ছায়ার ঘরবাড়ি

রিমি মুৎসুদ্দি

“I never saw a wild thing
sorry for itself.
A small bird will drop frozen dead from a bough
without ever having felt sorry for itself.”
-D. H. Lawrence

‘লক্ষ জন্মের চেয়েও’ যে মৃত্যু মহান, কোনওএক পাতাঝড়া হেমন্তের বিকেলে তার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারার মতো এক আদিম মুহুর্ত দৈবাৎ এসে পড়লে কিছু সংলাপ নিজে নিজেই জন্ম নেবে। তাকে আমি প্রশ্ন করতে চাই। এই যে সব শব্দরা একে অপরের সঙ্গে মেপে মেপে জুড়ে রয়েছে এইসব শব্দের কি সত্যিই আছে কোনও বিপুল জাদু আর শক্তি? আর ভাষার সম্মোহনী আকর্ষণ?

You are confessing to your social-facist instincts by referring to the blood count. But I can counter you, revolutions in the revolutions.....’ ‘বিপ্লবের মধ্যে কত বিপ্লব, আবর্তের মধ্যে কত আবর্ত…’

১৯৪৭-এর ১৪-ই অগাস্ট মধ্যরাত্রে দিল্লির লালকেল্লায় দীর্ঘ যন্ত্রণাময় বিদেশী শাসনের ও শোষণের অবসানের প্রতীক হিসাবে ব্রিটিশ ইউনিয়ানের ফ্ল্যাগ নামিয়ে ভারতের নিজস্ব ত্রিরঙ্গা পতাকা ভারতবর্ষের আকাশে মাথা তুলে দাঁড়ালে, হয়ত সেই মুহুর্তে কোটি কোটি ভারতবাসীর মনে আশা জেগেছিল শোষণের অবসানে এবার সত্যিই তাঁরা মুক্তির আকাশ দেখবেন। কিন্তু মুক্তি শব্দটাই একটা ধোঁয়াশা। আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি তত্ত্বের সূত্র অনুসারে চরম বলে কিছুই হয় না। চরম মুক্তি বলেও কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। কিন্তু ভারতের বায়ুমণ্ডলে স্বস্তির চিহ্নও বড় লেশমাত্র। শাসকের মুখ বদলালেও শোষণ যন্ত্রের হেরফের বিশেষ ঘটেনি। তাই ভারতবর্ষের আকাশে ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ স্লোগান যেমন অপরিবর্তিত ছিল, তেমনি কলকাতার রাস্তায়, অলিতে গলিতে, বাসে ট্রামে, আঠালো গরম আর সেই প্রচণ্ড গরমে, ঘামের গন্ধে কয়েকফোঁটা রক্ত আর বারুদের গন্ধও মিশে রয়েছে।

কুচবরণ কন্যা তার মেঘবরণ চুল

-নাহ, আমি একটু ঘুরে আসি। আশেপাশের হোটেলগুলোও একটু দেখে আসি।
সাংবাদিক যুবকটি হোটেল থেকে বেরোতে উদ্যত হলে হোটেলের ম্যানেজার বলে ওঠেন,
-আরে স্যার অন্যকোথাও যাবেন কেন? এই হোটেলের থেকে কম রেটে আপনি পুরো বস্তারে কোথাও পাবেন না। লছমী, পানি পিলাও স্যারকো।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আদিবাসী মেয়েটা ম্যানেজারের ঘরের এককোণে রাখা মাটির কুঁজো থেকে গড়িয়ে একগ্লাস জল সাংবাদিকটির সামনে এগিয়ে দেয়।
হোটেলের বিল অফিস মিটিয়ে দিলেও ঘরের নোনাধরা দেওয়াল আর বাথরুমে জিরো পাওয়ারের থেকেও কম আলোর হলুদ বাল্বটার চোখের সামনে ভেসে ওঠায় সাংবাদিক ছেলেটি এই হোটেলে থাকতে চাইছে না। জলটুকু খেয়েই সে বেরিয়ে যেতে গেলে, ম্যানেজার আবার বলে ওঠে,
-স্যার, এই রুমের সাথে আপনি ওই লছমীকে ফ্রি পাবেন। আপনি যখন বলবেন, যতক্ষণ বলবেন আপনাকে সার্ভিস দিয়ে যাবে।

