দুঃখ গাছ

নাহার তৃণা

সেবার শরতে আমাদের সবাইকে চমকে দিয়ে রমাদিদের উঠোনের শিউলি গাছটায় ঝেপে ফুল এলো। এ পাড়ায় বহুদিন থাকার সুবাদে জানতাম, গাছটায় ফুলটুল ধরে না। ফুল ধরে না এমন একটা বেহুদা গাছ কেটে না ফেলার পেছনে রমাদিদের পারিবারিক একটা করুণ ঘটনা আছে। ঘটনাটা আমরা এতবার শুনেছি যে শুনতে শুনতে আমাদের মুখস্হ হয়ে গিয়েছিল। রমাদি কিংবা ওর ঠাকুমা যখন ঘটনাটা বর্ণনা করতো তখন ওদের চোখে মুখে অনেকটা ব্যথার সাথে এক চিলতে গর্বভাবও বুঝি খেলা করে যেতো। রূপকথার গল্প শোনার আগ্রহ নিয়ে আমরা ওদের মুখ থেকে ঘটনাটা শুনতাম। যদিও কাহিনিটা মোটেও রূপকথা কিংবা মজার ছিলো না। কিন্তু তখন হাতখুলে অবজ্ঞা আর নিষ্ঠুরতা দেখানোর বয়স ছিলো বুঝি! শুধু যখন রমাদির ঠাকুমা গল্পের শেষে কান্না লুকাতে চোখে আঁচল চাপা দিতেন, মুখস্হ প্রায় দৃশ্যটা আমাদের মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তি ছড়িয়ে দিতো। আমরা তখন আমাদের বসবার ভঙ্গি বদলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়তাম।

রমাদি আমাদের সবার খুব প্রিয়। বয়সে বড় হলেও ও ছিলো আমাদের সবার বন্ধুদি। আমরা ওর আশেপাশে ঘুরঘুর করতে ভালোবাসতাম। প্রতি বছর বাবলি, নমিতা আর আমার স্কুল ড্রেস রমাদিই সেলাই করে দিতো। স্কুলের ড্রয়িং পরীক্ষায় ডাব্বা খাওয়া থেকে কত্ত বার রমাদির জন্য বেঁচে গেছি! শিউলি ফুলের বোঁটার কমলা রঙ দিয়ে রমাদি কতোবার আমাদের পোশাকে নকশা এঁকে দিয়েছে। রমাদির প্রিয় ফুল শিউলি। বছর জুড়ে ফুলটা না পাওয়ার খেদ বুঝি রমাদি তাই কড়ায় গণ্ডায় পুষিয়ে নিতে চাইতো শরৎ-হেমন্ত এলে। শিউলি ফোঁটার সময়গুলোতে ফুল তোলার জন্য খুব ভোরে আমাদের যার যার বাড়ির দরজায় এসে নাম ধরে রমাদি হাঁক দেয়া মাত্র আমরা কী এক জাদু মন্ত্রে জেগে ওঠতাম। তারপর দল বেঁধে বড় রাস্তাটা পেরিয়ে গোলাপি রঙের বাড়িটার সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম অন্য কেউ পৌঁছানোর আগেভাগে।

গোলাপি বাড়ির পাঁচিল ঘেষে দাঁড়ানো বিশাল গাছ দুটোতে এত শিউলি ধরতো যে আমরা চারজনে কুড়িয়ে শেষ করতে পারতাম না। আমরা গিয়ে দেখতাম সবুজ ঘাসের উপর শিশির মেখে বুঝি আমাদেরই অপেক্ষায় পড়ে আছে রাশি রাশি শিউলি। শিশির ভেজা ঘাসে পা ডুবিয়ে রমাদি আলতো হাতে ফুলগুলো তুলে ওর ঝুড়িতে রাখতো। আমরা ততদিনে রমাদির কাছ থেকে জেনে গেছি, শিউলি খুব নাজুক স্বভাবের ফুল। ওর আরেক নাম শেফালী। শিউলি গাছেরও যে আরেকটা নাম আছে সেটাও আমরা রমাদির মুখে প্রথম শুনি । 'ট্রি অফ সরো -দুঃখ গাছ'। বাবলিটা বরবরই আলটপকা কথায় ওস্তাদ, মুখ কুঁচকে বলতো, "এম্মা গাছের আবার এমনধারা নাম হয় নাকি! ও ব্যাটার আবার কিসের দুঃখ রমাদি?"

