একটি নষ্ট আলজিহ্বার (আসলে অলিজিহ্বার) ‘বিবরণ’ অথবা ‘তেরে বিনা জিয়া যায় না’

অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

অলিজিহ্বা তথা আলজি/আলজিব খুব দামি জিনিশ। উটি আলটাকরায় (মানে গলনালীর উপরে, টাকরার আগে, ক্ষুদ্র জিহ্বা হিসেবে বাস করে)। ইংরিজি নাম uvula। মুখের ব্যালান্স বজায় রাখে। দেখুন না হুতোমে। সেখানে এক ব্যক্তি “আলজিবও খারাপ হ’য়ে যাওয়ায় সর্ব্বদাই ভেটকী মাছের মত হাঁ ক’রে থাকতেন”। তারও বহুদিন পরে, সেই ‘ত্যাখনকার’-ই দিনে ডাক্তাররা বাচ্চাদের ক্রনিক টনসিলাইটিস হলেই কুচ ক’রে আলজিব কেটে বাদ দিতেন। অতনু ছোটোবেলাতেই প্রাইমারি ইস্কুলে দেখেছে এক সহপাঠীকে আলজিব কাটানোর পরে সারাদিন ভেটকী মাছের মত হাঁ ক’রে না থাকলেও ‘অ্যাল অ্যাল’ করে, চেষ্টা ছাড়াই গলা কাঁপিয়ে কথা বলতে। অতনুর বাবা বুদ্ধিমান মানুষ। ছেলের পাকা টনসিলও কাটাননি। অতনুও নিজের মেয়ের/ছেলের আলজিব তো দূরস্থান, নাকের পলিপও কাটায়নি। হোকনা ডিএনএস (ডেভিয়েটেড ন্যাসাল সেপ্টাম)! আসলে একই ডিএনএর তো!
কারণ একটাই। অতনু ছেলেবেলা থেকেই অন্ধের মতো নিজের যুক্তিবুদ্ধিতে বিশ্বাস করতো। কোনো ব্যাপারে নিজে না কুল পেলেও গুরুজনদের সাহায্য চাইতো না। বেতাল পঞ্চবিংশতি বইয়ের দ্বিতীয় গল্প থেকে শেষ গল্পাবধি শেষে ‘ইহার পরে বেতাল ইত্যাদি …’-তে কী বোঝায় না বুঝতে পেরেও কাউক্কে শুধোয়নি। মানে, বাংলার ‘মানে’ বইয়ের পাতায় পাতায় পরের দিকের ব্যাখ্যাগুলোতে প্রত্যেকটার আগে ‘ভূমিকালিপি পূর্ববৎ’ কথাগুলির মানে কী, তাও। এমনকি, ‘রামের সুমতি’ গল্পের পাতায় পাতায় ‘রাম হাত ছুঁড়িল’ প’ড়ে কত্তোবার হাত ছুঁড়ে দেখেছে উটিও যথাস্থানেই আছে, ছোঁড়া যায় না। হাত কী করে ছোঁড়া যায়, চন্দ্রযানের মতো করে, তাও বোঝেনি। আসলে অতনুদের বাড়িতে বাচ্চাদের হাত ছোঁড়ার রেওয়াজই ছিল না। ফলে অতনু বুঝতো না। এই ব্যাপ্ত বোঝা-না বোঝার আলোআঁধারির জগতে বাস ক’রে অতনু নিজের মতো ক’রে বুঝেছিল নস্টালজিয়ার মানে নষ্ট আলজিহ্বা, আলজিহ্বা নষ্ট হয়ে যাওয়ার অবস্থা। সেই ‘মানে’টা বুড়ো বয়সেও বজায় ছিল। তাই অতনু ওদের, মেয়ের/ছেলের, নাকের পলিপও কাটায়নি। নষ্ট আলজিহ্বা অতীতকে জাগিয়ে না হয় রাখলো। কিন্তু পলিপকাটা নাক তার গন্ধ নিতে পারবে?
এইসব কথা হচ্ছে এই জন্যে যে আলজিব অতীতের বর্তমানত্ব ও বিরাজমানতাকে জিইয়ে রাখে যে এই কথাটা সবার জানা। অথচ, অতীত ব’লে কি সত্যিই কিছু আছে? অতনু ছোটোবেলায় অধ্যাপকদের কাছে পড়েছে যে আমেরিকায় প্র্যাগম্যাটিজম ধারার এক বড়ো প্রবক্তা জর্জ হার্বার্ট মীড তাঁর ফিলসফি অভ দ্য প্রেজেণ্ট (১৯৩২) বইয়ে বর্তমান সাক্ষ্যের থেকে যৌক্তিক নির্মাণ হিসেবে অতীতের প্রতি উল্লেখের ব্যাপারটা খতিয়ে দেখেছিলেন। কিন্তু এই যুক্তির অধঃশায়ী অর্থের তত্ত্বের প্র্যাগম্যাটিজমকে মেনে নিয়েও, এখনকার দার্শনিক- ইতিহাসবিদদের অনেকেই মনে করেন যে ‘আক্ষরিক অর্থে অতীতই, তার সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টির চেয়ে, পরিবর্তনশীল বর্তমানের সঙ্গে বদলে যায়। এদিক