চতুরাঙ্গিক সময়

রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়

ঘোর সময় আর বেঘোর অসময় চতুরঙ্গ বিছিয়েছে ঘরের দাওয়ায়। ঘরের চারপাশে অপেক্ষায় আছে অষ্টনাগের ফণা। হয়তো মণি সংযোগে সম্ভাব্য জীবন; নয়তো তীব্র কালকূটে নিশ্চিত মৃত্যুর হাতছানি। চতুরঙ্গের প্রতিটা খোপে নিঃশ্বাস ফেলছে জীবন অথবা মৃত্যু; ঘর অথবা ঘরহীনতা। ছক্কা-পাঞ্জার এক নিবিড় দীর্ঘসূত্রতা। এমন এক অদ্ভুত খেলা, যেন ঘোড়া, গজ, নৌকা বা রাজাই প্রধান অঙ্গ; বাকিসব অঙুলিহেলনের অপেক্ষায় উপেক্ষিত, সাধারণতন্ত্র; নেচে উঠছে অদ্ভুত সময়ের আঙুল ধরে; কফির ভেতর খুঁজছে চিকেনের টুকরো! ঘরহীনতার ক্যালাইডোস্কোপে থমকে আছে সময়। মুহূর্ত ভাঙছে ছুটন্ত আগামী। বিপন্ন বিভ্রম। রিমলেস বৃত্তে তাল দিচ্ছে মাতাল জনগণমন; আঙুলে তার একপলক জীবন থেকে তুলে নেওয়া একচুমুক মৃত্যু। আর আমার আমি ‘আমি’ ‘আমি’ করে দুলে উঠছে-

আমি আছি
কোথায়
হাতড়াচ্ছি ভিতরবাহির
আমি আছি
কেন
নিঃশব্দ দোলাচল
আছি কি
চোখ পাতে চলাচল
চোখের আগে আমির ছায়া
দাওয়ায় বসে সময় মাপে
সময় কি আর বসতে পারে
আঁচল খুলে গতির আগে
আগুন লাগায় স্থিতির গায়ে
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুড়তে থাকে
আমার ছায়া আমার মাপে

আমি হাত পেতে জমা করি কিছু কিছু দুঃখ; হিমগ্ন সময় আর পালকের ঠিকানা; ঠিক যতটা আনায় বেজে ওঠে তিনতাল। নোঙরভোলা আঙুলে কুয়াশার ফাঁক, সমে এসে মাত্রা ফেলছে হিজিবিজি সময়ের নৈঋতকোণ। আমার চারপাশ থেকে খুলে যাচ্ছে সময়। সময়ের হাতে চৌকাঠ হারানো ভূত ও ভবিষ্যৎ। বহুজাতিক। আমি সময়হীনতার ভেতর এক পা এক পা। টাইম এন্ড স্পেসের ধারণাগুলো ওলোটপালোট; সূত্রের হাতি ও ঘোড়ার এমন বাঁকবদল যেন আমি নয় তুমি নয়, আমার অবস্থানই পাটরানি। আমি ভাবি আমি তবে কে? খাপখোলা সময়ের বাতাসিয়া ভাষ্য- তুমি কেউ নও, অনন্তের এক উপাদান মাত্র! তবে কি এই চতুরাঙ্গিক সময়ে দর্শকনিরপেক্ষ কোনো একক ইতিহাস নেই? অথচ ফেইনম্যানের আঙুলে খেলা করছে পিছুফেরার প্রাকৃতিক রহস্য। কনওয়ে ছক হাঁটছে খোপ থেকে খোপে নিরবচ্ছিন্ন পদক্ষেপে, যেখানে আমরাই সৃষ্টি করছি আমাদের ইতিহাস। কিছু বেপরোয়া কিছু বেওয়ারিশ অথচ যোগফলে আধিপত্য করছে একটাই ইতিহাস যেখানে আমার আমি খেলতে নামে উৎসের সময়সঙ্গমে-

মানবজমিন খুলছে অভিমানী মুখ
তালাশ করছে আপন ঘর
সময় উড়বে এবার
সামনে ও পিছনে
মধ্যবর্তী নগ্ন করে রাজার মুখোশ
জ্বলে ওঠে ঘরহীনতার বিপদসংকেত
বৈধতার কাগজে কলমে

