হাজারিবাগ গ্রিক সৈনিক ও স্মৃতি্র দুর্গ

পার্থজিৎ চন্দ


বহুদিন আগে, ঠিক মনে নেই কতদিন আগে, একটি ইংরেজি সিনেমা দেখছিলাম। দেখেছিলাম কি না ঠিক তাও মনে নেই; কিন্তু না-দেখে থাকলে একটি বিশেষ দৃশ্য কেন এত স্পষ্ট ভাবে মনে গেঁথে থাকবে!
সুদর্শন, কিন্তু ক্লান্ত গ্রিক সৈনিক ফিরে আসছে ঘরে। সমুদ্রের নীল ঢেউয়ের মাথায় দুলছে নৌকো। শ্মশ্রুমণ্ডিত সৈনিক … শরীরের দু’এক জায়গায় ক্ষত থেকে চুঁইয়ে পড়ছে রক্ত। একটা ক্লোজ-শট তার চোখ দু’টিকে ধরে রয়েছে।
সে যেখানে ফিরছে সেটা আসলে কিছু সংকেত। কিছু ‘মেমোরেটিভ সাইনস।’ স্মৃতির ভিতর একটা বর্শা বারবার খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রেখে গেছে কিছু চিহ্ন। সেখানেই তাকে ফিরে ফিরে আসতে হবে। হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানো আসলে সে-সব চিহ্নগুলিকে, সংকেতগুলিকে ক্রমশ জাগিয়ে তোলা।
অনঙ্গ অন্ধকার, অথচ মাতৃগর্ভের মতো প্রিয় এক দুর্গ। আধুনিক মানুষের যে-পারপারহীন বিষন্নতা ও আশ্রয়হীনতা তার ঠিক উলটো দিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই দুর্গ। জীবনের মেটা-থিয়েটারে ঘটে যাওয়া সব বিপন্নতার সে যেন এক সহদর। এক ছাদের নীচে থেকে আজও একে অপরকে চিনতে পারে না। এই না-চিনতে পারাটাই এক স্পেস। একটা পালিয়ে যাবার জায়গা।
আমার বাবাও আমার কাছে সেই গ্রিক সৈনিকেরই মতো। আমার থেকে বেশ কয়েকগুণ বেশী মেমোরটিভ সাইনস খেলা করছে তাঁর মাথায়। তার একটার নাম নোয়াখালি, একটার নাম পুরুলিয়া। আবার কোনও একটির নাম হয়তো হাজারিবাগ।
কল্প-বাস্তব কোনও পরিস্থিতি ছাড়া তো আমার পক্ষে বাবার সঙ্গে সেই নোয়াখালির দিনগুলিতে পৌঁছে যাওয়া সম্ভবপর নয়। কিন্তু আমি তো পৌঁছে যাই সেই অমরপুর … সেই খিলপাড়া গ্রাম। দেখতে পাই বাবা-জ্যাঠা মিলে পাঁচ ভাই ছুটে বেড়াচ্ছে মাঠের পর মাঠ। আমার রোগা পিসির বয়স তখন কত আর! সন্ধেবেলা সে ছোট ভাইটিকে গল্প শোনাচ্ছে। ভূত আর রাক্ষসের গল্প।
তখন কি আমার পিসিও জানত যে খুব দ্রুত রাক্ষস ঝাঁপিয়ে পড়বে মানুষের জীবনের ওপর! উদ্বাস্তু হয়ে উঠবে লক্ষ লক্ষ মানুষ!
