হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে.....

লায়লা আফরোজ

হরিপদ কেরানির সাথে তখনো ঠিক পরিচয় হয়নি, কৈশোরত্তীর্ণ আমি একদিন রবিঠাকুরের ‘বাঁশি’ কবিতার ‘ঘরেতে এলো না সে তো মনে তার নিত্য আসা-যাওয়া, পরনে ঢাকাই শাড়ী কপালে সিঁদূর’ অংশটুকু পড়ে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, আরে এই নারীকে তো আমি চিনি! ইনি তো আমাদের অলকানন্দা মাসি! রবিঠাকুর তাঁকে চিনতেন?!

অলকানন্দা মাসি ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ মামার স্ত্রী যিনি ১৯৭১ সালে পাক-হানাদার বাহিনীর ভয়ে ভিটে ছেড়ে সপরিবারে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের শরনার্থি শিবিরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানেই অনাহারে-অর্ধাহারে থেকে, রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে অতঃপর কলেরায় আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে রিফিউজি জীবনের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন ! স্বাধীনতার পর দেবেন্দ্রনাথ মামা তাঁর একমাত্র বোবা ভাই, দুই কিশোরী কন্যা স্নেহবালা, মিনুবালা ও শিশুপুত্র শ্যামলের হাত ধরে ফিরে আসেন পূর্বপুরুষের বাস্তুভিটার ভগ্নস্তূপে।

আমার আম্মাকে দেবেন্দ্রনাথ মামা বোন ডেকেছিলেন, কেন তা জানি না। আমার আম্মা এই ভাইটিকে তাঁর কলিজার একটা টুকরা মনে করতেন। আমাদের বাড়ী পেরিয়ে বড়ো পুকুরের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে অবস্থিত রাজা অষ্টম এ্যাডোয়ার্ডের সমবয়সী বুড়ো বটগাছটা ছাড়িয়ে দেবেন্দ্রনাথ মামার বাড়ী। পাশে আরো কয়েকটা হিন্দু বাড়ী ছিল। একটা বাড়ী ছিল যামিনী সাধুর, একটা বাড়ী ছিল বিনোদ দাদাদের। আরেকটা বাড়ী ছিল সুনীল দাদাদের। গ্রাজুয়েট বিনোদ শীল স্কুল মাস্টার ছিলেন, যদিও তাঁর পৈত্রিক পেশা ক্ষৌরকর্ম।

সুনীল’দার বড়ো জ্যাঠা যামিনী সাধু ছিলেন মহাদেবের মতো সুন্দর, উঁচা-লম্বা-সুঠামদেহী রাশভারী মানুষ। কপালে চন্দনের তিলক, বাউলের মতো লম্বা দাড়ি। মাথায় জটা ছিল না বটে তবে তিনি তাঁর দীঘল ঝাঁকড়া আধা কাঁচাপাকা চুলগুলোকে মাথার ওপর উঁচু চূড়া করে বেঁধে রাখতেন। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, গায়ে হলুদ নামাবলি। যামিনী সাধু ফিনফিনে সাদা ফতুয়া পরতেন, ফতুয়ার ভেতর থেকে তাঁর নির্মেদ চওড়া সিনা ভেসে উঠত। কাঁধে থাকত একটা খয়েরি ঝোলা। এই মানুষটিকে আমি শিশু বয়সে অবাক হয়ে দেখতাম।

স্ত্রী এবং সাধন-সঙ্গিনীর সাথে তাঁর শান্তিপূর্ণ সহবাস ছিল। তাঁর স্ত্রী সুমিত্রা মাসি ছিলেন একটা মাটির পুত্তলি। যামিনী সাধুর সাধন-সঙ্গিনী গিরিজা মাসি ছিলেন গলগন্ড রোগী। কমন্ডুলের মতো গলায় একটা বড়ো গলগন্ড নিয়ে তিনি কিভাবে দিব্যি চলাফেরা করতেন সেটা আজো আমার কাছে একটা বড়ো প্রশ্ন। নিন্দুকেরা ওই নারীকে যামিনী সাধুর ‘ঢেমনি’ বলত। এই শব্দের অর্থ আমি তখন জানতাম না। নিন্দুকেরা যাই বলুক, সাধুর স্ত্রী ও সাধন-সঙ্গীর মধ্যে ছিল চমৎকার বোঝাপড়া। তাঁরা সাধুর সার্বক্ষণিক ছায়াসঙ্গী ছিলেন।