সময়ের পাখিপায়ে প্রশ্ন ওঠে- হে কবি তোমার রাজনীতি নেই? কবি নিরুত্তর। তার আঙুল ধরে থাকে ছাপোষা নারীটি। তাকে নায়ানো, খাওয়ানো, শানানো, বাঁধানো- এই করতেই দিন চলে যায় কবির; রাজার ধামাধরার সময় হয় না তার। তবে কথা হল, তুমি যদি প্রতিষ্ঠানের ছায়া চাও; শান্তিনিকেতনী ঝুলি থেকে পঞ্চম সংষ্করণের উধাও চাও; রতন-ভুষণের পাগড়িটি চড়াতে চাও তবে আলাদা কথা, যেখানে কবিতার কোনো কথা নেই। রাজনীতির শিবিরে শিবিরে যে কুটিল মন্ত্রণার শব্দ ভাসে তার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে দিলে নারীটির অবুঝ দুটি চোখে কেবলই প্রশ্ন ওঠে, এ কোন ভাষা? রাজনীতির পায়ে গাঁথা সময়ের গাঢ় গণ্ডি। এক এক সময়ে এক এক নীতির পায়ে রাজাদের গা থেকে ঝরে পড়ে দিকনির্ণয়। উত্তরমেরুতে ঝড় উঠলেই নিমেষে দিকবদল ঘটে যায় দক্ষিণমেরুতে। কিন্তু কবিকে কোনো কালের গণ্ডি বাঁধতে পারে না। সময়ের লক্ষ্মণরেখা ডিঙিয়ে সর্বকালের সর্বমানুষের সঙ্গে তার অচ্ছেদ্য গ্রন্থন। রাজনীতির শিবিরে অর্ঘ্য দিতে গেলে কবিতানারীটি খুইয়ে আসে তার নারীত্ব। স্বচ্ছ শাড়িতে লাগে ন্যাংটামির রক্ত; কখনো লাল কখনো সবুজ কমলার মিশ্রণ। রাজনীতি হেঁটে যায় নির্দিষ্ট গন্তব্যে, যেখানে দাবার ছক পেতে অবিরাম খেলা চলে ডানে আর বামে। ঘোড়ার আড়াই পায়ে ঝুলে থাকে তন্ত্রসাধন। সাধন পথের মই বেয়ে বেয়ে বাকি সব জন বা গণ। বাছতে বাছতে গাঁ উজাড়। কাঁটাতারের ঘেরে এই জনগণসাধন। আর সাধনপিঠের চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে কবির অবুঝ নারীটি। তার সবুজ পা দুটি সাধনযজ্ঞের উল্টোমুখে-

কবির বোবা আলজিভ উচ্চারণ করে
অক্ষর দাও
হে অগ্রন্থিত সময়ের দুরূহ বিস্ময়
অক্ষর দাও
সম্ভবে
অসম্ভবে
সম্ভবের ভেতর দানা খোঁটে অসম্ভব
নিটোল নয়
টোলের ভেতর মাস্টারি রকমারি
বীজ নয়
তার গাজনও নির্দিষ্ট
কবি কিছুটা অসংলগ্নে
কিছুটা অনির্দিষ্টে
অনিকেত যেমন

আমি কবি। সময়কে ধরবে বলে যেসব ঘুড়ি ভোকাট্টা হয়ে যায় সীমানার ওইপাশে, তাদেরই ইচ্ছেগুলো ধরা পড়ে আমার আঙুলে। আমি তাই সময় ও অসময়ের মাঝে, কাল ও অকালের মাঝে খানিকটা স্পেস দাবি করি। মহাকালের দামামা বেজে ওঠে মৃত্যুতোরণে – ‘কালের কাছে তোমার কোনো ন্যায্য স্বত্ব নেই, গর্ভে তোমার বীজরোপণের মন্ত্র নেই, কেবলই অর্থের হাটে অনর্থের বিকিকিনি’। তাই সময়কে পিছনে ফেলে বেরিয়ে পড়ি। ইর‌্যাটিক ইরেজারে মুছতে মুছতে চলি অতীতের চলন, বর্তমানের বলন আর ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আগমনিগুলো। অনন্তের হাটে বাসা বাঁধে এক অচিন পাখি। ভাঙা স্বপ্নে রং দেয় ডানা বসায়। রঙের ভেতর আমি লাল সবুজ বাদ দিই। আঙুলে লেগে যায় গাঢ় কালকূট রং। তীব্র হলাহলে ক্রমশ নীল হয়ে আসে সমস্ত শরীর। হৃদি উপচে কয়েক ফোঁটা গরল গড়িয়ে পড়ে নরম মাটিতে। রোপিত হয় বিষবৃক্ষ। সন্ধ্যার শঙ্খধ্বনি থেমে যায়। আমি হাতড়ে বেড়াই দিগনির্ণয়ের প্রথাসকল। অনাত্মীয় ঠোঁটে বিশ্বাসী আঙুল জড়ো করে ভুল সময়, ধ্বংসের স্রোত, ছিন্নমূল স্পেস। যেন এসমস্ত জুড়ে জুড়েই তার সম্প্রসারিত সেতু, সৃজনের নির্যাস। বিলাসী আলোর পাশে অনিবার্য অন্ধকার যেমন; স্বস্তিক চিহ্নের পাশে ঈশ্বরের প্রমাদ যেমন। শৈশব পেরোনো ডুবজল, অফুরন্ত বিহঙ্গ। যদিও অন্ধ, বন্ধ করে না পাখা, উড়তেই থাকে, উদোম সময় থেকে উর্দিপরা সময়ের দিকে-

সময়ের দাগ লাগে রক্তের নীচে
মজ্জায়
প্রবাহে
স্তনসংকটে ক্রিয়া থেকে পরকীয়া
দূরত্ব মাপে তামস আঙুল
জলের ভাস্কর্য কতটা জলীয়
যদি কোনো দাগ এখনো থাকে
অনিশ্চিত সম্পর্কের ভেতর ঘনিয়ে ওঠে ঘূর্ণি
পালাতে পালাতে প্লাবন আসে
সময়ের স্রোতে
মায়ার ভাঁজে
এমন নিভাঁজ দাগ
যেন লুকোনো তরঙ্গে উৎসের মুখ
বিস্তারে যেতে যেতে মুছে ফেলবে বাস্তব
ঘোর লাগবে অবাস্তবের
বস্তু থেকে খসে পড়বে বিষয়
কাঠামো থেকে নেমে যাবে কাহিনী
আর কলমের মুখে ঘনিয়ে উঠবে সময়ের জ্বোরো তাপ