কথাটা শুনে চমকে উঠলেও সাংবাদিক অভিজ্ঞতায় এইরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি তিনি আগেও হয়েছেন। লছমী নামে আদিবাসী যুবতীটির কালো চোখে কী ভীষণ কাঠিন্য, নির্লিপ্তি! তবু এখনও যেন বনভূমির সরলতা লেগে রয়েছে ঐ মুখে। বস্তারের জঙ্গলে বসবাসকারী বেশিরভাগ আদিবাসী যুবতী, কিশোরীর গল্পটা খানিকটা একইরকম। সালওয়া জুড়ুম বন্ধ হলেও যখন তখন হয় পুলিশ, নয় মাওবাদীদের অত্যাচারে ওদের অনেকেরই ঘরবাড়ি পুড়ে গেছে। অনেকের পরিবারের পুরুষ সদস্য মারা গেছে। টাটা কোম্পানি বক্সাইটের জন্য যে যে অংশগুলো লিজ নিয়েছে, জঙ্গলের সেই অংশগুলোয় ওরা ঢুকতে পারে না। তাই ওদের গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য যে বনভূমির ওপর এতদিন ধরে ওরা নির্ভর করত, তা এখন রাষ্ট্র ও বহুজাতিকের মালিকানা হওয়াতে ওরা ঘর ছাড়া, ভূমিহীন, অরণ্যহীন।

Feminisation of Poverty- সারা পৃথিবীতে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দারিদ্রের ভার(Burden of Poverty) নারীদের ওপরই বর্তায়। UNIFEM-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘the burden of poverty borne by women, especially in developing countries.’ এর কারণ হিসাবে জেণ্ডার বায়সডকেই দায়ী করেছে WHO থেকে UNESCO। ইউনাইটেড নেশন ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম (UNDP)-এর জেণ্ডার রিলেটেড হিউম্যান ডেভলপমেন্ট ইনিডেক্স ও হিউম্যান ডেভলপমেন্ট ইনডেক্স- এই দুই উন্নয়ন সূচক অনুসারে সারা বিশ্বে বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পুরুষদের তলনায় মহিলাদের লাইফ এক্সপেক্ট্যান্সি ও মরটালিটি রেট অনেক কম।

মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক, অধ্যাপক ডায়না পিয়ার্স সারা বিশ্বের ৩৭ টি উন্নয়নশীল দেশের ওপর গবেষণা করে দেখেছেন, দারিদ্র্যের দায়ভার ও বোঝা বেশিরভাগ দেশে ও সামাজিক পরিকাঠামোতে মহিলারাই ভোগ করেন।
অপুষ্টি ও স্বাস্থ্য-পরিষেবার অভাব, নূন্যতম জীবন ধারণের অধিকার থেকে বঞ্চিতের পরিসংখ্যানে আমাদের দেশে মহিলাদের সংখ্যা অনেক বেশী- অর্থনীতিবিদ উমা কাপিলা তাঁর বই ‘India’s Economic Development Since 1947’- পরিসংখ্যান দিয়ে বুঝিয়েছেন। উমা কাপিলার গবেষণা অনুযায়ী ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মহিলাদের সমস্যা সেই অঞ্চলের ভৌগলিক ও আর্থসামাজিক কারণগুলোর উপর নির্ভরশীল। এবং অবশ্যই জেন্ডার বায়সডের যে মানসিকতা শুধু ভারত নয় সারা পৃথিবীর মানুষের হাড়ে মজ্জায় ঢুকে রয়েছে সেগুলোও অন্যতম কারণ।

