সমগ্র পল্লীবাসীকে জানাই শুভ শারদীয়ার প্রীতি, শুভেচ্ছা ও আন্তরিক অভিনন্দন...

শুভ আঢ্য


‘রানাঘাট থেকে এসেছে রানু মণ্ডল। তুমি যেখানেই থাকো, পূজা মণ্ডপের অনুসন্ধান অফিসের সামনে যত শিগগিরি সম্ভব চলে এসো। এখানে তোমার জন্য তোমার বোন বুল্টি, ভাই গুলিট অপেক্ষা করছে... নিউ ব্যারাকপুর থেকে এসেছেন কাকলি দাস, আপনি সত্ত্বর চার নম্বর গেটের সামনে চলে যান... কেউ ধাক্কাধাক্কি করবেন না, সকলকে প্রতিমা দেখার সুযোগ করে দিন। আমাদের ‘সার্বজনীন’ পুজো এবছর পঁচাত্তরতম বর্ষে...’ নির্ঘণ্ট মেনে এভাবেই শুরু হয়। রোল থেকে টমেটো সস কনুই অব্দি আর কোমরের বেল্ট আস্তে আস্তে নীচের দিকে চলে এসেছে যখন, তখন বাড়িতে মায়ের কাছে প্রবল গঞ্জনা আর লাঞ্ছনার শিকার হতে হবে এমনটা ভেবেই বাড়ির পথে ফোস্কা পড়া পা টেনে চলাই নিয়ম। ২০১৩-র পুজোর সপ্তমীও সেরকম। আলাদা কিছু নয়।
সপ্তমীর সকালে নাম-কা-ওয়াস্তে অফিস। বিকেলে মেট্রো ধরে অলিপাবে গিয়ে বসে পড়া... পুজো এভাবেই শুরু হয়, মাঝপথে ট্যাক্সি পেলে উঠে পড়ে, একটা সময় ভাড়া মিটিয়ে নেমেও যায়। মাঝে একবার বাগবাজার দেখে নেওয়া এরই মধ্যে কোনো একটা দিন। নয়তো কোনো না কোনো বন্ধুর সাথে কোনো না কোনো সস্তা বারে কাটানো। তবে রোজ মদ খাওয়া মাস্ট। সেরকম হলে এম্পায়ার বারে হলেও চলবে। বাট মাল ইজ দ্য অনলি স্পিরিট অফ পুজো। মাঝে বাসে বা মেট্রোতে যাবার আসার সময় এরকম শোনা অ্যানাউন্সমেন্ট – ‘স্বেচ্ছাসেবক ভাইদের বলছি, অটোচালক বন্ধুদের এখানে দাঁড়াতে দেবেন না। তারা আগের স্টপেজে যাত্রী নামিয়ে দিয়ে আসুন প্লিজ’। পুজো এভাবেই বাম্পার, সিগন্যাল খেতে খেতে এগোয়। সাথে, নতুন গেঞ্জির গরম, নতুন ব্রা-র বেশী আঁট হয়ে বসে থাকা, ভিড়, শ্রীভূমির প্যাণ্ডেল, দেশপ্রিয় পার্ক, একডালিয়া আর বাড়ি ফিরে নতুন জামা আর ক্রপ টপ ছেড়ে ছেঁড়া ধুলুরি একখানা প্যান্ট বা নাইটি পরে বসতে পারলেই আরাম!
