ফুলবাবু,গৌরাঙ্গ মাস্টার,মালতীর মা ও কালের যাত্রার ধ্বনি

তমাল রায়




ফুলবাবুর চেহারা ছোটখাটো হলে কি হবে মন কিন্তু তিনটে৷ ওই যে ফুলবাবুর কিছুটা মন ঝি-বস্তি পেরিয়ে,ভুতনাথ ছুঁয়ে এঁদো গলি,আর মায়ের বাড়ির পাশ দিয়ে বড় রাস্তায়,তাপ্পর নেতাজির ঘোড়ার লেজের দিকের রাস্তা ধরলো,ওটাই যশোর রোড। দৌড়ে গেছে সবুজ,মাঠ-ঘাট-পানা পুকুর,কলোনি ও কাঁটাতার পেরিয়ে রফিক,জব্বার বরকতদের বাসভূমিতে,ও পথ দিয়েই তো কত্ত লোক এয়েচিলো, ফুলবাবুদের বাগবাজার শোভাবাজার, আহিরীটোলায়। তাপ্পর তো বদলেই গেল শহরটা। তাতে অবশ্য ফুলবাবুর কিচুই হয়নি। মানুষকে আপন করে নেবার ক্ষমতা ছিলো তাদের বটে।
একটা মন ভার্চুয়ালেই ঘোরে ফেরে!
আর বাকিটা মন অবিশ্যি এক প্রায় অন্ধ দেওয়ালে পেরেক পুঁতে,শূন্যে ঝুলছে কিছুটা শাহিনবাগ, পার্কসার্কাস হয়ে, যেমন হয়!

ফুলবাবুকে দেখতে যেমন ফুল্টুস,সন্ধ্যে ঘনালেই ফিনফিনে আদ্দির পাঞ্জাবি,গলায় পাউডার লাগানো দেখে ভুল বুঝবেন না যেন। বোস,আর মিত্তির বাড়ি মাঝে যেমন সরু গলি,যা আছে বলেই বাবুবাগান থেকে গোপীমোহনে টুকুস করে ঢুকে পড়া যায়,শব্দ আর পার্শ্ববর্তী শব্দের মাঝেও তেমন সরু যে ব্যবধান,সেখানে মুখ গুঁজে রয়েছে সময়! সে দৃশ্যমান বা অদৃশ্য,কিন্তু সে বহমান,নিজ ধর্মেই,যেমন এঁদো গলিগুলোও,ওরাই তো লাইফ লাইন! ফুলবাবুকে মালতীর মা যেভাবেই চিনুক না কেন,সে কিন্তু আদ্যন্ত দার্শনিক! পাশের বাড়ির বারান্দায় কাপড় শুকুত দিতে মালতীর মা আসলে,এক দৃষ্টিতে চে,বলে মালতীর মা হয়তো,বুকের আঁচল টানছে৷ ফুলবাবু তা বলে কেবল শুধু মালতীর মা নয়,দৃষ্টিকে বেঁধে রাখায় তো আর তিনি বিশ্বাস করেন না৷ আর তাই কি করা সম্ভব? গোটা বারান্দা,তার ওপর-নীচ,ঝুলে পড়া ইলেকট্রিকের তার,তারে লাট খাওয়া ঘুড়ি সবই চোখে পড়ে,ঠিক যেমন আকাশে উড়তে থাকা পাখির দিকে তাকালে,দৃষ্টি কি কেবল সে পাখিতেই সীমাবদ্ধ থাকে? অবশ্যম্ভাবী ভাবেই চোখ চলে যায় অসীম আকাশের ক্যানভাসে। ওই আকাশ,সেও তো সময়। সময়ের অসীম অনন্তে ডানা মেলে যে উড়ে যাচ্ছে,সে একটি ঘটনা মাত্র। যেমন মালতী,যেমন ফুলবাবুও। বাকিটা কাল চেতনাতেই নিহিত৷ ফুল বাবু এলিয়ট না পড়ে থাকলেও,তিনিও কবি,আর তাকে গৌরাঙ্গ মাস্টার বলেছিলেন,প্রতিটি অতীতের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বর্তমানের বীজ,প্রতিটি বর্তমানে লুকনো অতীত ইতিহাস আর ভবিষ্যতের ঘ্রাণ,আর প্রতিটি ভবিষ্যতই হলো বর্তমান আর অতীতের ভাষান্তর। কে বলেছে জানিস? ফুলবাবু মিষ্টি হেসে উত্তর করেচিলেন,কেন রামকৃষ্ণ! মাস্টার হেসে বলেছিলো,তা এলিয়ট হয়ত আধুনিক কবিতার রামকেষ্টই বটে৷ 'ওয়েস্টল্যান্ড' যতটা স্পেসের ততটাই সময়েরও আখ্যান,আর রামকেষ্ট তো সময়কেই ধরেছেন তার কথায়!' অত বুঝতে না পেরে ফুলবাবু গঙ্গার ধারে চলে এসেছিলেন। জীবনকে সহজ করে নেওয়াই শ্রেয়৷ চুপ করে বসে দেকচিলো সন্ধ্যা আরতি। জেলে নৌকোগুলোর ছই এর ভেতর তখন রান্না হচ্ছে৷ নদীর বাতাস লেগে আগুন জ্বলছে উনুনের,কমে যাচ্ছে৷ ফুলবাবুর মনে পড়ছে,গৌরাঙ্গ মাস্টারের কথাঃ
প্রতিটি প্রথম ঘটনাকে ভেঙে দেখা যেতেই পারে,প্রতিটি দ্বিতীয় ঘটনায় ভাঙা অংশগুলোর মধ্যে তুলনামূলক বিচার করা যেতেই পারে,তৃতীয় ঘটনায় কিন্তু সীমা ভেঙে মিশে যাচ্ছে,প্রথম,দ্বিতীয় এবং তৃতীয়তেই,কে মিশছে,বল দেখি। গৌরাঙ্গ মিচকি হেসে বলেছিলো,মালতীর মা আর ভূতনাথ আর বেন্দাবন পাল বাই লেন৷ মাস্টার হেসে বলেছিল,তা বটেই৷ নারীই তো কাল। কাল থেকেই কালী। এক অন্তহীন সময়!
বুঝলি,এরিস্টটল সাহিত্যের সীমাবদ্ধতার কথা বলেছিলেন,কারণ তা সময়কে ধারণ করেনা। এ অবশ্য বহু প্রাচীন সময়ের কথা। সাহিত্য বরং কালচেতনাতেই নিহিত তার সমগ্র জার্নি জুড়েই। সে কাল চেতনা হয়ত সোশাল টাইম,হিস্টোরিকাল টাইমে বিভক্ত,আবার ইতিহাসও বিভক্ত মেটা হিস্ট্রির উপকরণে। বিভাজনে জ্বালানি সরবরাহ না করে বরং বলা যাক,পল ভ্যালেরির কথায়,প্রতিটি কবির মধ্যেই লুক্কায়িত থাকেন এক বয়োবৃদ্ধ। কে সেই বৃদ্ধ?—সময়!
চোখ স্থির করে বলেছিলো ফুলবাবু,হুম! আমাদের উঠোনের বুড়ো বটগাছটা যেমন!

