ক্ষুধা

রাজিব মাহমুদ


ঢাকা’র একটা ব্যস্ত সিনেমা হল। হলে ঢোকার কেঁচিগেটে’র পাশেই ভেতরে চলা সিনেমাটা’র একটা বড় পোস্টার। ওটার ঠিক মাঝ বরাবর একটা বড় ফুটো। তবে মাঝের জায়গাটাকে এইম করে ফুটোটা করা হয়নি পোস্টারটায়; এইম করা হয়েছে কোলেস্টরেল স্বাস্থ্য-ভরপুর নায়িকার ডান বুককে। আসলে ঠিক বুকও নয়, বলা যায় বুকেরও একেবারে মাঝ বরাবর—হুম, ঠিক ধরেছেন, একেবারে বোঁটাতে। ইন ফ্যাক্ট বোঁটারও ঠিক মধ্যেখানে মানে যে জায়গার নাম অভিধানে নেই। থাকবেই বা কীভাবে? এই এক পোস্টারের বর্ণনা দিতে গিয়ে শরীরের এত সুনির্দিষ্ট জায়গা’র কথা বলতে হবে এটা কে জানত?
চোখা কিছু দিয়ে খুঁচিয়ে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে ওখানকার সুগোল মাংসটুকু; মানে পোস্টারের ঐ জায়গার কাগজটুকু। আর ঐ শূন্য জায়গাটার দিকে ঠোঁট বেকিয়ে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছে আমির আলী। ঢাকা তার কাছে নতুন কোনো জায়গা নয়। এখানে সে চাকরি করে গেছে প্রায় ২ বছর, একটা এনজিও’র পিয়ন পদে।
পোস্টারের ঠিক ঐ জায়গায় বা মিডস্ট্যাম্প মিস করা ক্যাচআউটের বলের মত আশেপাশে অল্প-বিস্তর ছিটকে যাওয়া এরকম ফুটো আমীর আলী মফস্বলেও দেখেছে। তবে ঢাকা’র সিনেমা হলগুলো’র সামনে থাকা পোস্টারগুলো নিখুঁত হয়-রীতিমত শিল্পীর কাজ। যে করেছে সে ঐ একান্ত মাংসটুকু ছাড়া আশেপাশের অন্য জায়গাগুলোতে যে আগ্রহী নয় সেটা তার কাজের সুনির্দিষ্টতা থেকেই বুঝিয়ে দিয়েছে। মফস্বলের পোস্টারগুলোতে এমনটা দেখা যায় না। অনেক সময়ই বোঁটার আশেপাশের কাগজও ছেঁড়া থাকে- একটা কাঁচা জিঘাংসা’র চিহ্ন লেপ্টে থাকে পুরো ব্যাপারটায়। এর সাথে আশেপাশে লেগে থাকে পানের পিক ও খয়েরের দাগ। যা দেখে মনে’র কোনো সুপ্ত কামনা জেগে ওঠার বদলে বরং এক ধরনের বিবমিষা জাগে।
আমির আলী’র আর যাই না থাকুক একটা শিল্পীত মন আছে নিশ্চিত। অশিল্পীত কোনো কিছুই তার সহ্য হয় না। এই যেমন এনজিওটাতে চাকরি করার সময় তার বসের বাড়িতে নানা এটা-সেটা ছুঁতোয় যাওয়া-আসার ফলে সেবাড়ির কাজের মেয়ে সিতারা’র সাথে ঘনিষ্ঠ মেলামেশার সুযোগ পেয়েছিল, বা বলা যায় সুযোগ করে নিয়েছিল।
সপ্তাহ দেড়েক ইটিশ-পিটিশের পর একবার অন্ধকার সিঁড়ি’র কোনায় কাজের মেয়েটার বুক চেপে ধরেছিল আমির আলী। ষোড়শী মেয়েটার জীবনে বোধহয় ওটাই প্রথম পুরুষের স্পর্শ ছিল-ভেতর থেকে শিউরে উঠেছিল সে। আমির আলী জানত হাতে সময় কম। আরও কয়েকটা চাপ কিছু খুচরো চুমু’র সাথে সুনির্দিষ্ট গ্যাপে দিয়ে দিয়ে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার রাস্তাটা পরিষ্কার করতে হবে। আমির আলী’র মনের আশ মিটে যাবার পরেও মেয়েটা বেশি গায়ে গায়ে এসে পড়ত; অভিজ্ঞ আমির জানে ব্যাপারটা কোনদিকে যাচ্ছে। সেই সম্ভাবনা’র কুঁড়ি বেরোনোর আগেই সিতারার নামে বসের কাছে অভিযোগ করে শেষমেশ মেয়েটাকে তার গ্রামের বাড়িতে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল সে।
আপদ বিদায়! এরকম শান্তি অনেকক্ষণ ধরে রাখা বাথরুমের সাথেই শুধু তুলনীয়।
এ জাতীয় ঘটনা আমীর আলী’র জীবনে এন্তার। বিয়ের পরেও তার প্রাক-বিবাহ উদ্দামতা একইরকম রয়ে গেছে।
তবে এই মূহুর্তে পোস্টারটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার সুখ-চিন্তার স্রোতটা বেঁকে যায়। এর দু’টো কারণঃ এক। পোস্টারটার ঠিক পাশেই শেষ বিকেলের আলোতে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে শস্তা কড়া পাউডার ও শরীরে একইরকম সুগন্ধী। তবে চুলটা বাঁধা বেশ যত্ন করে। আর গায়ের কাপড় বুকের জায়গায় আলুথালু, ডান বুকের ঠিক মাঝখানে বোঁটার স্ফীতি চ্যাংড়া পোলাপানের তো বটেই, স্ত্রী-পুত্র নিয়ে সিনেমা দেখতে আসা ভদ্রলোকদের চোখের কোণকেও মুহূর্তের জন্য হলেও চুম্বকের মত টেনে রাখছে। মেয়েটার চারপাশে ঘন মশার ভনভন সন্ধ্যাটাকে অচিরেই আরো ঘন করে তুলতে থাকে।
এর ঠিক পাশেই বাদামি চিকামারা দেয়ালে হেলান দিয়ে এক ভিখারিনি বসে আছে। তার কাপড়ও ঠিক একই জায়গায় আলুথালু। তবে বেশভুষা মলিন। কোলে একটা দশ-এগারো মাসের শীর্ণ বাচ্চা, সে বড় বড় চোখ করে মায়ের বুকের দিকে তাকিয়ে একটা আঙুল মুখে পুরে রেখেছে। চোখে-মুখে ভীতি। এই ভীতির কারণ কিছুক্ষণ পর পর মায়ের বুকের দিকে অগ্রসর হতে গিয়ে মায়ের গালিসহ থাপ্পড়—
‘বান্দির পুত আরেকবার যদি এরম করছোস...থাবড়া দিয়া এইহানেই মাইরা থুইয়া যামু...এত খিদা ক্যান তর?’
আমির আলী চোখ সরিয়ে নেয়। সন্ধ্যাটা কেমন ঝিমিয়ে যায়। গরম পড়েছে আজকে। কিন্তু আমির আলী’র কিঞ্চিৎ শীতবোধ হতে থাকে।