ভারতবর্ষের আরো একটা গ্রামের চিত্র দিই। রাজস্থানের প্রত্যন্ত কয়েকটা গ্রাম। যেখানে নিম্নবর্ণ উচ্চবর্ণের ভেদাভেদ একেবারে দিনের আলোর মতোই দৃশ্যমান। মেয়েরা জলের খোঁজে দূরদূরান্তে যায়। তবু কাছাকাছি, উচ্চবর্ণের জলাশয়ের ধারেকাছেও যেতে পারে না। বেশিরভাগ দিনই শূন্য কলসি হাতে ফিরে আসে। দূরের একটামাত্র কুয়োতে অর্ধেক সময় জল থাকে না। আবার বাড়িতে জলের অভাব হলে বাড়ির পুরুষদের কাছেও মারধোর খায়। এটা সম্প্রতি ন্যাশনাল উইমেন কমিশনের রিপোর্টে উল্লেখিত ঘটনা।

হরিয়ানা, পাঞ্জাবের বেশ কয়েকটা অঞ্চলে কন্যা ভ্রুণ হত্যা এমন পর্যায় উঠেছে যে ছেলেরা বিয়ে করা বা বংশরক্ষার জন্য মেয়ে পাচ্ছে না। তাই বাংলা, বিহার, ওড়িশা থেকে খুব গরীব ঘরের মেয়েরা এইসব অঞ্চলে পাচার হয়ে যায়। রীতিমতো পয়সা দিয়ে কিনে বিয়ে করে নেয় পাত্রটি। এরপর বয়স্ক থেকে কনিষ্ঠ পরিবারের সব পুরুষ সদস্যদেরই সেবাদাসী ও যৌনদাসীতে রূপান্তরিত হয় সেই মেয়েটি। আদিবাসী মেয়েদের অবস্থা আরো করুণ।

যাইহোক, দারিদ্র্যের সংজ্ঞা বা তথ্যের কপচানি না দিয়ে সাধারণ জীবনের আশেপাশে তাকালেই বোঝা যায়, মেয়েরা কীভাবে পরিবারের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে নিজেদের সবটুকু নিংড়ে দিচ্ছেন। গৃহস্থ বাড়িতে কাজ করতে আসা অথবা কারখানায় দৈনন্দিন আয়ের ভিত্তিতে কাজ করা মেয়েটা তার আয়ের সবটুকু পরিবারের জন্য তুলে দেন। নিজেদের শরীর, স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা ও কিছুটা পরিবার ও সমাজের উদাসীনতায় সেইসব মহিলারাই সঠিক পুষ্টি ও চিকিৎসার অভাবে বিভিন্ন রোগের শিকার।

এইসব আলোচনা করতে করতে রূপকথার গল্পের শেষটা মনে আসে, প্রশ্ন জাগে। রাজপুত্র এসে কেন উদ্ধার করবে বন্দী রাজকন্যাকে? সোনার কাঠি রূপোর কাঠি ছোঁয়ালেও জেগে যে তাকে থাকতেই হবে। নিজের বিরুদ্ধে হওয়া অত্যাচারের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে আরো অনেক বন্দীমুক্তি তাকেই ঘটাতে হবে। তবে তো সে রাজকন্যা। কুচবরণ কন্যা তার মেঘবরণ চুল- রাজকন্যার এই প্রোটোটাইপটাও কিন্তু চাপিয়ে দেওয়া।


যুদ্ধ মানে শুধুই অবহেলা


‘The struggle of man against power is the struggle of memory against forgetting.’ – Milan Kudera, The Book of Laughter and Forgetting.


আকাশে একটা ধুলো ঢাকা চাঁদ। তারা দেখা যায় না। সন্ধ্যেবেলার লোডশেডিং। কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলি ওগরাতে ওগরাতে শহরের ভিড়ে ঠাসা বাসগুলো ঘাম প্যাচপ্যাচে কলকাতার নাগরিক জীবনকে বয়ে বেড়াচ্ছে। উত্তর কলকাতার ফুটপাথ জুড়ে পলিথিনের শীটের আড়ালে প্যাকিং বাক্সে গোছানো সংসারগুলো যেন আশ্চর্য অনুভূতিহীন এক দ্বীপ।

সারাদিনের অজস্র মানুষের আনাগোণা আর রাতের ল্যাম্পপোস্টের তীব্র আলোয় কোনও আড়াল নেই। তাই হয়ত জানা যায়না ফুটপাথ জুড়ে ছড়ানো ছিটানো অজস্র জন্ম রহস্য। যারা কখনও বা বড় রাস্তায় চলন্ত গাড়ীর প্রায় কাছাকাছি চলে এসেও বেঁচে থাকে। কী অদ্ভুত এক প্রাণশক্তিতে ভরপুর!