এই মেমোরেটিভ সাইনের সঙ্গে প্রায় হাত ধরাধরি করে আসে আরেকটি চিহ্ন। আরেকটি সংকেত। সে-দাগের নাম ‘হাজারিবাগ’ বা ‘বরকাকাণা।’
সেই সংকেত আমাকে হাত ধরে তুলে দেয় এক ছোট রেল-ইঞ্জিনে। ভুস ভুস করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ইঞ্জিন এসে থেমেছে লোকো শেডে। সেখানে সদ্য চাকরিতে যোগদান করেছেন শ্রীযুক্ত মাখনলাল চন্দ। কতই বা বয়স! এক দেশের মাটি ছেড়ে আসতে বাধ্য হওয়া সেই যুবক জীবনের ঘূর্ণী থেকে মাথা তুলে বেঁচে উঠতে চাইছে একটু একটু করে। হদ্দ-গরীবের সংসারে, তখন রেলের সেই মাইনের কাছে তুচ্ছ হয়ে যায় কুবেরের ধনসম্পদ।
ছোট ভাই আর মা-কে ছেড়ে বেঁচে থাকবার কথা তখনও ভাবতে পারে না ছিন্নমূল যুবক।
শহরের একটু বাইরে সে লোকো-শেড। তরুণ দাদার কাছে মাঝে মাঝেই পালিয়ে আসে ছোট ভাই। পুরুলিয়া থেকে বরকাকাণা আর কতই বা দূর!
শীতের হাজারিবাগ আর বরকাকাণায় ঘোর ঠাণ্ডা নামে। ছোট ভাইটির আবার ঠাণ্ডা লাগার ধাত। রেল তার কর্মচারীদের জন্য দু-তিন সেট ‘খাঁকি কাপড়ের’ ড্রেস দেয়। ফুলহাতা জামা ট্রাউজার; এমনকি একটা কোট’ও। চাকরীতে যোগ দেবার পর থেকে বেশ কিছু ড্রেস পেয়েছে মাখনলাল। নিজের গায়ে দেওয়া মোটা কম্বলটা ভাইয়ের গা’য়ে আরও কিছুটা টেনে দিতে দিতে মাখনলাল ভাবে, কালই শহরের হিন্দুস্থানী টেলর-মাস্টারের কাছে নিয়ে গিয়ে নিজের একটা জামা-প্যান্টের সেট ভাইয়ের মাপে কাটিয়ে আনবে।
রাত্রের এই সময়টা ভাইকে একটু কথা শোনাতেও ইচ্ছে করে। দেশ ছেড়ে আসা মানুষকে দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যেতে হয়। কিন্তু ছোট ভাইটি বেশ ছন্নছাড়া। লোকো-শেড থেকে অনেকদূরে উদাসীন দাঁড়িয়ে থাকা ইঞ্জিনের মতো জীবন কাটিয়ে দেবার দিকেই তার লক্ষ্য।
বকাঝকা করতে গিয়েও তো ঠোঁট খুলতে চায় না। সে জন্মানোর আগেই তো বাবা মারা গেছেন। বাবাকে চোখে দেখেনি ছোট ভাইটি।
একটা লোকো-ইঞ্জিন দম ছেড়ে কোথাও মিশে যাচ্ছে অন্ধকারে। শীতের রাত্রে, পাহাড় আর শাল-জঙ্গল ছাড়িয়ে সেই শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে দূর থেকে দূর।



মাখনলালের কাছে মাঝে মাঝে দীর্ঘ দীর্ঘ দিন থেকে যায় ছোটভাই। কোনও কাজ নেই। কেরিয়ার নামক শব্দটি তখনও মানুষের থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে থাকা একটি শব্দ। বর্ষার দিনে রামগড় বরকাকাণা হাজারিবাগ থেকে দেখা যায় পাহাড়ের সার। টিলা তো কাছে-পিঠেই। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হবার পর কাঁচাপাকা রাস্তা ঝিকমিক করে ওঠে অভ্রের আলোয়। জীবনের চার পাশে অভ্র চড়ানো। শাল-জঙ্গলে এসে পড়েছে বিকেলের রোদ।