ঘরে আলো জ্বলছে। বচ্ছরকার দিন, বিছানায় নতুন চাদর পাতা হয়েছে, তবে পর্দাটা পালটানো হয়নি। ঘরবাড়ি মহালয়ার আগে থেকেই ঝাড়াঝুড়ি করা হয়েছে। এই সাদামাটা ফ্যাটফ্যাটে সংসারও সামান্য আলো চলকে দেয় এমন সন্ধ্যেগুলোতে। স্টার আনন্দে, ২৪ ঘণ্টায় জানানো হচ্ছে কলকাতার হেভিওয়েট পুজোর ভিড়ের গতি প্রকৃতি। বাড়ি থেকে না বেরোনোর কারণে টিভিই এখন ধৃতরাষ্ট্রের সঞ্জয়। কলতলায় জল টাইম করে এসে সেই কখন চলে গেছে। চৌবাচ্চা পুরো ভরেনি। পাশে লোহার বালতিতে টপ টপ করে জল পড়েই যাচ্ছে কল থেকে। ওখানকার পিছল জায়গাগুলো ভালো করে ধোয়ার কথা বললেও মামণি করে দিয়ে যায়নি এখনও। খাবার টেবিলের ওপর রাখা টিয়াপাখীর খাঁচাটা নামিয়ে রাখা থাকলে ভাল হতো। এমনিতেও স্টিলের রেকাবি, জলের বোতল রেখে জায়গাটা নরক গুলজার অবস্থাতেই থাকে সারা বছর। এই বাঞ্চোৎ টিয়াও কোনো চ্যানেল দেখতে দেয় না এতটুকু শান্তি করে। আমোদগেড়ের মতো থেকে থেকে কেবলই এটা সেটা বলেই চলে। ওদিকে শোনা যাচ্ছে ‘ ...বাড়ি থেকে সরাসরি দেখাচ্ছি... এখন সন্ধ্যারতি চলছে। শেষ হলে বাড়ির সকলে আড্ডায় মাতবেন। ওঁদের বাড়ির পুজো এ বছরে দু’শো বছরে পড়োল। আমরা পেয়ে গেছি এ বাড়ির এ প্রজন্মের একজনকে। তোমাকে জিজ্ঞেস করি, এই ক’টা দিন মেনু’তে কী কী থাকে?’... ‘টি এম টি রড... মজবুত রাখে আপনার ভবিষ্যৎ’। এখানে বর্তমান কেবল গোপালের গেঞ্জি পরে নতুন লুঙ্গি সামান্য ছড়িয়ে বসে টিভিটুকু দেখা। এখানে কলঘরের সামনে অন্ধকার জমাট বাঁধা আছে টিয়াটির মতো, বাবুই পাখিটি বড় যত্ন করে তা বুনেছে। খাঁচার বাইরে ও ভেতরে সমান অন্ধকার, যাতে এক অন্ধকার থেকে অন্য অন্ধকারে যাবার সময় চোখের রেটিনা কোনো অস্বাভাবিকতার শিকার না হয়। এখানে রেটিনার যত্ন নেওয়া হয়।
হতে পারে সপ্তমী, তা বলে চা কি আর আজ নিজেকে করে নিতে হবে না? হতে পারে বারান্দার তলায় মেয়েরা ছেলেদের পয়সায় ঘাড় ভেঙে এগরোল খাচ্ছে, একে অপরের হাত ধরলে ইলেকট্রিক সাপ্লাইয়ের দরকার পড়ছে না। তা বলে ঘরের ভেতরে থিন অ্যারারুটের বদলে গুড ডে বিস্কুট অব্দি হতে পারে। তার বেশী দেখানেপনার দরকার নেই। সামর্থ্যই বা কি! টিউবের আলোয় বেশ দেখা যাচ্ছে পুরী থেকে কেনা গামছাটা দুপুর থেকে শুকোতে দেবার পর এখন শুকিয়ে পাঁপড়ের মতো মড়মড় করছে। দেখা যাচ্ছে, ওষুধগুলো খাওয়ার পর শুধুই বাহ্য হয়ে বেরিয়েই যাচ্ছে, তার কোনো গুণ নেই। বড়িগুলো নির্গুণ ব্রহ্মের মতো তাদের গুণাগুণ শরীরে ত্যাগ করেছে। তো, চা বানানো যাচ্ছে। গ্যাসের নব ঘোরানোর পর হঠাতই...