কোনও নিরাপত্তা নেই। কোনও আশ্বাস নেই। বেঁচে থাকার নুন্যতম সুযোগ সুবিধাও নেই। তবু আকাশ জোড়া নক্ষত্রদের জন্মরহস্য বা ঈশ্বরকণার সন্ধান পেলেও এই সব রহস্যেরা আজও অজানাই রয়ে যায়।

ফিরে আসি লোডশেডিং-এর সন্ধ্যায়। হ্যারিকেনের আলোয় পড়ায় বইয়ের ফাঁকে ঝিমুনি এসে যায় দুইবোনের। সুর করে রামায়ণ পড়ে যেত এক বৃদ্ধা। আমারই ঠাকুমা। শেষ হলে গুরুদেবের অষ্টোত্তর শতনাম। ঝিমুনি কেটে গিয়ে ইতিহাস ভূগোলের বইয়ের থেকে মন সরিয়ে কানখাড়া করে সে সুর যেন ভরে নিত বালিকাযুগলের হৃদয়। সেই সুরে মিশে থাকত ইতিহাস, স্মৃতি। হয়ত বা ক্ষত। হারিয়ে যাওয়া আত্মগৌরবের জন্য বিলাপ ও কিছু বেদনা।
‘জিলা বরিশালে আছে বাখরগঞ্জ থানা।
তার অন্তর্গত রাজাপুর গ্রামখানা।।’

এই অব্ধি পড়ে থেমে যেত ঠাকুমা। ঠাকুমার তোবাড়ানো গালে হাসি ফুটে উঠত। কুঁচকানো চোখ দুটো বইয়ের মধ্যে থাকলেও ঠাকুমা ঠিক বুঝতে পারত। আমরা দু’বোন হা করে তাকিয়ে আছি তারই দিকে। ঠাকুমা শুরু করত গল্প। ‘আমাগো বরিশাল কী সুন্দর দ্যাশ আছিল। যে দিকে তাকাই শুধু নদী আর নদী। খাল, বিল, বাওড় আর সবুজ চারিদিক।’
একঢোক জল খেয়ে বুড়ি আবার শুরু করত। বোধহয় নদীর কথা মনে পড়ায় তৃষ্ণা জেগে উঠত।
-নদীগুলোর নাম শুনবি? ভারী সুন্দর নাম। মধুমতী, পানগুছি, সুগন্ধা, সন্ধ্যা, ধানসিঁড়ি, কালিজিরা, কীর্তনখোলা, কালাবদর আর পায়রা নদী। কীর্তনখোলা তো আমাগো বাখরগঞ্জ দিয়া যাইত। পায়রা নদীতে বুঝি এসে মিশত। নদীর কথা থেকে মাটির দোতলা বাড়ির কথায় চলে আসত ঠাকুমা। সে মাটির বাড়ি কী শীতল! সারাদিন একটা শিরশিরভাব থাকত ঠাকুমার। এইসব মনে করতে করতে উত্তর কলকাতার দুকামড়ার ভাড়া বাড়িতে কীভাবে যেন বাকিজীবনটুকু কেটে গেল তার। বরিশালে আরো একবার যাওয়ার ইচ্ছে ছিল ঠাকুমার। কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠে নি।

নিরাপত্তা একটা বোধ না ছদ্ম আশ্বাস সে দ্বন্দ্ব ব্যাখ্যার থেকেও জরুরি নিরাপত্তা শব্দের একটা সঠিক মানে খুঁজে বের করা। অন্তত এই উপমহাদেশে নিরাপত্তার অর্থ - কয়েকটা চুক্তি মেনে একা হয়ে যাওয়া। অথবা একা হতে বাধ্য হওয়া। আর এই একাকীত্বে সঙ্গী শুধুই স্মৃতি। যে স্মৃতিতে ফেলে আসা গোয়ালঘর, উঠোন, তুলসীতলা, বনকলমিলতার মাচা থেকে মনিহারি ঘাট, উদ্বাস্তু মানুষের ভীড়ে ঠাসা ষ্টেশনও যেমন আছে। তেমনি রক্তাক্ত সব সাল, তারিখ ও কয়েকটা নাম। শহর, জেলা, গ্রাম- বরিশাল, নোয়াখালি, কলকাতা।