বাঙালী আছে বেশ কিছু। কিন্তু ছোট ভাইটির বেশী মেলামেশা ঝাড়খণ্ডী ছেলেদের সঙ্গে। তাদের সঙ্গে সে চলে যায় দূরের পাহাড়ে। বা রামগড়ের সেই সিনেমাহলে। যার নাম ‘শান্তি টকিজ।’ ক্যান্টনমেন্ট এলাকা বলে বেশ শহরের হালচাল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সে দেখে সব।
আর আছে ‘সেন্ট কলম্বাস কলেজ।’ প্রথাগত পড়াশোনা বেশী দূর করে ওঠা হয়ে ওঠেনি তাঁর। জীবনের দিকে বেশী ফিরে তাকায়ও না সে।শুধু এই কলেজটা দেখলে মাঝে মাঝে বুক চিনচিন করে।
বিকেলে ছোট স্টেশনে ইয়ারবন্ধু নিয়ে আড্ডা জমে ওঠে। এক লাইন থেকে খুব ধীর গতিতে আরেক লাইন হয়ে লোকো-শেডের দিকে যাবে ইঞ্জিন। এ-সময়ে ইঞ্জিনে উঠে পড়লে বেশ একটা অ্যডভেঞ্চার হয়।
বন্ধুদের নিয়ে লাফিয়ে উঠে পড়ে সে। দাদা জানতে পারলে বকুনি বাঁধা। দাদার দিকে চোখ তুলে এখনও কথা বলতে পারে না। কোনও দিনই পারবে না হয়তো। কিন্তু এই ইঞ্জিনে চড়ার লোভ সামলানোও যায় না। বর্ষা মাথায় নিয়ে ভুস ভুস করতে করতে ইঞ্জিন চলে। লোহার গন্ধ এসে লাগে নাকে। জলে ভেজা লোহার গন্ধ।
মুরী গোমো হয়ে ভুরকুণ্ডা পত্রাতু ম্যাকলাক্সিগঞ্জ...। আরও কত কত নাম। নাম নয়, এক একটা চিহ্ন। সংকেত।
দুর্গাপুজোয় কি হয় না সেখানে একটা? হয় তো। আলবাত হয়। ছোট একটা প্যান্ডেল। বাঙালীরাই বেশী ভিড় জমায়। একটা প্যান্ডেলের সামনেই চক্কর কাটা। কোনও বছর পুজোর সময়ে দাদার মাইনে হলে ভাইয়ের আনন্দ আর ধরে না। হাজারিবাগের মিষ্টি তার মুখে রোচে না। শুধু এই মাইনের দিনে এক বাঙালী মিষ্টিওয়ালা মিষ্টি নিয়ে আসে। মানুষের হাতে ওই একদিনই টাকা থাকে। এবং ওই একদিনই মিষ্টি খাবার দিন।
কিন্তু শরৎ কি এত সহজেই আসে! আসে না।
তখন শরৎ আসার আগে পৃথিবী শান্ত হয়ে যেত। গা শিরশির করা একটা ঠাণ্ডা এসে ধীরে ধীরে জাঁকিয়ে বসতে শুরু করত পৃথিবীর বুকের উপর। ঘাসের আগায় শিশিরবিন্দু দেখা যেত। আর দূরের পাহাড়ে সত্যি সত্যিই আমলকির বন ছিল। ঘন আমলকির বন। শেষ শরতের দুপুরে সে কী এক মন খারাপের আবহাওয়া। ‘আমলকি বন কাঁপে যেন তার বুক করে দুরুদুরু...।’ পাতা খসানোর সময় আসছে।
বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসছে এক কিশোর।দু’হাত ভর্তি সত্যি-আমলকির সবুজ সতেজ শরীর। উনিশ-শো ছাপান্ন সাতান্ন আটান্ন সাল থেকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে স্মৃতির শালবন বেয়ে ক্রমাগত নেমেই চলেছে এক কিশোর।
আমি কোনও দিন রামগড় ভুরকুণ্ডা পত্রাতু শান্তি-টকিজ এ্যট রামগড় লোকো-কলোনী এ্যট বরকাকানা সার্চ করিনি। ইচ্ছে করেই করিনি।
শুধু জানতে ইচ্ছে করে, সে-আটান্নয় কি শান্তি-টকিজে ‘মধুমতী’ রিলিজ করেছিল?