থেকে এটা কেবল সত্যি নয় যে অতীত বর্তমানকে আলোকিত করে বটে, বর্তমানও অতীতের উপর নতুন আলো ফেলে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে আমরাই কি অতীতকে আলাদা ক’রে দেখি, নাকি দেখার জন্যে আলাদা কিছু সত্যিই আছে? রিয়ালিস্টরা যদি জোর দিয়ে বলেন যে না আমরাই কেবল অতীতকে আলাদাভাবে দেখি, তাহলে প্র্যাগম্যাটিস্টরা বলবেন আমরা যাকে বাস্তব ব’লে চোখে দেখছি তার থেকে আলাদা কোনো অব্‌জেক্‌টিভ বাস্তবতাকে কী ক’রে পৃথক করা যাবে, প্রথম থেকেই ‘বিশ্বাসে মিলয়ে বস্তু’ মনোভঙ্গীকে বাদ না দিয়ে?, তবুও বলুন, আমরা কেমন ক’রে একটা সর্বস্বীকৃত গপ্পো বা উপকথা, আর বিষয়ীনিরপেক্ষ বাস্তবতার মধ্যে প্রভেদ করবো? বোধহয় জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪-র বিখ্যাত স্লোগান, “Who controls the past controls the future” পুরো গল্পটা নয়: আমাদের কি তবে যোগ করতে হবে, “Who controls the present, controls the past”?’ [Abraham Kaplan, ‘Historical Interpretation’, in (Ed.) Y. Yovel, Philosophy of History and Action (Boston, London: D. Riedel Publishing Compny, 1978), p. 29]। এইটাই প্রেস্টন কিং অন্যভাবে বলেছিলেন (নাও পড়তে পারেন) যে, ‘History is seized, grasped, intuited, understood in the past. But it is present reflection whose object is to portray and explain the past, a past which by definition cannot be entered chronologically. The past as such we have no evidence for; we never seize nor know the “past” itself as such. The past, strictly speaking, is never seen, but only assumed, and such evidence as we have in the present may be set out in accordance with this assumption’. [Preston T. King, Thinking Past a Problem: Essays on the History of Ideas (London, Portland, Or: Frank Cass, 2000), p. 50]।
নষ্ট আলজিহ্বার খালি আলটাকরাটা অতনুর ক’দিন ধরেই চুলকোচ্ছে। ‘জিয়া নস্ট্যাল’ আর জিয়া যায় না, অন্ততঃ যাচ্ছে না। লেখাপড়া, এমেডিগ্রি, চাকরি, প্রেম, বিয়ে, ডক্টরেটি, ছেলেমেয়ে, পদোন্নতি, অল্পস্বল্প খ্যাতিকুখ্যাতি, নাতিপুতি, অল্পভগ্নশরীর, একাকী বেছে নেওয়া নিঃসঙ্গতা, সবই তো হোলো। কিন্তু অতনু জীবন থেকে পেল কী? অথচ শৈশবের খেলার মাঠ, বিকেলের সুহৃৎ সঙ্ঘের লাইব্রেরি, শেঠেদের অট্টালিকায় হ্যাজাক বা পেট্রোম্যাক্সের আলোয় জ্বলজ্বলে বিয়েবাড়িতে প্রথম খাওয়া রঙিন শরবৎ সব গেল হারিয়ে। মুন্সিরহাটে চিন্তামণি স্কুলে ক্লাস ফাইভের সে যুগে সপ্রতিভ ছেলে বনেদি কুন্ডু পরিবারের বভ্রুবাহন কুন্ডু, যে অতনু স্কুলে পৌছলেই একগাল হাসি আর কোনো স্মার্ট কথায় অভ্যর্থনা করতো। বভ্রুবাহন একটা চিরকুটে লিখে আনতো ওর লেখা অমিত্রাক্ষর ছন্দের নব রামায়ণঃ
আরে আরে লক্ষ্মণ এই কী তোর বীরত্ব?
গিয়েছিলি গিয়েছিলি তালতলাতে,
বাহ্যে সারতে
সেখানে করিল শৃগালে তাড়া;
ঝাঁপ দিলি যমুনার জলে;
যমুনার জল শুকাইল;
মুছিলি কাগজে পাছুর ওটা।