‘সতু বলেছিল – অর্ধেক রাস্তা আসার পরই ঢাকার স্টিমারের ভোঁ বাজল। সঙ্গে সঙ্গে ওদের সংকেত পৌঁছে গেল সমস্ত ঘাঁটিতে। তারপর চতুর্দিকের আকাশে শুধু আগুন আর কান্নার রোল।’ (কলকাতা ও নোয়াখালি দাঙ্গা, অজুর্ন গোস্বামী সম্পাদিত, গাঙচিল প্রকাশনী) – যুদ্ধ মানেই এই কান্নার রোল। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধে ভারত ও পাকিস্তান নামে যে দুটো খণ্ড দেশ তৈরি হল তাদের মানুষগুলোর জীবনে এই আগুন আর কান্নার রোল যুদ্ধের বাইপ্রোডাক্ট হয়ে দেখা দিয়েছিল।
আবারও আরেকটা যুদ্ধের বাইপ্রোডাক্ট এই দুই ভুখণ্ডই অনুভব করেছে। ১৯৯৯-এর কার্গিল যুদ্ধ। যুদ্ধে বিধ্বস্ত জম্মু-কাশ্মীরের সীমান্ত গ্রামগুলো। জম্মু-কাশ্মীরের কার্গিল থেকে আরো ১০ কিমি উপরে ধূসর পাহাড়ে ঢাকা এক সীমান্ত গ্রাম হুন্দারমেন। ১৯৯৯-এর কার্গিল যুদ্ধের আগে পর্যন্ত এটা ঐতিহাসিক স্কার্দু- কার্গিল- সিল্করুটের মধ্যে পড়ত। ১৯৪৭-এ দেশভাগের সময়েও এই ছোট্ট পাহাড়ী গ্রাম এত গোলা-বারুদ, রক্ত দেখে নি। স্কার্দু, ব্রোলমো, হুন্দারমেন প্রায় গাঁ ঘেঁষাঘেঁষি গ্রাম। স্কার্দু তুলনায় একটু দূরে। এই তিন গ্রামের প্রায় সকল বাসিন্দাই একে অপরের আত্মীয়। ১৯৪৭-এ এই তিনগ্রামই পাকিস্তান-কাশ্মীরের অংশ ছিল। ১৯৭১-এর ভারত-পাক যুদ্ধের পর হুন্দারমেন ভারতবর্ষের অন্তর্গত হয়। এরপর বেশ কয়েকবছর ধরে এই শীতল মরু গ্রামের বাসিন্দাদের নিজেদের কোন পরিচয়পত্রই ছিল না। পরবর্তীকালে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও ভারতসরকারের সৌজন্যে তারা কিছুটা সুযোগ-সুবিধা পায়।
প্রচণ্ড ঠাণ্ডার দরুণ বছরের বেশীরভাগ সময়েই এই সীমান্ত গ্রাম সারা ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। কার্গিল-স্কার্দু সিল্ক রুটের সৌজন্যে হুন্দারমেন-এর বাসিন্দারা ব্রোলমো, স্কার্দুতে তাদের আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারত। এপ্রিকট, মেওয়া ও বিভিন্নধরণের ড্রাইফ্রুটের টুকটাক আদানপ্রদানও চলত এই গ্রামগুলোর মধ্যে। এরপর আবার আছড়ে পড়ল আরেক মরুঝড়। ১৯৯৯-এ আবার ভারত-পাক কার্গিল যুদ্ধ। বন্ধ হয়ে গেল সমস্তরকম যোগাযোগ, লেনদেন। যুদ্ধ থেমে গেলেও স্বজন হারানোর ক্ষত বুকে নিয়ে বেঁচে রইল এই সীমান্তগ্রাম।
না, যুদ্ধে প্রাণহানি হয় নি গ্রামবাসীদের। যুদ্ধের আগেই সীমান্ত গ্রামের বাসিন্দাদের কার্গিল থেকে আরো নীচে নামিয়ে আনা হয়েছিল। আবার দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করলে গ্রামবাসীরা ফিরে আসে তাদের গ্রামে। গ্রাম তখন ধূ ধূ ফাঁকা। গ্রামের বেশীরভাগ বাসিন্দার আত্মীয়ই তো থাকত পাকিস্তানের ব্রোলমোতে। এই ব্রোলমো তখন যুদ্ধের ফলে এতটাই ক্ষত-বিক্ষত যে একে বরবাদী গাঁও বলা হত। এই গ্রামের যে ক’জন বেঁচে ছিল তারা হয় স্কার্দুতে চলে গিয়েছিল আর বাকী অর্থনৈতিকভাবে আরো দুর্বল মানুষদের জায়গা হয়েছিল ইসলামাবাদের বড়ি ইমাম সৌধের কাছের পুনর্বাসন কেন্দ্রে।
হুন্দারমেনের অনেকের বাবা, মা, ভাইবোন ও অন্যান্য আত্মীয়রা ব্রোলমো গ্রামের বাসিন্দা ছিল। তারা সকলেই স্কার্দুতে চলে যায়। এরপর অনন্তকাল ধরে প্রতীক্ষা! কিভাবে এবং কবে দেখা হবে স্বজনদের সাথে। এদিকে ব্যবসা বাণিজ্যও বন্ধ হয়ে গেছে, তাই বরফের দেশে মরুপাহাড়ের বাসিন্দাদের অর্থনৈতিক সঙ্কট চরম। রোজগার বলতে পশুপালন ও ভারতীয় সেনাদের মালপত্র বহনের কাজ। তাও রক্তের টানে কেউ কেউ একবার স্কার্দুতে যেতে চায়। হুন্দারমেন থেকে স্কার্দু প্রায় ২০০কিমি যেতে আগে যেখানে জনপ্রতি ১০০ টাকা লাগত, ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে ইসলামাবাদ হয়ে স্কার্দু যেতে খরচ হয়েছিল জনপ্রতি ৫০০০০টাকা। ভিসার বৈধতা মাত্র কয়েকসপ্তাহর। কাঁটাতারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অনেকেই তাই আত্মীয় স্বজন হারিয়ে একা হয়ে বেঁচে থাকে। চৌকো করে কেটে নেওয়া এই উপমহাদেশীয় স্পেসে যুদ্ধ মানে, নিরাপত্তা। আর নিরাপত্তা মানে একা হয়ে বেঁচে থাকা।
একা হয়ে বেঁচে থাকা শুধুমাত্র ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশেরই সমস্যা নয়। এই আইসোলেশন পৃথিবীর সর্বত্র। অ্যামেরিকার বিভিন্ন শহরের রাস্তায় এখনও ভিয়েতনাম যুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা কিছু মানুষ রয়েছেন, তাঁরা শহরের রাস্তায় প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন। আর সেই প্ল্যাকার্ডে লেখা থাকে- ‘We are the veterans of Vietnam War. We want a No War World for our coming generation.’