ঘন পাপড়ির বড় বড় দুচোখে আলতো একটা ছন্দ তুলে রমাদি বলতো, "দুঃখ হবে না! সারারাত ধরে বেচারি গাছ ভর্তি করে ফুল ফোঁটায় , অথচ দিনের আলো ফুটতেই সেগুলো সব কেমন ঝরে পড়ে.. বুকের ধন আগলে না রাখতে পারাটা কম দুঃখের ?" অতশত মাথায় ঢুকতো না। কোঁচড় ভরে ফুল কুড়িয়ে মালা গাঁথবার প্রতিযোগিতায় জিতে যাওয়াটাই তখন বড় ব্যাপার আমাদের কাছে। বাবলিটার শুধু মুখই চলতো না, দ্রুত হাতে মালা গাঁথাতেও ছিলো তুখোড়। প্রতিবারই সে আমাদের আগে আগে মালা গেঁথে দুটো বেশি নারকেলের নাড়ু আদায় করে নিতো ঠাকুমার কাছ থেকে।

কাকীমায়ের হাতের নারকেলের নাড়ু, চিড়ে মুড়ির মোয়া কী যে অসাধারণ ছিলো! সেগুলো বাড়তি পাওয়ার লোভে ঠাকুমা, কাকীমায়ের ফরমায়েশ খাটতে আমাদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যেতো। শরৎ এগিয়ে আসা মানেই আমাদের পোয়াবারো। বাতাসে পূজোর গন্ধ ছড়ালো কী ছড়ালো না, রমাদিদের বাড়ি ঘিরে উৎসব উৎসব ভাব ছড়িয়ে পড়তো। শুধু যে খাইদাইয়ের ঘটা চলতো তা তো না। রমাদি পাড়ার আরো অনেককে জুটিয়ে কী দারুণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো শিউলি গাছটার তলায়। নাচ, গান, আবৃত্তির সাথে নাটকও হতো প্রতিবার। ডাকঘর নাটক করেছিলাম দু’বার। বাবলি করেছিল অমলের পার্ট, নমিতা দইওয়ালা। আমি সামান্য দু একটা সংলাপও মনে রাখতে পারতাম না। মাঝ পথে হেসে ফেলতাম। তাই সুধার চরিত্র থেকে সরিয়ে আমাকে পিচ্চিদের দলে রাখা হয়েছিল। গ্রামের কূটকচালী মোড়লের ভূমিকায় রমাদিকে দেখে কেন জানি আমার ছোট্ট বুকে কষ্টেরা পাক খেতো। এ কথাটা আমি কাউকে বলিনি কখনও, কিজানি কেন! ওই একই মানুষ যখন কাকীমায়ের শাড়িতে ঘেরা শিউলি তলার রঙবেরঙের স্টেজে দুহাত ছড়িয়ে আবৃত্তি করতো -
"এসেছে শরৎ, হিমের পরশ
লেগেছে হাওয়ার 'পরে...."

তখন বন্ধুদির মুখে-চোখে উপচে পড়া আনন্দ গড়িয়ে এসে যেন আমাদেরও তার সঙ্গী করে নিতে চাইতো। মনটা খুশিতে হাততালি দিয়ে ওঠতো। মনে হতো ওটাই সত্যি রমাদি। ওকে কেবল আনন্দেই মানায়। বিপরীত কিছুই ওর জন্য নয়, একদমই না।