ওখানে শুনতে পাওয়া যাচ্ছে একটি বিশেষ ঘোষণা। ‘গোলাপি রঙের একটি মানি পার্স খুঁজে পাওয়া গেছে মণ্ডপের সামনে। উপযুক্ত প্রমাণ দেখিয়ে এর মালিককে, তা নিয়ে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে’। দেখতে পাওয়া যাচ্ছে এখনও যারা বাবা-মা’য়ের সাথে ঠাকুর দেখতে বেরোয়, তারা রোল ক্যাপের পিস্তল টানা ঢ্যা-ট্যা-ট্যা-ট্যা-ট্ া-ট্যা-ট্যা-ট্যা করে শেষ করে ফেলছে। আইসক্রিম একটু হেসেই কাউকে কিনে দিচ্ছে কেউ, আবার কখনও নিজের বার্গার কেউ আরও মজাদার বানিয়ে তুলছে।
হুটার শোনা যাচ্ছে। এটা ২০১৩-র সপ্তমীর সন্ধ্যে। আটটা দশ বাজানোর পর ঘড়িটা তার ব্যাটারি শেষ করে ফেলেছে। সাইরেনটা অ্যাম্বুলেন্সের। শুনতে পাওয়া যাচ্ছে সে হন্যে হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশ রাস্তা ক্লিয়ার করার আপ্রাণ চেষ্টা করেও করে উঠতে পারছে না। টিয়াপাখীটা ঘরে কেউ নেই দেখেও এটা সেটা বকেই যাচ্ছে। বাক্স টিভির ভেতরে কাতারে কাতারে মানুষ প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে বেরিয়েছে। তাদের রঙিন জামার ছবি বাড়িটির শার্সিতে ভেসে উঠছে। ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই, সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি’ গান চালিয়েছে কোনো পুজো কমিটি। কলতলার চৌবাচ্চার কাছে জমাট অন্ধকার একই ভাবে জ্বলে আছে। তার কোনো জোনাকি নেই, টুনি বাল্ব নেই, চন্দননগরের লাইটিং নেই।
আর জি কর। এমার্জেন্সির সামনে কিছু লোক চায়ের প্লাস্টিকের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের অনেকের নতুন জামা হয়েছিল এবার। কারোর হয়নিও। ড্রিপ চালানো হয়েছে। ডিফিব্রিলেটর দিয়ে যতটা যা করা সম্ভব সব চেষ্টা করা হচ্ছে। ঢাকের আওয়াজ এত কিছুর মধ্যেও এখানে চলে আসছে একটু একটু করে। হার্টবিট উঠছে, নামছে যেভাবে ননস্টপ দিনের প্রথম মেট্রো চালু হবার পর শেষ পর্যন্ত চলে। পার্কস্ট্রীট থেকে আর জি কর ডাইরেক্ট ট্যাক্সি পাওয়া যাচ্ছে না। আলো ভেসে চলেছে আর জি করের সামনের রাস্তায়। তার সালোয়ার ভেসে চলেছে বলে যার দেখার কথা ছিল, সে এই মাত্র এমার্জেন্সির সামনে দাঁড়ালো। এখানে কোনো রিপোর্টার নেই। এখানে সেরা প্রতিমার পুরষ্কার কাউকে দেওয়া হচ্ছে না। সপ্তমীর রাতে রজনীগন্ধার স্টিক নিয়ে একটা গাড়ি এমার্জেন্সির সামনে দাঁড় করানো হয়েছে। ভিড় হাল্কা করা হচ্ছে। দেহ, নশ্বর হয়ে গেল তা প্রায় সাড়ে চারঘণ্টা হবে।
এখানে সারা রাতে যে কোনো সময় চা-বিস্কুট পাওয়া যায়। কাছাকাছি পুজোর লেশ যা আছে, তা সামান্যই। ওই সধবাদের কপালের লালটুকু প্রথমবার মুছে দিলে যে রেশটুকু থেকে যায়, তার মতো। গঙ্গায় এখন জোয়ার নেই। কখন আসবে তা বলতে পারা লোকজন মাল টেনে গ্যারেজ হয়ে গেছে। খুব দূর থেকে শোনা যাচ্ছে – ‘তাড়াহুড়ো করবেন না, পরপর লাইন দিয়ে দাঁড়ান... নিজের দেখুন, অপরকেও দেখার সুযোগ...’।