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই অর্থনীতিবিদ থেকে আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব বিশেষজ্ঞরা ডিফেন্স প্যারাডক্সের ওপর কাজ করে চলেছেন। আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব বিশেষজ্ঞ থেরেসা ক্লেয়ার স্মিথ, প্রথম জার্ণাল অফ কনফ্লিক্ট রেজোলিউশনে ‘আর্মস রেস’ এই শব্দবন্ধটির ব্যবহার করেন। অর্থনীতি ও অঙ্কের গেম থিওরি তত্ত্বটি এখানে বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত। মার্কিন অঙ্কবিশারদ জন ফোর্বস ন্যাশের প্রিজনারস ডিলেমা ও ন্যাশ সমতা তত্ত্বটি বিভিন্নভাবে সিকিউরিটি ডিলেমার মধ্যে দিয়ে এই ডিফেন্স প্যারাডক্সে এসেছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ১৮৯৭ থেকে ১৯১৪ পর্যন্ত ইউনাইটেড কিংডম আর জার্মাণির মধ্যে অত্যন্ত আগ্রাসী মনোভাবের এই ‘আর্মস রেস’ বা ‘অস্ত্র প্রতিযোগিতা’-র মনোভাব বজায় ছিল। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, শত্রু দেশ বা শত্রুভাবাপন্ন দেশ যতটা যুদ্ধের প্রয়োজনে প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়েছে ঠিক ততটাই বা তার বেশি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সফল করতে হবে। যুদ্ধের পদ্ধতি বা যুদ্ধাস্ত্র বিষয়ে নিজেদেরকে উন্নত ও প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। অস্ত্র ও যুদ্ধের কৌশল নিয়ে এই প্রতিযোগিতা অ্যামেরিকা ব্রিটেন ও জামার্ণির মধ্যে চলতেই থাকে। যার ফলশ্রুতি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

