ঈশ্বরের সান্নিধ্যে

শীর্ষ ভট্টাচার্য

সন্ধ্যে হচ্ছে । রোজকার নিয়মমত ওই গ্রামের বৌটি সন্ধ্যেপ্রদীপ হাতে তুলসীতলায় প্রণাম করছে হাঁটু গেড়ে । এক হাতে প্রদীপ আড়াল করে ধরে দুয়োরে আলো দিচ্ছে । শাঁখ বাজাচ্ছে ঠাকুরঘরে গিয়ে । সব অমঙ্গল দূর কর ঠাকুর , সব পাপ ধুয়ে দাও তোমার ঐশ্বরিক ক্ষমতা বলে । আমরা সামান্য অবোধ মানুষ , কত যে পাপ করে চলি নিজেদের অজান্তে … ক্ষমা কোরো প্রভু ! আচ্ছা এই বৌটি কি খুব ধর্মভীরু ? সেই ছোট্টোবেলায় বিয়ে হয়ে চলে এসেছিল এই বাড়িতে । তখন অনেকটা শাশুড়ির গুঁতোয় , কিছুটা সংস্কারের চোটে এইসব লোকাচার ও রপ্ত করে ফেলেছে । ঈশ্বর বলতে ও বোঝে একটা চাপা ভয় , এক নাম না জানা দূরত্বের নাম । যাকে , তাকে তুলে রাখতে হয় , যাকে নিয়ে একটাও হালকা কথা বললে পাপ হয় খুব । এই সময় শহরের ফ্ল্যাটবাড়িতেও শাঁখ বেজে উঠেছে । তুলসীতলা নেই , তবু ছোটো এক কাচের পাল্লার আড়ালে ছোটো এক সিংহাসনে ঠাকুর বসে আছেন । হয়ত এ বাড়ির বয়স্কা কোনো সদস্যা এই কাজটি নিয়মিত করে থাকেন । বাকী সদস্যরা স্নান করার পর একবার জোড়হাত করে যান এখানে এসে । ঈশ্বর এখানে নিয়মের মত , অভ্যেসের মত । এখানে কোনো ভয় দেখি না । অসময় এলে , বিপদের দিনে অবশ্য অভিযোগ বা অভিমান বর্ষিত হতে থাকে ঠাকুরের গায়ে । এ তুমি কি করলে ঠাকুর ? আমি কি দোষ করেছি , যে আমাকে এমন শাস্তি দিচ্ছ … ইত্যাদি , ইত্যাদি ।
ঈশ্বর কি তাহলে একটা কনসেপ্ট ? একটা মিথ ? একটা ভুল তথ্যের ওপর দাঁড় করানো হয়েছে যাকে , সেই ঈশ্বর কি একটা বিলাস মাত্র না ? তথ্য ভুল না ঠিক , এ প্রসঙ্গে অবশ্য বিস্তর বিতর্ক চলতে পারে । তবে ওই বিতর্কটুকুই সার । ঈশ্বর আছেন , এমন প্রমাণ দিতে পারবেন না কেউ । ঈশ্বর সোজা সটান দাঁড়িয়ে আছেন বিশ্বাসের ওপর ভর দিয়ে । তোমার বিশ্বাস , যেটাকে তুমি ঠিক ভাবছ , ঈশ্বর আছেন । আর নাস্তিকের বিশ্বাস , যেটাকে তুমি ভুল ভাবছ , ঈশ্বর নেই ।
ঈশ্বরের মূর্তি গড়ে পুজো হচ্ছে । কালী , দুর্গা , গণেশ , লক্ষ্মী , নানা রূপে পূজিত হছেন ঈশ্বর । এখানে ইশ্বর বারেবারে তাঁর রূপ বদলাচ্ছেন । এক মুখ থেকে আর এক মুখে চলে যাচ্ছেন অবলীলায় , কিম্বা এক মুখোশ থেকে আর এক মুখোশে । তুমি যেই মুখ ভাবলে , ভগবানের মুখ তোমার কাছে ঠিক । আর যদি মুখোশ ভাবো , তখন সেই ঈশ্বরের মুখ মারাত্মক এক একটা ভুল তোমার কাছে । আর যদি আকারে বিশ্বাস না রাখো , মূর্তি তোমার কাছে একটা হাসকর ভুল ছাড়া আর কিছু না , নিরাকার ব্রহ্ম তোমার মনে , তোমার প্রাণে সুধা ঢেলে দেয় , তোমার আত্মার বিকাশ ঘটায় , সেখানেও সেই একই যুক্তি খাটে । তুমি যদি ঠিক ভাবো , তো ঠিক – নইলে ঈশ্বর তোমার কাছে সেই ভুলই থেকে যাবেন । শিল্পী সরস্বতীকে ঈশ্বর ভাবলেন না , তাঁর অসামান্য শারীরিক সৌন্দর্য তিনি ফুটিয়ে তুললেন রং-তুলিতে । শিল্পীর কাছে ওই শারীরিক সৌন্দর্যই তখন ঈশ্বর , তাঁর কাছে তাঁর শিল্পই ঈশ্বর । আর তুমি ভাবলে তোমার ঈশ্বরকে অপমান করছেন শিল্পী । তুমি রে রে করে তেড়ে এলে মারতে । তোমার কাছে তুমি ঠিক , শিল্পীর কাছে তুমি ভুল । আবার উল্টো দিক থেকে দেখলেও সেই একই ঠিক-ভুলের মাঝে আমরা রয়ে গেলাম ।
