ফেলে আসা পুজো

সমরজিৎ সিংহ

যতদিন জীবিত ছিলেন বাবা, প্রতিবছর, আমাদের ঘরে, দুর্গাপূজা হত, এর অন্যথা হতে দেখিনি কখনও । বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকে হয়ে আসছে এই পূজা । ১০১ বছর হবার পর, আর হয়নি ।
আমাদের ঘরের এই পূজা নিয়ে আমার কোনো মাতামাতি, খুব একটা যে ছিল, তা নয় । তার একটিই কারণ, পাশে সোনামুখী চাবাগানে, প্রতিবছর, দুর্গাপূজা হত ধুমধাম করে । তিনদিন যাত্রাপালা হত বড় প্যাণ্ডেল বানিয়ে । সেই যাত্রাপালায় অভিনয় করতাম আমি । ফলে, মন পড়ে থাকত চাবাগানেই ।
তবু বাড়ির পূজার আলাদা আনন্দ । আত্মীয়স্বজন আসত দূরদূরান্ত থেকে, পরগনার লোক আসত দলে দলে । দুপুরে, প্রতিদিন, অন্নভোগ রাঁধতেন বিজয় ঠাকুরের ঘরের লোকরা । বিজয় ঠাকুর ব্যস্ত থাকতেন পূজা নিয়ে ।
এই বিজয় ঠাকুর আমার দেখা সেরা ব্রাহ্মণ, যার কোনো লোভ ছিল না, অন্ধতা ছিল না ।
বাবার চাকরি ছিল বদলির । একবার, বাবার কোনো খবর নেই, পূজা হবে কি না, এই প্রশ্ন উঠল আমাদের পরিবারে । কাকা বললেন, দাদার খবর নেই, অন্য সময় চিঠি দিতেন, পূজার আয়োজন কর, এবার তাও জানালেন না ।
তা বলে, পূজা বন্ধ থাকবে ? বড়-মা'র সাফ কথা ।
কিছুই করার নেই, বৌদি ।
ফলে, পূজা হবে না, ভেবে, মন খারাপ সকলের । আমার ব্যস্ততা রিহার্সাল নিয়ে । অভিমন্যুবধ যাত্রাপালার অভিমন্যু আমি, তাতেই ডুবে আছি । অষ্টমীর রাতে এই যাত্রাপালা অভিনীত হবে, বলে, উত্তেজিতও খানিকটা ।
সপ্তমীর বিকেলে এলেন বাবা । এসে দেখলেন, পূজামণ্ডপ অন্ধকার, সমগ্র বাড়ি জুড়ে এক বিষাদ যেন ছড়িয়ে আছে ।
ব্যাগ উঠানে রেখেই কাকাকে ডাকলেন, কেন পূজার আয়োজন করনি ?
কাকা তার বক্তব্য জানালেন । গম্ভীর হয়ে, বাবা আদেশ দিলেন, বিজয় ঠাকুরকে ডাক । হ্যাঁ, সঙ্গে রমেশ আচার্যকেও । রমেশ আচার্য মানে গণক, প্রতিমা তিনিই প্রতিবছর বানান । সে প্রতিমা প্রত্যেক বছর একই থাকে, কোনো অদলবদল নেই ।
বিজয় ঠাকুর আর রমেশ আচার্য এলে, বাবা প্রথমে, বিজয় ঠাকুরকে বললেন, আজ সপ্তমী । রমেশ যদি আজ রাতের মধ্যেই প্রতিমা তৈরি করে দেয়, আগামীকাল, আপনি একসঙ্গে ষষ্ঠীর বোধন, সপ্তমী ও অষ্টমীর পূজা করতে পারবেন তো ? কোনো শাস্ত্রকথা শোনাবেন না, স্রেফ পারবেন কি না, বলুন ।
বিজয় ঠাকুর হেসে উঠলেন । না পারার কিছু নেই, প্রফুল্ল । ওসব নিয়ম তৈরি করেছে মানুষই, এই পূজার নিয়মও তৈরি করব আমরা ।
সারারাত ধরে প্রতিমা তৈরি করলেন গণক, সে প্রতিমা পুতুলের মত হলেও, সেবারই, প্রথম, রমেশ আচার্য তার প্রথার বাইরে কাজ করলেন ।
অষ্টমীর দিন সকাল থেকে ভিড় আমাদের ঘরে । এমন আজব ঘটনা এর আগে কেউ দেখেনি । অন্দরমহলে কান্নাকাটি, যদি অমঙ্গল হয়ে যায় কিছু ।
পূজা শেষ হতে হতে বিকেল । পঞ্জিকার তিথি নক্ষত্র উপেক্ষা করে, পুরোহিত দর্পণ তুচ্ছ করে, বিজয় ঠাকুর পূজা করলেন অন্তর দিয়ে ।
সন্ধ্যারতির আগে, বললেন, এই পূজা করতে পেরে, প্রফুল্ল, আমি আজ প্রকৃত ব্রাহ্মণ হলাম ।
রাতে, মঞ্চে, সপ্তরথীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করার সময়, আমার হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল দর্শকের দিকে । না, ঘাবড়ে যাইনি, বিজয় ঠাকুরের কথা মনে ছিল, ভাবলাম, অভিনয় মানুষই করে, সুতরাং, তলোয়ার ছাড়া যুদ্ধ করেই মাতাব দর্শক ।
বলে রাখি, দর্শকদের থেকে, সে বছর, সাতশ টাকা পুরস্কার পেয়েছিলাম ।