এই বিষয়ে ভারত-পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাজেটের উল্লেখ করা যেতে পারে। অর্থনীতিবিদ মিহির রক্ষিতের একটা গবেষণাপত্রে গেম থিওরির ম্যাথামেটিক্স দিয়ে তিনি বুঝিয়েছেন ভারত ও পাকিস্তান দুদেশই প্রতিরক্ষা খাতে যত টাকাই ব্যয় করুক না কেন ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম শূন্য-শূন্য (০,০)- দু দেশের জন্য। ধরা যাক, ভারত কোন এক বাজেট অধিবেশনে ৫কোটি টাকা বরাদ্দ করল প্রতিরক্ষা খাতে। সেইবছর অথবা পরের বছর পাক সরকারও তাদের বাজেটে সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করল। এইবার আবার পরের বছর ভারত বাড়ালে, তারাও বাড়াল। শেষপর্যন্ত দেখা গেল, দেশের শতকরা আয়ের(GDP) ৮০ শতাংশ নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করা হলেও দুদেশের নিরাপত্তা তিলমাত্রও বাড়েনি।
অর্থাৎ এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধ না করেও যুদ্ধ প্রয়োজনীয় উত্তেজনা ও সেইজন্য জাতীয় সম্পদের অকারণ ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা ভারত পাকিস্তানের মতো উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে যেমন সত্যি তেমনই ঘটেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মাণি ও ব্রিটেনের মধ্যে। পরবর্তীকালে রাশিয়া ও অটোমানদের মধ্যে, গ্রীস, ফ্রান্স, অ্যামেরিকা, জাপান, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা চিলি- সমস্ত দেশের ক্ষেত্রেই সত্য। অথচ নিরাপত্তা আসলে কী? একটা বোধ? একটা আশ্বাস? তাহলে সবার জন্য অন্ন বস্ত্র বাসস্থান, আর একটু ভাল থাকা- এই আশ্বাস কে দেবে? রাষ্ট্র? জাতীয় সম্পদের কত শতাংশ উন্নয়নে, জনকল্যাণে খরচ হবে আর কত শতাংশ নিরাপত্তা খাতে ব্যয় হবে সে বিষয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে বইকি।
দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধ ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে জাতিসত্ত্বার মিথ্যে দম্ভ জিইয়ে রেখে ক্রমাগত হয়ে চলা যুদ্ধ ইতিহাসবিদ, অর্থনীতিবিদ ও অন্যান্য গবেষকদের এই বিষয়ে আরো ভাবতে বাধ্য করে। জার্মাণ ইতিহাসবিদ এইচ হার্জ ১৯৫১ সালে তাঁর লেখা বই ‘পলিটিক্যাল রিয়্যালিজম এণ্ড পলিটিক্যাল আইডিয়ালিজম’-এ প্রথম ‘সিকিউরিটি ডিলেমা’ বিষয়ে লেখেন। ঐ একই সময়ে ব্রিটিশ ঐতিহাসিক হার্বার্ট বাটারফিল্ডও তাঁর বই ‘হিস্ট্রি এণ্ড হিউম্যান রিলেশনস’-এ একই কথা উল্লেখ করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যখন চূড়ান্ত নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয় যুদ্ধের সম্ভাবনা তখনই দেখা যায়। কিন্তু এই নৈরাজ্য সৃষ্টির সময় দুদেশই অস্ত্র ক্রয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন কৌশলগত পরিবর্তনে এতটাই লিপ্ত হয়ে পড়েন যে এর ফলে দুই দেশের মধ্যে আরো বেশি করে নৈরাজ্য বাড়তে থাকে। নিরাপত্তার প্রতি এই বিনিয়োগ আসলে দু দেশেরই নিরাপত্তা বাড়ায় না এবং নৈরাজ্য বা দ্বন্দ্বেরও কোনও সমাধান দেয় না। একেই ‘সিকিউরিটি ডিলেমা’ বলে। এর