হেসে খুন হয়ে যেতো অতনু। বভ্রুবাহনের মাথায় আরো কত কী যে আছে? বা ছিল? বভ্রুবাহন কোথায়? হারিয়ে গেছে। কলেজ স্ট্রিটের সব চেয়ে বড় নাটকের দোকান নব গ্রন্থ কুটিরে কাজ করতো মুন্সিরহাটের চিন্তামণি স্কুলের ছাত্র সহপাঠী গোপাল। অতনু তাকে চেনেনি। নাম দেখে সেই চিনেছিল। রাইটার্সে ডবলিউবিসিএস অফিসার বভ্রুবাহনের খবর সেই দেয়। ফোন নম্বর, ইমেলাইডি দিতে পারেনি। তবু চেষ্টা করলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়, যেতো। কিন্তু মুন্সিরহাটেরই রামচন্দ্রপুর গ্রামের আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বরকতুল্লা, মসূর আলি, মনিরুল, আর মহম্মদ মুসাকে কোথায় পাবে? ১৯৬৮-তে মার্টিন লাইট রেলের হাওড়া-আমতা, হাওড়া-চাঁপাডাঙা, হাওড়া-শিয়াখালা লাইন উঠে যাওয়ার বছরে একবার বরকতুল্লা, মসূর আলিকে দেখেছিল গরুর গাড়িতে মাল নিয়ে যাচ্ছে। একগাল হেসে বলেছিল, ‘কিরে শক্তি, কেমন আছিস?’ তখন শক্তিই নাম ছিল অতনুর।