সকাল সকাল হুড়োহুড়ি করে বানানো মালার দু’ তিনটে স্কুলের ম্যাডামদের দেবার জন্য রেখে বাকি মালাগুলো আমরা ঠাকুমাকে দিতাম। ঠাকুমা আমাদের বানানো সেই মালাগুলো নিয়ে তার পূজোর ঘরে মাটির পুতুলগুলোর গলায় ঝুলিয়ে দিতেন। ঠাকুমার মুখ থেকেই শুনেছিলাম কুড়োনো ফুলে পূজো হয়না। তবে কুড়িয়ে আনা শিউলির মালা ঠাকুরের গলায় ঝুলানো হলো যে? ঠাকুর পাপ দেবে না? সে কথা শুনে, পান খাওয়া লাল টুকটুকে ঠোঁট জোড়ায় হাসি গড়িয়ে চিবুক ছুঁতো। রমাদির ঠাকুমা ওই বয়সেও ছিলেন অসম্ভব সুন্দরী। নিশ্চয়ই রমাদির বড় ঠাকুমাও দেখতে এই ঠাকুমার মতো সুন্দরী ছিলেন। সেটাই বুঝি কাল হয়েছিল তাঁর।

যুদ্ধ দিনের সেই বিভীষিকা ছড়ানো সময়ে এলাকার বহুদিনের পরিচিত কিছু লোক যারা ভোল পাল্টে শান্তি কমিটির চামচা হয়েছিল, তারাই চিনিয়ে দিয়েছিল বাড়িটা। রাত গভীর হলেই ঠাকুমার মেজদার ক্যাম্পে ফিরে যাবার কথা ছিলো। নিজের ঘরে তিনি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। বাবা আর বড় দিদি বাইরের ঘরে মৃদু ভলিউমে রেডিওতে কিছু একটা শোনার চেষ্টা করছিলেন। তাদের পিঠাপিঠি দুই ভাইবোনকে নিয়ে মা উঠোনের ওদিকটায় কী একটা কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আজ আর মনে পড়ে না। ঠিক সে সময় মিলিটারির ট্রাকটা এসে থেমেছিল বাড়ির সামনে। বাবা, বড়দি কিংবা মেজদা কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি পালানোর। ঠাকুমা পিঠাপিঠি ভাইটার হাত ধরে মায়ের সাথে কোনো রকমে পেছনের নালার আবর্জনার আড়ালে লুকিয়ে পড়তে পেরেছিলেন। মা তাদের দু’ভাইবোনকে ওখানে রেখে ঘরে ফেরার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে বাড়ির ভেতর গোলাগুলি শুরু হয়ে গেছে। মা ওদের আঁকড়েই ওখানে বসে পড়েন। খুব দ্রুত তাণ্ডব চালিয়ে ফিরে গিয়েছিল ট্রাকটা। যাবার সময় রমাদির বড় ঠাকুমাকে সঙ্গে নিতে ভুলেনি পাকি বাহিনী। সারারাত পেছনের নালার অন্ধকারে কাটিয়ে ভোরের দিকে তিনটে জীবন্মৃত মানুষ উঠোনে পা দিয়ে অবাক করা এক দৃশ্য দেখেছিল। দু'জন মানুষ আকাশের দিকে মুখ করে চিৎ হয়ে পড়ে আছেন শিউলি গাছটার তলায়। ফুলে ফুলে ঢেকে আছে তাঁদের শরীর। একজন ঠাকুমার বাবা, অন্যজন মেজদা। বড়দির চিহ্ন ছিলো না গোটা বাড়িতে কোথাও। আর খোঁজ মিলেনি রমাদির বড় ঠাকুমায়ের। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সেই শেষবারের মতো ফুল ফুটেছিল গাছটায়। প্রায় পনেরো বছর পর সেই গাছে ফুল ফোঁটাটা রীতি মতো চমকেরই ব্যাপার।

বহু বহু বছর পর বন্ধ্যা গাছটাতে ফুল আসায় কোথায় রমাদি, ঠাকুমা খুশি হবে, তা না তারা দুজন কেঁদেই আকুল! আমরা তিনজন সমবয়সী বালিকা সেই শরতের সকালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভেবে কিছুতেই কুল পাইনি কোন গাছের দুঃখ বেশি- মানুষ গাছের নাকি শিউলিটার!



***