আজ মাতৃভাষা দিবস। মায়ের ভাষায় ভাসতে ভাসতেই আমাদের সাহিত্যের অসীম অনন্তে প্রবেশ। আর সে সাহিত্য আদতে নিরবধি কাল চেতনা সমন্বিত এক প্রশ্নাতীত দলিল। রবি ঠাকুর থেকে এলিয়ট,ডিকেন্স থেকে কমলকুমার...কালের যাত্রা ধ্বনির পলাতক ও অনুসরণকারী একইসাথে।
বলা হয়নি ফুলবাবু,গৌরাঙ্গ মাস্টার,মালতীর মাও আমাদের উত্তর কলকাতার এক একটি কবিতার নাম। ওরা আজ কেউই নেই৷ তবে বোস,আর মিত্তিরদের বাড়ির মাঝখানে বয়ে যাওয়া ওই গলিগুলো আর ভুতনাথ আছে,সময়ের স্মারক হিসেবেই!
সেভাবেই এঁদো গলি গোপীমোহন দত্ত লেন কখন যশোর রোড ধরে সোজা কাঁটাতার পেরিয়ে পৌঁছেছে,ঢাকার মতিঝিল,ভুতের গলি,বা সিদ্ধেশ্বরীতে। যেভাবে কাল মেশে নিরন্তর প্রবাহে কালেই।
প্রকাশিত হল একুশকে মনে রেখে,সময়ের ভাষ্য ধারণকারী সংখ্যা,'কালধ্বনি'।
ভাষার চেতনা আমাদের স্পর্ধার আকাশ গড়ুক৷
বরকত,রফিক আর জব্বারদের হাত ধরুক ফুলবাবু,গৌরাঙ্গ মাস্টার বা মালতীর মা। কিছু দূরে কুয়াশায় অস্পষ্ট ঝুলে থাকুক শাহিনবাগ - পার্কসার্কাস। মুষ্টিবদ্ধ আঙ্গুলগুলো কেবল আকাশের পানে,আরও শক্তি নিয়ে উদ্বেল হলে
ফুল বাবু,গৌরাঙ্গ মাস্টার,মালতীরা যশোর রোড পার হয়ে অনন্তের পথে কোথাও কখনও মিলিত হন। ভাষার ভাসার ভালোবাসায় যেমন হয় আর কি!