যামিনী জ্যাঠার হাতে দোতারার মতো একটা যন্ত্র থাকত। তাঁদের বাড়ীর সামনে কোন স্থায়ী রাস্তা ছিল না। অস্থায়ী রাস্তাটা প্রতিবছর পাহাড়ী ঢলে ধুয়ে নিয়ে যেত। তাই, আমাদের বাড়ীর সামনের কয়েক হেক্টর জমি নিয়ে যে বিস্তীর্ণ ‘চুয়ামনি পাথার’ সেটির ভেতর দিয়েই তিনি যাতায়াতের সংক্ষিপ্ত পথ করে নিয়ে ছিলেন। নীল আকাশ আর ছাই রঙা পাহাড়কে পেছনে রেখে যামিনী সাধু যখন কচি সবুজ ধানখেতের ভেতর দিয়ে হেঁটে আসতেন তখন দূর থেকে তাঁকে দেখে মনে হতো যেন কোন দেবতা স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নেমে আসছেন! বড়োদের মুখে শুনেছি, সীতাকুন্ড পাহাড়ের ‘চন্দ্রনাথ মন্দির’ এবং ‘কামরূপ-কামাখ্যায়’ তিনি নিয়মিত যাতায়াত করতেন! হিমালয়ের নাগা-সন্ন্যাসীদের সাথেও নাকি তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিল। সন্ন্যাসব্রত নেওয়ার কারণেই কি না জানি না, সংসারী হয়েও তিনি ছিলেন নিঃসন্তান।

শৈশবে দেবেন্দ্রনাথ মামার বাড়ীটাকে আমার মনে হতো, স্বর্গের নন্দনকানন! অজস্র গাছপালা দিয়ে বাড়ীটা ঘেরা ছিল। বাড়ীর প্রবেশ মুখেই ছিল একটা ‘ঝাপ্পুইররা’ শিউলি ফুলের গাছ। উঠান ভরা ছিল জবা-গাঁদা-কলাবতি-নাইন ও ক্লক-নয়নতারা-টগর ফুলের গাছে। সেই গাছগাছড়ার মাঝখানে টিনের চাল দেওয়া দেবেন্দ্রনাথ মামার দু’কামরার ছোট্ট ঘর। ঘরের পেছনে মাঝারি আকৃতির পুকুর। তাঁদের বাড়ীর উঠান-বারান্দা সবসময় গোবর-মাটি দিয়ে নিকানো থাকত। সেই উঠানে গা-মেলে দিয়ে প্রতিদিন রোদে পোহাত পিতল-কাঁসার থাল-বাসন-গ্লাস- ঘটি- বাটি। রোদের আলো পড়লে সেগুলো চিকচিক করতো। দেখে ভ্রম হতো, ওগুলো সোনার তৈরি বাসনকোসন বলে।

দেবেন্দ্রনাথ মামা কম্পাউন্ডারি পাশ করে ছিলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন আমাদের সকলের কাছেই ডাক্তার মামা। যার যে অসুখই করুক না কেন,শেষ ভরসা ছিলেন তিনি। রাত-বিরেতে খবর পাওয়া মাত্রই দশ ব্যাটারির লম্বা টর্চলাইট টিপে টিপে তিনি রোগী দেখতে ছুটে আসতেন। তারপর, হা-করিয়ে রোগীর জিহবা পরীক্ষা করে, চোখের পাতা উলটে, নাড়ী টিপে রোগের লক্ষ্যণ বিচার করে প্রয়োজনীয় ওষুধ-পথ্য বাতলে দিয়ে বাড়ী ফিরতেন। কারো বাড়াবাড়ি রকমের ব্যারাম হলে তিনি ফুটন্ত জল আনতে নির্দেশ দিতেন। ফুটন্ত জলে দেবেন্দ্রনাথ মামা তাঁর ব্যাগ থেকে একটা মোটা সুঁইওয়ালা সিরিঞ্জ বের করে বেশ কিছুক্ষণ চুবিয়ে রাখতেন। তারপর ভালোভাবে ধুয়ে স্পুলে সুঁই ঢুকিয়ে সিরিঞ্জ দিয়ে ওষুধ টেনে নিয়ে আমাদের শরীরে পুশ করতেন। তাঁর সেই বিশাল সিরিঞ্জ এবং মোটা সুঁই দেখেই, আমাদের অসুখ দেহ ছেড়ে কোথায় যেন উধাও হয়ে যেত!