ফলে আন্তর্জাতিক স্তরে একটা রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। যার প্রভাব অনেকগুলো দেশেরই অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজনীতিকে প্রবলভাবে আক্রান্ত করে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, ভারত ও পাকিস্তানের পরমাণু বোমা উৎক্ষেপণের বিষয়টি। ভারত ১৯৯৮ তে ১১-ই মে রাজস্থানের পোখরাণে প্রথম পরমাণু বোমা উৎক্ষেপণে সাফল্য লাভ করে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হয়, ‘বিষয়টা নিয়ে আমরা কোনও উত্তেজনা চাই না। শান্তি বজায় থাক। দুদেশেই।’ অথচ ওই একই সালে কিছুদিনের মধ্যেই পাকিস্তান চাগায় তাদের প্রথম সফল পরমাণু বোমা উৎক্ষেপণ করে। একটা কালো পাহাড় বরফের মতো শাদা হয়ে গেল, যেন বরফের ভেতর ডুবে যাচ্ছে সমস্ত পাহাড়। আর মাটিতে ভূমিকম্প। মানুষ ভয় পায় না। বরং ভেবে খুশি হয় এই হল উপযুক্ত সময় মুখোমুখি চায়ের আসরের বসার। যখন কেউ কাউকে ভয় পাবে না। বরং সমীহ করবে। সমঝে চলবে।
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় সেইসব নারীদের কথা। যাঁরা একজনও শত্রু সেনাকে হত্যা করেন নি। অথচ নিজেরা প্রতিপক্ষ দ্বারা ধর্ষিতা হয়ে, নির্যাতিতা হয়ে এবং মৃত্যু বরণ করে বীরঙ্গানার তকমা পেয়েছেন। নিরাপত্তা তাহলে একটা দুষ্টচক্র। যার ভেতরে রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্ক ও সাধারণ ভুক্তভোগী মানুষ সবাই আটকে রয়েছে। অথচ পুরো বিষয়টা আরো একবার ভেবে দেখলে লালনের গান মনে পড়ে যায়- ‘বাতাসে গেরো দেওয়ার মত কাজ।’ যে কাজে নিট ফল হয়ত শূন্যই। কারণ, যুদ্ধ মানে খরচ, যুদ্ধ মানে আবারও বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষের জীবন, আরো অনেকবেশি গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ানো। পৃথিবীতে আরো বেশি ক্ষুধার্ত, অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি। আরো অপরাধ, অত্যাচার বেড়ে যাওয়া। পরিশেষে নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় বলি- ‘যুদ্ধ মানেই শত্রু শত্রু খেলা/যুদ্ধ মানেই আমার প্রতি তোমার অবহেলা।’




সূত্র সহায়তাঃ
১) ‘ Smith, Theresa Clair (1980). "Arms Race Instability and War". Journal of Conflict Resolution
২) Mitchell, David F., and Jeffrey Pickering. 2018. "Arms Buildups and the Use of Military Force." In Cameron G. Thies, ed., The Oxford Encyclopedia of Foreign Policy Analysis, vol. 1. New York: Oxford University Press, 61-71
3) Political Realism and Political Idealism, John H. Herz, 1951
4) History and Human Relations, Herbert Butterfield, 1951
5) The Mercantile Capital of Economic Development, Mihir Rakhit, 1992
6) Yarhi-Milo,K.(2014) Knowing the adversary: Leader, intelligence, and assessment of intentions in the international relations. Princeton, NJ: Princeton University Press

৭) কলকাতা ও নোয়াখালি দাঙ্গা, অজুর্ন গোস্বামী সম্পাদিত, গাঙচিল প্রকাশনী