আমতায় অতনুর বাবাকাকার পৈতৃক কেনা বাড়ি। আসল বাড়ি হুগলি জেলার ছোট্ট গ্রাম গুটি সিংটি। মার্টিন রেলের ইছানগরী স্টেশন থেকে সময়কাল/স্থান/সামর্থ্য অনুযায়ী লোকে যেতো মাঠের পাশের উঁচু রাস্তায় হেঁটে /গোগাড়িতে /সাইকেলে /সাইকেলরিক্সায় /ভ্যানে /ভ্যানোয়। বাবার সঙ্গে স্টেশনে স্টেশনে কোয়ার্টারে কোয়ার্টারে ঘুরে বেড়ালেও আমতায় প্রায়ই থাকতো। আমতার নিত্যানন্দ স্কুলে ক্লাস সিক্সের দেবকীনাথ জানার কাছেই অতনুর প্রথম যৌনতার জ্ঞান পাওয়া। তার বিড়বিড় ক’রে বলা সব রগরগে গল্প, যাদের অনেকেরই নায়ক দেবকী, অতনুর হীনম্মন্যতার সৃষ্টি করলেও তাকে বড় হতেও সাহায্য করেছে। নিজের বাড়িতো ছিল ফুলবেলপাতার গন্ধ ওয়ালা। কিন্ত তার চেয়ে চার বছরের বড়ো হলেও দেবকী ক্লাসের ফাস্টসেকেন হওয়া অতনুকে এই সব না জানা আশ্চর্য জিনিশের জ্ঞান দিয়ে কিসের আত্মশ্লাঘা পেতো, কে জানে? তাকে অতনু জানাতো তার আশৈশব খবরের কাগজে মন দিয়ে পড়া দেবকীর কাছে না জানা, আশ্চর্যের অনেক জিনিশ। যেমন ১৯৪৭ সাল থেকে প্ল্যান করা, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পাশ হয়েও ‘চক্রবেড়ে রেল’ কিছুতেই তৈরি হচ্ছে না কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকারের অসহায়তায়, যেমন হচ্ছেনা ১৯৪৯ সালে প্ল্যান করা, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পাশ হয়েও পাতাল রেল। আবার বেরুবাড়ির ইউনিয়ন মামলায় সিপিআই আর অন্যান্য বামপন্থী দলের দিল্লির কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের কী কী কারণ। ১৯৪৭ সালে বেরুবাড়ির ছিটমহল ব্রিটিশ সরকার ভারতের পক্ষে দিলেও একদিকে থানা বোডা তার মধ্যে না থাকায়, আর বেরুবাড়ির ম্যাপ ভুলভাবে আঁকা থাকায় পাকিস্তান বেরুবাড়ির ভেতরের অনেক এলাকাকে নিজের ব’লে দাবি করছে। দেবকী এসব শুনে অতনুর জ্ঞানের বহর দেখে আশ্চর্য হয়ে যেত। দেবকীকে বলাই হয়নি যে ক্লাস থ্রিতে নানু মাস্টারমশাইয়ের সংগে ট্রেনে ক’রে মাজু স্কুলের প্রাইমারি সেকশনে যাবার সময় আগে পৌঁছে ময়রার দোকানে অপেক্ষমাণ অবস্থায় পড়া আনন্দবাজার পত্রিকা, বাড়ির স্টেটসম্যান যার একটা কলাম বানান ক’রে ক’রে পড়া বাড়ির সব ছেলে মেয়ের দৈনিক টাস্ক, আর স্টেশনের কমিউনিস্ট পয়েন্টসম্যান কানাই সামন্ত-র তার কংগ্রেসি বাবাকে নিয়ে শ্লেষ অতনুর তথ্যের প্রধান উৎস। কোথায় গেল দেবকী আর কানাই সামন্ত? অতনুর কান্না পায়।

ক্লাস এইটের মাঝামাঝি সময়ে অতনু ভর্তি হয় হাওড়ার বেলিলিয়াস স্কুলে, হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষার ঠিক আগে আগে। সেই অবস্থায় পরীক্ষাতে বসে ইংরিজি আর বাংলার পরই জ্বরে পড়ে। সেই সময়ে আন্ত্রিক জ্বর অতনুর নিত্যসঙ্গী। ইংরিজি আর বাংলায় নিয়মমতো ফার্স্ট হয়। বাকিগুলোয় জিরো। কিন্তু অ্যানুয়াল পরীক্ষায় নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ওরই খুড়তুতো ভাই বিকিরণ-এর থেকে বিপুল নম্বর বেশি পেয়ে ফার্স্ট হয়। এই স্কুলে প্রথম ছাত্র আর মাস্টারমশাইদের সমান প্রিয়পাত্র হয় অতনু। বাংলার টিচার ননীবাবু, ইংরেজির টিচার শৈলেনবাবু, অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারমশাই ভয়ংকর বাণেশ্বরবাবু, ইতিহাসের হীরালালবাবু (পদবীতে সরখেল, মনসবদারকে মনসব্দার না ব’লে মনস্‌বদার বলতেন), অঙ্কের রামবাবু, আর সর্বোপরি মোটাসোটা, হাস্যমুখ হেডমাস্টার মশাই পটলবাবু ভীষণ ভালোবাসতেন। গরমের ছুটি পড়ার আগের দিন হাফস্কুল সেরে বাড়ি যাওয়ার আগে শৈলেনবাবুকে না ব’লে বাড়ি চলে যাওয়ায় তিনি স্কুলের দারোয়ানকে দিয়ে ডেকে পাঠান। এঁদের আরেকবার দেখতে ইচ্ছে করে। আর বন্ধুসহপাঠীরা? পেটরোগা, স্কুলের প্রতি ক্লাসের আগে বড় বাইরে যাওয়া, বাঁকা হলহলে জুতো পরা, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের ভক্ত শক্তি; একই ক্লাসের প্রায় দশবছরের বড়, দীর্ঘদেহী, মুসলিম বন্ধু/দাদা শফি; এরাই বা কোথায়?

