পয়লা আশ্বিন

সাবেরা তাবাসসুম


পয়লা আশ্বিন
(এক মটরদানার গল্প)

আম্মাকে কখনো চা খেতে দেখি নি আমরা, আম্মা খেতেন মিঠাপানি
কোটপাড়ার বাসায় রান্নাঘরের চুলায় শোঁ শোঁ লাকড়ি জ্বলতো মনে পড়ে
সকালের নাশতায় শেষ রুটি সেঁকে চুলায় দুধ আর গুড় জ্বালাতেন আম্মা
টিনের হলুদ মগে ঢালা ঘন তরলে প্যাঁচানো রুটিগুলো ভিজত
আমি জুলজুল চেয়ে থাকতাম- শীতের দিনে, শীত শুরুর দিনে

শীত প্রসঙ্গ এলে মনে পড়ে আম্মাকে কখনো ভারী গরম পোশাক পরতে দেখি নি
একটা ছাইরঙা কার্ডিগান ট্রাংকে তোলাই থাকত
ক্বচিৎ কখনো আম্মার গায়ে উঠত সেই দুর্লভ জিনিস
হয়তো সেদিনের মিঠাপানি খাওয়ার স্মৃতিটাই আমার মস্তিষ্ক ধরে রেখেছে

আলীপুর গোরস্থানে যে ঘুমিয়ে আছে তার কথা মনে করে আম্মা চা খেতেন না
অতিথি হয়ে কারো বিকেলবেলায় গেলে আম্মা সবিনয়ে বলতেন, আমি চা খাই না
অথচ চায়ের নেশা ভাই-বোন কারো চেয়ে কম ছিল না তার জানতে পেরেছি
কোনো এক নাজুক মুহূর্তে নিজের ভালো লাগা অভ্যাসকে না করেছিলেন আম্মা
তারপরও কখনো কখনো আমাদের খুব আয়েশ করে চা খেতে দেখলে
আম্মা একটা শ্বাস ফেলতেন, বলতেন, আহ্হা, খোকন!

খোকন বলে আম্মার যে দস্যি ভাই ছিল তাকে আমরা কেউ দেখি নি
আম্মা আব্বার সাথে সংসার করতে আসার চার মাস আগে উনি গত হলেন
আম্মার শেষ চা খাওয়ার দিন, মেজদির কাছে খোকনের শেষ চা চাইবার দিন
খোকন চা পায় নি, বন্দুক সাফ করতে গিয়ে গুলি ছুটে বুক ফুটো হলো তার
কন্ট্রোলার সাহেবের মেধাবী কিশোর ওই ঘটনার খানিক আগে বলেছিল,
মেজদি, একটু চা দিবি? আম্মা খেঁকিয়ে উঠেছিলেন শুনেছি
রোজ নিজের ভাগের চা খেয়েও মেজদিকে জ্বালানো তার স্বভাব ছিল
হয়তো আম্মা চল্লিশটা রুটি বেলে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন চায়ের মগে
হয়তো আসন্ন বিবাহের কনে ভাবছিল অন্য কারো প্রেমময় সম্ভাষণ
আমরা শিশুরা শুধু এটুকু শুনেছিলাম, আম্মা তার খোকনকে তখন বকেছিলেন
যতদিন বেঁচেছিলেন আম্মা, ওই বকা ধ্বনিত ছিল তার মনে
অম্বিকাপুর থেকে ঝিলটুলি তারপর সারা বাংলাদেশ ঘুরে ঘুরে
চা পানের স্বাদ আম্মা পেতেন কেবল তাঁর স্মৃতিতে
মেজদি, একটু চা দিবি?