ঈশ্বরকে বারবার পর্যদুস্ত করতে পারে নাকি একমাত্র শয়তান । এই শয়তানের কনসেপ্ট ঠিক ঈশ্বরের বিপরীত । ঈশ্বর যতটাই সাদা , শয়তান ততটাই কালো । আমরা কেউ শয়তানের পূজারী নই । চরমতম খারাপ মানুষ বলি যাকে আমরা , তাদের বলি যেন সাক্ষাৎ শয়তান । এখন এই শয়তানের অস্তিত্ব তখনই তুমি মানবে , যখন তুমি ঈশ্বর সম্বন্ধে অন্ধ হবে । ঈশ্বর আছেন বলেই শয়তান আছে তাঁকে বেগ দিতে । তাঁর সুপার পাওয়ার দেখানোর জন্য একজন শয়তান চাই । সবসময় ঈশ্বর জিতে যাবেন , ঈশ্বর সৃষ্টি হয়েছেন জয়ী হবার জন্যই । আর শয়তানের হার অবধারিত । এইসব সাজানো-গোছানো পরিকল্পনাকে তুমি যদি রূপকথা ভাবো , ভাবতেই পার । বিশ্বাসীদের কিছু যায় আসে না । তাদের কাছে পৃথিবীর সেই আদি থেকে শয়তান সাপ রূপে লোভ দেখিয়ে আসছে , এই শয়তানই নাকি প্রলয় আর ধ্বংসের কারন । তুমি সাপের হিলহিলে গড়ন দেখছ , তার আঁকাবাঁকা চলন দেখছ , তার বিষদাঁত দেখে ভয় পাচ্ছ , অথচ তুমি জানো সাপ খুব নিরীহ প্রাণী , খুব ভয় না পেলে ও তোমাকে ছোবল মারবে না । তাহলে কি এই বিষের ধারণা থেকে শয়তানকে সাপের রূপে দেখা হয়েছে ! এই বিষ না থাকলে সাপ তখন তোমার কাছে অতি সুন্দর এক প্রাণ , ঈশ্বরের অংশ ।
কোনো এক বর্ষার রাতে লোডশেডিঙের সময় মোমবাতি জ্বেলে ভূতের গল্পের আমেজ নিয়েছি আমরা প্রায় সবাই । একটা ছমছমে ভয় এসে ঘিরে থাকত তখন । গায়ে কাঁটা দিত সেই অদৃশ্য ভূতের না-দেখা অস্তিত্ব ঘিরে । তুমি হয়ত ভূতে বিশ্বাস কর না , কিন্তু এই ছমছমটুকু উপভোগ করছ বেশ । দিনের বেলায় এই ছমছম তোমার কাছে ছেলেমানুষী মনে হবে , নিজের মনেই হাসবে তখন । কিন্তু সেই রাতে ভূত তোমার কাছে একদম মিথ্যে ছিল না ! আর যারা ভূতে বিশ্বাসী , তারা আরো বেশি করে ভয় পাবে , আরো জড়িয়ে ধরবে ওই ভয়টাকে গায়ের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে ।
ঈশ্বর , শয়তান বা ভূত সবটাই তোমার বিশ্বাস বা অবিশ্বাস । রাখবে রাখো মাথায় করে , নইলে ছুঁড়ে ফেলে দাও ডাস্টবিনে । রাখে হরি মারে কে ? তোমাকে হরি রাখবে না হরি তোমায় রাখবেন , তুমি থাকবে , না ঈশ্বর থাকবেন , ঈশ্বরের সাথে সাথে শয়তান আর ভূতও থাকবে , নাকি কোনো কিছুই থাকবে না , শূন্যতা সম্বল করে চলবে তুমি , সে বিচারের ভার তোমার ওপরেই রইল । তুমি হয়ত অসীম শুন্যতাকে ঈশ্বর ভেবে নিয়ে তার মধ্যে ভাসতে থাকলে , তোমার দুটো ডানা গজালো , তুমি উড়তে উড়তে চলে গেলে মহাশূন্যে , আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে । আমরা তোমায় দেখতে পেলাম না , আমরা ভাবতে শুরু করলাম , তুমিই ঈশ্বর । যাই হোক না কেন , সবার ওপর এটাই সত্য , একদম স্ট্যাটিক যেটা , সে হল তুমি । তুমি অবলম্বন হিসেবে যদি ঈশ্বরকে বেছে নাও , সেটা ভুল না ঠিক , যাচাই করতে পারে তোমার বিশ্বাস । যখন এই বিশ্বাস একটু টলে যায় , তুমি দেখবে তুমি বা তুমি-রূপী ঈশ্বর তোমার থেকে দূরে চলে যাচ্ছে । তুমি হাত বাড়ালেই তিনি আবার ফিরে আসছেন ডানা গুটিয়ে । একমাত্র তুমিই রইলে শেষ দেখার জন্য । শুভেচ্ছা …