মন আরো বিকল ক’রে দেয় শৈশব সঙ্গিনীদের পাত্তা না থাকা। রামচন্দ্রপুর আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময় মালাকারদের বাড়ির সীতা, আর চম্পা রোশেনারা, মুন্নি। চম্পা হয়েছিল ডাকঘরের সুধা, ওর অমলের বিপরীতে। ওকে, মানে অমলকে শেষ দিকের দৃশ্যে তার উদ্দেশ্যে বলেছিল “তোমরা ওকে একটি কথা কানে কানে বলে দেবে?... সুধা তোমাকে ভোলে নি’। রোশেনারা নিজের লজ্জার মূল্যে ওকে পরীসাধনার মিথ্যের কথা বলেছিল, যেকথা অতনু এখানেই গত উৎসবসংখ্যায় লিখেছে। অতনুর আজো মনে পড়ে, রোশেনারার মুখ ঘেমে দেখাচ্ছে যেন গর্জন তেলে ধোয়া। লম্বা গলায় ঝোলা লাল সুতোর তাবিজটাও নেই, আর তাই দেখা যাচ্ছে তিনটে আড়াআড়ি ভাঁজ। এর পরেই বগলে তামাটে কচি চুল। হিলহিলে তামাটে গায়ে কিচ্ছুটি নেই, ফ্রক, প্যাণ্ট। বুকে দুটো গোল বোম্বাই টোপার উপরে পড়ে থাকা কাঁচা কিসমিসের রঙের বোঁটা। কোমরের নিচ থেকে জ্বলছে ঘাসে ঢাকা বনে জ্বলা আগুনের মতো কিছু। চোখ রাখা যায় না! আর তার মুখের দিকেও তাকাতে ভয় করে! লাল। যেন ধুম জ্বর হয়েছে। ফ্যাঁসফেঁসে গলায় সে বলছে— বাবুর পরী নামানোর শখ! চারধারে পরী দেখতে পাস না! নে, কী দেখতে চাস বল। আমিই পরী!

কিন্তু সবার উপরে পোস্টমাস্টারের মেয়ে সন্ধ্যা। যে আর তার বাবা অতনুদের সঙ্গে সঙ্গেই জাঙ্গিপাড়া থেকে মুন্সিরহাটে এসেছিল। ক্লাসের মেয়ে। কিন্তু এমন ভাব করতো, মন্তব্য ছুঁড়তো যেন তখনকার বাজার কাঁপানো সুচিত্রা-উত্তমের ছবি। তার সঙ্গে অতনুর দেখা হয়েছে রাস্তার ধারে মাত্র কয়েকবার। কয়েক মিনিট। কিন্তু তার প্রতিটার মধ্যেই কোটি বছরের মানুষের প্রেমের নির্যাস ভরা যাবে। সে কেবল ফিরে ফিরে আসে, সানাইয়ের পুরনো সুরের মতো। অতনু কবি নয়, কিন্তু কয়েকবার তাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে সন্ধ্যা তারই সন্ধাকালে —