অলকানন্দা মাসি ছিলেন ডাক্তার মামার দ্বিতীয় স্ত্রী। এমন সুন্দরী নারী আমি জীবনে দেখিনি। সত্যজিতের অনঙ্গ বউ কিংবা হার্টথ্রব সুচিত্রা-নার্গিসও তাঁর কাছে কিছু না। কি গায়ের রঙ, কি উচ্চতা, কি ফিগার, কি চুলের দৈর্ঘ্য, কি নাক-মুখ-চোখের গড়ন! টকটকে লালপেড়ে কোরা-কাপড় পরা অলকানন্দা মাসির ধবধবে সাদা হাতে লোহা-পলা-শাঁখা এবং কপালে বড়ো লাল টিপ আর সিঁথির মাঝখানে লাল সিঁদুর জ্বলজ্বল করত। হিরালাল ভাইকে জন্ম দিয়ে ডাক্তার মামার প্রথম স্ত্রী ধরাধাম ত্যাগ করেন। হিরালাল ভাই দেখতে কালাকুলা-দুবলা-পাতলা যুবক ছিলেন। তাঁর গর্ভধারিণীকে দেখিনি তাই জানি না তিনি দেখতে কেমন ছিলেন। তবে ডাক্তার মামার গায়ের রঙ তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর মতোই ছিল দুধে আলতা। তাঁরা নিতান্ত সজ্জন ছিলেন এবং আমাদের পরিবাকে দারুণ ভালোবাসতেন!

ডাক্তার মামার সংসারে টানাপোড়েন ছিল। তিনি প্রায়ই আম্মার কাছ থেকে টাকা ধার নিতেন। অলকানন্দা মাসিও নিরিবিলি দুপুরে এসে মাঝেমধ্যে আম্মার কাছ থেকে চালডাল উধার নিয়ে যেতেন। ধার-কর্জ করার জন্য এলেও আম্মা তাঁদের দেখে খুব খুশি হতেন। কাঙ্ক্ষিত অতিথির মতো উৎফুল্ল হয়ে আপ্যায়নে গলে যেতেন। অথচ কী আশ্চর্য, অমন মায়ের কন্যা হয়েও আমি কাউকে ধার দিই না। একাধিক ব্যক্তি কষ্টার্জিত টাকা মেরে দেওয়ার পর আমি বুদ্ধিমান হয়েছি। ডাইরেক্টলি ‘নো’ বলতে পারি এখন। বাস্তবতা কিভাবে মানুষের আচরণ পালটে দেয় !

আমার তুতো-ভাইয়েরা তখন মোটামুটি সবাই লায়েক। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুর্দান্ত রেজাল্ট করে বেরিয়েছেন। একজন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা পাশ করে চাকুরিতে যোগ দেওয়ার জন্য অপেক্ষমান। আরেকজন চিটাগাং পোর্ট কাস্টমস অথরিটির নিয়োগ পেয়ে কাজে যোগ দেওয়ার জন্য তল্পিতল্পা গুটাচ্ছেন। তাঁদেরই সমবয়সী বিনোদ’দা-সুনীল’দার সাথে ওদের দারুণ সখ্যতা ছিল। ঘাটলার ওপর গামছা পেতে তার ওপর তাস বিছিয়ে কখনো ওরা টোয়েন্টি নাইন খেলত, কখনো বরিক পাউডার ছিঁটিয়ে ক্যারম খেলত, কখনো বর্শিতে বল্লার ডিম গেঁথে পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরত। প্রায়ই ওদের বর্শিতে ধবধবে সাদা বিশালাকৃতির কচ্ছপ উঠে আসত। কচ্ছপ ধরা পড়লেই বিনোদ’দা-সুনীল’দা কাড়াকাড়ি করে বাড়ী নিয়ে যেত। কচ্ছপকে ওরা বলত জল খাসি। বর্শিতে কচ্ছপ ধরা পড়লে আমার তুতো-ভাইদের মন খারাপ হয়ে যেত। এটা নাকি অলুক্ষুণে ব্যাপার। এর মানে হচ্ছে, সেদিন মাছ আর বর্শি গিলবে না!

