক্রিয়া’ হিসাবে গণ্য করছেন না। এবার লক্ষ্য করলে দেখা যাবে দ্বিতীয় বাক্যটিতে (যা আসলে হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা মানুষের ভাষা ব্যবহারের থেকে একটি মেজর ‘ডিভিয়েশন⠙) ক্রমশ মুছে আসছে সক্রিয়তার পদ্ধতি।

পৃথিবীর কোনও ভাষাই, সে যত পুরানো বা নতুন হোক, এর আগে এই ধরণের সংকট ও চ্যালেঞ্জৠর মুখে পড়েনি। আজ একজন মানুষ তার ভার্চুয়াল পৃথিবীটিকৠ‡ ব্যবহার করে, একটিও কথা না-বলে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতে পারে। তার জন্য তাকে মৌনীবাবা হতে হয় না। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া যায় যে হাজার বছর আগেও একজন মানুষ একই রকম নিরুচ্চার থেকে একটা বড় সময় কাটিয়ে দিতে পারত, তবু এটি স্বীকার করতেই হবে সে-সময়ে ব্যপারটি যতটা কঠীন ছিল এখন আর ব্যপারটি তেমন নেই। নেই মানে, নেই’ই।

ঠিক এই অদ্ভুত চ্যালেঞ্জৠর মুখে দাঁড়িয়ে ঠিক কী ভাবে ভাষায় ধরা থাকবে ‘সময়ের ভাষ্য’? আমার বাংলাভাষাৠঠিক কী ভাবে ধরা পড়ছে সময়ের ভাষ্য? আমার ভাষাও কি আন্দোলিত হচ্ছে না?

ভার্চুয়াল রিয়ালিটির সময়ে আরও বেশী শক্তিশালী হয়ে উঠছে রাষ্ট্র ও ‘ক্ষমতা’। সাহিত্যে ভাষা যত না ক্ষমতার হয়ে কথা বলে, তার থেকে অনেক বেশী কথা বলে ক্ষমতার বিরুদ্ধে। এ এক আশ্চর্য প্যারাডক্ঠ। গত দু-দশকের বাংলা দিকে তাকালে দেখা যাবে, এ-সময়ে রাজনৈতীক আন্দোলন ও ক্ষমতার মেরুপরিবরৠতন কিছু কম হল না। রাজপথ বারবার গর্জে উঠল স্লোগানে ও ব্যারিকেডৠ‡à¥¤ এবং তরুণ-তরুণতঠকবিরা ঠিক ততটাই কম সংখ্যক ‘তথাকথিত রাজনৈতিক’ কবিতা লিখল। আরেকটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই সময়ে দিনবদলের কথা যারা তুলনায় বেশী লিখলেন তাঁরা মূলত সত্তর বা আটের দশকে আত্মপ্রকাঠ¶ করা কবি-সাহিত্ঠ¯à¦¿à¦•। অসমাপ্ত বিপ্লবের হাতছানি তাঁদের আবার তাড়িয়ে বেড়াতে শুরু করেছিল কিনা, অথবা গত দুটি দশকে ভার্চুয়াল-ঠিয়ালিটির হাত ধরে ভাষা ও তার মধ্যে সময়ের এনক্রিপ্টৠড হয়ে যাওয়ার পদ্ধতিটি তাঁরা অনুধাবন না-করতে পারার কারণেই কিনা জানি না, ঘটনাটি কিন্তু এমনই ঘটেছে।

ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু কিছু সময় আসে যখন প্রকাশ্য দিবালোকে হাজার ভীড়ের মাঝখানে ক্ষমতার প্রবল আস্ফালনের মুখে দাঁড়িয়ে â€˜à¦ªà¦¦à¦•à¦°à§à¦¤à¦¾â€™à ¦°à¦¾ হয়ে ওঠেন ওই হাবাযুবকেঠ° দলের মতো। গূঢ় সাংকেতিক এক ভাষায় তাঁরা কথা বলতে শুরু করেন। সময়ের ‘পৃষ্ঠতলে⠙ তেমন কোনও আলোড়ন তৈরি হয় না। আলোড়ন ঘটে যায় অনেক গভীরে। অর্থাৎ যে সিস্টেম যে ক্ষমতাকে তাঁরা অনবরত কাউন্টার করে চলেছেন, যার দিকে অনবরত ছুড়ে দিচ্ছেন প্রশ্ন সেগুলি সরাসরি পৃষ্ঠতলে আলোড়ন ফেলে না। এমনকি কাউন্টার-à¦¨à à¦¯à¦¾à¦°à§‡à¦Ÿà¦¿à¦­à§‡à¦° তকমাও পায় না সেগুলি অনেক সময়ে।

থ্যাঁতলানৠরক্তমাখা-à¦‡à ¦à¦¦à§à¦°à§‡à¦° মুখে ধরে থাকা ধানের গুচ্ছের মতো একটা একটা করে লেখা তাঁরা টেনে নিয়ে চলে যা্ন অন্ধকার গহ্বরের দিকে। অন্ধকারে জমা হতে থাকে তাঁদের ঘাম ও রক্তমাখা দলিলগুলি।

জন্মাবার সময়েই এক কবজকুণ্ডল নিয়ে জন্মায় â€˜à¦šà¦°à§à¦¯à¦¾à¦ªà¦¦â€™à ¤ পুনরায় আবিষ্কৃত হবার কবজকুণ্ডলॠ¤ সব সময়ে যে সমকালের দ্রোহ ও দিনবদলের আহ্বানকে ভাষায় (এখানে, কবিতায়) আপনি-আমি চিনতে সমর্থ হব, এমনটা নাও হতে পারে। তার মানে এমন ভাবার কোনও কারণ নেই যে সমসময়ের â€˜à¦ªà¦¦à¦•à¦°à§à¦¤à¦¾â€™à ¦°à¦¾ এ-প্রশ্নে নির্দ্বন্দ ।

নিজেদের তৈরি করা ভাষায় যেমন হাবাযুবকেঠ°à¦¾ কথা বলেছিল, আপনি-আমি তার একবর্ণও বুঝতে পারিনি।