সানাই

ছুটে গিয়ে ফিরে আসে
নিপুণ হাটের টানে, নয় শূন্যভিতে;
কিন্তু তোমার ইয়ো-ইয়ো, ছুটে ছুটে গিয়ে ফিরে আসে,
বাদকের শ্বাসসীমা অনুযায়ী,
কমদূর, বেশিদূর, অনেক অতীত নিয়ে;
কেন্দ্র তার প্রোথিত অতীতে।
বালকের হাতলাট্টুবৎ
অতীত পিছনে ছুঁড়ে’ তালুবন্দী করার কসরৎ
তুমি তো এখনও শেখো নাই!
হৃদয় মোচড়ানো বাজনার ভাণে, গানে,
কখনও ভেবেছো,
নিজের মনের মধ্যে কান্নার জন্যেই,
নিজেরো একটা মন চাই?
দেখেছো কি, সানাই?
ছোটোরেল পাতিহাল যেতে
যেখানে বাঁকটা নেয়, সেখানের লেভেল ক্রসিং
‘তুমি ফিরায়ে দিয়েছো ব’লে ফিরে চলে যাই’—
মাঠপার সুর শুনে কেঁদে মরে?
বালিকার ঝিম ধরে বালকের কালো চুল
আরো কালো একপুকুর, বাঁওহীন, কালো চোখ ভেবে!
তাই দেখে মার্টিনের একা ইঞ্জিন
বন্ধ ক’রে টিংটিং,
ভবিষ্যতের দিকে চ’লে যেতে, ঝাঁপায় লাইন!
আজ, বিনা শপথেই কহো,
কাঁদিয়ে কাঁদিয়ে যত লোকদের পুনর্বার দারপরিগ্রহ
বেদনার জটিলতা, নিপুণতা, ইয়ো-ইয়ো ফেরাবে কি?
তার কোথা পিছুটান? হায়!
রুদতী সানাই!

কিম্বা —
বিলে ডু (বিয়ে দু)

ইচ্ছে করে চিঠি লিখে কলমের নিবটাকে দোয়াতে ডুবিয়ে,
কেবল জানতে তুমি কোথায়? কিভাবে? পোস্টমাস্টারের মেয়ে
জাঙ্গিপাড়ার থেকে মুন্সিরহাটে, কোন্ ভাগ্যে জানি এসে গিয়ে,
ফুটে গেছো, না এখনও বেঁচে আছো কোথায়ও, নাতিপুতি নিয়ে?
লেভেল ক্রসিংএর কাছে মার্টিনের কয়লার ইঞ্জিনের শিস পৌঁছিয়ে,
যাকে আটকিয়েছিলে, কয়লার গুঁড়ো, কালো ধোঁয়া দিয়ে দিলো ভিজিয়ে।
হারু ঘোষ, নাকি কাসাব্লাঙ্কার মতো, সে প্রেমিক রান-ওভার হ’য়ে,
অকাল অভিসারে, ট্রেনে কাটা বটগাছ, জীববৎ এখনও দাঁড়িয়ে।

বেঁচে থাকলে কাছে ডেকে, মুখখানা কাছে এনে, ইয়ে —
অগভীর চুম্বনে — বোলো কার সাথে হয়েছিলো ভুল বিয়ে।
সব অর্জন ফেলে দিয়ে সে বালক গেছে তার কালো চুল নিয়ে,
লেভেল ক্রসিংএ, তেঁতুল গাছের নিচে, সময় যেখানে থমকিয়ে।

এই অতনুর বৃদ্ধবয়সের প্রেজেন্ট তাকে ইতিহাসের জন্য যে যে উপাদান যুগিয়ে দিচ্ছে সেগুলোকে নিয়ে যে ইতিহাসযান তৈরি হবে, অতনু তার নাম দেবে ‘নষ্ট অলিজিহ্বা’। মনশ্চক্ষে অতনু তার চেহারা দেখতে পায়। মার্টিন রেলের সাইডিঙে রাত্রে থেকে দেওয়া ধোঁয়া ওঠা কুয়লার ইঞ্জিনের সাঁইসাঁই-এর মতো তার রুদ্ধগতির ক্রোধ। অশ্বমেধের উদ্যত ঘোড়ার পুরুষাঙ্গর মতো বেরিয়ে আছে তার লিভার। তার সামনে ঝুলছে শিউলির মালা; আর পিছনে অশ্বপুচ্ছের কেশের মতোই কাশফুল। লিভারে একটান মারলেই তা মানুষকে পৌঁছে দেবে তার নির্মিত অতীতে, হুগলির জাঙ্গিপুরে; হাওড়ার মুন্সিরহাটের শ্যামবাটিতে, ধ্বসা-নরেন্দ্রপুরে; আমতায়, বেলিলিয়াস পার্কে। নস্টালজিয়াকে আউট ক’রে দেবে। সব মানুষ থাকবে অর্ধেকটা তার বর্তমানে, আর বাকি অর্ধেক তার নির্মিত অতীতে।