আমরা অপেক্ষায় থাকি, কখন ঝড় বৃষ্টি কিংবা হা হা রোদ্দুর
অপেক্ষায় থাকি বিকালে গরম এক পেয়ালা চায়ের
সাথে আম্মার ঘি-চিনি-বাদাম মুড়ি মাখা, এলোঝেলো পিঠা, আলুচপ
আমার স্মৃতি সতর্ক পাহারা আশা করে, আম্মার কথা ভাবি
আম্মার কথা ভেবে ভ্যাবলার মতো বসে থাকি
শীত-গ্রীষ্মে উত্তরের ধরন অনুমান করে বসে থাকি
স্মৃতি আমাকে নিরহং পালকের স্বরে বলে,
একটা শস্যদানার কাছে আমরা বন্দী
মটরদানার মতো ছোট্ট প্রতিশ্রুতির কাছে বন্দী
তোমার কি এমন কিছু আছে? আমি আম্মার মুখ মনে করি
আলীপুর গোরস্থানে শুয়ে থাকা কিশোরের অদেখা মুখ মনে করি
আর একখানা মটরদানা প্রতিশ্রুতির পাওয়ার জন্য
এক চা-খোর জীবন ভরে অপেক্ষায় থাকি।


পয়লা আশ্বিন
(বঁএ্যাপাতি)

আম্মার রান্নার স্বাদ আমাকে স্মৃতিতে চাখতে হবে ভাবি নি কখনো
নুন-ঝাল ঠিক হলে সকল পদ সুস্বাদু হয়ে ওঠে জেনেছি
স্মৃতি হাতড়ে টের পেতে চাই কেমন ছিল আম্মার রান্নাকরা
লাবড়ার ঝাল, মুর্গমুসাল্লাম, ভুনা খিচুড়ি আর হাঁসের মাংস কষা
কখনো নেশস্তার হালুয়ার চকচকে বরফিগুলোয় জাফরানের পোড়া মিষ্টি স্বাদ
চারশো বছরের ইতিহাস নিয়ে ঢাকার মেয়ে কী আর এমন পদ রাঁধতো
তবু তুর্কি, ফারসি বা পুশতু রান্নার ঘ্রাণ সেখানে ছিল হয়তো
আমরা যা জেনেছি সব এলোমেলো, আফসোস, কিছুই আসে না
মনে আর পথ কেটে কেটে রসুই ঘরের স্মৃতির গভীরে
আম্মার কোনো একটা রান্নাঘর ছিল না, সারা বাংলাদেশ ঘুরে ঘুরে
ছোটমোট ঘরগুলোয় কখনো লাকড়ি কখনো স্টোভ বা হিটার
আর শেষমেশ গ্যাসের চুলায় রেঁধেছেন স্বাদু সব খাবার
তাঁর ভাবনায় নানান মশলার আনাগোনার খবর আমার জানা ছিল না
আম্মার ডাগর চোখ আর সপসপে ব্লাউজ চাপা ঘামের গন্ধ সব ভ-ুল করে দেয়
চুলার সামনে দুটো বড় পিঁড়ি দিয়ে উঁচু করা আসনে আম্মা
বসে খুন্তি নাড়ছেন- এই ছবি মূলত প্রধান হয়ে গেল
আত্মীয়-স্বজন আম্মার রান্নার সুখ্যাত ক’রে আমার সামনে আহা-উঁহু করে
তাদের পারলৌকিক আঙুল চাটার শব্দের সাথে কোনো স্বর্গীয় অনুভূতি মেলাতে পারি না
আম্মা শিক্ষক ছিলেন- আমি তাঁর চশমা চোখে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে
ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার খাতা দেখার ছবিটাকে মনে করতে পারি
আব্বাকে দেখে শান্তি আর প্রেমের আশ্বাসে বিছানা ছাড়ছেন সেটাও পষ্ট মনে আছে
সন্তানেরা তাকে ঘিরে থাকছে সেই সুখের ছরি চোখে নিয়ে
আম্মার ভাতঘুম- তা-ও একযুগ পরে মনে ভাসছে বেশ
কিন্তু আজব ব্যাপার, আম্মার রান্না করা কোনো দুর্দান্ত পদের স্বাদ
আমার স্মৃতিতে আসে না- কী জানি, আমি হয়তো কেমন যেন
হয়তো আমার স্মৃতিশক্তি দুর্বল, হয়তো স্বাদের পৃথিবী
মাটিতে অন্ধকারে বেমালুম ঢেকে গেছে অথবা
আম্মা আতর লোবান মেখে ঘাসের উঠানে শুয়ে আছেন এই ছবিখানা
আমার কাছে তার খাদ্য সম্পর্কীয় যাবতীয় স্মৃতিকে লোপাট করে দেয়।