ভাষার করুণা বিষয়ক গল্প

শতানীক রায়

মাঝেমধ্যে মনে হয় এমন একটা লেখা লিখব এমন বাংলায়, গভীর ঘুম থেকে জাগিয়ে তুললে যেমনভাবে ভিটেমাটিহীন বাংলা বলে একজন মানুষ। সেই মানুষটার এক অদ্ভুত কথ্যভাষা হবে তবে তা মিনিটখানেক থাকে। ঘুমঘোর কেটে গেলেই আবার আগের মতো সচেতন একটা বাংলা যে-বাংলায় কোনো আক্ষেপ অথবা ভাঙনের কালদর্প নেই। একটা গোটা পৃথিবীর মানুষ হয়ে ওঠার বোধ নেই সেই ভাষায় যাকে আমি কখনো আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারব না আমার নিজের মধ্যেকার নিত্যভাষা আর আলাদা কোনো মদ-মাংসময় ভাষার থেকে। বারবার মনে করি এমন এক ভাষাকে আশ্রয় করব যেখানে সরাসরি আমি নিজেকে দেখাতে পারব যেমন গভীর জঙ্গলে হেঁটে গেলে আমাকে যেভাবে দেখবে কেউ। এই কোনো কেউ আর কেউ নয় এখানে কোনো কূলশীল পাঠক এসে আমাকে জঙ্গল বা বয়েমের মাছের চোখ দিয়ে দেখতে আসবে না। সে যেমন জীবনকে যাপন করে ঠিক সেরকমই ধারণা নিয়ে আমাকে দেখবে। আর আমার লেখায় যখন আমারই জীবনের অনুপঙ্খকে খুঁজে পাবে একজন পাঠক সে তো তখন দেখতেই পাবে কীভাবে আমার ভাষা আমারই রক্তমাংস আমারই যন্ত্রণাকাতরতা বয়ে নিয়ে চলেছে! এই স্বাভাবিকতা তার কাছে ধরা দিবে এক আশ্চর্য জগতে প্রবেশ করার মতো করে। সে ক্রমে এমনকিছু খুঁজে পাবে প্রতি বাক্যের ভেতর যখন প্রচলিত চলা আর ঘুম ভাষায় দেখা দিবে আগুনের উপর ফুটন্ত ভাতের হাড়ির রূপান্তরিত হওয়াকালীন চাল আর ভাতের পাক খাওয়ার মতো। যখন লিখব আমি, সে-সময় যদি অনুভব করতে পারি কীভাবে আমার অতীত আমারই কাছে এক অপরিচিত ধানের গোলার ভেতরের বছরের পর বছর পুরোনো চালের মতো স্বাদহীন। কুয়োর জলের শ্যাঁওলা জড়ানো জলের গভীর গন্ধের মতো তখন আমার মনোজগতের কোণগুলোতে একজন এমন কিছু আবিষ্কার করতে চাইবে এমন এক কুহকতা যা কখনো আমি আবিষ্কার করিনি। আলুর স্বাদ এমন এভাবে আমি কখনো পাইনি। সেই পুরোনো রুটির গন্ধের মতো শরীরটা নিয়ে আমি লিখেই চলব। আমি বলে যাব অনর্গল, বুঝব না কীভাবে আমার লেখাটা আজ কোনদিকে যেতে চাইছে বা ভবিষ্যতে কোন অন্ধকারে গিয়ে পাক খাবে। বিস্ময়ে তখন আমার একটি আলাদা শরীর হবে। ধানদূর্বার এই শরীরটা যখন মনে করাবে অতীতের আমি কেমন এক সময় দূর্বা বেছে পুজোর থালায় সাজিয়ে রাখতাম। কীরকম করে আমি আমার জীবনের প্রথম সঙ্গমের স্বাদ নিতে পেরেছি। কীভাবে এক-জোড়া হাঁস একটি