আমি ছিলাম এই অভিযান সেনাদলের তুর্যবাদক। বিনা পারিশ্রমিকে ওদের ফাইফরমাশ খেটে কৃতার্থবোধ করতাম। বিনিময়ে অবশ্য কাঠিওয়ালা লাল লেমঞ্চুষ ঘুস হিসেবে পেতাম। কিন্তু এই নব্য কালের সভ্য যুবাদের কিছু কায়কারবার আমার মনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক করত। লক্ষ্য করতাম, অলকানন্দা মাসি পুকুর ঘাটে নাইতে কিংবা ধোয়া-পাখলা করতে এলেই ওরা কিভাবে যেন টের পেয়ে যেত। কেউ একজন পরিচিত শিষ দিয়ে উঠতো। সেই সাংকেতিক শিষ শুনেই আমার নব্য কালের সভ্য যুবা ভাই বেরাদরেরা পরষ্পরের দিকে চেয়ে মুচকি হেসে আড্ডা ভঙ্গ দিয়ে ওদিকটায় গিয়ে অকারণ ঘোরাঘুরি করত। আর মুরগি-চোর শেয়ালের মতো গাছগাছালির ফাঁক-ফোকর দিয়ে অলকানন্দা মাসিকে আড় চোখে দেখত। দেখে মনে হতো, এই ব্যাপারটায় মাসিরও মৌন সায় ছিল। তিনি ওদের শেয়াল-দৃষ্টি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতেন এবং প্রশ্রয় দিতেন।

একবার পুকুর থেকে চান করে উঠে অলকানন্দা মাসি দেখেন, তাঁর শাড়ীটা উধাও ! অথচ, আশপাশে কোন বানর ছিল না। তবে,চট্টগ্রামের পাহাড়ে তখন প্রচুর বাঁনরের উৎপাত ছিল কিন্তু তারা কখনো লোকালয়ে আসত না ! অলকানন্দা মাসির বস্ত্র চুরি কিংবা বস্ত্র হরণের ঘটনা রাষ্ট্র হতে বেশি সময় লাগেনি। এই ঘটনার পর, বড়োদের কাছে তাঁকে প্রচুর ‘বক্র কথা’ শুনতে হয়েছে। আম্মাও মুখ কঠিন করে বলেছেন, ‘বৌ তোমার নামে এসব কি শুনছি? এসব খুব খারাপ কথা। আমার কানে এসব কথা যেন আর না আসে।‘ আমাদের কলঙ্কিনী রাধা অলকানন্দা মাসি সেদিন কোন জবাব না দিয়ে শুধু মাটির দিকে চেয়েছিলেন।

দেবেন্দ্রনাথ মামার বাড়ীটার প্রতি অনেকেরই লোভ ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর বাড়ীটা ওদের হাতছাড়া হয়ে যায়। বোবা কাকার পক্ষে উদ্ভিন্ন যৌবনা ভাতিজিদের সামলে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে,মামার বড়ো মেয়ে স্নেহবালা একদিন এক মুসলমান ষন্ডার সাথে পালিয়ে যায়। মিনু গার্মেন্টসে যোগ দেয়। যাতায়াতের পথে রায়ের বাজারের এক স্বর্ণকারের সাথে ওর আশনাই হয়। মিনু এখন খুব সুখী। রায়ের বাজারে ওর ৫তলা শ্বশুর বাড়ী।

শ্যামলও পরে ধর্মান্তরিত হয়ে যায়। বড়ো হয়ে ও একবার আমাদের সাথে দেখা করতে ঢাকায় এসেছিল। ধর্মান্তরিত হওয়ার কথা শুনে আমার বড়ো ভাই বিশিষ্ট ক্যমিউনিস্ট ওকে তিরস্কার করে বলেছিলেন-‘তুই তোর বাপদাদার ধর্ম ত্যাগ করলি? কেন? যে মানুষ নিজের ধর্ম ত্যাগ করতে পারে সে মানুষও খুন করতে পারে!’

কোন জবাব না দিয়ে শ্যামল অপরাধীর মতো মাটির দিকে চেয়েছিল। ঠিক, পঞ্চান্ন বছর আগে ওর অভিযুক্ত মা অলকানন্দা মাসির মতো।