অশ্রুসংলাপ

সাদিয়া সুলতানা

১.
এমন এক একটা দিন যায়, পাহাড়ের মতো ভারী। নিশ্চল। টেনে চলতে পারি না। থির দাঁড়িয়ে থাকি, সূর্যাস্তের অপেক্ষায়। সূর্যের যাত্রাবিরতিতে সবাই যখন স্বপ্নযোগী তখন আমার বুকে অশ্রুফুলের বসত। জানালার ফাঁক গলে হাসনাহেনার সুবাস নিঃসঙ্গ ঘরে ঢুকে পড়ে। সূর্যের জুজুতে দিশেহারা আমি সেই সুবাসে ভুলি না। জোছনামুখোও হই না। তবু সূর্যের আলো শরীরে মেখে বিস্রস্ত জোছনা আমার পালঙ্কে আছড়ে পড়ে।

তারপর...
অশ্রুসংলাপে রাত ফুরিয়ে আবার একটা দিনের শুরু হয়, পাহাড়সম।

২.
মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে দর্জির কাছে গিয়ে নিজের কান সেলাই করি, চোখ সেলাই করি। দ্বিপদীর চতুষ্পদ প্রাণীর মতোন আচরণ, গোঙানি আর সহ্য হয় না। অত নিপাট অন্ধকারও চোখে সয় না।

আমি চলেই যেতাম। কিন্তু ফেলে আসা দিনগুলি কেবলই পা টেনে ধরে। অন্তরমহলে আড়ি পাতলে সেই কবেকার সুখস্মৃতি বুকের ভেতর ঝুমঝুমির মতোন বেজে ওঠে। সেসবই আমার কাল হয়। পা মাটিতে ডুবে যায়। আমি স্বপ্নকান্ত গাছের মতো থমকে থাকি। যেতে পারি না। জানালার ধারে বসে আপনমনে বিকেলের হলুদ আলোয় পাখিদের দলবাজি দেখি। পরিশ্রান্ত পাখিরা চলে গেলে ধীরে ধীরে মায়া আলো মুছে গিয়ে রাত নামে। সঙ্গে নামে ঘোর অন্ধকার। এরপর সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমি আঁধার সাজাতে বসি।

৩.
আমি তার চলে যাওয়া দেখি। সে চলে যায় নিঃশব্দে, নিথর মাটিতে রেখে যায় তার পদচিহ্ন। সে চলে যায়। তার সামনে বেহিশেবী মহাকাল আর পেছনে অপেক্ষার মায়াডোর। শীতরাত্রির হিম ঝরে পড়ে গাছের পাতায়। কুয়াশার ঘোরে অচল চোখ ঝাঁ ঝাঁ করে। খেই হারায়। জানে, রাত্রিতে আমি একা। বিশ্বসংসারে আমি ভিন্ন আর কেউ নেই।

অদ্ভুত সময় এক! একদিকে কষ্টগুলো শীতপাতার মতোন খসে খসে পড়ে। আরেকদিকে চোখের কোণে জমে থাকা নুন জমানো গল্পগুলো অন্ধরাত্রির নিঃসঙ্গতায় গলে যায়। সে ফিরে আসে না। বাতাসের ভেজা শরীরে কেবল তার গন্ধ জুড়ে থাকে।