মানুষের শরীরের ভেতর মাংসে মেশে। অন্ন-ভাত-ভক্তের জীবন কীভাবে পরিভাষিত হয়। পরিভাষার অন্ধকার জগতে এক এক করে আলাদা হতে থাকে পিঁপড়ে। ব্যর্থ গল্পের স্বাদ পালটে পালটে যেতে থাকে। মানুষ কীরকম আরও পরিষ্কার হয় সাদা থেকে আঁশটে হয় মধু থেকে নিংড়ে নিতে চায় মেঘের স্বাদ। কখন আমি টের পেতে থাকি আর এই সঙ্গম আমাকে তৃপ্তি দিচ্ছে না তখন শুধুই মনে হতে থাকে আত্মমৈথুনে এক পরাজাগতিক আনন্দ আছে। এখান থেকে আমাকে আলাদা হতে দেখা যায় বুঝতে পারি ভারী এই শরীরের আদৌ কোনো মর্যাদা নেই কারো কাছে। কারো কাছে নিজের কুণ্ডলিনী দেখানো নেই। একটি মেয়ের শরীরের রহস্যহীনতা আমাকে ছিটকে দেয়। পৃথিবীর প্রতিটি নারীর একই সেই স্তন ও যোনি যখন আমাকে আশ্চর্য করে না আর। আমাকে মুখ থুবড়ে পড়তে হয়। কোনো নেংরা জায়গায় স্তূপ ময়লাগুলো দেখে বা ময়লা কাদা মেঝে দেখে ক্রমে অনুভব করতে থাকি আরও খুঁটিয়ে দেখি এই মেঝের ময়লাগুলোর স্বাদ নিই আরও ঘষে দিই চামড়াটা মাটির। মাটির চামড়া টেনে তুলে দিলে হওয়ার মতো কিছু হওয়া হয়তো হবে। তখন কেউ আমাকে পেছন থেকে ডাকলে জমে থাকা মূত্রগন্ধ আমাকে আশীর্বাদ করতে শেখায় আমাকে আহরণ করতে শেখায় কীভাবে স্বয়ং ভাষা হয়ে উঠবে তুমি। কখন গান শুনতে বসে একবার ঘুম একবার জাগার অনুরণন মনে করিয়ে দেয় এখানে দুইজন ভাষা বহন করছে। কেউ পাশ থেকে ডাকলে কিংবা ফোন করলে মনে হবে আমি কোনো এক ভিড় বাসের ভেতর এসে পড়লাম বা এমনও হতে পারে ফোনটা ধরে ওপার থেকে শুনতে পেলাম কোনো অচীন জঙ্গলের নিরালা আওয়াজ নির্জন ভয় বা কিংকর্তব্যময় একটি শরীরের নিজস্ব জটা আর জাল। আবার পরক্ষণেই মনে হবে আজ সঙ্গমের ইচ্ছে জেগে উঠছে প্রবল। প্রবল হচ্ছে আমার যৌনাঙ্গের গভীরের একটা তরঙ্গ যা আমাকে আরও একজন মানুষ করে তুলবে সে আরও উদ্ধত হবে অধিগ্রহণের নেশায় তাকে আহরণ করতে হবে আরেকটি শরীর যা তাকে আরও বেশি লিঙ্গের বোধ করাবে। এই বোধ তখন কি শব্দ পাবে আমার। কোনো দূরসংযোগ ঘটাবে বাঘের সঙ্গে মানুষের কিংবা দুটো বাঘের বা দুটো মানুষের সঙ্গে বা সর্বশেষ দুটো মানুষ থেকে আলাদা হওয়া দুটো বাঘের। এত কিছু হওয়ার পর এত ভাষা জ্যান্ত হওয়ার পর আমাকে হয়তো ঘুমিয়ে পড়তে হবে আর ভাবতে হবে। উঠে আবার ঘুম নিয়ে ভাবতে হবে। ভাষা নিয়ে ঘুম ভাববে হয়তো কিংবা ভাষাকে ভালোবাসার বোধ আমাকে আরও কঠিন কিছু ভাবাবে।